মার্শ আরব-৫ হাজার বছরের প্রাচীন ভাসমান গ্রাম

বিশ্বের প্রথম ও সবচেয়ে প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতার স্থানটি ছিলো বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল, যে জায়গা সংলগ্ন বর্তমান ‘মার্শ আরব’ অবস্থিত। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ইরাকের তাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর সংযোগস্থলে একটি পরিবেশবান্ধব ভাসমান গ্রাম গড়ে উঠেছিলো। ৯০০০ বর্গমাইলের এই ভাসমান গ্রামে এখনও ১৫০০ মানুষ বসবাস করে। এখানকার বাসিন্দারা ‘মার্শ আরব’ ও ‘মা ডান’ উপজাতির।ইংরেজী Marsh শব্দের অর্থ জলাভূমি, মরুভূমির মাঝখানে জলাভূমি সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয় এবং এরূপ বিশ্বের আর কোথাও নেই। সুমেরীয় সভ্যতার পতনের পর আরব জাতির এ অঞ্চল আয়ত্তে আসে। এরপর মা’দান নামক আরব উপজাতীয়রা এই জলাভূমিতে বসবাস করা শুরু করে, এই মা’দানরাই পরবর্তীতে মার্শ আরব নামে পরিচিত হয়।

জলাভূমিতে ছুটে চলেছে এক মার্শ নারীর নৌকা

জলাভূমিতে ছুটে চলেছে এক মার্শ নারীর নৌকা

মরুভূমির মধ্যকার এই জলাভূমিতে মার্শ আরব জনগোষ্ঠী গত পাঁচ হাজার বছর ধরে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে আসছে। এদের বাসস্থানগুলো তৈরী হয় নলখাগড়া দিয়ে যা ঐ জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবেই উৎপন্ন হয়। স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য এই বাড়িগুলোকে বলা হয় ‘মুদিফ’, যা তৈরী হয় কোনো প্রকার কাঠ, পেরেক, কাঁচ ছাড়াই। বাড়িগুলো তৈরী হয় একেকটা দ্বীপের উপর, যে দ্বীপগুলো আবার তৈরী হয় খড়খুটো আর মাটি জমা করে। ফলে মার্শ আরব অধিবাসীদের গ্রামগুলো উপর থেকে দেখলে হাজার হাজার দ্বীপের সমষ্টি বলে মনে হয়। আর এই কারণেই এই জায়গাকে বলা হয় ‘ভেনিস অব মেসোপটেমিয়া’।

জলাভূমিতে ছুটে চলেছে এক মার্শ নারীর নৌকা

ভেনিস অব মেসোপটেমিয়া

স্থাপত্যের দিক দিয়ে এদের বাড়িগুলো খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং সহজে নির্মাণযোগ্য। ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাক সরকার মার্শ আরবদের বাড়ি তৈরীর এসব কলাকৌশলকে ইরাকের অন্য অঞ্চলের মানুষদেরকে শিখতে উৎসাহিত করে। এতে যুদ্ধপীড়িত ইরাকের নানা অঞ্চলের গৃহহীন মানুষের আশ্রয় প্রদানে সুবিধা হয়েছিলো।

এখানকার জেলেরা এ ভাসমান গ্রামের নামকরণ করেছেন ’কাসোনি’(casoni)। ভাসমান এ বসতি বর্তমানে ‘মুদিফ ’ (mudhif)নামে পরিচিত। ভাসমান বসতিগুলো দেখতে খুবই চমৎকার।

marsh

নৌকাই এখানকার বাসিন্দাদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। এখানকার নারী-পুরুষ সবাই নৌকা চালাতে পারে। ভাসমান বসতির নারীদের বোরকা পরে বাইরে বের হতে হয়। এ ভাসমান বসতিতে এখানকার বাসিন্দারা পশুপালনও করে।

অনন্য স্থাপত্যের নিদর্শন মার্শ আরবদের এই ‘মুদিফ

অনন্য স্থাপত্যের নিদর্শন মার্শ আরবদের এই ‘মুদিফ ’

এ বাড়িগুলোর আরো কিছু বাড়তি সুবিধা আছে, যেমন পুরো বাড়িটাই বহন যোগ্য, অর্থাৎ খুব সহজেই খুলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া যায়। বসন্তকালে জলাভূমির পানির উচ্চতা বেড়ে যায়, ফলে চাইলে খুব দ্রুত খুলে ফেলে উঁচু ভূমিতে নিয়ে স্থাপন করে ফেলা যায়। কিছু কিছু বাড়ি আবার মাটির উপরে না বানিয়ে নলখাগড়ার তৈরী ভাসমান বেদির উপর বানানো হয়। এ জাতীয় বাড়ি নোঙ্গর করে রাখতে হয়, যাতে ভেসে না যায়। ভালোভাবে যত্ন নিলে এরকম একেকটি বাড়ি প্রায় ২৫ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।

অনন্য স্থাপত্যের নিদর্শন মার্শ আরবদের এই ‘মুদিফ

মুদিফ তৈরীর কৌশল, ঠিকভাবে রাখলে যা ২৫ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে

মার্শ আরব অধিবাসীগণ মূলত শিয়া মুসলিম। সমাজ ব্যবস্থা আরবের অন্যান্য গোত্রভিত্তিক সমাজের মতোই। তারা পেশাগতভাবে মূলত দুই ভাগে বিভক্ত, একদল মোষ লালন পালন করে, আরেকদল জলাভূমিতে ধান, যব আর গমের চাষ করে।

ধর্মের দিক থেকে মার্শ আরবরা শিয়াপন্থী

এপ্রিল মাসের দিকে যখন জলাভূমিতে পানির গভীরতা অনেক কম থাকে, সে সময় ফসলের চারা রোপণ করা হয়ে থাকে। এছাড়াও জলাভূমিতে মাছ ধরেও অনেকে জীবিকা নির্বাহ করে। এই জলাভূমি থেকেই ধরা মাছ দিয়ে সমগ্র ইরাকের মাছের একটা বড় অংশ জোগান দেয়া হতো। এছাড়াও গত শতাব্দী থেকে মার্শ আরবেরা নলখাগড়া দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কার্পেট বুননকেও তাদের পেশা বানিয়ে নিয়েছে।

নলখাগড়া সংগ্রহ করে ফিরছে এক গ্রামবাসী

নলখাগড়া সংগ্রহ করে ফিরছে এক গ্রামবাসী

বর্তমান ইরাক সরকার মার্শ আরবদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে রক্ষার চেষ্টা করছে। মার্শ আরবদের এই কুঁড়েঘর পর্যটকদের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাইবেলে এ জায়গাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘গার্ডেন অব ইডেন’ হিসেবে

বাইবেলে এ জায়গাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘গার্ডেন অব ইডেন’ হিসেবে

পবিত্র বাইবেলে যাকে উল্লেখ করা হয়েছে দুই নদীর মাঝে থাকা ‘গার্ডেন অব ইডেন’ বা স্বর্গের বাগান হিসেবে (Genesis chapter 2, verse 14)

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *