সুউচ্চ অভিলাষ

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু উপরিকাঠামোগুলো বলে দেয় মানুষের সুউচ্চ অভিলাষের কাহিনী। সবচেয়ে প্রাচীন উপরিকাঠামোগুলো ছিল প্রাচীন মিসরের ফারাওদের সাড়ম্বর শেষ বিশ্রামাগার বা কবর। মধ্য যুগে সারা ইউরোপে যখন খ্রিষ্টধর্ম প্রসার লাভ করল, তখন বিশাল বিশাল গির্জা হয়ে দাঁড়াল ঈশ্বরের আরাধনার প্রতীক। আধুনিক যুগের আকাশছোঁয়া স্থাপনাগুলো যেমন প্রযুক্তির উৎকর্ষ নির্দেশ করে, তেমনি মানুষের পুরনো ধাঁচের উদ্ভাবনী কৌশলের পরিচয় প্রকাশ করে। অতএব আপনার মাথায় যদি উদ্ভাবনের চিন্তা চেপে বসে থাকে, তাহলে চলুন আপনাকে আমরা ইতিহাসের কালোত্তীর্ণ কাঠামো ভ্রমণে নিয়ে যাবো।

১.বুর্জ দুবাই
বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থাপনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত বুর্জ দুবাই। ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে উদ্বোধনের সময় এর উচ্চতা ছিল ৬৮৮ মিটার বা ২২৫৭ ফুট, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। আইফেল টাওয়ারের চেয়ে এ উচ্চতা দ্বিগুণের বেশি। সেপ্টেম্বর ২০০৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলে এর উচ্চতা দাঁড়ায় ৮১৮ মিটার বা ২৬৮৪ ফুট।

২.কলোগ্নি ক্যাথিড্রাল
(১৮৮০-১৮৮৪)
কলোগ্নি ক্যাথিড্রালের নির্মাণকাজ ১৮৪৮ সালে শুরু হলেও গথিক স্থাপত্যের এই উজ্জ্বল নমুনা নির্মাণ ১৮৮০ সালে গিয়ে শেষ হয়। তখন থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত এই গির্জাটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা। তারপর এটাকে ছাড়িয়ে যায় ওয়াশিংটন স্মৃতিসৌধ। কলোগ্নি ক্যাথিড্রালের চেয়ে কেবল উল্ম ক্যাথিড্রালের চূড়া উঁচু যা ১৫৭ মিটার বা ৫১৫ ফুট, অর্থাৎ লন্ডনের দোতলা বাসগুলোর উচ্চতার দশ গুণ। এখন এটাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।সেন্ট ম্যারির গির্জা (১৬২৫-৪৭)
জার্মানির স্ট্রলসুন্ডে অবস্থিত এবং গথিক স্থাপত্যের আরেক প্রসিদ্ধ নিদর্শন সেন্ট ম্যারির গির্জা। ১৫১ মিটার বা ৪৯৫ ফুট উঁচু। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের আগে নির্মিত স্থাপনাটি বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবনের খেতাব হারায় ১৬৭৪-এ বজ্রপাতে এর টাওয়ার ধ্বংস হলে। এখন এর উচ্চতা ১০৪ মিটার বা ৩৪১ ফুট।

 

৩.স্নিফেরুর লাল পিরামিড
(খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০-২৫৬০ খ্রি:পূ:)
গোলাপি রঙের পাথরে তৈরি বলে এটাকে লাল পিরামিড বলা হয়। ১০৪ মিটার বা ৩৪১ ফুট উঁচু এই পিরামিডটি মিসরের দাহসুর নেক্রপলিসে অবস্থিত তিনটি পিরামিডের একটি। চতুর্থ ফারাও স্নিফেরু, যিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৬১৩ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৮৯ পর্যন্ত মিসর শাসন করেন, তিনিই এটা নির্মাণ করেন। গির্জার সবচেয়ে বড় পিরামিডটি নির্মিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটাই ছিল পৃথিবীতে মানুষের তৈরি সবচেয়ে উঁচু উপরিকাঠামো।

 

৪.ওস্টানকিনো টাওয়ার (১৯৬৭-৭৫)
এখনো ইউরোপে এটাই মানুষের নির্মিত সর্বোচ্চ কাঠামো এবং ৫০০ মিটার বা ১,৬৪০ ফুট অতিক্রমকারী প্রথম স্থাপনা। রাশিয়ার মস্কোয় অবস্থিত টিভি ও রেডিও টাওয়ার হিসেবে ব্যবহৃত এর উচ্চতা ৫৪০ মিটার বা ১৭৭২ ফ্টু। নির্মাণকাজ ১৯৬৩ সালে শুরু হয়ে চার বছরে শেষ হয়। টরন্টোর সিএন টাওয়ারের কাছে তা সর্বোচ্চ কাঠামোর খেতাব হারায়।

 

৫.সেন্ট নিকোলাই (১৯৭৪-৭৬)
জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত বিশাল গথিক রিভাইভাল ভবনটি মাত্র দুই বছরের জন্য বিশ্বের
সর্বোচ্চ স্থাপনা ছিল। তারপর এটিকে ছাড়িয়ে যায় রৌয়েন ক্যাথিড্রাল। সেন্ট নিকোলা নামে কয়েকটি ভবন আছে। সবচেয়ে প্রাচীনটি নির্মাণ করা হয় একাদশ শতকে। কিন্তু ১৪৭ মিটার বা ৪৮৩ ফুট ৩ ইঞ্চি উঁচু চূড়ার এই গির্জা ১৮৪৬ থেকে ১৮৭৪ সালের মাঝামাঝি নির্মিত হয়।

 

৬.গিজার গ্রেট পিরামিড (খ্রি:পূ: ২৫৬০-১৩১১ খ্রিষ্টাব্দ)
মিসরের সবচেয়ে বড় পিরামিডটির এক সময় উচ্চতা হয়ে যায় ১৪৬ মিটার বা ৪৭৯ ফুট। অবশ্য য়ের কারণে তা এখন একটু কমে গেছে। কুফুর পিরামিড হিসেবেও পরিচিত এটা কায়রোর কাছে গিজা নেক্রোপলিসে অবস্থিত তিনটি পিরামিডের একটি। এটার নির্মাণকাজ শেষ হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৬০ সালে। তখন থেকে ৩৮০০ বছর ধরে এটা ছিল বিশ্বের উচ্চতম ভবন। এরপর ১৩১১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয় লিঙ্কন ক্যাথিড্রাল, যার উচ্চতা এটার চেয়ে বেশি।

 

৭.আইফেল টাওয়ার (১৮৮৯-১৯৩০)
প্যারিসে অবস্থিত অতিপ্রিয় এই স্থাপনাটির নাম রাখা হয়েছে এর ডিজাইনার গুস্তাভ আইফেল (ফ্রান্স)-এর নামে। প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল এটি প্যারিস নগরীর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর প্রধান গেট হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং মাত্র ২০ বছর থাকবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এটা নির্মাণে দুই বছর সময় লেগেছিল এবং উদ্বোধন হয় ১৮৮৯ সালে। ৩২৪ মিটার বা ১০৬৩ ফুট টাওয়ারটি লন্ডনের সেন্ট পল ক্যাথিড্রালের চেয়ে তিন গুণ উঁচু। অচিরেই তা পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়। তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ টাওয়ারের মুকুট ছিনিয়ে নেয় ১৯৩০ সালে ক্রিসলার বিল্ডিং।

 

৮.লিঙ্কন ক্যাথিড্রাল (১৩১১-১৫৪৯)
১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৩১১-এর মাঝখানে নির্মিত ১৬০ মিটার বা ৫২৫ ফুট উঁচু চূড়ার এই গির্জা ১৫৪৯ পর্যন্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ওই বছর এর চূড়ায় আগুন লাগে এবং এর রেকর্ড নিয়ে নেয় এস্তোনিয়ার গির্জা।

৯.এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং (১৯৩১-৬৭)
নিউইয়র্কের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক এই ভবন ১০০তলা অতিক্রমকারী প্রথম ভবন। এটি এখন আধুনিক বিশ্বের সাত আশ্চর্যের একটি বলে চিহ্নিত করেছে মার্কিন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স সোসাইটি। ১৯৩১ সালে নির্মিত ৩৮১ মিটার বা ১২৫০ ফুট ভবনটি ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বের উচ্চতম স্থান দখল করে রেখেছিল। তারপর এ স্থান দখল করে ওস্টানকিনো টাওয়ার।

১০.জোসার পিরামিড (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০-২৬০০ খিৃ:পূ:)
মিসরের সাককার নেক্রোপলিসে অবস্থিত এই পিরামিডটি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭ শতকে নির্মিত হয়। এটার উচ্চতা ৬২ মিটার বা ২০৩ ফুট। মাউন্ট রাশমোরে চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অমর করে রাখার জন্য যে ভাস্কর্য নির্মিত আছে, এই পিরামিডের উচ্চতা তা থেকে চার গুণ। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ সালে স্নিফেরুর লাল পিরামিড নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত এটাই ছিল সর্বোচ্চ স্থাপনা।

১১.সেন্ট ওলাফ গির্জা (১৫৪৯-১৬২৫)
এস্তোনিয়ার তালিনে অবস্থিত সেন্ট ওলাফ গির্জা ১৫৪৯ থেকে ১৬২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ছিল। তারপর স্ট্রলসুন্ডের সেন্ট ম্যারির গির্জা এই মুকুট ছিনিয়ে নেয়। সেন্ট ওলাফ গির্জা মূলত ১৫৯ মিটার বা ৫২২ ফুট উঁচু ছিল। কিন্তু বারবার বজ্রপাতের আঘাত ও পুনর্নির্মাণের পর এখন তা ১২৩ মিটার বা ৪০৪ ফুট।

 

১২.সিএন টাওয়ার (১৯৭৫-২০০৯)
কানাডার টরেন্টোতে নির্মিত সিএন টাওয়ারের উচ্চতা ৫৫৩.৩৩ মিটার বা ১৮১৫ ফুট। ১৯৭৫ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হলে তা মস্কোর ওস্টানকিনো টাওয়ারকে ছাড়িয়ে যায়। তার পর থেকে ৩২ বছর ধরে এটিই ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থাপনা। ২০০৯ সালে বুর্জ দুবাইয়ের কাছে চলে যায় সর্বোচ্চ স্থাপনার খেতাব। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এটিও আধুনিক বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি।

১৩.রৌয়েন ক্যাথিড্রাল (১৮৭৬-৮০)
সরকারিভাবে ক্যাথিড্রাল নটর ডেম ডি রৌয়েন নামে পরিচিত। এই চমৎকার গথিক গির্জাটি নির্মিত হয় ১২০২ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে এবং ১৮৮০ পর্যন্ত শেষ চার বছর তা ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। এটার চূড়া ১৫১ মিটার বা ৪৯৫ ফুট উঁচু। এটার উচ্চতা ছাড়িয়ে যায় কলোগ্নি ক্যাথিড্রাল।

১৪.ক্রিসলার বিল্ডিং (১৯৩০-৩১)
ম্যানহাটানের এই আকাশছোঁয়া ভবনটি নির্মিত হয় ১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে। এটির উচ্চতা ৩১৮ মিটার বা ১০৪৬ ফুট, যা স্নিফেরুর লাল পিরামিডের উচ্চতার তিন গুণ। এক বছরেরও কম সময়ের জন্য এটি ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। তার পর তা হেরে যায় নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের কাছে।

১৫.স্ট্রসবুর্গ ক্যাথিড্রাল (১৬৪৭-১৮৭৪)
১৪২ মিটার বা ৪৬৫ ফুট উঁচু স্ট্রসবুর্গ গির্জা সিডনি হার্বার ব্রিজের চেয়ে ৩ মিটার বেশি উঁচু। ১৬৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট ম্যারির গির্জাকে হারিয়ে এটিই হয়ে যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। ১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে এটার এই খেতাব ছিনিয়ে নেয় হামবুর্গের সেন্ট নিকোলাই গির্জা। এটার নির্মাণকাজ শুরু হয় ১০১৫ খ্রিষ্টাব্দে এবং সম্পন্ন হয় ১৪৩৯-এ।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *