রোহিঙ্গা : স্বাধীন জাতিটি আজ সবচেয়ে নিপীড়িত রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠি

রোহিঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী । এককালে যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখন তারাই বৌদ্ধদের নৃশংস নির্যাতনের শিকার । মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে মর্মাহত করবে । এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে,আরাকান তার মধ্যে অন্যতম । রোহিঙ্গারা সেই আরাকানি মুসলমানের বংশধর । এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয় ।১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে । ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোগল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে ।এই হত্যকান্ডের রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি । এরপর শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক অত্যাচার নিপীড়ন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর মুসলমানদের কাটাতে হয় এই দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে।১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরাকান দখল করে নেন । তিনিও ছিলেন ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী । বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকে । ১৮২৮ সালে ইংরেজদের শাসনে চলে যায় বার্মা । তবে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্তশাসন লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় । তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিম হত্যা করে । ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে । কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি । তারা থেকে যায় ভাগ্য বিড়ম্বিত। স্বাধীন দেশের সরকার তাদেরকে নাগরিকত্ব দূরে থাক মানবিক অধিকারটুকুও দেয়নি ।নাসাকা বাহিনী ও বৌদ্ধদের হামলার শিকার হয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশসহ বিশ্বের আনাচে-কানাচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন । এরা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক । ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয় ।সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় । তাদের ভোটাধিকার নেই । নেই কোনো সাংবিধানিক ও সামাজিক অধিকার । নিজ দেশে পরবাসী তারা । তারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না । এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু আজ সেখানে তারা সংখ্যালঘু । রাখাইন বৌদ্ধদের সেখানে এনে মুসলিমদের সংখ্যালঘু বানানো হয়েছে ।ভৌগোলিক দিক থেকে আরাকানের অবস্থান ৯২০ থেকে ৯৪.৯০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এবং ২১.৯০ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে । আরাকানের প্রকৃত আয়তন ১৬,৫০০ বর্গমাইল, কিন্তু ১৯৭৪ সালে বার্মার সরকারি মানচিত্রে ও নথিপত্রে ১২,৬৪২ বর্গমাইল উল্লেখ করা হয়েছে । (সূত্র- বাংলা বিশ্বকোষ, ১ম খন্ড, পৃ- ২২৩)। ১৯৭৪ সালে বর্মী সরকার আরাকান নাম পরিবর্তন করে রাখাইন রাজ্য নামকরণ করে । ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী বার্মার মোট জনসংখ্যা ১,৪৬,৫৩,৯৭৭ জন; এর মধ্যে মুসলিম ৫,৮৪,৮৩৯ জন । আরাকানের মসুলমানদের সংখ্যা এখানে উল্লেখিত হয়নি । বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড. আবদলু করিম তাঁর ‘রোহিঙ্গাদের হাজার বছরের ইতিহাস’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আরাকানের লোকসংখ্যা আনমুানিক ৪০ লক্ষ। এর মধ্যে বৌদ্ধ ২০ লাখ, মসুলমান ১০ লাখ, জড়বাদী ৮ লাখ, হিন্দু ও খ্রিস্টান ২ লাখ । বৌদ্ধরা আরাকানে মগ নামে পরিচিত এবং মুসলমানরা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত ।’ ২২-০৬-১২ তারিখে জাতিসঙঘ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী আরাকানে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আট লাখ । মসুলমানদেরকে হত্যা ও বহিষ্কার করে এবং বার্মার বৌদ্ধদেরকে পুনর্বাসন করে বার্মা সরকার আরাকানের মুসলমানদের অবস্থান প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে ।আরাকানের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক ইতিহাসখ্রিস্টপূর্ব ২৬৬৬ সাল থেকে ১৪০৬ সাল পর্যন্ত আরাকান মোটামুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন । বেশিরভাগ সময়ে আরাকান উত্তর ও দক্ষিণে ২টি রাজ্যে বিভক্ত ছিল । খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ২০০০ শতকে উত্তর বিহারের মগধ থেকে আগত অনেক হিন্দু-বৌদ্ধ ও জৈন বঙ্গে, আরাকানে ও বার্মায় ধর্মপ্রচার ও উপনিবেশ স্থাপন করতে আসে। তখন থেকে আরাকান ও বার্মার শাসকগণ নিজেদেরকে মগধ রাজবংশীয় হিসেবে পরিচিত করার জন্য মহৎচন্দ্র, সুলতচন্দ্র, নরপতিগী, চন্দ্রসুধর্মা, শ্রীসুধর্মা খেতাব গ্রহণ করতো এবং রাজধানীর নাম ভারতীয় নামে বৈসালী, ধন্যাবতী, চম্পাবতী রেখেছিল ।অপর ঐতিহাসিক তথ্য হলো- সম্রাট অশোকের মগধ বিজয়কালীন মগধ থেকে বিতাড়িত হয়ে যারা আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেন তারাই আরাকানের মূল মগ জনগোষ্ঠী । খ্রিস্টীয় ২য় শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত চন্দ্র-সর্যূ ও কোলসিংহ চন্দ্রবংশ আরাকান শাসন করেছে ।দশম শতকে সান উপজাতি কিছুদিনের জন্য আরাকান দখল করেছিল। দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বার্মার প্যাগান বংশ (১০৪৪-১২৮৭) উত্তর আরাকানকে সাময়িকভাবে সামন্তরাজ্যে পরিণত করেছিল। (G.E Harvey, History of Barma, P.138)


বার্মার আক্রমণে টিকতে না পেরে ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ নরমিখলা সদলবলে গৌড়ের সলুতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের দরবারে আশ্রয় লাভ করেন । ১৪০৬ সাল থেকে ১৪৩০ সাল পর্যন্ত আরাকান বার্মার অধীনে ছিল। ১৪৩০ সালে গৌড়ের সুলতান জালালদ্দুীন মহুাম্মদ শাহ (যদু) দুই পর্যায়ে ৫০ হাজার সেনা সহায়তা দিয়ে তাঁকে আরাকানের সিংহাসনে পনুঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। ১৪৩০ সাল থেকে ১৫৩০ সাল পর্যন্ত ১০০ বছর আরাকান গৌড়ের করদরাজ্য ছিল। (সূত্র- আরাকান, রাজসভা, ড. মহুম্মদ এনামলু হক/আবদলু করিম সাহিত্য বিশারদ, তৎসূত্র-J.A.S.B vol-13, Part-1, 1844, P-46)
১৫৫৪ সালে দিল্লীর সম্রাট শের শাহের জ্ঞাতি শামসদ্দুীন মোহাম্মদ শাহ গাজী সমগ্র চট্টগ্রাম ও উত্তর আরাকান জয় করেন । ১৫৮০ সালে সমগ্র চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে যায় এবং মোগল বিজয় পর্যন্ত (২৭-০১-১৬৬৬ইং) চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে ছিল । ১৭৮৫ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করে অবর্ণনীয় জলুমু শুরু করেন । তাঁর অত্যাচারে আরাকানের মগ ও রাখাইনরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যায় । কক্সবাজার ও বাকেরগঞ্জের রাখাইন সম্প্রদায় এবং বান্দবানের মারমা (মগ) সম্প্রদায় উক্ত সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ।১৪০৬ সাল থেকে ১৪৩০-এর মধ্যে আরাকানের অনেক মগ বা রাখাইন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ।১৬৬৬ সাল থেকে ১৭৮৫ সালের মধ্যে আরাকানের করদরাজ্য ‘চকোমা’ (বর্তমান মিজোরাম) থেকে বর্তমান চাকমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করে। মোগল প্রশাসকদের বদান্যতায় চাকমারা দলে দলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। ১৭৮৫ সাল থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে বার্মার শাসন, ১৮২৬ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন, ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানি শাসন এবং পনুরায় ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন এবং ১৯৪৮ সাল থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত বর্মী শাসনের কাল।বাংলাদেশের ভূখন্ডে রোহিঙ্গা সমস্যার রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাসবর্তমানে মিয়ানমারের অন্তর্গত আরাকান প্রদেশ ছিল একটি সুপ্রাচীন আলাদা দেশ । মোগল, তিব্বত, ভ্রহ্ম ও বহু উপজাতি নিয়ে প্রাচীন আরাকানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী গঠিত। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মরাজ বোধপায়া স্বাধীন আরাকান রাজ্যে দখল করে ব্রহ্মদেশের অন্তর্ভুক্ত করে । সে থেকে মূলত এ ভূখন্ডে রোহিঙ্গা সমস্যা বর্মী সৈন্যরা আরাকানের গ্রাম গ্রামান্তরে মুসলমানদের একত্রিত করে যত সম্ভব হত্যা করে । বর্মী সেনাদের অত্যাচার নির্যাতন সম্পর্কে তৎকালীন আরাকানী সর্দার অ্যাপোল-এর জবানীতে জানা যায়, বর্মী সেনারা নির্বিচারে ২ লাখ আরাকানীকে হত্যা করে ।সমসংখ্যক দাস হিসেবে বার্মায় প্রেরণ করে । বর্মী রাজ্যের এ ধরনের নির্যাতন, খুন, হত্যা-নিপীড়নের ফলে আরাকান রাজ্যের সন্নিকটস্থ কক্সবাজারে আশ্রয় গ্রহণ করে ।এ বিষয়ে হেয়াল্টার হেমিল্টন লিখেছে যে, সে ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে রামুর শরণার্থী শিবিরে লক্ষাধিক আরাকানী শরণার্থীর অবস্থান দেখেছে । সংশ্লিষ্ট মহল উল্লেখিত ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে জানায় এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে মূলত আরাকান অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে বর্মীদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একই রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও রোহিঙ্গা মুসলিম ও বৌদ্ধ বর্মীদের মাঝে ২শ’ বছরেরও বেশি সময় আগে থেকে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব সংঘাতের ধারাবাহিকতা আজকে পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে । এ ধারাবাহিকতায় তাদের মধ্যে টানাপোড়েন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছলে বা সীমা ছাড়িয়ে গেলে আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী নিরাপদ আশ্রয় অর্থাৎ কক্সবাজারের টেকনাফ চলে আসে । এভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা একদিনের জন্যও সম্ভবত থেমে নেই ।রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের একটি জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়৷ তারা মূলত দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্য রাখাইনে বসবাস করে৷তবে সে দেশের সরকার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি৷ আর দেশটির সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা তাদের উপর গত কয়েক দশক ধরে নির্যাতন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে৷ জাতিসংঘ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে৷ প্রতি বছর মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিরাপদ জীবনের আশায় মুসলিমপ্রধান অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে৷ রোহিঙ্গারা কেন রাষ্ট্রহীন জাতি?
পৃথিবীর রাষ্ট্রহীন মানুষের মধ্যে দশ শতাংশের বাস মিয়ানমারে এবং তারা রোহিঙ্গা৷ জাতিসংঘ ২০১৪ সালে মিয়ানমারের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংস্কারকে স্বাগত জানালেও রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে৷ জাতিসংঘ সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো একই রকম নাগরিকত্ব এবং এ সংক্রান্ত সকল সুযোগ-সুবিধা দিতে মিয়ানমারের সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে৷ তবে মিয়ানমারে সরকার এখন পর্যন্ত সেই দাবি মেনে নেয়নি৷তাদের চোখে, এগারো লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা অভিবাসী৷ এমনকি জাতিসংঘের রেজ্যুলেশনে সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়কে ‘রোহিঙ্গা’ উল্লেখ করায় আপত্তি জানিয়েছে মিয়ানমার৷ অতীতে অবশ্য দেশটি বলেছিল যে, রোহিঙ্গারা নিজেদের বাঙালি হিসেবে স্বীকার করে নিলে তাদের নাগরিকত্ব দিতে দেশটি প্রস্তুত ৷ তবে রোহিঙ্গারা নিজেদের বাঙালি হিসেবে মানতে নারাজ৷ গত সোয়া ২শ’ বছরের ইতিহাসে ব্যাপকহারে অর্থাৎ এক সাথে ৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে চলে আসে । পরবর্তী ১৯৭৯ সালে মিয়ানমারের ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক ওই সময় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত নিয়ে যায়, ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পর এক যুগের ব্যবধানে আবারো ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে পুনরায় বাংলাদেশে ২ লাখ ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় । এ শরণার্থীদের নিয়ে শুরুতেই ঘটে শুভংকরের ফাঁকির একটি ঘটনা । এ সময় টেকনাফের অভ্যর্থনা পয়েন্টে বাংলাদেশ ২ লাখ ৬৫ হাজার শরণার্থীকে গ্রহণ করলেও তাদের ২০টি শরণার্থী শিবিরে রেখে সেখানে গণনার সময় মোট শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন। এ হিসাবের শুরুতেই প্রায় ১৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পালিয়ে যায় কৌশলে । বর্তমানে ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন শরণার্থীর মধ্যে ২০ হাজার ৩৬৭ জন শরণার্থী প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় কুতুপালং এবং নয়াপাড়া শিবিরে অবস্থান করছে।এবার দেখা যাক মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় মদদে কিভাবে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালানো হয় এবং রাষ্ট্র কী করে তা অনুমোদন করে ।বছরের পর বছর ধরে মিয়ানমারে কেন রোহিঙ্গারা নিষ্পেষিত হচ্ছে? কারণ রোহিঙ্গাদের মুসলমান পরিচয়ের সঙ্গে যাবতীয় নেতিবাচকতা যুক্ত করার প্রচেষ্টা। দেশটির সোশাল মিডিয়ায় রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা মিয়ানমারের মেয়েদের ধর্ষণের খবর ছড়ানো হয়। তারপর প্রয়োজনমতো চলে আক্রমণ, নির্যাতন, নিপীড়ন। যদিও বাস্তব অবস্থা অবলোকন করলে এমন খবরকে আপনার হাস্যকর মনে হবে।কিভাবে সেখানকার উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা ধর্মকে আশ্রয় করে দিনের পর দিন নির্মন নির্যাতন চালাচ্ছে রোহিঙ্গাদের উপর তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন সাংবাদিক ওং চুং ওয়াই । তার অনুসন্ধানের কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো ।প্রত্যেক ধর্মেই কিছু উগ্র লোক থাকে । এরা সবসময়ই নিজের ধর্মের কলঙ্ক । মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষু আরশিন উইরানথুও উগ্র বৌদ্ধদের দলেই পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারের নামে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে আসছেন তিনি । ২০০৩ সালে ধর্মীয় উস্কানি দেয়ার অপরাধে তার নয় বছরের জেল হয় । জেল খেটে বেরিয়ে এসে মুসলমান-বিরোধী প্রচারণা আরো বাড়িয়েছেন তিনি ।সম্প্রতি আবারও এই ধর্মীয় নেতা বিশ্বমিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছেন । রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে করা এক আইনের সামলোচনা করায় জাতিসংঘের এক কর্মকর্তাকে ‘ব্শ্যো’ বলেছেন তিনি । মিয়ানমারে তার প্রভাব অস্বাভাবিক । সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিন তাকে নিয়ে একটি প্রচ্ছদ করে যার শিরোনাম ‘দ্য ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেরর’। এ প্রতিবেদনের কারণে মিয়ানমারে টাইম ম্যাগাজিনকে নিষিদ্ধ করা হয় । এতেই উগ্র জাতীয়তাবাদে রাষ্ট্রের মদদ বা অনুমোদনটা আঁচ করা যায় ।একারণেই মিয়ানমারের সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হচ্ছে, সেখানে শুধু বৌদ্ধ ধর্মের নাম করে যেকোনো কিছু করা সম্ভব । উইরানথুর মত অনেক উগ্র বৌদ্ধরা তা করছেও । দেশটিতে কোনো মুসলিম উগ্রবাদী সম্পর্কে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়, তার ছিটেফোটাও নেয়া হয়না বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের ব্যাপারে । শুধু ধর্মীয় নেতারাই নয়,এ দলে আছেন দেশটির পুলিশ, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা পর্যন্ত ।কিন্তু বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবস্থানটা একদমই চোখে পড়ার মতো । তাদের এটা মনে রাখা উচিত যে, একজন ধর্ম প্রচারক হিসেবে তাদের সবসময় হিংসা ও ধ্বংসের বদলে শান্তি, ঐক্য, ক্ষমা ও সহনশীলতার কথা বলা উচিত । কিন্তু তারা ঠিক উল্টো কাজটাই করছেন সেখানে ।সবসময়ই অন্য ধর্মের খুঁত বের করা খুব সোজা । কিন্তু নির্লজ্জভাবে কিছু লোক নিজেদের দুর্বলতা, উগ্র মনোভাব না দেখে সবসময় অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায় । কিন্তু শুধু ধর্মের কারণে তো কাউকে ভালো খারাপের মাপকাঠিতে নির্নয় করা উচত নয়। একজন অন্যজনের ধর্মকে তীব্র ঘৃণা করতে পারেন, তাই বলে তো সে ধর্মের কাউকে আপনি মেরে ফেলতে পারেন না ।এ ইস্যুতে কিছু বলার জন্য সবসময় সুচির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বিশ্ব । কিন্তু সুচি কিছু বলেন না । সম্প্রতি দালাই লামা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরো সরব হতে সুচির প্রতি আহবান জানিয়েছেন ।যাইহোক, মিয়ানমারে এসব উগ্র ধর্মগুরুদের কারণে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক দুর্নাম ছড়িয়েছে । তারা প্রচার করে মুসলমান মানেই খারাপ, তাদেরকে মারো । মিয়ানমারে এখন বৌদ্ধধর্মের নামে যা চলছে, নিশ্চিতভাবে সেটি বৌদ্ধ ধর্ম নয়।বৌদ্ধ ধর্মের এমন দুর্নাম ঘোচাতে পারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উদার ও আধুনিক বৌদ্ধরা । মিয়ারমারের উগ্র ধর্মপন্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের এটা বোঝানো উচিত, এরা যা করছে সেটা কোনোভাবেই বৌদ্ধ ধর্ম হতে পারে না ।কোন দেশে কত রোহিঙ্গা শরণার্থীমিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতিত। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকে অসংখ্যবার রোহিঙ্গা মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের ওপর চলেছে নির্মম নির্যাতন। এই নির্যাতিত মানুষেরা নিজ দেশের নাগরিকত্ব হারিয়ে আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এখনো ১০ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকত্বহীন অবস্থায় মিয়ানমারে অবস্থান করছে।মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বেসামরিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের ধারাবাহিক নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময়ে বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। মূলত ১৯৭০ দশক থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছাড়তে শুরু করে। গত সাড়ে চার দশকে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়েছে।এসব রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। পৃথিবীর কোন দেশে কত রোহিঙ্গা আছে তার একটি ‌‘আপাত’ হিসাব দিয়েছে কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার বরাতে পাওয়া এ তথ্য আজ শনিবার এক প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে।আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ছয় লাখ ২৫ হাজার। যদিও এর চেয়ে বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে ধারণা করেন স্থানীয়রা।রাখাইনের বাইরে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আছে বাংলাদেশেই। এদের বেশিরভাগই কক্সবাজারের উপকূলবর্তী বিভিন্ন নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পে এরা অবস্থান করছে।আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাব অনুযায়ী, সহিংসতার শিকার হয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) গতকাল শুক্রবার সর্বশেষ জানিয়েছে, নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা বেড়ে তিন লাখের উপরে যাবে। অর্থাৎ গত ১১ মাসে সাড়ে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। এই সময়ে মিয়ানমারে সহিংসতায় মারা গেছেন প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সূত্র মতে, কক্সবাজার উপজেলার বিভিন্ন উপকূলে যেসব রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে, সেখানে দশকের পর দশক ধরে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এদের মধ্যে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত উভয় শরণার্থীই রয়েছেন। অনেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে।মিয়ানমারের উপকূলবর্তী রাজ্য রাখাইন। সেখান থেকে নৌকায় করে বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়ার উপকূলে পৌঁছায়। এভাবে ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে প্রায় এক লাখ ১২ হাজার রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। তাঁরা সেখানে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে শেল্টার সেন্টারে আশ্রয়ে আছে। গতকাল শুক্রবার মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির মহাপরিচালক জুলকিফলি আবু বাকার বলেছেন, তাদের উপকূলে যাওয়া রোহিঙ্গা নাগরিকদের তাঁরা ফেরাবে না, আশ্রয় দেবে।গত আগস্টে নতুন করে সহিংসতা শুরুর আগে জাতিসংঘ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় চার লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। এ সময় আরো এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথাও বলা হয়।আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে রয়েছে দুই লাখ, পাকিস্তানে রয়েছে সাড়ে তিন লাখ, মালয়েশিয়ায় দেড় লাখ, ভারতে ৪০ হাজার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ হাজার, থাইল্যান্ডে পাঁচ হাজার এবং ইন্দোনেশিয়ায় এক হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ‘বিদ্রোহী রোহিঙ্গাদের’ সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে। এ ঘটনার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে।মিয়ানমার সরকারের বরাত দিয়ে জাতিসংঘ গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, মিয়ানমারে সহিংসতা শুরুর পর গত এক সপ্তাহে ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭০ জন ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’, ১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, দুজন সরকারি কর্মকর্তা এবং ১৪ জন সাধারণ নাগরিক।মিয়ানমার সরকারের আরো দাবি, ‘বিদ্রোহী সন্ত্রাসীরা’ এখন পর্যন্ত রাখাইনের প্রায় দুই হাজার ৬০০ বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এখনো রাখাইন রাজ্যে থাকা মুসলিমদের মধ্যে মাইকে প্রচার চালাচ্ছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।নারীসহ ১৭ জন রোহিঙ্গা ছিলেন মিয়ানমারের সংসদ সদস্যবিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারে দুই নারীসহ ১৭ জন রোহিঙ্গা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। শুধু এমপি-মন্ত্রীই নন,মিয়ানমার সরকারের সচিবসহ শীর্ষ বিভিন্ন পদেও ছিলেন রোহিঙ্গারা।১৯৯০ সালের নির্বাচনেও সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের চার জন প্রতিনিধি ছিলেন দেশটির পার্লামেন্টে। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এরপর থেকে আর কোনও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি তারা।
১৯৪৮ সালে বার্মার স্বাধীনতার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ১৯৪৭ সালের নির্বাচনে এম এ গাফ্ফার এবং সুলতান আহমেদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে সাধারণ নির্বাচনে পাঁচ জন রোহিঙ্গা তৎকালীন বার্মার পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন জুরা বেগম। তৎকালীন বার্মার নির্বাচিত প্রথম দুইজন নারীর একজন হলেন এই জুরা বেগম। ছয়জন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৫৬ সালের সাধারণ নির্বাচন ও পরবর্তী যেসব উপনির্বাচন হয়েছিল তাতে। দেশটিতে ১৯৯০ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে রোহিঙ্গাদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ফর হিউম্যান রাইট চারটি আসনে জয়ী হয়। ওই চারজন এমপি হলেন, সামসুল আনোয়ারুল হক, ইব্রাহিম, ফজল আহমেদ ও নূর আহমেদ। সুলতান মাহমুদ একজন রোহিঙ্গা রাজনীতিবিদ। তিনি বার্মা সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন।১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইন দিয়ে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।এ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বার্মার সংসদ নির্বাচিত সদস্য, তাদের সরকারে মন্ত্রী, সংসদীয় সচিবসহ আরও বহু সরকারি উচ্চপদে আসীন ছিলেন। বার্মার সামরিক শাসকেরা ১৯৬২ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রোহিঙ্গাদের তাদের সব রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।সমুদ্র পেরিয়ে কানে ভাসছে রোহিঙ্গা নির্যাতনের আওয়াজ
মুসলিম, আমার পরিচয় আমি বাঙ্গালী। আমার জাতি, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য সবই বাংলাকে ঘিরে। আমার প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার। বাংলাদেশ এবং মিয়ারমারের সীমানা জুড়ে রয়েছে নাফ নদী। আজ সেই নাফ নদী পেরিয়ে আমার কানে ভাসছে মিয়ারমারে রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা-নির্মম নির্যাতন-বিতাড়িতের কান্নার আওয়াজ। এ আওয়াজ শুধু আমি নয়, বিশ্ব বিবেকে নাড়া দিচ্ছে। বিকড় আওয়াজে আমি আর চুপ থাকতে পারিনি। আমাকেও আওয়াজ দিতে হচ্ছে মানবতার স্বার্থে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে এ নির্মম নির্যাতনের করুন চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।এক ভয়াবহ নির্মমতার রাষ্ট্র এখন মিয়ানমার। জাতিসংঘের তথ্যমতে রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠি। শত শত বছর ধরে তারা নির্যাতিত ও নিপিড়ীত হচ্ছে। আজ মিয়ানমারের মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাচাঁও বাচাঁও বলে আর্তচিৎকার করছে। মায়ানমারের বর্বর সরকার তাদের উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাচ্ছে। হত্যা করছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু, যুবক, বৃদ্ধাদের। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করছে অসংখ্য মা-বোনদের। বিধবা করছে হাজারো নারীদের। সন্তানহারা করছে অসংখ্য মাকে। স্বামীহারা করছে অসংখ্য স্ত্রীকে। ভাইহারা করছে অসংখ্য বোনকে। মুসলমানদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়েই থেমে নেই সেখানকার সেনা-পুলিশরা। মুসলমানদের ধর্মী উপাসনলয় মসজিদ, পবিত্র কোরআন শরীফ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইমাম-মুয়াজ্জিনের উপর নির্যাতন শেষে পৈচাসিক কায়দায় খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম পরিবারের উপর নির্যাতনের ঘটনা লোমহর্ষক থেমে নেই। মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের আহাজারীতে পৃথিবীর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।
কোথায় আজ বিশ্ব মুসলমানদের সহযোগীতা ও ভ্রাতৃৃত্বের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলো। নীরব কেন আজ মানবধিকার সংস্থা? নিশ্চুপ কেন জাতিসংঘ?। পৃথিবীতে দেড়শ কোটি মুসলমান থাকার পরও কেন দেশে-দেশে মুসলমানরা আজ নির্যাতিত? মুসলমানগণ কি আমাদের কেউ নন?
মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের মদদেই সেনা-পুলিশ মিলে মুসলিম নির্মূলের নামে জঘন্যতম পন্থায় চিরুণী অভিযান চালাচ্ছে। তাদের সাথে এ নির্মম বর্বরতায় যোগ দিয়েছে সেখানকার বৌদ্ধ স¤প্রদায়। মানুষ হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণই প্রমাণ করে- মিয়ানমার সরকার একটা অসভ্য বর্বর-নিকৃষ্টতম জাতি। প্রকৃত অবস্থা জানতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার কর্মীদের মিয়ারমারের রাখাইন এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মিয়ানমারের নোবেল শান্তি বিজয়ী নেত্রী অংসান সুচির নিরবতাই প্রমাণ করে এ গণহত্যাকে তিনি সমর্থন করছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর নিন্দাসহ সুচির নোবেল প্রত্যাহার করে নিতে বিশ্ব¦জুড়ে লাখ লাখ মানুষ আজ আওয়াজ তুলছেন। এ নির্মম গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে। বাংলাদেশেও উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এমন জঘন্যতম বর্বরতা বন্ধে জাতিসংঘ মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতে দাড় করার কথা। কিন্তু তা না করে জাতিসংঘ বাংলাদেশের বর্ডার খুলে দিতে বলেছে। এতে মিয়ানমার থেকে মুসলমান বের করে দেবার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। জাতিসংঘ আরো বলছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গা নির্মূল করতে চায়। সে দেশের সেনারাও সরাসরি এ অপরাধে জড়িত। এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কমিটি (ওআইসি)’র জোরাল ভূমিকা না থাকার বিষয়টিও ভালভাবে নিচ্ছেন না বলে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
জাতিসংঘের এ কথাও অজানা নেই যে, আমার রাষ্ট্র বাংলাদেশ মানবিকতার দেশ। মিয়ানমারে গণহত্যা-মানবিকতা বিপর্যয় রোধে যে কোন শান্তিপূর্ণ সমাধানে পাশে থাকার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ঘোষণা এবং বাংলাদেশের অবস্থান জানার পর পরই চীনের বর্ডার খুলে দিয়ে মানবতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলাদেশের এই মানবিকতার প্রশ্নে চীনও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চিকিৎসা-খাদ্য-বস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। বহু রোহিঙ্গা মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় রোহিঙ্গাদের উপর বর্বর নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে।
মিয়ারমারের রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে গোটা বিশ্বের অমুসলিম শক্তি আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। আমরা এখনও নিশ্চুপ! রোহিঙ্গা মুসলমানদের কিই বা দোষ ছিল? যার কারণে তারা আজ নির্মম-জুলুম নির্যাতন ভোগ করতে হচ্ছে? কারণ একটাই ওরা যে মুসলমান। ধর্মীয় পার্থক্য ও বৈপরিত্যের কারণেই রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের সামরিক জান্তা, প্রশাসন ও বৌদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী  গোষ্ঠিরা তাদের উপর সীমাহীন জুলুম চালাচ্ছে।
এ সহিংসতার মধ্যদিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমান স¤প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় মিয়ানমার সরকার, যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় ও জাতিসংঘসহ মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি, অতি দ্রুত দাঙ্গা বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিরাপদে বসবাসের সুযোগ করে দিন নতুবা এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *