হযরত খাদিজা (রা:) এর জীবনী

৬১০ খ্রিষ্টাব্দে, হিজরী পূর্ব ১২ সালে, ২৭ শে রমজান লাইলাতুল ক্বদরে বিশ্বনবীর জীবনে সবচাইতে ভীতি ও উদ্দীপনার সংমিশ্রণে এক শুভ লগ্নের আবির্ভাব হলো। হঠাৎ করে তাঁর জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। তিনি অন্তর চোখে পরম সত্যের সুস্পষ্ট প্রকাশ দেখতে পেলেন। আলস্নাহ রাব্বুল আলামীনের অসীম জ্ঞানরাজ্যের নির্দেশাবলি জমীন ও আসমানের সর্বত্র নূরের বিকাশ, ইহলোক ও পরলোকের সার্বিক চিত্রলেখা তাঁর মনের মুকুরে ভেসে উঠল।

এমন সময় আলস্নাহ পাকের নির্দেশে আলস্নাহর বাণী নিয়ে হেরা পর্বতে অবতরণ করলেন জিব্রাইল ফেরেশতা। তিনি বিশ্বনবীকে বললেন, পড়-ন আলস্নাহর নামে।

উত্তর দিলেন- আমি পড়তে জানি না। দ্বিতীয়বার বলা হলো-পড়-ন আলস্নাহর নামে। উত্তর দিলেন- আমি পড়-য়া নই। তৃতীয়বার বলা হলো-পড়-ন আলস্নাহর নামে। উত্তর দেয়া হলো-আমি পড়তে পারি না।

তারপর জিব্রাইল ফেরেশতা বিশ্বনবীকে পর পর তিনবার বুকের সাথে চেপে ধরলেন। এই আলিঙ্গনের পর রাসূলুলস্নাহর জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন হলো। জ্ঞানভান্ডারের দ্বার তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেলে। ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত, শ্রান্ত, জ্ঞানদীপ্ত আল্-আমীন জিব্রাইল ফেরেশতার সাথে সাথে পড়লেন:(১) ইক্রা বিস্মি রাবি্বকালস্নাযী খালাক, (২) খালাকাল্ ইন্সানা মিন্ আলাক্, (৩) ইক্রা ওয়া রাব্বুকাল্ আকরাম, (৪) আলস্নাযী আলস্নামা বিল্ কালাম, (৫) আলস্নামাল্ ইনসানা মালাম ইয়া’লাম।

অর্থাৎ হে আল্ -আমীন মুহাম্মদ (স.)! তোমার প্রতিপালকের নাম নিয়ে পাঠ কর, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড হতে পয়দা করেছেন। পাঠ কর তোমার সেই মহামহিম প্রতিপালকের নামে যিনি কলম দ্বারা শিক্ষাদান করেছেন এবং মানুষকে সে সকল জ্ঞান শিখিয়েছেন যা তাদের অজানা ছিল।

কিছুদিন পর রাসূলুলস্নাহ (স.) জাবালে নূরের শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এমন সময় সুদূর নীলিমার বুকে একটি প্রচণ্ড আওয়াজ তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করল। তিনি চেয়ে দেখলেন, হেরা গিরিগুহার সেই পরিচিত ফেরেশতা নভোমণ্ডলের এক স্বর্ণ-সিংহাসনে উপবিষ্ট। তাঁর নূরানী তেজোদৃপ্ত চেহারা অবলোকন করে তিনি প্রকম্পিত হয়ে গেলেন। ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় গৃহে প্রত্যাবর্তন করে বললেন, আমার শরীর বস্ত্রাবৃত কর, বস্ত্রাবৃত কর। একটু পরেই বিবি খাদিজার গৃহে দ্বিতীয়বার অহী নাজিল হলো।
পরবর্তী সময়ে বিদূষী খাদিজা রাসূলুলস্নাহ (স.) কে নিয়ে চাচা ওয়ারাকা বিন্ নওফেলের নিকট চলে গেলেন। সবিস্তারে সবকিছু বর্ণনা করলেন। ওয়ারাকা বললেন, খাদিজা! ভয় করো না। তোমার স্বামীই হচ্ছেন শেষ নবী মুহাম্মদ রাসূলুলস্নাহ (সা.)। আর তিনি যে নূরানী পুরুষকে নভোমণ্ডলে দর্শন করেছেন-তিনি হলেন অহীবাহক জিব্রাইল ফেরেশতা। হে খাদিজা! প্রকৃতই তুমি সৌভাগ্যবতী।
গৃহে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুলস্নাহ (স.) সকল ভীতি ও অবসাদ পরিহার করলেন। প্রিয়তমা পত্মীকে কাছে ডেকে বললেন, প্রিয়ে! আলস্নাহ পাক আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন মানুষকে হুঁশিয়ার করতে, আলস্নাহর পথে আহবান জানাতে। বলতো প্রিয়ে! এখন কাকে আমি আহবান জানাই, কাকে আমি এই শাশ্বত বাণী শোনাই? কে দেবে আমার আহবানে সাড়া?
বিবি খাদিজা-যিনি সাধনার সফলতার জন্য নিজের আরাম আয়েশ, অগণিত ধন-দৌলত অকাতরে উৎসর্গ করেছেন, যিনি সর্বাত্মক সাহায্য, সহানুভূতি ও সহযোগিতার দ্বারা সকল প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করেছেন, যিনি সর্বক্ষণ স্বামীর চলার পথে শক্তি-সাহস, উৎসাহ-উদ্দীপনা, অদম্য মনোবল ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সেই খাদিজা ভক্তি চিত্তে স্বতঃস্ফূর্ত মধুর স্বরে বললেন, স্বামী! আমিই প্রথম সাড়া দিচ্ছি আপনার ঘোষণায়। আমিই ঘোষণা করছি -’ লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌।(সাঃ)” হে প্রিয় নবী! আপনি সম্পূর্ণ নিরুদ্বেগ, নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি সর্বদাই আপনার অহীর সত্যায়ন করতে প্রস্তুত আছি। এমনিভাবেই রাসূলুলস্নাহ (স.)-এর রেসালতের ওপর সর্বপ্রথম ঈমান আনলেন বিবি খাদিজাতুল কোব্রা। বিশ্বনবীর নবুয়তের মহান দায়িত্বের শুভ উদ্বোধন হলো তাঁর প্রিয়তমা পত্মী জীবন সঙ্গিনীর সত্যবিভাসিত উজ্জ্বল অন্তরের মণিকোঠায়।
রেসালতের প্রথম তিন বছর অর্থাৎ বিশ্বনবী (স.)-এর ৪০ হতে ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি চুপে চুপে ইসলাম প্রচার করতে লাগলেন। এই প্রচারণার ফলে হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা.), হযরত আলী (রা.) এবং আরো কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম কবুল করলেন। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল রেসালতের পয়গাম। সত্যের শাশ্বত আহবানের স্রোতের টানে অসত্য ও মিথ্যার বেড়াজাল তৃণবৎ ভেসে যেতে লাগল। দিকে দিকে অনুরণিত হতে লাগল- “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌।(সাঃ)”

শুরু হলো সংঘাত। সত্যের সাথে মিথ্যার, আলোর সাথে অন্ধকারের। মক্কার পৌত্তলিক মানবগোষ্ঠী সত্যের এই প্রোজ্জ্বল আহবানকে কোনক্রমেই সহ্য করতে পারছিল না। তারা নানাভাবে বিশ্বনবী ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাতে লাগল। শয়তানী শক্তি পুরোদমে কাজ শুরু করে দিল। কিন্তু সত্যের যে অনির্বাণ শিখা জাবালে নূরের হেরা গুহা হতে বিচ্ছুরিত হয়েছিল, যার তেজোদ্দীপ্ত রৌশনীতে সকল অন্ধকার বিদূরিত হতে বাধ্য, সেই পরম প্রবাহকে জাগতিক কর্মকাণ্ড দ্বারা স্তব্ধ করে দেয়া কোনকালেই যে সম্ভব নয়, তা তৎকালীন পৌত্তলিক আরব জাতি ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। আর পারেনি বলেই আলস্নাহ প্রদত্ত হেদায়েত তাদের অনেকেরই নসীব হয়নি। নসীব হয়নি সত্যাশ্রয়ী জীবন যাত্রার পথে পা বাড়াবার।

খাদিজা, মহীয়সী খাদিজা। যিনি ছিলেন রাসূলুলস্নাহর প্রেম-ভালোবাসা ও উদারতার মূর্ত প্রতীক। তিনি ছিলেন প্রীতি ও মমতার উৎস ভাণ্ডার, সুখে-দুঃখে সকল সময়ে তিনি রাসূলুলস্নাহ (স.) -এর চিরসঙ্গিনী। তিনি ছিলেন প্রীতিসুলভ মমতার মূর্ত প্রতীক। স্নেহ, মমতা, আনন্দ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে তিনি যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তা যুগ যুগ ধরে অক্ষয় ও অমস্নান থাকবে।

ক্রমেই তিনি কেমন যেন আরো দুর্বল হয়ে পড়লেন। কোন কিছুর প্রতিই তাঁর আকর্ষণ নেই। একমাত্র রাসূলুলস্নাহর খেদমত কিভাবে করা যায়, কেমন করে তাঁর চিত্তে আনন্দ লহরী প্রবাহিত করা যায়, কেমন করে বিশ্ববাসীর দুশমনদের কুটিল ষড়যন্ত্রগুলো নিষ্ফল করে দেয়া যায় এ-ই ছিল তাঁর একান্ত কামনা। তারপর একদিন সত্যিই তাঁর বিদায়ের মূহুর্ত এলো। নবুয়্যাতের দশম বর্ষে পবিত্র রমজান মাসের ১০ তারিখে বিবি খাদিজাতুল কোবরা (রা.) মৃতু্যবরণ করলেন। “ইন্নালিলস্নাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *