মারজা আল-উলামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ:)

অসাধারণ এক জগৎ বরেণ্য আলেম। মারজা আল-উলামা উপাধিতে ভুষিত আহমদ বিন আলী বিন মুহাম্মাদ যিনি ইবনে হাজার আসকালানী নামে সুপরিচিতি। তিনি ইলমে হাদিসের একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস , একজন বিখ্যাত হাদীস বিশারদ, শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহ এবং বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ বুখারির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘ফাতহুল বারীর প্রণেতা। যা প্রণয়নে তাঁর সময় ব্যয় হয়েছিল ৩০ বছর। একাধারে তিনি ছিলেন হাফেজ, মুহাদ্দিস, মুফতি এবং কায়রোর প্রধান বিচারপতি ।

আহমদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ, ইবনে হাজার আসক্বালানী (আরবি: ابن حجر العسقلاني‎‎) নামে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ, তাঁর আসল নাম হলো আহমদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ। আবুল ফজল হলো তাঁর উপনাম। শিহাবুদ্দীন হলো তাঁর উপাধি। এছাড়া তিনি হাফেজ উপাধিতেও ভূষিত হয়েছেন। তাঁর পরিবার মূলত তিউনিসিয়ার অন্তর্গত কাবেস এলাকার অধিবাসী ছিল। পরবর্তীতে তারা ফিলিস্তিনের অন্তর্গত আসক্বালান নামক এলাকায় বসতি গড়ে। তার পরিবার আসক্বালানের অধিবাসী ছিল বলে তাকে আসক্বালানী (আসক্বালান সংশ্লিষ্ট)বলা হয়, যদিও তাঁর জন্ম মিশরে।তিনি ১৩৭২ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নুরুদ্দিন আলী ছিলেন একজন কবি এবং শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহ। শৈশবেই পিতা-মাতা উভয়কেই হারান। তাঁর এক মামা তাঁর কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। শৈশবেই তিনি পুরো কুরআন শরীফ এবং আরো বেশকিছু গ্রন্থ মুখস্থ করে ফেলেন।

কর্মজীবন-
তিনি কায়রোর আমর ইবনে আস এবং আল আযহার মসজিদের খতিব ছিলেন। খতিব থাকাকালীন সময়ে তিনি এক হাজারেরও বেশি খুতবা প্রদান করেন। এ জগৎ বরেণ্য আলেম ১৫০ এর অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। ৩০ বছরের পরিশ্রমে বুখারির ব্যখ্যাগন্থ ‘ফতহুল বারী’ ১২ খণ্ডে সমাপ্ত করেন। ৮২৭ হিজরি সন থেকে তিনি ২১ বছর কায়রোর প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রচনাবলী

তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর সংখ্যা দেড় শতাধিক। নিচে তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর একটি তালিকা দেয়া হলো:

  • তাগলীক আল-তা’লীক
  • তাবাক্বাত আল-মুদাল্লিসীন
  • নুখবাত আল-ফিকার ফী মুসতালাহি আহলি আল-আছর
  • নুযহাত আন-নাযর ফী তাউযীহি নুখবাত আল-ফিকার
  • আল-তালখীস আল-হাবীর
  • ফাতহ আল-বারী
  • তা’জীল আল-মানফাআ’ত
  • আল-উ’জাব ফী বায়ানি আল-আসবাব
  • তাহযীব আল-তাহযীব
  • তাবসীর আল-মুতানাব্বিহ বিতাহরীরি আল-মুশতাবিহ
  • আল-আমালী আল-মুতলাক্বাহ
  • আল-ইমতা’ বি আল-আরবাঈ’না আল-মুতাবায়িনাতি আল-সামা’
  • আল-আমালী আল-হালবিয়্যাহ্‌
  • নুযহাত আল-আলবাব ফী আল-আলক্বাব
  • আল-ঈছার বি মা’রিফাতি রুওয়াতি আল-আছার
  • আল-দিরায়াহ্ ফী তাখরীজি আহাদীছি আল-হিদায়াহ্
  • লিসান আল-মীযান
  • আল-ইসাবাহ্ ফী তামায়ীযি আল-সাহাবাহ
  • বুলূগ আল-মারাম মিন আদিল্লাতি আল-আহকাম
  • তাক্বরীব আল-তাহযীব
  • আল-নুকাত আ’লা কিতাবি ইবনে আল-সালাহ্
  • নুযহাত আল-সামিঈ’ন ফী রিওয়ায়াতি আল-সাহাবাহ্ আ’ন আল-তাবিঈ’ন
  • সিলসিলাতু আল-যাহাব
  • আল-ক্বাওল আল-মুসাদ্দাদ ফী আল-যাব্বি আ’ন মুসনাদি আহমাদ
  • আল-দুরার আল-কামিনাহ্ ফী আয়া’নি আল-মিআত আল-ছামিনাহ্
  • তাসদীদ আল-ক্বাওস মুখতাসারু মুসনাদ আল-ফিরদাউস

একটি চমকপ্রদ ঘটনা:

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) যখন প্রধান বিচারপতীর পদে সমাসীন তখন একটি মজার ও শিক্ষনীয় ঘটনা ঘটে।

একদিন তিনি কায়রো শহরের যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন তার পাশে ছিল জনৈক ইহুদীর তেলের মিল । ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে তিনি তেলের মিলে কাজ করছিলেন । প্রধান বিচারপতিকে পথ দিয়ে যেতে দেখে সেই ইহুদী এগিয়ে এলেন । তিনি ইবনে হাজার আসকালানীকে বললেন “আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে , প্রশ্নটি হলো আপনাদের নবী কি সত্যই বলেছেন , এ পৃথিবী মুমিন মুসলমানদের জন্য দোযখ স্বরূপ আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেহেশত স্বরূপ ? ”

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) বললেন – হ্যা তিনি ঠিকই তা বলেছেন ।

সেই ইহূদী লোকটি তখন বলল : “সেটা যদি হয় তাহলে আপনি আমাকে বলুন আপনি কোন দোযখে আছেন এবং আমি কোন বেহেশতে আছি” ।

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) তৎক্ষনাৎ বললেন, “আল্লাহ তা’আলা মুমিন, বিশ্বাসীদের জন্য বেহেশতে যে নেয়ামতরাজী , অফুরন্ত সুখ-শান্তি রেখেছেন তার তুলনায় এই পার্থিব জীবন বিষাদময়, দোযখ-স্বরূপ । আর অবিশ্বাসীদের জন্য যে ভয়াবহ শাস্তি , ভীতি এবং দুর্বিষহ জবীন দোযখে রয়েছে তার তুলনায় এই পৃথিবী তাদের জন্য বেহেশত-স্বরূপ ।

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) এর জবাব শ্রবণ করে সাথে সাথে ইহুদি লোকটি বলল “আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করব, আমাকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিন”।

এ মহামনীষী ৮ জিলহজ্জ ৮৫২ হিজরি মোতাবেক ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৪৪৮ মতান্তরে ১৪৪৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর রূহানি ফয়েজ এবং বরকত মুসলিম উম্মাহকে দান করুন। আমিন।

 

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *