যোগী নিয়ে চলছেন মোদি

যে হিন্দুত্ববাদের জয়গান গেয়ে উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করেছে, মুখ্যমন্ত্রী পদে যোগী আদিত্যনাথে শপথের মাধ্যমে তা যেন ষোলকলা পূর্ণ করল। ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার রাজ্যটিতে একজন কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে বিজেপি তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতিকেই পাকাপোক্ত করল।

ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় উত্তর প্রদেশকে। দীর্ঘদিন পর রাজ্যটিতে জয় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। নির্বাচনের লড়াইয়ে তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল হিন্দুত্ববাদী নীতি। এ নীতির জোরেই রক্ষণশীল হিন্দু ভোটব্যাংকে নিজেদের পক্ষে টেনেছেন নরেন্দ্র মোদি। নির্বাচনের বিজয়ের পর চার কোটি মুসলমানের রাজ্যটিতে বিজেপির নীতি কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল ছিল সবার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার লক্ষ্যে একজন ক্লিন ইমেজের উদারপন্থী নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে বলে ধারণা ছিল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কিন্তু সেসবের ধার ধারল না নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহর দল। বিতর্কিত হিন্দুত্ববাদী সন্ন্যাসী যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিলো তারা। আগাগোড়া বিতর্কিত একজন কট্টরপন্থী নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানোর মূলে যে বিজেপির হিন্দুত্ববাদ জোরদার করা, তা সহজেই বলা যায়।

রাজনীতিতে আসার পর থেকেই যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশে একটি বিতর্কিত নাম। ২০০২ সালে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে একটি উগ্রপন্থী সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। ২০০৫ সালে উত্তর প্রদেশে অসংখ্য মানুষকে ধর্মান্তরিত করার সাথে তার যোগসাজেশ আছে। বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের গোরক্ষপুরের দাঙ্গায় তার উসকানির কথা নিয়ে ব্যাপক জনশ্রুতি আছে। এ দাঙ্গা নিয়ে তার নামে দায়েরকৃত মামলাও চলছে আদালতে। মামলা আছে আরো একাধিক অভিযোগে। বিভিন্ন সময় বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন আদিত্যনাথ। এবারের নির্বাচনী প্রচারণার সময় বলেছেন ‘সমাজবাদী পার্টির সরকার শুধু কবরস্থানগুলোর উন্নয়ন করেছে। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এলে রামমন্দিরও প্রতিষ্ঠা করবে’। ২০১৬ সালের জুন মাসে রামমন্দির প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘যেখানে অযোধ্যার মসজিদ ভেঙে ফেলা কেউ আটকাতে পারেনি তাহলে মন্দির নির্মাণ আটকানোর সাধ্য কার?’ সে বছরই অক্টোবরে মুসলমানদের পশু কোরবানি দেয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। তার সাম্প্রদায়িক বাক্যবাণ থেকে রক্ষা পাননি বলিউড তারকা শাহরুখ খানও। আর সম্প্রতি সব থেকে বিতর্কিত মন্তব্য ছিল, ‘যদি অনুমতি পাই তাহলে দেশের প্রত্যেকটা মসজিদে গৌরী-গণেশের মূর্তি স্থাপন করে দেবো। পুরো হিন্দুস্থান হবে হিন্দুদের জন্য। পুরো পৃথিবীতে গেরুয়া পতাকা উড়বে’।

এ রকম অতীত রেকর্ডের একজন রাজনীতিক রাজ্য শাসনে কী নীতি গ্রহণ করবেন সে প্রশ্ন তোলা অবান্তর। সর্বদা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ পোষণকারী এই নেতা যে রাতারাতি আমূল পাল্টে গিয়ে সব মানুষের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবেন সে আশা করাও বৃথা। তাই আদিত্যনাথের বিভেদের রাজনীতির প্রধান কোপটা যে মুসলমানদের ওপরই পড়বে, তাতে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অনেকেই মনে করেন এর ফলে রাজ্যটিতে মুসলমানরা আরো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে। আদিত্যনাথের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের মধ্যেও। এমনিতেই বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদের প্রসারে মুসলমানরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নতুন করে কট্টর মুখ্যমন্ত্রীর শাসন তাদের জন্য অনিশ্চয়তার এক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। রাজ্যের ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মোহাম্মদ সাজিদ রশিদি বলেন, ‘যে মানুষটার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আছে, যিনি বিভেদ সৃষ্টিকারী এজেন্ডার ধারক, তাকে কিভাবে মুখ্যমন্ত্রী করা হলো?’ ভারতীয় রাজনীতিকেরাও যে আদিত্যনাথের মনোনয়নে হতাশ তা বোঝাই যাচ্ছে। কংগ্রেস নেতা মনীশ তিওয়ারি আদিত্যনাথকে উত্তর প্রদেশের বিভাজনের রাজনীতির অগ্রদূত হবেন বলে ইঙ্গিত করেছেন।

তবে যে যা-ই বলুক, মোদি-অমিত শাহ যে তাদের দীর্ঘমেয়াদি এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন তাতে কোনো ভুল নেই। আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনেও (২০১৯) উত্তর প্রদেশ থেকে বিজয়ী হতে তারা রাজ্যটিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ছক নিয়েই অগ্রসর হচ্ছেন। আর হিন্দুতের সন্তুষ্ট রাখতেই আদিত্যনাথের মতো কট্টর নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। আবার হিন্দু বর্ণবিভেদ যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেদিকে লক্ষ রেখে ব্রাহ্মণ দীনেশ শর্মা ও নি¤œবর্ণের কেশব মৌর্যকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। সব বর্ণের হিন্দুদের মন রক্ষার জন্যই ক্ষমতার এই ভারসাম্য। সব মিলে হিন্দুত্ববাদের যে প্যাকেজ নিয়ে বিজেপি নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল তার উপসংহার টানা হলো সরকার গঠনের মাধ্যমে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাগরিক ঘোষ এক নিবন্ধে বলেছেন, ‘আদিত্যনাথের মাধ্যমে উত্তর প্রদেশে যে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে, তা আদতে হিন্দুরাষ্ট্র গঠনেরই প্রক্রিয়া। যেখানে মুসলমানদের জন্য কোনো স্থান থাকবে না’।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *