ওল্ড টেস্টামেন্টের (পুরাতন নিয়মের) বিভিন্ন পুস্তক।

The books of the Old Testament

ওল্ড টেস্টামেন্ট বিভিন্ন দৈর্ঘ্য আকার ও প্রকরের রচনার একট সংকলন।  মৌখিক প্রবাদের ভিত্তিতে এগুলো নয় শতাধিক বছর যাবৎ বিভিন্ন ভাষায় রচিত হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময়ে, বহুদিন পর পর, কোনো ঘটনার ভিত্তিতে অথবা কোনো বিশেষ প্রয়োজনবশত অনেক রচনই সংশোধন ও সম্পূর্ণ করা হয়েছে।
সম্ভবত খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে একাদশ শতাব্দীতে ইসরাইলি রাজবংশের রাজত্বকালের প্রথম দিকে এ বিপুল রচনাবলি রচিত হয়েছল। ওই সময় রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই লেখক ছিলেন। তারা বিজ্ঞ ও পন্ডিত ছিলেন এবং তাদের ভূমিকা কেবল লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে যে অসম্পূর্ণ রচনার উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রথম সম্ভবত এ আমলেই রচিত হয়েছে। তখন এগুলোর লিখিত আকার দেওয়ার একটি বিশেষ কারণও ছিল । তৎকালে বহু সংগীত, কাব্যগাথা, ইয়াকুব ও মুসার নসিহত, দশ ফরমান এবং ধর্মীয় রেওয়াজ সৃষ্টিকারী রাজকীয় হুকুমনামা সংরক্ষণ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হতো । ওল্ড টেস্টামেন্টের বিভিন্ন গ্রন্থে এখন এগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। আরও কিছুদিন পরে সম্ভবত খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে দশম শতাব্দীতে পেন্টাটিউকের ‘ইয়াহভিস্ট’ গ্রন্থ রচিত হয়। এ গ্রন্থে আল্লাহকে “ইয়াহওয়ে’ নামে অভিহিত করা হয় বলে গ্রন্থের সে নাম রাখা হয় । মূসার (আঃ) এর নামে যে প্রথম পাঁচখানি গ্রন্থ চালু রয়েছে, তার মূলসূত্র হচ্ছে এ গ্রন্থ। পরে তার সঙ্গে ‘ইলোহিস্ট’ নামক রচনা এবং তার “স্যাকারডেটাল’ সংস্করণও যোগ করা হয়। আল্লাহকে ‘ইলোহিম’ নামে অভিহিত করায় রচনাটিকে ‘ইলোহিস্ট’ বলা হয়। আর জেরুজালেমের মন্দিরের স্যাকারডোট নামে পরিচিত হয়। দক্ষিণের জুডাহ রাজ্য থেকে পাওয়া ওই প্রাথমিক “ইয়াহভিস্ট’ রচনায় দুনিয়ার আদিকাল থেকে ইয়াকুব এর ইন্তিকাল পর্যন্ত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
খিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতেই লেখক পয়গম্বরদের আবির্ভাব ঘটে। ইসরাইলের আমোস ও হোসিয়া নামক দুজন এবং জুডায় মিকাহ নামক একজন লেখকপয়গম্বরের খোজ পাওয়া যায়।
খ্রিস্টপূর্ব ৭২১ সালে সামারিয়ার পতনের ফলে ইসরাইল রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ধর্মীয় এতিহ্য জুডাহ রাজ্যের হাতে চলে যায়। ধর্মীয় কিংবদন্তি সংগ্রহের কাজ এ সময় থেকে শুরু হয়। এ সময়ই ইয়াহভিস্ট ও ইলোহিস্টের রচনাবলি একত্রিত করে “তাওরাত’ নামে একখানিমাত্র গ্রন্থে রুপান্তরিত করা হয়। এ সময় ডিউটারোনমিও লেখা হয়।

খিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জোশিয়ার রাজত্বকালে পয়গম্বর জেরোনিয়ার আবির্ভাব ঘটে,কিন্তু তার বানী ও কর্মের বিবরণ লিখিত আকার লাভ করে আরও এক শতাব্দী পরে ।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী দ্বিতীয়ার্ধে জোশিয়ার রাজত্বকালে পয়গম্বর জেরোনিয়ার আবির্ভাব ঘটে,কিন্তু তার বাণী ও কর্মের বিবরণ লিখিত আকারে লাভ করে আরো এক শতাব্দীর পরে।
খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৯ সালে ব্যাবিলনে প্রথম দেশান্তরিত হওয়ার পূর্বে জেকানিয়া, নাহুম ও হাব্বাক্কুকের গ্রন্থ লিখিত হয়। এ সময়ের পরে এজেকিয়েল তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী প্রচার করতে থাকেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৭ সালে দ্বিতীয়বার দেশান্তরিত হওয়ার কাজ শুরু হয় জেরুসালেমের পতনের সময় এবং তা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে।

এজেকিয়েল একজন বিখ্যাত পয়গম্বর ছিলেন । কিন্তু তার গ্রন্থ বর্তমানে যে আকারে পাওয়া যায় তার জীবদ্দশায় সে আকারে সাজানো ছিল না। তার ইন্তিকালের পর যে কাতিবগণ ওইভাবে সাজান, তারাই তার আধ্যাত্মিক খলিফা বলে গণ্য হন। এ কাতিবগণ স্যাকারজোলটাল সংস্করণ নামে পরিচিত জেনেসিসের তৃতীয় সংস্করণ প্রস্তত করেন। এ সংস্করণে জেনেসিসের একটি অধ্যায়ের অর্থাৎ পৃথিবীর আদিকাল থেকে ইয়াকুবের ইন্তিকাল পর্যন্ত সময়ের বিবরণ রয়েছে । এভাবে তাওরাতের ইয়াহভিস্ট ও ইলোহিস্ট রচনার মুল পাঠের মধ্যে একটি তৃতীয় রচনার শামিল হয়ে যায়। পরে আমরা দুই থেকে চার শতাব্দী আগে লেখা কতিপয় গ্রন্থে এ তৃতীয় রচনার একটি কৌশলগত বৈশিষ্ট্য দেখতে পাব। এ একই সময় ল্যামেন্টেশন্সও (বিলাপ) প্রকাশিত হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সাইরাসের হুকুমে দেশান্তরিত হওয়ার অবসান ঘটে। ইহুদিরা ফিলিস্তিনে ফিরে আসে এবং জেরুসালেমের মন্দির পুনঃনির্মাণ করা হয়৷ ফলে পয়গম্বর ও প্রচারকদের কাজ পুনরায় শুরু হয়। এ সময় হাজ্জাই, জাকারিয়া, মালাচি ও ডানিয়েলের গ্রন্থ এবং ইসাইয়ার তৃতীয় গ্রন্থ ও বারুচের গ্রিক ভাষায় গ্রন্থ প্রণীত হয়।

আসলে দেশান্তরের ঘটনার পরবর্তী আমলে প্রধান প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থগুলো  রচিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০সালের কাছাকাছি সময়ে “প্রোভার্বস’ পঞ্চম শতাব্দীতে জব এবং তৃতীয় শতাব্দীতেপঞ্চম শতাব্দীতে ‘জব’ এবং তৃতীয় শতাব্দীতে “একলেজিয়াস্ট’ বা ‘কোহেলেথ’, “সঙ অব সউস’, “ক্রনিকেলস’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং ‘এজরা ও নেমোলিয়া’ রচিত হয়। একইভাবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে ‘একলোজিয়াসটিকাস’ বা “সিরাহ্ন’ এবং প্রথম শতাব্দীতে “বুক অব উইজডম’ ও “বুক অব মাকাবিজ’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড লিখিত হয়। কিন্তু রুথ, ইসথার ও জোনার গ্রন্থ যে কখন লেখা হয় তা সহজে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। “তাওরাত’ ও জুডিথের গ্রন্থের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা বলতে হয়। যেহেতু খ্রীষ্টের জন্মের মাত্র এক শতাব্দী পূর্বে ওল্ড টেস্টামেন্টের রচনাবলি গ্রন্থের আকারে সাজানো হয়েছে, সেহেতু এখানে যে সকল তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, তার পরেও সংশ্লিষ্ট রচনাগুলোর পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়ে থাকতে পারে বলে ধরে নিতে হবে। কারণ খ্রিস্টের জন্মের এক শতাব্দী পূর্বকালে এ রচনাগুলোর বেশিরভাগই কোনো সঠিক বা সুনির্দিষ্ট আকার লাভ করেনি। ‘

এভাবে আদিকাল থেকে খ্রিস্টান ধর্মের আবির্ভাব পর্যস্ত ইহুদিগণ ওল্ড টেস্টামেন্টকে তাদের ধর্মীয় ও সাহিত্যিক মিনার বলে গণ্য করেছে। এ গ্রন্থের বিভিন্ন খণ্ড অধ্যায় ও বিভাগ খ্রিস্টপূর্ব দশম ও প্রথম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত, সমাপ্ত ও সংশোধিত হয়েছে। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত নয়। এ তথ্য এবং এঁতিহাসিক জরিপের বিবরণ আমি একটি সর্বজনস্বীকৃত নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছি। গ্রন্খানি হচ্ছে সলকয়ের ডোমিকান ফ্যাকাল্টির প্রফেসর যে পি স্যামড্রোল রচিত এনসাইক্লোপিভিয়া ইউনিভার্সালিস (প্যারিস ১৯৭৪, তৃতীয় খণ্ড ২৪৬-২৫৩ পৃষ্ঠা), “দি বাইবেল” নামক নিবন্ধ । এ সকল তথ্য উচ্চতম যোগ্যতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞগণ সত্য ও সঠিক বলে সাব্যস্ত করেছেন। কাজেই ওল্ড টেস্টামেন্টের বিষয়বস্ত অনুধাবন ও উপলব্ধি করার জন্য এ তথ্যগুলো মনে বাখা আবশ্যক । ওল্ড টেস্টামেন্টের রচনাবলির মধ্যে অহী মিশ্রিত ছিল বলে বিশ্বাস করার কারণ আছে। কিন্তু এখন গ্রন্থখানি আমরা যে অবস্থায় পেয়েছি, তাতে সেই অহী আর বাকি রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে ।কারণ আমরা আগেই দেখেছি মূল বর্ণনা অনেকবার রদবদল হয়েছে এবং অনেক লেখকই হস্তক্ষেপ করেছেন। সুতরাং সহজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, তারা তাদের নিজ নিজ পরিবেশ, পরিস্থিতি ও পছন্দ অনুসারে যা ভালো মনে করেছেন, শুধু সেইটুকু বাকি রেখেছে এবং এখন আমাদের পর্যন্ত শুধু সেইটুকু এসেছে।
এ সকল বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রচারিত বাইবেলের বিভিন্ন সংস্কারণ ভূমিকায় প্রদত্ত বিবরণের তুলনা করা হলে দেখা যাবে যে,আসল তথ্য ও সত্য সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পরিবেশন করা হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থের রচনায় যে সকল ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে।দ্ব্যর্থবোধক হওয়ায় যে সকল বিষয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে,সেগুলো ঠিক সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। অসত্যকে সত্য বলে একটি ভুল ধারণা সৃষ্টির জন্য তথ্যের ব্যাপারটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা হয়েছে। বাইবেলের অধিকাংশ ভূমিকাতেই সত্য ও বাস্তবতা গোপন করে একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।যে সকল গ্রন্থ কয়েকবার রদবদল করা হয়েছে(যেমন, পেন্টাটিউক)সে সকল ক্ষেত্রে গ্রাসরি সে কথা না বলে শুধু বলা হয়েছে কিছু কিছু খুটিনাটি বিষয় পরবর্তীতে যোগ করা হয়েছে,কিন্তু আসলেই যেখানে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কেও নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে। জনসাধারণের জন্য বিপুল সংখ্যায় মুদ্রিত ও প্রচারিত বাইবেলে এ জাতীয় ভুল ও অশুদ্ধ তথ্য থাকা সত্যি দুঃখজনক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *