হাদীস সংরক্ষণ ও সংকলন

মাহনবী (স)এর কথা কাজ ও সম্মতিকে হাদীস বলে। কিন্তু প্রিয় নবীর বানী ও কাজ এগুলো কাছ থেকে দেখেছেন শুনেছেন। তাদের স্মৃতিই হাদীসের উৎস। পরবতীকালে গবেষক চিন্তাবিদগণ তাদের স্মৃতি, তাদের নৈতিকতা, হাদীসের বিষয় বর্নণা ও ইসলামের এবং প্রিয়নবীর অন্যান্য গ্রহণযোগ্য আচরণ ও কথার সাথে সমন্বয় করে হাদীস সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেন।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীসসমূহ অত্যান্ত আগ্রহ সহকারে মুখস্ত করে রাখতেন। আবার অনেকে মহানবী (সাঃ) এর অনুমতি সাপেক্ষে অল্পকিছু কিছু হাদীস লিখে রাখতেন। বিশেষ করে কোরআনের সাথে মিশ্রণ ঘটায় তখন হাদীস লেখার নির্দেশ ছিলনা। রোম, পারস্য প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশসমূহের সম্রাটদের পত্র প্রেরণ ইসলামের দাওয়াত এবং বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের সাথে চুক্তি ও সন্ধি লিখিতভাবে সম্পাদন করা হতো। আর মহানবীর সম্মতিক্রমে যা লেখা হতো তাও হাদীস হিসেবে বিবেচিত।

হযরত আবূ বকর (রাঃ) এর আমলে কুরআন মজীদ গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হলে সাহাবীগণ হাদীস লিপিবদ্ধ করার ব্যপারে আর কোন বাধা আছে বলে অনুভব করেননি। হযরত ওসমান (রা)কোরআন নিজহাতে লিপিবদ্ধ করে ইতহাস সৃষ্টি করেছেন।

হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষে সাহাবি ও তাবেয়ীগণ প্রয়োজন অনুসারে কিছু হাদীস বিচ্চিন্ন ও ব্যক্তিগতভাবে লিপিবদ্ধ করেন। পরে উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয (র) হাদীস সংগ্রহের জন্য মদীনার শাসনকর্তা আবু বকর বিন হাজম সহ মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন এলাকার শাসনকর্তা ও আলিমগণের কাছে একটি ফরমান জারী করেন যে, আপনারা মহানবী (সাঃ) হাদীসসমূহ সংগ্রহ করুন। তখন হাদীস সংগ্রহ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদান শুরু হয়।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী (রঃ) সর্বপ্রথম হাদীস সংগ্রহ এবং সংকলনে হাত দেন বলে জানা যায়। যদিও তাঁর সংকলিত হাদীসগ্রন্থের বর্তমানে কোন সন্ধান পাওয়া যায়না।

ইমাম ইবনে জুরাইজ (র) মক্কায়, ইমাম মালিক (র) মদীনায়, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব (র) মিসরে, আব্দুর রাজ্জাক ইয়েমেনে, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক খুরাসানে, এবং সূফিয়ান সাওরী ও হাম্মাদ ইবনে সালমা বসরায় হাদীস সংকলনে আত্ননিয়োগ করেন। সবচে বেশী হাদীস বর্নণা করেছেন আবু হুরায়রা (রা)তার স্মৃতিশক্তি এবং সততা দুটোই অসাধারণ। এরপর হযরত আয়েশার নামও প্রনিধানযোগ্যঅ

এই সময়ে লিখিত হাদীস গ্রন্থসমূহের মধ্যে ইমাম মালিকের “মুয়াত্তা” সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান প্রমান্য হাদীসগ্রন্থ। ইমাম মালিকের “মুয়াত্তা” গ্রন্থটি হাদীস সংকলনের ব্যপারে বিপূল-উৎসাহ উদ্দিপনার সৃষ্টি করেছিল। ইমাম শাফঈ (র) এর কিতাবুল “উম্ম” এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের “মাসনাদ” গ্রন্থদ্বয় হাদীসের উপর গুরুত্বপুর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে বিভিন্ন মণিষী মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অন্ঞ্চল থেকে প্রচুর হাদীস সংগ্রহ করেন। তন্মধ্যে বিখ্যাত হলেন ইমাম বুখারী (র), ইমাম মুসলিম (র), ইমাম আবূ দাউদ (র), ইমাম তিরমিজী (র), ইমাম নাসাঈ (র), এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (র)। এদের সংকলিত হাদীস গ্রন্থগুলো হলো সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবূ দাউদ, জামি’তিরমিযী, সূনানে নাসাঈ এবং সূনানে ইবনে মাজাহ্। এই ছয়খানা হাদীসগ্রন্থকে সন্মিলিতভাবে সিহাহ সিত্তাহ বা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ বলা হয়। এগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যাচাই বাছািই করে সংকলন করা হয়েছে।

কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচুর জালহাদীসের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে সুফিইজমের বিভিন্ন থিমকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং ব্রিটিশ সময়ে হঠাৎ স্বাধীকার চেতনায় জেগে উঠা মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার জন্য জাল হাদীসের বিস্তার করা হয় বলে শোনা যায়। তবে আধুনিক যুগের সচেতন মুসলিমগণ সিহা সিত্তাহ বাইরে হাদীস গ্রহণ করতে সর্তক থাকেন। এছাড়া কোরআনকে এবং রাসূলের জীবনকে মূল ধরে হাদীস মানার ব্যাপারেও আজকাল অনেকে সচেতন।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *