হযরত উয়ায়েস্‌ কারনী (রহ)

পরিচয়ঃ হযরত উয়ায়েস্‌ কারনী রেহ.) একজন তাবেঈ ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) বলেছেন -।ওয়ায়েস আল্-কারনী তাবেঈগণের মধ্যে উত্তম ।” একদিন রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) বলেন,-“আমি বাস্তবিক আল্লাহ্‌ তাআলার রহমতের সুগন্ধযুক্ত হাওয়া ইয়ীমনের দিক থেকে পাচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ্‌ সো.) আরও বলেন, “ কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তা’আলা সত্তর হাজার ফেরেশ্তাকে উয়ায়েস্‌ কারনীর অনুরূপ চেহারা দিয়ে সৃষ্টি করবেন। হযরত উয়ায়েস্‌ এ সকল ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবেন। তিনি দুনিয়াতে নির্জন স্থানে এবং লোকালয় থেকে দুরে থেকে ইবাদত-বন্দেগি করতে ভালবাসতেন ও নিজেকে গোপন রাখতে চেষ্টা করতেন । তাই
কিয়ামতেন দিন তাঁকে আল্লাহ্‌ তায়ালা “সিদক্‌’ নামক স্থানে রাখবেন । আল্লাহ্‌ তাআলা তখন বলবেন- আওলিয়াগণ আমার মিনারের নীচেঃ তাদেরকে আমি ছাড়া কেউ চিনতে পারে না। একদিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবাগণকে বলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছেন, রাবীয়া’ ও মোযার সম্প্রদায়ে ছাগল পালের পশমের পরিমাণ গোনাহ্গারের জন্য তিনি সুপারিশ করবেন।” সেকালে এ দুটি সম্প্রদায়ের ছাগল দুনিয়ায় সুপ্রসিদ্ধ ছিল। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করেন, ইয়া “রাসূলাল্লাহ্‌ (সা.) এমন ব্যক্তি কে?” তিনি বলেন, “তিনি আল্লাহর একজন গোলাম, নাম উয়ায়েস্‌ কারনী; তিনি কারণ নামক স্থানে বাস করেন।” সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.)! “তিনি কি আপনাকে দেখেছেন?” উত্তরে হযরত (সা.) বলেন, “তিনি আমাকে প্রত্যক্ষভাবে দেখেন নি বটে, কিন্তু অন্তরের চোখে আমাকে চোখে দেখছেন।” সাহাবাগণ আরয করেন, “আপনার আশেক হলে তিনি কেন আপনার খিদমতে আসেন না?” রাসূলুল্লাহ সো.) উত্তরে বলেন, “তিনি দুটি কারণে আসতে অক্ষম। প্রথমত, তিনি আল্লাহর ইশৃকে এবং তার রাসূলের (সা.) প্রতি ভক্তিতে মশগুল থাকেন। দ্বিতীয়তঃ, শরীয়তের হুকুম একমনে পালন করেন। তার মা অন্ধ এবং হাত-পা অচল। মাতার ভরণপোষণের ভার উয়ায়েস্‌ কারনীর ওপর। উট চরিয়ে তিনি নিজের ও মায়ের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন।” অতপর রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) বলেন, “আমরা তাকে দেখব না । হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রো.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, “তুমি ও তাকে তোমার জীবনকালে দেখবে না। কিন্তু ওমর ফারুক (রো.) উয়ায়েস্‌ কার্নীকে দেখবেন।” ওফাতের সময় রাসূলুল্লাহ্‌ হযরত ওমর ও হযরত আলীকে (রা.) বলেন, “তোমরা আমার ওফাতের পর আমার জামা উয়ায়েস্‌ কারনীকে দিয়ে তাকে আমার সালাম পৌছাবে ।”
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের অনেক পরে হযরত ওমরের খিলাফতের সময় হযরত ওমর ও হযরত আলী (রা.) কুফায় গিয়ে খুতবার মধ্যে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ হে কুফাবাসিগণ! তোমরা কি উয়ায়েসের সন্ধান দিতে পার?” তারা উত্তর বলল, সে একজন পাগল লোকালয়ে বাস করে না, জংগলে উট চরিয়ে থাকে । দিনশেষে একবার শুস্ক রুটি আহার করে । মানুষ যখন হাসে, সে তখন কীদে, মানুষ কাদলে সে হাসে।” এর পর হযরত ওমর (রা.) ও হযরত আলী (রা.) একটি নির্জন স্থানের দিকে রওনা হয়ে তারা সেখানে গিয়ে তাকে প্রথমে নামাযরত দেখেন। তিনি লোক আগমনের শব্দে নামায সংক্ষেপ করলে সাহাবাগণকে সালাম করেন। হযরত ওমর (রা.) সালামের জওয়াব দিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন, আবদুল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌র দাস)। তখন হযরত ওমর (রা.) বলেন, “আমরা সবাই আল্লাহ্‌র দাস। আপনার প্রকৃত নাম কি?” উত্তরে তিনি বলেন,“উয়ায়েস্‌।” হযরত ওমর (রো.) বলেন, “আপনার ডান হাতখানা দেখান।” উয়ায়েস্‌ নিজের ডান হাতখানি দেখালে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নছীহত অনুযায়ী তার ডান হাতে সাদা চিহ্ন দেখতে পেয়ে হযরত ওমর (রা.) তার হাতে চুমা খেয়ে বলেন,“রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং নিজ জামা মুবারক আপনাকেই দান করেছেন এবং তার উম্মতগণের জন্য দোয়া করতে বলে গিয়েছেন।”
হযরত উয়ায়েস্‌ বলেন, “দোয়ার জন্য তো আপনারাই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং উপযুক্ত।” হযরত ওমর রো.) বলেন, “আমরা তা করছি। কিন্তু আপনি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর নির্দেশ পালন করুন।” হযরত উয়ায়েস্‌ বলেন, “হযরত ওমর! আপনি বিশেষভাবে বিবেচনা করে দেখুন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) যার কথা
বলেছেন তিনি অন্য কেহ হবেন।” হযরত ওমর (রা.) বলেন, “আপনার হাতের যে চিহের কথা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) বলে গেছেন, আমি সে চিহ্ন দেখছি।” হযরত উয়ায়েস্‌ বলেন, “আগে রাসূলুল্লাহর (সা.) খেরকাটি দিন, তারপর দোয়া করব।” হযরত ওমর (রা.) জামাটি প্রদান করলে উয়ায়েস্‌ তা গ্রহণ করে বলেন, “একটু অপেক্ষা করুন।”

এ বলে তিনি সিজ্দায় গিয়ে বলেন, “হে আল্লাহ! যেহেতু রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) এটি আমাকে দান করেছেন, যে পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মদীকে তুমি মা’ফ না কর, সে পর্যন্ত আমি পবিত্র জামা পরব না। হযরত ফারুক ও হযরত মোরতাযা (রা.) নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন কাজ বাকী রয়েছে।” আওয়াজ হল, “তোমার দোয়ার অসিলায় কিছু সংখ্যক লোককে মা’ফ করব । হযরত উয়ায়েস্‌ বলেন, “যে পর্যস্ত সকলকে মা’ফ করা না হবে, সে পর্যন্ত তোমার এ হাবীবের পবিত্র জামা আমি পরিধান করব না।” আওয়াজ হল, “কয়েক হাজার লোককে মা’ফ করা হবে।”

উয়ায়েস্‌ সিজদায় থেকেই এভাবে বলতে ছিলেন। এমন সময় হযরত আলী মোরতাযা (রা.) তার সম্মুখে উপস্থিত হন। হযরত উয়ায়েস্‌ জিজ্ঞেস করেন, আপনারা এখানে কেন এসেছেন? যে পর্যস্ত সমস্ত উম্মতকে মা’ফ না করা হবে, সে পর্যন্ত জামা মুবারক আমি পরব না।” হযরত ওমর (রা.) উয়ায়েসের পরনের কম্বলের দিকে নযর করলেন এবং তাতে আঠার হাজার আলমের ধন-দৌলত দেখে এতই বিস্মিত ও অভিভূত হলেন যে, খিলাফতের প্রতি তার ঘৃণা জন্মে। তিনি বলে উঠলেন, “এমন কেহ কি আছেন, যিনি এক টুকরা রুটির বদলে খিলাফত ক্রয় করবেন?” হযরত উয়ায়েস বলেন, “যার বুদ্ধি নেই একমাত্র সে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে। দুরে ফেলে দিন, যার ইচ্ছা হয় কুড়িয়ে নিক । বেচা-কেনার কি প্রয়োজন?”

তারপর হযরত উয়ায়েস জামা মুবারক পরিধান করে বলেন, “হে আল্লাহ্তাআলা । এ জামা মুবারকের তোফায়লে বনী-রবীয়া ও বনী-মোযার সম্প্রদায় দুটির ছাগ সমুহের লোমরাশির অনুরূপ উম্মতেমুহাম্মদীকে আমার উপলক্ষে ক্ষমা করে দাও । (প্রকাশ থাকে যে, এতিহাসিকগণের মতে এ সম্প্রদায়দ্য়ের কারো ছাগ-সংখ্যা বিশ হাজারের কম ছিলনা ।
হযরত আলী (রা.) হযরত উয়ায়েসের সব কথা শুনে নির্বাক হয়ে বসে পড়েন। হযরত ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করেন, “হে উয়ায়েস! আপনি কেন রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন না?” উত্তরে তিনি বলেন, “আপনারা কি  রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-কে দেখেছেন?” হযরত ওমর ‘হ্যা’ বললে উয়ায়েস “সম্ভবতঃ আপনারা তার জুব্বা দেখেছেন। আচ্ছা, বলুন তার ভ্র-দুটি সংযুক্ত না পৃথক ছিল?” আশ্চর্যের বিষয় যে, কেউ এ কথার সঠিক উত্তর প্রদান করতে পারলেন না।

এর পর হযরত উয়ায়েস বলেন, “আপনারা কি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বন্ধু?” তারা উত্তরে হা বলেন। হযরত উয়ায়েস বলেন, “যদি আপনারা প্রকৃত বন্ধুই হতেন, তাহলে শত্রুরা যেদিন তার পবিত্র দাত ভেঙ্গে দেয়, সেদিন কেন আপনারা নিজেদের দীত ভেঙ্গে ফেললেন না? এ কি বন্ধত্রে প্রকৃত পরিচয়? তিনি নিজ দীতগুলো তাদেরকে দেখালেন। তীর সব কটি দীতই ভাঙ্গা ছিল । তিনি বলেন, “আমি হযরত (সা.)-কে চর্মচক্ষে না দেখেই নিজের দাত ভেঙ্গে ফেলেছি; কেননা, যখন আমি একটি দাত ভাঙ্গলাম, মনে সন্দেহ হল, হযরত তার অন্য দাঁতও ভেঙ্গে ফেললাম । এরূপ একে একে সমস্তই ভেঙ্গে ফেললাম ।” শুনে হযরত ওমর ও হযরত আলীর (রা.) শরীর কেঁপে উঠল। তারা বুঝতে পারলেন, আল্লাহ্‌র রাসূলের প্রতি তার আশেকের ভালবাসা অন্যরূপ। তখন তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন, “ইনি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.)-কে দেখেন নি, অথচ তার প্রতি কেমন প্রেম ও ভালবাসা!” হযরত ওমর (রা.) বলেন, “আমার জন্য আপনি দোয়া করুন।”

নরনারীকে ক্ষমা কর। হে ওমর! যদি আপনি ঈমান নিয়ে কবরে যেতে পারেন, তখন দোয়া আপনাকে তালাশ করবে ।” হযরত ওমর ফারুক (রা.) বলেন, “আমাকে আরও নছীহত করুন|” হযরত উয়ায়েস বলেন, “হযরত ওমর! আপনি কি আল্লাহ্‌কে চিনেছেন?” হযরত ফারুক বলেন, “হা, নিশ্চয়ই চিনেছি।” হযরত উয়ায়েস বলেন, “যদি তাকে ব্যতীত অন্য কাউকে না চিনেন, তাহলে সেটাই আপনার জন্য উত্তম।” হযরত ওমর ফারুক বলেন, “আরও কিছু নসীহতের কথা বলুন।” হযরত উয়ায়েস বলেন, “আল্লাহ্‌ তা’আলা কি আপনাকে জানেন?” হযরত ওমর ফারুক বলেন, “হ্যা, জানেন।” হযরত উয়ায়েস বলেন, “যদি তিনি ছাড়া অন্য কেহ আপনাকে না জানে, তাও আপনার জন্য উত্তম। হযরত ওমর (রা.) বলেন, “একটু অপেক্ষা করুন, আমি আপনার জন্য কিছু নিয়ে আসি।” হযরত উয়ায়েস নিজের হাতে পকেট থেকে দুটি পয়সা) বের করে বলেন, “আমি উট চরিয়ে তা উপার্জন করেছি। যদি আপনি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারেন যে, এটা খরচ না করা পর্যন্ত আপনি জীবিত থাকবেন, তাহলে আপনি আরও গ্রহণ করতে পারেন। হযরত উয়ায়েস তারপর বলেন, “অনেক কষ্ট পেয়েছেন, এখন ফিরে যেতে পারেন। কিয়ামত খুব কাছে সেখানেই পুনরায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ হবে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। আমি এখন কিয়ামতের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত।” এ বলে হযরত উয়ায়েস তাদেরকে বিদায় দেন। হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত মোরতাযা (রা.) বিদায় হলে হযরত উয়ায়েসের ইয্যত ও হুরমতের কথা চারদিকে প্রকাশ হয়ে পড়ে। তখন তিনি সেখান থেকে পালিয়ে কুফা গমন করেন। তারপর হারম ইব্‌নে জাবান ব্যতীত আর কেহ তার সাক্ষাত পান নি।

হযরত ইব্‌নে জাবান বলেন, “যখন আমি হযরত উয়ায়েসের কথা শুনলাম তখন তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা আমার প্রবল হল। আমি কুফায় এসেই তার অনুসন্ধান করতে লাগলাম । হঠাৎ একদিন তাকে ফোরাত নদীতে ওযু করতে ও কাপড় ধৌত করতে দেখলাম । পূর্বে তার যে সব লক্ষণের কথা শুনেছিলাম, সে অনুসারে তাকে চিনে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে আমার দিকে চাইলেন । আমি তার হাতে হাত মিলাতে (মোসাফাহা করতে) চাইলে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন না। আমি বললাম, “হযরত উয়ায়েস্‌! আল্লাহ্‌ আপনার প্রতি রহম করুন ও আপনাকে ক্ষমা করুন। হযরত উয়াসের প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসার জন্য তার দীনতা দেখে আমি কেঁদে ফেললাম । হযরত উয়ায়েসও কেঁদে বলেন, “হে হারম ইব্নে জাবান! আল্লাহ্‌ তোমার হায়াত দারাজ করুন। তুমি কি জন্য এখানে এসেছ এবং কে তোমাকে আমার সন্ধান দিয়েছে?” আমি বললাম, “আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কিভাবে জানলেন? আপনি ত কখনও আমাকে দেখেননি।” তিনি উত্তর বলেন, “যার জ্ঞানের অগোচর কিছুই নেই তিনিই আমাকে তোমার সন্ধান জানিয়েছেন আমার রূহ তোমার রূহকে চিনেছে; কেননা, মুমিনগণের রূহ পরওয়ারদিগারের সাথে সংযুক্ত থাকে ।” এর পর আমি বললাম, “হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কিছু বলুন।” তিনি উত্তর বলেন, “আমি তাকে দেখিনি, তার প্রবিত্র বাণী অন্যেদের কাছে শুনেছি মাত্র। আমি বক্তী, মুফতি (ফেত্ওয়াদাতা) অথবা মুহাদ্দিস(হাদীসবিদ) হতে চাই না । আমার অন্য কাজ আছে, সুতরাং আমি এ ব্যাপারে লিপ্ত হতে পারিনা ।” তা শুনে আমি বললাম, “তাহলে একটু কুরআন পাঠ করুন, আমি শুনি।” উত্তরে : আউযুবিল্লাহ… পড়ে কাদতে লাগলেন । তারপর বলেন, আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন-
অর্থ “আমি জিন ও মানব জাতিকে শুধু আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। আমি আসমান ও যমীন এবং তাদের মাঝে যা কিছু আছে সে সবকে খেলার বস্তু হিসাবে তৈরি করি নি। এদের উভয়টিকে সত্য ছাড়া অন্য কিছু সৃষ্টি করিনি |কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না ।’ তারপর তিনি এমন জোরে চীৎকার করেন যে, আমি ভাবলাম তিনি বেহুশ হয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি বলেন, “ ওহে ইব্নে জাবান, কিসে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে?” আমি বললাম, “আপনার বন্ধুত ও সোহ্বতের শান্তি আমাকে এখানে টেনে এনেছে ।” তিনি বলেন, “ যে আল্লাহ্‌কে চিনেছে, সে ছাড়া আর কারো সাথে আল্লাহ্‌ ছাড়া বন্ধুত্ব করে আরাম পেয়েছে বলে আমি জানি না। যে ব্যক্তি আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে চিনেছে সে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে কখনও সুখী হতে পারে না।” প্রসঙ্গক্রমে আমি বললাম, “আমাকে কিছু উপদেশ প্রদান করুন।” তিনি বলেন, “যখন নিদ্রা যাবে তখন মৃত্যুকে শিয়রে রাখবে, আর জাগ্রত অবস্থায় মৃত্যুকে চোখের সামনে রাখবে । কোন গুনাহ্‌কে ছোট বলে মনে কর না, বরং বড় বলে জেন। গুনাহ্‌কে ছোট মনে করাও (বড়) গুনাহ্‌। যদি তুমি গুনাহ্‌কে ছোট বলে মনে কর, তাহলে তুমি যেন আল্লাহকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করলে । “আচ্ছা আমি কোথায় বাস করব” জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “শাম দেশে ।” আবার প্রশ্ন করলাম, “সেখানে আমি কিভাবে জীবিকা অর্জন করব?” তিনি আফসোস করে বলেন, “যে হৃদয়ে সন্দেহ এত প্রবল, উপদেশে তার কোন ফল হবে না।” বললাম, “আরও কিছু উপদেশ প্রদান করুন।” তিনি বলেন, “হে ইবৃনে জাবান, তোমার পিতার মৃত্যু হয়েছে এমন কি শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও এ দুনিয়া ছেড়ে গিয়েছেন। আমার ভ্রাতা হযরত ওমর (রা.)ও মরে গেছেন। আমি বললাম, “আল্লাহ তা’আলা তীর মৃত্যু সংবাদ আমাকে জানিয়েছেন।” এরপর বলেন, এখন তুমি ও আমি মৃতদের দলভুক্ত ।” হযরত উয়ায়েস তারপর নামায পড়ে দোয়া করে নসিহত স্বরূপ বলেন, “তুমি আল্লাহর কুরআন ও আউলিয়াগণের পথ অনুসরণ কর। এক মুহূর্তের জন্যও মৃত্যুর কথা বিস্মৃত হবে না। যখন তুমি নিজ মাযহাবের কাছে যাবে তখন তাদেরকে এ উপদেশই দেবে। হে জাবানের পুত্র! তুমিও আমাকে দোয়া করবে, আমিও তোমাকে দোয়া করব। খাঁটি মুসলমানের যা কর্তব্য, তার বিপরীত কিছু কর না; কারণ, তেমন কিছু করলে পথভ্রষ্ট হওয়ার ও জাহান্নামে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এখন তুমি এ পথে যাও, আর আমি এ পথে যাই।” আমি তার সাথে কিছুদূর যেতে চাইলে নিজেও কাদলেন এবং আমাকেও কাদালেন। তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। কাদতে কাদতে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বর্ণনাকারী বলেন, “আমি একদিন হযরত উয়ায়েসের সাক্ষাত লাভের আশায় তার খিদমতে হাজির হয়ে দেখলাম, তিনি ফযরের নামায পড়ছেন। নামায শেষে তাসবীহ্‌ পড়তে লাগলেন ও যোহরের সময় পর্যস্ত তা পড়লেন। যোহরের নামাযের পর থেকে আসর পর্যস্ত তাসবীহ পাঠ করে সে নামাযও শেষ করলেন। এভাবে তিনি তিন দিন পর্যন্ত কিছুই খেলেন না এবং শয়নও করলেন না। চতুর্থ রাত্রিতে দেখলাম, তিনি সামান্য কিছু সময় ঘুমালেন। ঘুম ভাঙার পর মুনাজাত করতে লাগলেন, “ইলাহী! তৃপ্তির ঘুম এবং পেট পুরে খাওয়ার ক্রটি থেকে তোমার কাছে আমি আশ্রয় চাইছি। এ বাক্য শুনে আমি অবাক হয়ে ফিরে এলাম ।” উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি রাতে শুতেন না এবং বলতেন, “এ রাত রুকুর জন্য, এ রাত সিজদার জন্য, এ রাত দীড়িয়ে থাকার জন্য”-এভাবে তিনি প্রতিটি রাত জেগে কাটিয়ে দিতেন। মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করতেন, “হযরত উয়ায়েস! কেমন আছেন?” উত্তরে তিনি বলতেন, “রাতে সিজদায় গিয়ে সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা বলতে না বলতেই প্রভাত হয়ে যায়, আমি ফেরেশতাদের মত ইবাদত করতে চাই, কিন্তু পারছি না।” একদিন হযরত উয়ায়েসকে জিজ্ঞেস করা হল, “নামাযে একাগ্রতা কিরূপ?” প্রতি উত্তরে তিনি বলেন, নামায রত থাকা অবস্থায় নামাজিকে তীর মারলেও যদি বোধ না হয়, তাহলে সে একমনে নামায পড়ছে মনে করতে হবে ।” এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে “কেমন আছেন?” উত্তর বলেন, “আচ্ছা বলুন তো, তার অবস্থা আবার কেমন-যে প্রাতে উঠে জানতে পারে না যে, মৃত্যু সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিবে কি না?” লোকটি আবার বলল, “তবুও বলুন কি অবস্থা?” তিনি উত্তর বলেন, তিনি পথের সম্বলহীন এবং তার পথও সুদীর্ঘ । একদিন হযরত উয়ায়েস্‌ (রহ.)-কে লোকে জানাল, “কাছেই এক ব্যক্তি ত্রিশ বছর যাবত কবরে বসে গলায় কাফন ঝুলিয়ে কান্নীকাটি করে দিন যাপন করছেন।” তিনি বলেন, “আমাকে সে-স্থানে নিয়ে চল, আমি তাকে দেখব।” তারা হযরত উয়ায়েসকে তার কাছে নিয়ে গেলে তিনি দেখেন, যে,লোকটি জীর্ণ শীর্ণ ও বিবর্ণ হয়ে গেছেন এবং কাদতে কীদতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তখন তিনি বলেন,  “হে ফালানা! কবর ও কাফন তোমাকে আল্লাহ্‌ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। (অথচ তুমি এ দুটিতে মত্ত রয়েছ) এ দুটিই তোমার গন্তব্য পথের বাধা হয়ে দাড়িয়েছে ।” হযরত উয়ায়েসের কথায় লোকটি নিজের ভুল বুঝতে পেরে চীৎকার করে এবং সে অবস্থাতেই কবরেই তার ইন্তিকাল হয়। কোন এক সময় হযরত উয়ায়েস (রহ.) তিন দিন অনাহারে ছিলেন। চতুর্থ দিন খাদ্যের সন্ধানে বের হয়ে পথে একটি দীনার দেখতে পেলেন। কেউ তা হারিয়েছে ভেবে তিনি তা নিলেন না।অগত্যা শাকলতা আহার করবেন বলে ঠিক করলেন। ঠিক তখন একটি ছাগল একটি গরম রুটি মুখে করে এনে তার সামনে রেখে দিল । রুটিখানি অন্য কারো ভেবে হযরত উয়ায়েস তা গ্রহণ করলেন না। ছাগটি তাকে সেটি গ্রহণ করতে ইংগিত করে বলল, “আপনি যে আল্লাহর বান্দা, আমি তারই বান্দা” হযরত উয়ায়েস রুটিখানা গ্রহণ করা মাত্রই ছাগটি অদৃশ্য হয়ে গেল। বর্ণিত আছে, বৃদ্ধ বয়সে তিনি হযরত আলীর (রা.) সাথে সিফ্ফীনের যুদ্ধে যোগদান করে সে যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন মুসলমানদের মধ্যে উয়ায়েসী নামক একটি মাযহাব আছে। হযরত উয়ায়েস যেন রাসূলুল্লাহ্‌ সো.) দর্শন লাভ করেছিলেন উয়ায়েসী মাযহাবের লোকদের বিশ্বাস তারাও রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর দর্শন লাভ করবে, সুতরাং তাদের অন্য কোন পীরের আবশ্যকতা নেই। বর্ণিত আছে, হযরত উয়ায়েস এক ব্যক্তিকে নছীহত করে বলেন “তুমি যদি আসমান ও যমীন পরিমাণ ইবাদত কর, কিন্তু আল্লাহ্‌ ও রাসূলের উপর ঈমান না আন, তাহলে তা কবুল হবে না।” লোকটি জানতে চাইল, “আচ্ছা কিভাবে আল্লাহর উপর ঈমান আনব?” তিনি বলেন, “তোমার যা আছে তাতেই তুমি তুষ্ট এবং নিশ্চিন্ত থাকবে, যেন অন্য কোন বস্তুর প্রতি তুমি আকৃষ্ট না হও ।”

অমূল্য বাণী

১। যেব্যক্তি তিনটি জিনিসকে ভালবাসে, জাহান্নাম তার গলার খুব কাছে, (ক) সুখাদ্য ভক্ষণকারী | (খ) উত্তম পরিচ্ছদ পরিধানকারী । গে) আমীরের (বেড়লোকদের) মোসাহহেবী২

। যে ব্যক্তি আল্লাহকে চিনতে পেরেছে তার কাছে কোন কিছুই গোপন নেই।তার মাধ্যমেই আল্লাকে জানা যায়।

৩। নির্জনতাতেই প্রশান্তি।
৪। তওহীদের (একতর জ্ঞান শুধু তখনই লাভ হয় যখন আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য চিন্তা মনে স্থান না পায়। একাকী থাকা ঠিক না; কারণ শয়তান দু ব্যক্তিকে একত্রে দেখলে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। মনকে আল্লাহ্‌র সমীপে হাযির রেখ, তাহলে শয়তান সেখানে সুযোগ পাবে না।
৫। উচ্চ আসন আবেষ্টন করেছিলাম বিনয় দ্বারা। সর্দারী পেতে চেয়েছি সত্যের মাঝে তা পেয়েছি। গৌরব ও তালাশ করে দরিদ্রতায় মধ্যে তা পেয়েছি। শরীফি (আভিজাত্য) তালাশ করছিলাম আল্লাহ্‌ ভীতির মধ্যে তা পেয়েছি। মহত্ব তালাশ করি তুষ্টিতে তা পেয়েছি। নির্ভরতা তালাশ করে আল্লাহ্‌র প্রতি নির্ভরশীলতায় তা লাভ করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *