হযরত ইমাম জা’ফর ছাদেক (রাঃ)

আহলে বাইতগণের-নবী করিম (সা.) এর পরিবারের বারজন ইমামের মধ্যে হযরত ইমাম জা’ফর ছাদেক (রাঃ) ছিলেন একজন তার পূর্ণ নাম ইমাম আবু মুহাম্মদ জা’ফর ছাদেক ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবিতালেব। তিনি নবী করীম (সাঃ)-এর আধ্যাত্মিক সম্পদের প্রকৃত ওয়ারিস। কাজেই তার সম্বন্ধে এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, তিনি মা’রেফাত, তরীকত ও হকীকত-তন্বের সত্যিকারের একজন বিশদ ব্যাখ্যাকারী; এবং সুন্নতে নববীর তলোয়ার ও শরীয়অতে মুহাম্মদীর একনিষ্ঠ সাধক। বলা বাহুল্য, নবী করীম (সাঃ) এবং তার সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে-বাইতগণের বিষয় আলোচনা করতে হলে স্বতন্ত্র একটি বিরাট গ্রন্থের প্রয়োজন। আলোচ্য গ্রন্থে আমরা তাদের পরবর্তীকালের আউলিয়ায়ে কেরাম সম্বন্ধে আলোচনা করব। অতএব, এখানে আমরা বরকতের জন্য আহলে বাইতগণের মধ্য থেকে প্রথমে হযরত ইমাম জা’ফর ছাদেক (রঃ)-এর জীবনী আর্ত করছি। কেননা, আহলে-বাইতের ইমামগণের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ ইমাম। সর্বশেষ ইমাম ছিল তার উপর । সকল শ্রেণীর লোকেরই তিনি ছিলেন অগ্রনায়ক ও দিশারী এবং যাবতীয় সৃক্ষতত্রের আবরণ উন্মোচনকারী, কোরআনে পাকের গূঢ়তত্ত্ব বিশ্লেষণকারী ৷ হযরত জা’ফর ছাদেক (রঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি আল্লাহ তা“আলাকে চিনতে পেরেছে, সে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অপরাপর যাবতীয় পদার্থ থেকে পরাম্মুখ হয়েছে । ফলকথা, আল্লাহ তা“আলার মা’রেফাতে নিমজ্জিত ব্যক্তি একমাত্র তারই ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে অন্যান্য সমস্ত বস্ত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আর পার্থিব যাবতীয় উপাদান ও উপকরণকে বর্জন করে । কেননা, আল্লাহ তা“আলার প্রকৃত পরিচয় পেতে হলে তাঁকে ছাড়া অন্যান্য যাবতীয় পদার্থকে ভুলতে হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ পাকের মা’রেফাত পেরিচয় জ্ঞান লাভ করেছে, সে সৃষ্ট জগতের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে এক আল্লাহ তা’আলার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তার অন্তরে সৃষ্ঠ পদার্থের প্রতি এতটুকু মর্যাদাও থাকে না-অন্তত আড়চোখেও একবার তাকিয়ে দেখে। আর তাতে অস্তিত্ব তার অন্তরে এতটুকু চিন্তাও জাগায় না যে, মুহূর্তের জন্য তার স্মরণকে অন্তরে স্থান দেয়।
তিনি এও বলেছেন –
অর্থাৎ ইবাদত তওবা ব্যতীত শুদ্ধ হয় না। কেননা, আল্লাহ তা’আলা তওবাকে এবাদতের উপর অগ্রবর্তী করেছেন, যেমন তিনি একটি আয়াতে উল্লেখ করেছেন, “তওকারীগণই প্রকৃত এবাদতকারী | কেননা, তরীকতের স্তরসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম স্তর তওবার নির্দেশ প্রদান করেছেন “তোমরা সকলে আল্লাহ তা’আলার দরবারে তওবা কর।” আল্লাহপাক যখন রাসূল (সাঃ) -এর উল্লেখ করলেন, তখন তিনি স্থীয় বান্দার প্রতি ওহী প্রেরণ করলেন।” হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে বাগদাদের খলীফা মনছুর হযরত ফা’ফর ছাদেকের বিরাট ব্যক্তিত্ব এবং তার প্রতি জনসাধারণের অগাধ শ্রদ্ধা ও ভক্তি-ভালবাসা দেখে নিজের রাজত্ব সম্বন্ধে ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পড়লেন, তাই তিনি এক রাতে স্বীয় উযীরকে ডেকে বললেন, “যাও জাফর ছাদেককে ডেকে আন, আমি তাকে হত্যা করব ।” উযীর বিনয় সহকারে বললেন, “বেচারা নিরীহ লোক, নির্জনে বসে আল্লাহ তা’আলার এবাদত করছেন। সংসারের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই; সমস্ত কিছুরই সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছেন। এমন ব্যক্তির প্রতি আপনার রাগান্বিত হওয়া এবং তাকে হত্যা করার কারণ কি? আমি তো তার দ্বারা আপনার ক্ষতির কোনো আশংকা দেখছি না। তাকে হত্যা করে আপনার কি লাভ হবে? উযীরের এই কথায় বাদশাহের মনোভাবের কিছুমাত্র পরিবর্তন হল না; বরং তিনি উযীরের প্রতি রাগান্বিত হয়ে বলে উঠলেন, “আমি তোমার এসব নীতি কথা শুনতে চাইনা । তাকে আমার দরবারে হাজির করতে হবে ।” উযীর পুণঃ পুনঃ অনুরোধ করেও বাদশাহের মনোভাবের কোনই পরিবর্তন করতে পারলেন না, অগত্যা হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ)-কে ডেকে আনার জন্য গমন করলেন। এদিকে খলীফা গোলামদেরকে বলে রাখলেন, “জাফর ছাদেকের দরবারে হাষির করা মাত্রই আমি আমার মাথার মুকুট নামিয়ে ফেলব। আর তোমরা এই সংকেত পাওয়া মাত্রই তাকে হত্যা করে ফেল।” কিন্তু আল্লাহ পাকের বিধান বুঝা মুশকিল।

হযরত জাফর ছাদেক যখন দরবারে এসে উপস্থিত হলেন, তখন মনছুর তাকে হত্যা করবেন তো দূরের কথা তাকে দেখামাত্র সন্ত্রস্তভাবে সিংহাসন ছেড়ে তার এস্তেকবালের জন্য দ্রুত এসে তার সম্মুখে নতজানু হয়ে পড়লেন এবং পর মুহুর্তেই তাকে অতি সম্মানের সাথে নিজের সিংহাসনে নিয়ে বসালেন: গোলামেরা তো এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে রইল। এদিকে মনছুর হযরত ছাদেককে বললেন, “আমার নিকট আপনার কোন প্রয়োজন থাকলে বলুন, এই মুহূর্তেই আমি তা পূরণ করব। হযরত ইমাম জা’ফর ছাদেক (রঃ) বললেন, “আপনার নিকট আমার কোন জিনিসেরই প্রয়োজন নেই। শুধু আপনার নিকট আমার একটিই মাত্র অনুরোধ আপনি আমাকে আর কখনও ডেকে আমার এবাদতে বিঘ্ন ঘটাবেন না” এ কথা শুনে খলীফা মনছুর তৎক্ষণাৎ তাকে খুব সম্মানের সাথে বিদায় দিলেন। হযরত জা’ফর ছাদেককে বিদায় করার পরমুহূর্তেই মনছুরের সর্ব শরীরে কাপন শুরু হল। তিনি কাপতে কাপতে সংজ্ঞাহী হয়ে পড়লেন। এই জ্ঞানহীন অবস্থার মধ্যেই তার তিন দিন কেটে গেল। কেউ কেউ বলেছেন-এই বেহুশী অবস্থা এতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল যে, তদবস্থায় তার তিন ওয়াক্তের নামায ক্বাযা হয়েছিল । জ্ঞান ফিরে আসার পর উযীর যখন খলীফাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার এমন অবস্থা হল কেন? খলীফা বললেন, “হযরত জা’ফর ছাদেক আমার দরবারে প্রবেশ করলে, আমি দেখতে পেলাম তার সঙ্গে একটি বিরাটাকায় অজগর এমন বিকটভাবে হা করে রয়েছে যে, তার একটি চোয়াল চত্রের নিয়ে আর অপরটি ঊর্ধ্বে। অজগরটি তার ভাষায় আমাকে বলল,” মনছুর , সাবধান! যদি তুমি জাফর ছাদেকের একটি কেশও স্পর্শ কর অথবা কোন রকম কষ্ট দাও, তবে তোমাকে এখনই এই চত্বর সহ গিলে ফেলব।” অজগরের ভয়ে আমি এমন জ্ঞানহারা হয়ে পড়েছিলাম, আমি কি বলেছি বুঝতে পারিনি । তবে এতটুকু স্বরণ আছে যে, আমি জাফর ছাদেকের খেদমতে ওযর-আপত্তি পেশ করে বিনয় ও নম্রতার সাথে তাকে সসম্মানে বিদায় করেছি এবং পরক্ষণেই সম্পূর্ণরূপে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছি।

অন্য একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত দাউদ তা’‌য়ী(রঃ) হযরত জাফর ছাদেক (রঃ)এর দরবারে এসে আরয করলেন, “হে রাসুলুল্লাহ সোঃ)-এর সন্তান! আমার অন্তঃকরণ কালো এবং অন্ধকার হয়ে গেছে, আমাকে কিছু নছীহত করুন। তিনি বললেন, “হে আবু সোলাইমান (হযরত দাউদ তা’য়ীর কুনিয়ত)! আপনি নিজেই যুগের সংসার বিরাগী শ্রেষ্ঠতম ওলী; আমার নছীহতের আপনার কোন প্রয়োজরন নেই।” ইমাম দাউদ তা’য়ী বললেন, “হে পয়গম্বরের সন্তান! যুগের সমস্ত আউলিয়ায়ে কেরামেরা চেয়ে আপনার মর্যাদা অনেক উচ্চে। আপনাকে আল্লাহ তা’য়ালা সকলের চেয়ে অধিক বুযুগী দান করেছেন। আপনি নবী করীম (সাঃ)-এর সুযোগ্য উত্তারাধিকারী, অন্যান্য সকলকে নহীহত করা আপনার উপর ওয়াজিব ।” হযরত জাফর ছাদেক বললেন, “হে আবু সোলাইমান, আপনাকে আমি কি উপদেশ দিব! আমার নিজের পরিণামের ভয়েই আমি অস্থির। আমার মাননীয় নানাজী যদি আমাকে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করেন যে, “তুমি আমার আনুগত্য ও আদেশ পালনের হক আদায় করলে না কেন? বস্তুত” এই আনুগত্যের হক এবং পরকালের মর্যাদা আর বুজুর্গী হাসাব-নাসাবের দ্বারা সম্পন্ন হয় না; বরং আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে মান-মর্যাদা ও সফলতা লাভ করার একমাত্র ভিত্তি হলো নেক আমল । নেক আমল ছাড়া সেখানে অন্য আর কোন কিছুরই মূল্য নেই।” নানাজী আমাকে এরূপ বললে আমি তাকে কি উত্তর দিব? আমি যে সেই ভয়েই অস্থির । নানাজী আমাকে আহলে-বাইতগণকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “সাবধান! এমন যেন না হয় যে, কিয়ামতের দিন লোকেরা আমার নিকট তাদের আমল নিয়ে হাজির হয়, আর তোমরা কোন আমল ব্যতীত শুধু হাসাব-নাসাবের দাবী নিয়ে আমার নিকট উপস্থিত হও, তা হলে আমার মুখ লুকানোর স্থান থাকবে না।” এই কথা শুনামাত্র হযরত দাউদ তা’য়ী (রাঃ)কান্না করতে করতে অস্থির হয়ে পড়লেন এবং বিলাপ করতে লাগলেন- “হায় খোদা । পয়গম্বরের রক্তের মিশ্রণে যার দেহ গঠিত; যার নানাজী সৃষ্টির উৎস এবং সেরা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ), আর যার মাতৃকুল শিরোমণি বেহেশতের নারীদের মধ্যে শীর্ষ স্থানীয়রা হযরত ফাতেমা রোঃ), তিনিই যখন নিজের আমলের উপর কোনই নির্ভর না করে পারলৌকিক পরিণামের জন্য এত ভীত, এত চিন্তিত, তখন দাউদ কোন ছার ……, যে নিজের আমলের জন্য গর্বিত।

একদিন হযরত জাফর ছাদেক (রঃ) নিজের গোলামদের সঙ্গে বসে আলাপ প্রসঙ্গে তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, “আসুন, আমরা সকলে মিলে পরস্পর এই প্রতিজ্ঞা আবদ্ধ হই যে, কিয়ামতের দিন আমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি হিসাব-নিকাশে সকলের মধ্যে আগে মুক্তি লাভ করবে, সে-ই আমাদের অবশিষ্ট সকলের মাগফেরাতের জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে সুপারিশ করবে ।” তারা সমস্বরে বলে উঠলেন, “হে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সন্তান! আমাদের সুপারিশে আপনার লাভ কি? আপনার নানাজীই তো সমস্ত মানুষের জন্য সুপারিশ করবেন।” তিনি বললেন, “আমি আমার এই ক্রটিপূর্ণ যৎসামান্য ও নগণ্য আমল নিয়ে আমার নানাজীর সেই নূরানী চেহারার প্রতি তাকাতে লজ্জাবোধ করি এবং যথেষ্ট ভয়ও রয়েছে । এই জন্যই আপনাদের নিকট সুপারিশের আবেদন জানিয়েছি। নিজের আমলকে নির্ভরযোগ্য মনে না করে নিজের আয়েব ও দোষ ক্রটির প্রতি লক্ষ্য রাখলেই এমন উচ্চত্তরে উন্নীত হয়ে যায়। ইহা তরীকতপন্থিগণের মহৎ গুণ। সমস্ত আঘিয়া, রাসূল, আউলিয়া এবং বিশিষ্ট নেককার বান্দাগণই এই মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন৷ যেমন, রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেন অর্থৎ আল্লাহ পাক যখন নিজের কোন বান্দার মঙ্গল ও উন্নতি বিধানের ইচ্ছা করেন, তখন তার দোষ-ক্রটিসমূহ তার চোখের সম্মুখে তুলে ধরেন, আর যে ব্যক্তি নিজেকে অক্ষম মনে করে আল্লাহ পাকের মহাশক্তিশালী হাতে নিজেকে সমর্পণ করে তার সম্মুখে মস্তক অবনত করে, আল্লাহ তা“আলা তার যাবতীয় কাজ সুসম্পন্ন করে দেন।

এক সময় হযরত জাফর ছাদেক (রঃ) নির্জনতা অবলম্বনপূর্বক লোকলয়ে গমনাগমন সম্পূর্ণবিপে বন্ধ করে দিলেন। এই সময় একদিন হযরত সুফইয়ান ছওরী (রঃ) তার খেদমতে এসে বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ সোঃ)-এর ফরযন্দ! আপনি নির্জনতা অবলম্বন করেছেন কেন? আল্লাহর বান্দাগণ আপনার ফয়েয ও বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ।” হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) উত্তর দিলেন, “এ-সময়ের জন্য এটিই আমি সঙ্গম মনে করেছি।” এই বলে তিনি দুটি বয়েত (চরণ) আবৃত্তি করলেন, যার সারমর্ম-আনুগত্য ও ওফাদারী-বোধসম্পন্ন লোকের নজীর বর্তমান দুনিয়াতে বিরল । মানুষ কেবল নিজ নিজ পার্থিব উদ্দেশ্য ও কামনা সিদ্ধির মোহে হয়ে রয়েছে। একে অন্যের সাথে বাহ্যিক মহব্বতের ভাব প্রকাশ করে বটে, কিন্ত তাদের অন্তরসমূহ বিচ্চুতে পরিপূর্ণ রয়েছে।” একদিন হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রাঃ) মূল্যবান জাকালো পোশাক পরিধান করেছিলেন। জনৈক ব্যক্তি ইহা দেখে তাকে বলল, “আপনি নবীর বংশধর । নবীর সন্তানের পক্ষে এমন জাকজমকপূর্ণ পোশাক ব্যবহার করা শোভনীয় দেখায় না।” ইহা শুনে তিনি লোকটির হাত টেনে এনে তার আস্তিনের ভিতরে ঢুকিয়ে নীচের পরিধেয় পোশাকের উপর ঘষে দিলেন। লোকটি অনুভব করল যে, ভিতরের পোশাক খুব মোটা এবং খসখসে । এমনকি, উহার ঘষায় তার হাত জ্বালা করতে লাগল। অতঃপর হযরত জাফর ছাদেক (রোঃ) বললেন, “আমার কাছে দুই পরস্ত জামাকাপড় আছে। এক পরস্ত খুব মোটা ও খসখসে, তা পরিধান করে আমি আল্লাহ পাকের দরবারে দাড়িয়ে নামায পড়ি। আর এক পরস্ত জামা-কাপড় হলো লোক সমাজে চলাফেরা করার জন্য যা কিছুটা জাকজমকপূর্ণ বৈ কি!

একদিন হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) হযরত ইমাম আ’যম আবু হানীফা (রোঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “প্রকৃত জ্ঞানবান লোক কে?” তিনি বললেন, প্রকৃত জ্ঞানবান সেই ব্যক্তি, যে ভাল-মন্দ এবং নেকী-বদীর মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে চলে ।” হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ০ বললেন, “ইহা তো চতুম্পদ জন্তরাও করতে পারে। কারণ, কে তাকে মারে এবং কে তাকে চুম চুম করে আদর জানায় সে উহা ভাল করেই উপলব্ধি করতে পারে ।” হযরত আবু হানীফা (রাঃ) বললেন, “আচ্ছা, আপনার মতে সত্যিকারের জ্ঞানী লোক কে?” তিনি বললেন, “আমার মতে সেই ব্যক্তি প্রকৃত জ্ঞানী, যে ব্যক্তি দুটি ভাল ও দুটি মন্দের ম্যেধ তুলনা করে এবং দুটি ভাল কাজ বা বস্তর মধ্যে অপেক্ষাকৃত উত্তমকে অবলম্বন করে, আর দুটি মন্দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম মন্দটিকে বেচে নেয়। অতঃপর তাহাও বর্জন করে।”

একদা কতিপয় লোক তাকে বলল, “আপনার মধ্যে সর্বপ্রথম মহৎ গুণই বিদ্যমান রয়েছে। সংসার বিরাগ, দানশীলতা, আভ্যন্তরীন স্বচ্ছলতা ইত্যাদি । তদুপরি আপনি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর খানদানের নয়নমণিও বটেন, কিন্ত আপনার মধ্যে অহংকার বেশী ।” তিনি বললেন, “আমি অহংকারী নই; কিন্তু আমার সৃষ্টিকর্তা এমন অহমিকাপূর্ণ যে, আমি যখন গর্ব ও অহংকার বর্জন করলাম, তখন তার অহমিক আমার দিকে এসে আমার অন্তরের শূন্যস্থান পূর্ণ করে দিল.। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব কল্পনায় অহংকার করা অবশ্য উচিত নয়, তবে নিজের মধ্যে আল্লাহ তা’আলার শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করে গৌরব করা জায়েয।

কথিত আছে যে, একদা কোন এক ব্যক্তির হাজার টাকা ভর্তি একটি থলে হারিয়ে যায়। সে হযরত জা’ফর ছাদেক (রাঃ)-কে চিনিতে না পেরে সন্দেহক্রমে তাকে ধরে বলল, “তুমি আমার টাকার থলে চুরি করেছ, তুমি চোর ।” হযরত জাফর (রঃ) বললেন, “তোমার থলিতে কত টাকা ছিল?” সে বলল, “হাজার স্বর্ণ মুদ্রা।” তিনি লোকটিকে সঙ্গে করে বাড়ী আসেন এবং তাকে এক হাজার মুদ্রা দিয়ে বিদায় করেন। পরে যখন উক্ত লোকটি তার হারানো মুদ্রার থলে পেয়ে হযরত জাফর ছাদেকের মুদ্রা ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার নিকট এসে বলল, “
আমি ভুলক্রমে আপনাকে আমার টাকার জন্য  দায়ী করেছিলাম; আমাকে ক্ষমা করুন এবং আপনার এই এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা গ্রহণ করুন।” তখন হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) বললেন, “দান করে ফেরত নেয়ার অভ্যাস আমার নেই।” আমি তোমাকে যা দিয়েছি তা ফেরত গ্রহণ করব না।” লোকটি অতপর তার দরবার থেকে অন্যত্র গিয়ে একজন লোককে জিঙ্গেস করল, ইনি কে? সে বলল, ইনি হযরত ইমাম জাফর ছাদেক (রঃ)। হযরত জাফর ছাদেকের সাথে সে এরূপ রূঢ় ব্যবহার করেছে জানতে পেরে লোকটি লজ্জায় ও মনের দুঃখে সেখানে আর না দাড়িয়ে তার গন্তব্য পথে চলে গেল।
একদিন হযরত জাফর ছাদেক রোঃ) একাকী কোন পথ দিয়ে নিজ মনে “আল্লাহ,আল্লাহ” জিকির করতে করতে যাচ্ছিলেন। একজন দগ্ধচিত্ত দরবেশও তার পাছে পাছে “আল্লাহ, আল্লাহ’ বলতে বলতে পথ অতিক্রম করছিলেন। ইতিমধ্যে হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) মনে মনে আল্লাহ পাকের কাছে প্রার্থনা করলে, “ইয়া আল্লাহ! আমার জামা নেই, ইয়া আল্লাহ! আমার জুব্বা নেই।” তার প্রার্থনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে উৎকৃষ্ট ধরনের জামা-কাপড় গায়েব থেকে এস তার সামনে উপস্থিত হলো । হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) উহা পরিধান করলেন। ইহা দেখে তাঁর পিচনের সেই দরবেশ লোকটি তার সামনে এসে বললেন, “হে খাজা! আল্লাহ আল্লাহ জিকির করাতে আমিও আপনার সঙ্গে শরীক ছিলাম । এখন আপনি আপনার পুরাতন কাপড়গুলো আমাকে দান করুন দেখি।  হযরত জাফর ছাদেক (রঃ) তার কথায় সন্তুষ্ট হয়ে তৎক্ষণাৎ গায়ের পরিধেয় পুরাতন জামা-কাপড়গুলো তাকে দিয়ে দিলেন।
এক ব্যক্তি হযরত জাফর ছাদেকের (রাঃ) নিকট এসে বলল, “আমাকে আল্লাহ পাকের দীদার লাভ করিয়ে দিন। আমি যেন তাকে যেন আমার বাহ্য চক্ষু দ্বারা প্রকাশ্যে দেখতে পাই। হযরত জাফর ছাদেক বললেন, “তুমি কি শুননি যে হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহ পাকের দীদার লাভের প্রার্থনা জানিয়ে বলেছিলেন
হে খোদা! আমাকে আপনার দর্শন দান করুন।’ আল্লাহ পাক তৎক্ষণাৎ তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন তুমি (দুনিয়াতে এই চর্ম চক্ষু দিয়ে) আমাকে কখনই দেখতে পাবে না।’ লোকটি বলল, হ্যা শুনেছি, কিন্ত এটি তো সেই হযরত মুসা (আঃ)-এর যুগ নয় এ তো হযরত মুহাম্মদ সোঃ)এর যুগ । এই যুগে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুরক্ত আউলিয়ায়ে কেরামের মধ্য কেউ বলতেন- আমার কৃূলব আমার রবের দর্শন লাভ করেছে।’ কেউ কেউ চীৎকার করে বলতেন,এমন রবের এবাদত আমি কখনও করিনি যাকে আমি দেখতে পাইনি । অর্থাৎ তার উম্মতের মধ্যে অনেক ওলী-আল্লাহই আল্লাহ পাককে দর্শন করেছেন বলে দাবী করেছেন, তবে আমার পক্ষে অসম্ভব হবে কেন? লোকটির কথা শেষ হলে হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) নিজের খাদেমদেরকে বললেন, “এই লোকটির হাত পা বেঁধে তাকে নদীর মধ্যে ফেলে দাও ।” তৎক্ষণাৎ তার আদেশ পালন করা হলো । নদীর পানির ঘুর্ণিপাক তাকে একবার ডুবিয়ে দিল, আবার ভাসিয়ে তুলল, এ অবস্থা চলতেছিল। আর সেই লোকটি চীৎকার করে বলতে লাগল, “হে নবীর ফরযন্দ! আমাকে রক্ষা করুন! আমাকে রক্ষা করুন! হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) পানিকে আদেশ করলেন, পানি! এই লোকটিকে পুনঃ পুণঃ তোমার ভিতর ডুবাতে থাক। পানি হুকুম মত কাজ করে যেতে লাগল । এরুপে পানি বারবার তাকে ডুবাতে ভাসাতে লাগল । আর সে প্রত্যেকবারে ভেসে উঠে সেই একই চীৎকার করল, সে প্রত্যেকবারে ভেসে উঠে সেই একই চিৎকার করতে লাগল, “হে নবীর সন্তান! আমাকে রক্ষা করুন, আমাকে রক্ষা করুন! চিৎকার করতে করতে লোকটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল । অবশেষে যখন দাজলা নদীর অতলান্তে চলে গেল, তখন সমস্ত মাখলুকের আশা তার মন থেকে ত্যাগ করল। ঠিক এই সময় যখন সে পানির ঘুরপাকের সাথে হটাৎ উপরে ভেসে উঠল, তখন বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে রক্ষা করুন।” এবার হযরত জাফর ছাদেক (রঃ) খাদেমকে আদেশ করলে, “লোকটিকে উঠিয়ে আন।” খাদেম তাকে নদী থেকে তুলে কিছুক্ষণ বিশ্রামের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে একস্থানে বসিয়ে দিল। অনেক্ষণ বিশ্রামের পর তার পূর্ব জ্ঞান ও স্বস্তি ফিরে আসলে হযরত জাফর ছাদেক তাকে বললেন, “আচ্ছা এবার বল তো, আল্লাহ তায়ালাকে দেখতে পেয়েছ কি? সে বলল, যতক্ষণ মুখলুকের সাহায্যের আশা মনে স্থান দিয়েছিলাম, ততক্ষণ পর্দার আড়ালে ছিলাম, তাকে দেখতে পাইনি। কিন্তু যখন সকল মানুষের আশা মন থেকে মুছে ফেলে খাটি মনে একমাত্র আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করলাম এবং আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লাম, তখন দেখলাম, আমার অন্তরের একটি খিড়কির দুয়ার খুলে গেছে, তা দ্বারা আমি আল্লাহ্‌ তা’আলাকে দেখতে পেলাম, অর্থাৎ তার

রহমতের নূর আমার উপর অজস্র ধারায় প্রবাহিত হতে লাগল । তখন আমি বলে উঠলাম, বিপন্ন ব্যক্তি বিপদে পড়ে যখন তাকে ডাকে, তখন সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য এবং সেই বিপদ মোচন করে দেওয়ার জন্য তিনি ছাড়া আর কে আছেন? আর কেউই নেই । হযরত জাফর ছাদেক (রঃ) বললেন, যতক্ষণ তুমি আমার উপর নির্ভর করছিলে এবং আমার সাহায্য চাচ্ছিলে, ততক্ষণ তুমি ভুল পথে ছিলে এবং মিথ্যাবাদী ছিলে । তোমার অন্তকরণের যে খিড়কিটি উন্মুক্ত হয়েছে এখন থেকে সেটিকে খুব যত্ন সহকারে উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করে যাও।

নছীহত
হযরত জাফর ছাদেক (রাঃ) বলেছেন –
*যে ব্যক্তি বলে, আল্লাহ তা“আলা কেন বস্তুর উপর অবস্থিত কিংবা তার অস্তিত্ব কোন বস্তু থেকে উৎপন্ন, সে নিঃসন্দেহে কাফের হয়ে যায় ।
*মানুষের অন্তরে যে গুনাহের কাজ আরম্ভ করার পূর্বে ভয়ের উদ্রেক হয় এবং নফসকে দমন করতে না পেরে সংকোচিত মনে তা করে ফেলে, পরিশেষে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে তওবা করে, সেই গুনাহের কাজই মানুষকে আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী করে দেয়। পক্ষান্তরে যে এবাদত প্রথমে এবাদতকারীর মধ্যে আমিত্ব-বোধ জাগ্রত করে এবং এবাদত সমাপ্ত করে তদ্দরুন মনে অহমিকার উদ্ভব হয়-এ জাতীয় এবাদতই মানুষকে মা’বুদ থেকে ক্রমশঃ দূরে সরিয়ে দেয়; বস্তুতঃ সে এই এবাদতের জন্য অহংকারী ও গুনাহগার । আর গুনাহের কাজ করে অনুতাপকারী ও ক্ষমা প্রার্থকারী আল্লাহ তা’আলার ফরমার্বদার বলে গণ্য হয়। না শোকর গুযার ধনী লোকের ফযীলত বেশী? “উত্তরে তিনি বললেন, দরিদ্র ও ছবরকারী দরবেশের ফবীলতই অধিক । কেননা, ধনী লোকের দৃষ্টি টাকা-পয়সার উপরেই নিবদ্ধ থাকে, আর নিঃসম্বল ছবরকারী দরবেশের দৃষ্টি শুধু এক আল্লাহর প্রতিই আকৃষ্ট থাকে ।” বস্তত  দুনিয়ার সমস্ত পদার্থের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহ পাকের সাথে সম্পর্কস্থাপন করলেই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে স্মরণ করা হয়; এর ফলে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এরূপ স্মরণকারীর জন্য তার পরিত্যক্ত সমস্ত পদার্থের বিনিময় হয়ে যান।
* আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-অর্থাৎ “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা (নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে) যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতের সাথে বিশিষ্ট খাছ) করে থাকেন। অতএব, দেখ! বান্দাকে দান করার ব্যাপারটি আল্লাহ তা’আলা একমাত্র তার নিজের ইচ্ছার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন; মধ্যস্থলে আর কোন উছিলা-উপকরণকে স্থান দেননি।

* তিনিই মোমেন ব্যক্তি-যিনি ‘নফসে আম্মার’কে দমন করার জন্য সতর্ক প্রহরী রূপে দীড়িয়ে থাকেন। আর “আরেফ’ হচ্ছেন তিনি-যিনি সর্বদা আল্লাহ ত“আলার দরবারে দণ্ডায়মান থাকেন।
* যে ব্যক্তি নিজের নফসে আম্মারার সাথে যুদ্ধ করে তাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়, সে ব্যক্তিই স্বীয় সত্তার পক্ষে বিশেষ কারামতের অধিকারী । আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নফসে আম্মারার সাথে যুদ্ধ করে, আল্লাহ তা“আলাকে সেই পায়।
* এলহাম অর্থ আল্লাহ তা“আলার পক্ষ থেকে গায়েবী নির্দেশ প্রাপ্ত হওয়া । আল্লাহ তাআলার প্রিয়তম বান্দাদের গুণাবলীর মধ্যে এটি একটি অন্যতম গুণ । “এলহাম’ কিছু নয় বলে প্রমাণ করতে যাওয়া বেদ্বীনের আলামত ।
* অন্ধকার রাত্রে একটি কালো পাথরের উপর একটি কালো বর্ণের পিপীলিকার গতিবিধি যতটুকু গুপ্ত এবং অদৃশ্য, আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব মানুষের নিকট উহার চেয়ে অধিক প্রচ্ছন্ন ।
* মানুষের শক্রু জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান হওয়া তাহার জন্য একটি সৌভাগ্য

* পীচ ব্যক্তির সংসর্গ থেকে সর্বদা দূরে থেক
(ক) মিথ্যুক । তাকে সঙ্গী হিসেবে রাখলে সর্বদাই তুমি তার দ্বারা প্রতারিত হবে।
(খ) আহমক। তার সঙ্গে থাকলে সে তোমার হিত সাধন করতে চাইবে, কিন্তু তাতে তোমার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। কেননা, সে যা তোমার জন্য করবে, বুঝতে পারবে না যে, এতে তোমার ক্ষতি হবে, না উপকার হবে।
(গ) কৃপণ । কেননা, সর্বদা সে নিজের লাভের জন্য তোমার ক্ষতিই করতে থাকবে । তোমার সুসময়ে তোমাকে শোষণ করবে আর দুঃসময়ে তোমার সঙ্গ ত্যাগ করবে ।
(ঘ) কাপুরুষ । তার সাহায্যের মুখাপেক্ষী হওয়ার সময় তেমাকে সে নিঃসহায় অবস্থায় ফেলে ভয়ে পলায়ন করবে । (ঙ) ফাসেক। কেননা, সে একটি মাত্র দেরহামের বিনিময়ে তোমাকে বিক্রয় করে ফেলবে; বরং লোভে পড়ে তার চেয়ে নুন্যতম স্বার্থের বিনিময়েও তোমার মাথায় বিপদ চাপিয়ে দিতে কুষ্ঠাবোধ করবে না।
* আল্লাহ পাক দুনিয়াতেই মানুষকে বেহেশত ও দোযখ অনুভব করার শক্তি দান করেছেন । সুস্থতাই বেহেশত আর অসুস্থতাই দোযখ । নিজের কাজ আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দিলে বেহেশতের সুখ পাওয়া যায়, আর নিজের কীজ নাফসে আম্মারার হাতে সোপর্দ করলে দোযখের আযাবের মত আযাব ও অশাস্তি ভোগ করতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *