স্পেনের সর্বশেষ মুসলিম সাম্রাজ্য

প্রাচীনকালে সভ্যতা, সৌন্দর্য ও শিক্ষার বিচিত্র লীলাভূমি ও কীর্তি মন্দির বলিয়া যে সমস্ত মহানগরী খ্যাতিলাভ করিয়াছিল, তন্মধ্যে গৌরবোন্নত, সৌন্দর্য-সমালঙ্কৃত, সমৃদ্ধিসম্পন্ন স্পেনের কর্ডোভা মহানগরী অন্যতম। বাগদাদ ব্যতীত কর্ডোভা মহানগরীর সহিত অপর কোনও নগরীর নামও উল্লেখিত হইবার যোগ্য নহে। স্পেনকে পরী বলিয়া কল্পনা করিলে কর্ডোভাকে তাহার চক্ষু বলিয়া স্থান দিতে হয়। প্রাচীন আরব ঐতিহাসিকগণ কর্ডোভাকে স্পেনের পাত্রী বা কনে (Bride) বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। গৌরবের দিনে কর্ডোভার ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য, শিক্ষা ও সভ্যতা, শিল্প ও বাণিজ্য, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য, আমোদ-প্রমোদ ও বিলাস-উল্লাস, একত্র পুঞ্জীভূত হইয়া ইহাকে কবি-চিত্ত-সম্মোহন কল্পনাতীত সুন্দরী ও সুখময়ী করিয়া তুলিয়াছিল। পৃথিবীর নানা দিগদেশের ভ্রমণকারিগণ কৌতূহলাক্রান্তচিত্তে কর্ডোভার বিশ্ব-বিশ্রুত সৌন্দর্য-গরিমায় মুগ্ধ হইয়া তদ্দর্শনার্থে আগমন করিতেন এবং বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে ইহার গঠন-সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা, সুখশান্তি এবং বিপুল ঐশ্বর্যচ্ছটায় স্তম্ভিত হইয়া মুক্তকণ্ঠে ইহার প্রশংসা কীর্তনে আপনাদিগকে চরিতার্থ মনে করিতেন।স্পেন। ইউরোপের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংগ। এখানে একদিকে যেমন হয়েছে ইউরোপের প্রথম সভ্যতার উৎকর্ষ, অন্যদিকে ঘটেছে ইনকুইজিশনের মত বর্বরতা। সব মিলিয়ে স্পেনের ইতিহাস তাই বহুমাত্রিক, যা পাঠকদের আগ্রহী করে তোলে। নিতান্ত উদাসীন হলেও আপনি হারিয়ে যেতে চাইবেন স্পেনের বৈচিত্রময় অতীতে, মিশে যেতে চাইবেন সেখানকার মানুষদের জীবন ধারার সাথে।

গ্রানাদা — স্পেনের সর্বশেষ মুসলিম সাম্রাজ্য

৭১১ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়া উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) ইসলাম পৌঁছায়। সেখানকার রাজা রডারিক এর অত্যাচারী শাসনের ইতি ঘটাতে আইবেরিয়ার নির্যাতিত-নিপীড়িত খ্রিস্টানদের থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া মুসলিম বাহিনী তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মরক্কো ও স্পেনের মধ্যবর্তী জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে। এরপর সাত বছরের মধ্যেই আইবেরিয়া উপদ্বীপের বেশিরভাগ অঞ্চলই মুসলিম নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আর এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশ পরবর্তী ৭০০ বছর ধরে মুসলিম নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

১০ম শতকের মাঝামাঝিতে আল-আন্দালুসের ইসলাম স্বর্ণযুগে পৌঁছায়। প্রায় ৫০ লক্ষ মুসলিমের আবাসস্থল হয় আল-আন্দালুস, যা সেখানকার মোট জনসংখ্যার ৮০% এরও বেশী। এক শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ উমাইয়া খিলাফত এই অঞ্চল শাসন করছিল। আর আল-আন্দালুস (বা আন্দালুসিয়া) হয়ে উঠেছিল ইউরোপের সবচেয়ে অগ্রগামী এবং স্থিতিশীল অঞ্চল। আল-আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোবা আকর্ষণ করছিল গোটা মুসলিম বিশ্বের এবং ইউরোপের জ্ঞানপিপাসুদের। যাই হোক, এই স্বর্ণযুগ আজীবন স্থায়ী ছিলনা। ১১শ শতকের দিকে খিলাফত ভেঙ্গে যায় এবং অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে যেগুলোকে বলা হতো ‘তাইফা’। মুসলিম তাইফাগুলো বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সাথে সাথে আল-আন্দালুসের উত্তর দিকের খ্রিস্টান রাজ্যগুলো থেকে আক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। পরবর্তী ২০০ বছরে তাইফাগুলো এক এক করে খ্রিস্টান “রিকনকুইস্তা”-র কাছে ধরাশায়ী হতে থাকে। ১২৪০-এর দশকে এসে আল-আন্দালুসের একমাত্র মুসলিম তাইফা বাকি থাকে, সেটা হচ্ছে গ্রানাদা। এই প্রবন্ধে আমরা আইবেরিয়া উপদ্বীপের এই শেষ মুসলিম রাজ্যের পতনের উপর আলোকপাত করব।
[রিকনকুইস্তা (Reconquista) হচ্ছে একটি স্পেনীয় ও পর্তুগীজ শব্দ যার ইংরেজি হচ্ছে Reconquest (অর্থঃ পুনর্দখল)। ঐতিহাসিকরা ৭১৮ বা ৭২২ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৭৭০ বছরের সময়কালকে “রিকনকুইস্তা” হিসেবে অভিহিত করে থাকেন, যা মূলত খ্রিস্টানদের স্পেন পুনর্বিজয়ের আন্দোলনকে বুঝানো হয়।]

গ্রানাদা আমিরাত

গ্রানাদা আমিরাতের সীলমোহর, যাতে লেখা রয়েছে “আল্লাহ ছাড়া কোন বিজয়ী নেই”
গ্রানাদা আমিরাতের সীলমোহর, যাতে লেখা রয়েছে “আল্লাহ ছাড়া কোন বিজয়ী নেই”

রিকনকুইস্তার সময় আল-আন্দালুসের উত্তরদিক থেকে আসা হানাদার খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর হাতে একের পর এক মুসলিম রাজ্যগুলোর পতন হতে থাকে। কর্ডোবা, সেভিয়া এবং টলেডোর মতো বড় বড় শহরগুলোর পতন হয় ১১শ থেকে ১৩শ শতকের মধ্যে। যদিও উত্তর আফ্রিকার মুরাবিতুন এবং মুওয়াহিদুন আন্দোলনগুলো খ্রিস্টানদের আক্রমণের এই স্রোতকে মন্থর করতে সাহায্য করেছিল, তবে মুসলিমদের মাঝে চরম অনৈক্য শেষ পর্যন্ত তাদের রাজ্যহীন ও ভূমিহীনে পরিণত হওয়ার দিকেই ধাবিত করে।
একটিমাত্র মুসলিম প্রদেশ — গ্রানাদা – ১৩শ শতকে খ্রিস্টানদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবার পতনের পর গ্রানাদা আমিরাতের শাসকগণ শক্তিশালী খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের সাথে এক বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করে। অর্থাৎ তারা “গ্রানাদা আমিরাত” হিসেবে স্বাধীন থাকার অনুমতি পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তাদেরকে চড়া মূল্যে ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের কাছে কর প্রদান করতে হয়েছিল। এই কর প্রদান করতে হতো প্রতি বছর স্বর্ণমুদ্রা হিসেবে। এটি গ্রানাদার মুসলিমদের আরো দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দেয় যেহেতু তারা নিজেরাই নিজেদের শত্রুদের কাছে কর প্রদানের মাধ্যমে শত্রুদের ধীরে ধীরে আরো শক্তিশালী করে তুলছিল।

এছাড়াও গ্রানাদা আমিরাতের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকার পেছনে অন্যান্য আরো কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে এর ভৌগলিক অবস্থান। গ্রানাদা দক্ষিণ স্পেনের সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার মধ্যে অনেক উঁচু স্থানে অবস্থিত যা আক্রমণকারী বহিঃশক্তির বিরুদ্ধে একটা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতো। একারণে খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যের চেয়ে সামরিক শক্তির দিক দিয়ে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও এই পর্বতমালা গ্রানাদাকে দিয়েছিল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে বিশাল এক সুবিধা।

গ্রানাদার যুদ্ধ এবং অস্তিত্বের লড়াই

প্রায় ২৫০ বছরেরও বেশী সময় ধরে গ্রানাদা টিকে ছিল শক্তিশালী খ্রিস্টান ক্যাস্টিলে সাম্রাজ্যকে কর প্রদান করে যাওয়ার মাধ্যমে। শত্রুভাবাপন্ন খ্রিস্টান রাজ্যবেষ্টিত হওয়ায় গ্রানাদা প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ছিল। ১৫শ শতকের শুরুর দিকে আল-আন্দালুসের সর্বশেষ এই রাজ্য নিয়ে এক মুসলিম স্কলার লিখেছিলেনঃ

“গ্রানাদা কি এক উত্তাল সমুদ্র এবং ভয়ানক অস্ত্রশস্ত্র-সজ্জিত হিংস্র এক শত্রু দ্বারা বেষ্টিত নয়, যারা উভয়ই রাতদিন গ্রানাদার জনগণের উপর ভীতির সঞ্চার করে?”

খ্রিস্টানদের গ্রানাদা বিজয়ের মূল চালিকাশক্তিটি আসে ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে, যখন অ্যারাগন রাজ্যের রাজা ফার্দিনান্দ এবং ক্যাস্টিলে রাজ্যের রাণী ইসাবেলা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এর মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয় আইবেরীয়া উপদ্বীপের সবচেয়ে শক্তিশালী দু’টি খ্রিস্টান রাজ্য। একজোট হয়েই তারা তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গ্রানাদার দিকে, উপদ্বীপের সর্বশেষ এই মুসলিম রাজ্যকে সমূলে উৎপাটন করাই হয়ে পড়ে তাদের লক্ষ্য।

রাজা ফার্দিনান্দ এবং রাণী ইসাবেলা আল-আন্দালুসের সর্বশেষ মুসলিম আমিরাত ধ্বংসের জন্য উঠেপড়ে লাগেন

১৪৮২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের এই নতুন খ্রিস্টান রাজ্যের সাথে গ্রানাদা আমিরাতের যুদ্ধ শুরু হয়। শক্তিমত্তার দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও গ্রানাদার মুসলিমরা নির্ভীক হয়ে বীরের মতো যুদ্ধ করে। এক স্পেনীয় খ্রিস্টান গল্পকার মুসলিম সৈন্যদের বীরত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলেন, “মুসলিমরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে এবং হৃদয় উজাড় করে যুদ্ধ করেছে ঠিক যেমনটা একজন সাহসী ও নির্ভীক ব্যক্তি তাঁর নিজের, নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন রক্ষা করতে করে থাকে।” এই যুদ্ধে মুসলিম জনসাধারণ এবং গ্রানাদা আমিরাত সেনাবাহিনীর সৈন্যগণ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করেছে, আল-আন্দালুসের ইসলামকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছে। অন্যদিকে মুসলিম শাসকদের ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো, তারা তেমন সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিতে পারেননি।

যুদ্ধের গোটা সময়জুড়ে খ্রিস্টানরা ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং নিজেদের মধ্যে কোন রকমের দ্বন্দ্ব-বিবাদ কিংবা দলাদলিতে জড়িত হয়ে পড়েনি। যদিও অতীতে এমন ঘটনা খ্রিস্টানদের মাঝে অহরহ ঘটতো। এমন ঘটনা ছিল খ্রিস্টানদের মাঝে খুবই স্বাভাভিক এক ব্যাপার। অন্যদিকে মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ দলাদলির কারণে গ্রানাদা বড় এক রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। মুসলিম নেতা ও গভর্ণরেরা একে অপরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছিল এবং একে অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ফন্দি আঁটতে ব্যস্ত ছিল। এদের বেশিরভাগই আবার অর্থ-সম্পদ, ভূমি এবং ক্ষমতার বিনিময়ে গোপনে বিভিন্ন খ্রিস্টান রাজ্যের যোগসাজশে কাজ করে যাচ্ছিল। আর এতো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটি ছিল গ্রানাদা আমিরাতের সুলতানের ছেলে মুহাম্মাদের বিদ্রোহের ঘটনা। ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর পরে মুহাম্মাদ তার পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে গ্রানাদায় তুমুল এক গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। আর একই সময়ে খ্রিস্টান স্প্যানীয় বাহিনীও বাহির থেকে গ্রানাদায় আক্রমণ করা শুরু করে।

রাজা ফার্দিনান্দ এই গৃহযুদ্ধকে নিজের সুবিধার্থে কাজে লাগায়। গ্রানাদা আমিরাতকে সামগ্রিকভাবে দুর্বল এবং মেরুদণ্ডহীন করে দেয়ার জন্য সে মুহাম্মাদকে তার পিতার বিরুদ্ধে (এবং পরবর্তীতে মুহাম্মাদের চাচাকেও) বিদ্রোহে সহায়তা করে। মুহাম্মাদকে নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে ফার্দিনান্দ অস্ত্র ও যোদ্ধা দিয়ে সহায়তা করে এবং শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ সফলও হয়। গোটা বিদ্রোহের সময়জুড়ে খ্রিস্টান বাহিনী ধীরে ধীরে গ্রানাদা আমিরাতের সীমান্তে চাপ প্রয়োগ করতে করতে আমিরাতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করতে থাকে এবং দখল করতে থাকে। ফলে ১৪৯০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ যখন বিদ্রোহে জয়ী হয়ে ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে, ততদিনে শুধুমাত্র গ্রানাদা শহরটিই তার শাসনাধীন অঞ্চল হিসেবে থাকে এবং গ্রাম অঞ্চলের সমগ্র অংশ খ্রিস্টানদের হাতে চলে যায়।

গ্রানাদার সর্বশেষ প্রতিরোধ

গ্রানাদায় মুহাম্মাদের ক্ষমতা ও শাসন পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তার কাছে রাজা ফার্দিনান্দ একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে রাজা ফার্দিনান্দ মুহাম্মাদকে চিঠি পাওয়া মাত্রই আত্মসমর্পণ করার ও গ্রানাদাকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়। ফার্দিনান্দের এই দাবিতে মুহাম্মাদ খুবই বিস্মিত ও হত-বিহ্বল হয়ে পড়ে কারণ ফার্দিনান্দ ইতিপূর্বে তাকে বুঝিয়েছিল যে সে তাকে গ্রানাদা শাসন করার অনুমতি দিবে। পরিষ্কারভাবে, বহু দেরীতে হলেও মুহাম্মাদ বুঝতে পারে যে আসলে গ্রানাদা দুর্বল করার জন্য ফার্দিনান্দ তাকে দাবাখেলার এক গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছে মাত্র।

খ্রিস্টানদেরকে সামরিকভাবে প্রতিরোধ করতে মুহাম্মাদ উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন মুসলিম সাম্রাজ্যের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। কিন্তু কেউই তার এই ডাকে সাড়া দেয়নি, শুধুমাত্র ওসমানী সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর এক ছোট্ট অংশ স্পেনীয় উপকূলে হানা দিয়েছিল তবে তাও তেমন কোন কাজে আসেনি। ১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার সেনাবাহিনী গ্রানাদা শহর চতুর্দিক দিয়ে ঘেরাও করে ফেলে। মুহাম্মাদ তার আলহাম্বরা প্রাসাদের মিনার থেকে দেখতে পায় যে খ্রিস্টান বাহিনী গ্রানাদা শহর বিজয়ের জন্য জড়ো হচ্ছে এবং আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মুহাম্মাদ সবকিছু অন্ধকার দেখতে পায় এবং শেষমেশ কোন উপায়ান্তর না দেখে ১৪৯১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে খ্রিস্টানদের সাথে একটি চুক্তি করে যা খ্রিস্টানদেরকে গ্রানাদা শহরের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দেয়।

২ জানুয়ারী ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে আলহাম্বরা প্রাসাদে খ্রিস্টান সাম্রাজ্যসমূহের পতাকা এবং ক্রস বা ক্রুশচিহ্ন লাগিয়ে দেয়া হয়

২ জানুয়ারী ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে এই চুক্তি কার্যকর হয় এবং স্পেনীয় বাহিনী গ্রানাদায় প্রবেশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে আল-আন্দালুসের সর্বশেষ মুসলিম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়। খ্রিস্টান সৈন্যরা সকাল বেলা ঐতিহাসিক আলহাম্বরা প্রাসাদে প্রবেশ করে এবং তাদের বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে প্রাসাদের দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন স্পেনীয় খ্রিস্টান রাজবংশ, রাজা-রাণীদের পতাকা ও নিশান লাগাতে থাকে। প্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু মিনারের উপরে সৈন্যরা রূপার তৈরী বিশাল এক ক্রুশ্চচিহ্ন বা ক্রস খাড়াভাবে স্থাপন করে এবং এর মাধ্যমে গ্রানাদার ভীত সন্ত্রস্ত মুসলিম অধিবাসীদের জানিয়ে দেয় যে খ্রিস্টান-বিশ্ব মুসলিমদের আল-আন্দালুসের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। শহরের মুসলিম অধিবাসীরা ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছিলনা এবং শহরের রাস্তাগুলো জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে।

সুলতান মুহাম্মাদকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। গ্রানাদা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় পথে সুলতান এক পর্বতমালার গিরিপথে থেমে গ্রানাদার দিকে ফিরে তাকায় এবং কাঁদতে আরম্ভ করে। তার এই আকস্মিক অনুশোচনা ও আক্ষেপে তার মা কোনরূপ প্রভাবিত না হয়ে বরং তাকে তিরস্কার করে বলেনঃ

“যে জিনিষ তুমি একজন পুরুষ হয়ে রক্ষা করতে পারোনি সে জিনিষের জন্য নারীদের মতো কান্নাকাটি করোনা।”

যদিও বিজয়ী খ্রিস্টানরা গ্রানাদার অধিবাসীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বেশকিছু সুবিধাজনক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তবে শীঘ্রই সকল প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ করা হয়। ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, ফলে শত-সহস্র মুসলিম অধিবাসী উত্তর আফ্রিকায় হিজরত করতে কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস গোপন করতে বাধ্য হয়। ১৭শ শতকের শুরুর দিকে এসে গোটা স্পেনে আর একজন মুসলিমের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়না।

১১শ শতকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি থেকে ১৫শ শতকের শেষদিকে এসে শক্তিহীন এক রাজ্যে পরিণত হয়ে খ্রিস্টানদের অধীনে চলে যাওয়া— আন্দালুসিয়ার পতনের এই গল্প ইসলামের ইতিহাসে অদ্বিতীয়। মুসলিমদের নিজেদের মাঝে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব-বিবাদ, অন্যান্য মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর সমর্থন ও সাহায্যের অভাব এবং ইসলামী ঐক্যের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেয়া এসবকিছুই আল-আন্দালুসকে পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে গ্রানাদা পতনের মাধ্যমে, এই গল্পেরও ইতি ঘটে।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *