মহাকালের কপোলে সমুজ্জ্বল মহাকবি ফেরদৌসী

কবিরা সত্যের দর্পণ ও বেহেশতী বাগানের বুলবুল। সত্য চির-অম্লান ও চিরসমুজ্জ্বল হয় বলে প্রকৃত কবিরাও দেশ আর কালের গন্ডী পেরিয়ে মানবজাতির অন্তরে চির-প্রজ্জ্বল হয়ে থাকেন অক্ষয় ধ্রুবতারার মত। হাকিম আবুল কাশেম ফেরদৌসী তুসি (ফার্সি: حکیم ابوالقاسم فردوسی توسی, ফেরদৌসী নামে বেশি পরিচিত (فردوسی); (৯৪০-১২২০ সিই) পারস্যের (বর্তমান ইরান)  মহাকালের পাখায় চির-অম্লান এমনই এক মহাকবি। এক হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে ক্ষণ-জন্মা এই কবির কালোত্তীর্ণ কাব্য “শাহনামা” বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাচীন কাব্য হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। বিশ্ব-বিশ্রুত এই কবির লেখনীর যাদুস্পর্শে জেগে উঠেছিল সাময়িকভাবে ঝিমিয়ে পড়া প্রতিভা-সমৃদ্ধ ইরানী জাতি। তিনি যে শুধু ইরানের জাতীয় জাগরণের কবি বা জাতীয় কবি ছিলেন তা নয়, বরং তার লেখনীর মোহনীয় স্পর্শে প্রাচ্যের স্তব্ধ-প্রায় কাব্য-রবিচ্ছবি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন আবারও হয়ে ওঠে প্রদীপ্ত ও প্রাণবন্ত। তাই ফেরদৌসী ও তার কীর্তি গোটা মানব সভ্যতার অমর ও অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক সম্পদ। সম্প্রতি কালোত্তীর্ণ কাব্যলোকের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র তথা ফেরদৌসীর শাহনামার এক হাজার বছর পূর্তি হয়েছে।

পরিবার

ফেরদৌসী উত্তর-পূর্ব ইরানের তুস শহরের পাশে পাজ নামে একটি গ্রামে ৯৪০ সিইতে জন্মগ্রহণ করেন। ফেরদৌসীর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায় এবং তার নাম নিয়েও সন্দেহ আছে। তের শতাব্দীতে বান্দোরী নামে শাহনামার একজন আরব অনুবাদকের মতে, ফেরদৌসীর আসল নাম “আল-আমির আল-হাকিম আবুল কাশেম মনসুর ইবনে আল হাসান আল-ফেরদৌসী আল-তুসি”। এটা জানা যায় না কখন বা কেন তিনি শাহনামায় তার লেখক নাম ফেরদৌসী ব্যাবহার করেছেন। তার স্ত্রী একটি শিল্প পরিবার থেকে এসেছিল। ফেরদৌসীর এক পুত্র ছিল যে ৩৭ বছর বয়সে মারা যায় এবং ফেরদৌসী শাহনামায় তার পুত্র সম্পর্কে শোক প্রকাশ করেছেন।

মনে করা হয় শাহনামার আগেও ফেরদৌসী কিছু কবিতা লিখেছিলেন কিন্তু সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায় নি। ৯৭৭ এর দিকে তিনি শাহনামা লেখা শুরু করেন এবং দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে তিনি ইরানের বিভিন্ন শাসক ও শাহদের কাহিনী তুলে ধরেন। এসময় সামানীয় রাজার কাছ থেকে গভীর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তিনি ৯৯৪ সিইর দিকে শাহনামার প্রথম শ্লোক লেখার কাজ সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে যখন তুর্কি গজনবী সুলতান মাহমুদ সামানীয় রাজা মনসুরকে ক্ষমতাচ্যুত করে তখন ফেরদৌসী মাহমুদকে গুণগান করে তার লেখা চালিয়ে যান। যাইহোক সেসময় কবিদের কিভাবে সমাদর করা হত সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে ইরানের সাহিত্য সম্পর্কে সামানীয় রাজার চেয়ে মাহমুদের আগ্রহ কম ছিল বলে ধারণা করা হয়।ফলে শাহনামার পরবর্তী শ্লোক গুলোতে রাজাদের গুণগানের পরিবর্তে ফেরদৌসীর নিজস্ব আবেগ, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অবশেষে ফেরদৌসী খ্ৰিস্টাব্দে তার মহাকাব্য লেখার কাজ শেষ করেন। কিন্তু তার শেষ জীবন সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় নি।

শাহনামা

শাহনামা হচ্ছে প্রাচীন ইরানের ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন কাব্যগাথা। এতে আছে ৯৯০টি অধ্যায়, ৬২টি কাহিনি। পুরো মহাকাব্যে ৬০ হাজার বার আছে অন্ত্যমিল। এটি হোমারের ইলিয়ড-এর চেয়ে সাত গুণ ও জার্মান মহাকাব্য নিবেলুঙগেনলিয়েড-এর (Nibelungenlied) চেয়ে ১২ গুণ বড়। ইংরেজিতে এ পর্যন্ত শাহনামার যতগুলো অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সবগুলোই প্রায় সংক্ষেপিত। ১৯২৫ সালে বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আর্থার অ্যান্ড এডমন্ড ব্রাদার্স পুরো শাহনামার একটি ইংরেজি অনুবাদ নয় খণ্ডে প্রকাশ করেছিলেন। সেই ইংরেজি অনুবাদের কোনো পুনর্মুদ্রণ এখন আর পাওয়া যায় না। এছাড়া রাশিয়া থেকেও এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

পারস্য সম্রাট সুলতান মাহমুদ যখন ফেরদৌসীকে শাহনামা লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তখন তিনি ফেরদৌসীর কাছে ওয়াদা করেছিলেন, মহাকাব্যে যতগুলো শব্দ থাকবে তার বিনিময়ে প্রত্যেক শব্দের জন্য একটি করে স্বর্ণ মুদ্রা কবিকে দেওয়া হবে। এরপর ফেরদৌসী ৬০০০০ শব্দে মহাকাব্য লেখার কাজ শেষ করেন। কিন্তু সম্রাট তার প্রিয় ভাজন মন্ত্রীর পরামর্শে কবিকে ৬০০০০ হাজার রৌপ্য মুদ্রা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ফেরদৌসী রৌপ্য মুদ্রা গ্রহন না করে সেগুলো তার চাকরদের মাঝে ভাগ করে দেন। রাজার কানে এ খবর যাওয়া মাত্র রাজা রাগান্বিত হন ও ফেরদৌসীকে ধরে আনার নির্দেশ দেন। রাজার ভয়ে কবি পালিয়ে যান কিন্তু পরে রাজা তার ভুল বুঝতে পারে এবং তাকে স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ততদিনে কবি মৃত্যুবরণ করেছেন। তার কন্যা এ মুদ্রা গ্রহণ করেন নি। পরবর্তীতে কিছু মুদ্রা দিয়ে কবির কবর সংস্কার করা হয় এবং কিছু গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

 

শাহনামা বাংলাভাষাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। শাহনামায় বিধৃত ইরানী সংস্কৃতির নানা সূক্ষ্ম দিক হুবহু বা যথাযথভাবে ভিন্ন ভাষায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সাহিত্যে শাহনামার প্রভাব অপ্রতিরোধ্য। এমনকি ইউরোপীয় জ্ঞানী-গুণীরাও ফেরদৌসীর কাব্যে উল্লেখিত মানবতার বাণী ও তার চিন্তাধারার সূক্ষ্ম নানা দিক উপলব্ধি করে সেগুলোকে মানব-সভ্যতার চিরন্তন উত্তরাধিকার বা সম্পদ বলে গর্ব প্রকাশ করেছেন। ইউরোপের অনেকেই শাহনামাকে বিশ্বের সবচেয়ে অসাধারণ ও মহত্ত্বম সাহিত্য-কর্মের সমতুল্য, এমনকি তাদের কেউ কেউ একে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন বলার মত উদারতাও দেখিয়েছেন। ইয়ান রিপকার ইরানী সাহিত্যের ইতিহাস শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, এ সত্য অকাট্য যে বিশ্বের অন্য কোনো জাতির মধ্যেই ইরানী জাতির মত এত বড় মাপের বীরত্ব-গাঁথা বা কাব্য নেই যাতে কিংবদন্তীর যুগ থেকে সপ্তম শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ঐ জাতির সমস্ত ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইরানের সাথে গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় এবং সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ বাংলাদেশ বা ভারত-উপমহাদেশ অঞ্চলে শাহনামার প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলা বাহুল্য বলেই মনে হতে পারে। এ অঞ্চলে সম্ভবতঃ এমন কোন শিক্ষিত পরিবার বা ব্যক্তি নেই যে সোহরাবের মত বীরের ট্র্যাজেডীতে অশ্রু-ভারাক্রান্ত হয় নি, কিংবা শাহনামায় বিধৃত বীরদের বীরত্বে উজ্জীবীত হয় নি। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্য-সমালোচক ও কবি মোহিতলাল মজুমদার শাহনামার মাহাত্ম্যে এতটাই মোহিত হয়েছেন যে তিনি ফেরদৌসীকে স্মরণ করে লিখেছেন, বাঙ্গালী জাতি “অশেষ দূর্গতি মাঝে লয় আজ তোমারি উদ্দেশ”। তিনি শাহনামাকে ইরানী জাতির কণ্ঠহারের সাথে তুলনা করে বাঙ্গালী জাতির জাগরণের জন্যেও সেরকম আদর্শ “সম-কন্ঠহার” কামনা করেছেন।
উল্লেখ্য, ইরানের ফেরদৌসী ফাউন্ডেশন শাহনামা রচনার হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ২০০৯ সাল তথা ফার্সী ১৩৮৮ সালকে ফেরদৌসী ও শাহনামার বছর বলে ঘোষণা করেছে।

সামানীয় শাসকদের গৌরব রবি যখন অস্তমিত হচ্ছিল এবং ফার্সী কবিতার জনক কবি রুদাকী যখন সমরখন্দে ইন্তেকাল করেন তখন ইরানের খোরাসান প্রদেশের তুস অঞ্চলের পাঝ নামক গ্রামে উদিত হয় ফেরদৌসী নামক নতুন সূর্য। হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসীর প্রকৃত নাম ছিল হাসান বিন ইসহাক বিন শরফ। গবেষকরা হিজরী ৩২৯ বা ৩৩০ সন মোতাবেক খ্রিস্টীয় ৯৪০ বা ৯৪১ সালকে ফেরদৌসীর জন্ম-সন বলে উল্লেখ করেছেন। বোখারার মত তুসও ছিল সে যুগে শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

রাজা-বাদশা বা বীরদের নিয়ে বীরত্ব-গাঁথা লেখা বেশ প্রাচীন রীতি। শাহনামা এ জাতীয় কাব্যের একটি প্রচলিত নাম। তুস অঞ্চলে ফেরদৌসী ছাড়াও এ জাতীয় কাব্য রচনা করেছিলেন কবি আবু মানসুরি, আসাদি এবং কবি দাকিকি। নিযামীর বর্ণনা থেকে জানা যায় ফেরদৌসীর পিতা ছিলেন বেশ স্বচ্ছল ও অনেক জায়গা-জমির মালিক। সম্মানিত ও সভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে উপযুক্ত শিক্ষকের তত্তাবধানে ফেরদৌসী শৈশবেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, কবিতা ও সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে থাকতে পারেন। একই প্রেক্ষাপটে তার মধ্যে স্বাধীনচেতা মনোভাব, সাহসিকতা, ভাষার শালীনতা, উদারতা ও বিভিন্ন সৎ-গুণাবলী বিকশিত হয়েছিল।

সমসাময়িক যুগের ফার্সী ভাষা ছাড়াও ফেরদৌসী প্রাচীন পারস্যের ভাষা তথা পাহলভী ও আরবী ভাষাও ভালোভাবে আয়ত্ত্ব করেছিলেন। পাহলভী ভাষা ছিল প্রাচীন ইরানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এ ছাড়াও তিনি ইসলামী দর্শন, কালাম শাস্ত্র ও গ্রীক দর্শন সম্পর্কেও পড়াশুনা করেছিলেন। আর তার কাব্যে প্রভাব পড়েছে এসব বিষয়ের। গবেষকদের কেউ কেউ বলেন, ফেরদৌসী ৫৮ বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু শাহনামার বিভিন্ন পংক্তি, ঘটনা ও বিষয়বস্তুর আলোকে অনেকেই মনে করেন যে তিনি যৌবনেই কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে তার শাহনামা কাব্যের কিছু কিছু ঘটনা বর্ণনায় যে তেজোদৃপ্ত ভাব দেখা যায় তা থেকে তারুণ্য ও যৌবণের আবেগ বা ভাবধারা ফুটে উঠে।
শাহনামার সর্বত্রই রয়েছে পরিপক্কতা ও অভিন্নতার ছাপ। আর এ থেকেই কবিতা রচনায় তার দক্ষতা ফুটে উঠেছে। প্রচলিত প্রাচীন কাহিনীগুলোকে তিনি অপূর্ব দক্ষতায় ছন্দবদ্ধ করেছেন।
বিভিন্ন সময়ে লেখা শাহনামার বিভিন্ন ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে ফেরদৌসীর মাধ্যমে ছন্দবদ্ধ হবার পরই সেগুলোর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। আর সেসব কবিতা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ত। রুস্তম ও ইস্ফান্দিয়ারের যুদ্ধের কাহিনী সম্বলিত শাহনামার পংক্তিগুলো শুনে রুস্তম বিন ফাখরুদ্দৌলা দেইলামী ঐ কবিতাবাহককে ৫০০ দিনার উপহার দেন এবং তিনি ফেরদৌসীর জন্যও একহাজার দিনার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী তার এ মহাকাব্যে গেয়ে গেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, মানুষ এবং মানবতার জয়গান। তুলে ধরেছেন সত্যের শাশ্বত ও চিরসুন্দর রূপ এবং তুলে ধরেছেন মিথ্যার পংকিলতা ও অন্ধকার দিক। সত্য তথা আলোর বন্যার দিকে তার যে আহ্বান তা মানব-প্রকৃতির চিরন্তন চেতনারই বহিঃপ্রকাশ হওয়ায় শাহনামা হয়েছে কালোত্তীর্ণ এবং কাব্যলোকে ফেরদৌসী হয়েছেন চির-উজ্জ্বল। মহাকবি ফেরদৌসী’র শাহনামা রচনার হাজার বছর‍ের সমসাময়িক যুগের পরিস্থিতি এবং শাহনামা রচনার পদ্ধতিসহ এই মহাকাব্য রচনার প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস সম্পর্কে কথা বলব।

ইরানে মুসলিম শাসন শুরু হবার পর ফার্সী সাহিত্য ও কবিতা পুনরায় বিকশিত হতে থাকে সামানীয়দের শাসনামলে। ইরানী বংশদ্ভুত সামানীয় শাসকরা ফার্সী ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে মনোযোগী হয়েছিলেন এবং তারা এ ব্যাপারে কবি, লেখক ও অনুবাদকদের উৎসাহ দিতেন। সামানীয়রা ছিলেন বিদ্যা ও শিক্ষার অনুরাগী এবং সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অভ্যস্ত। তারা লেখক ও শিল্পীদের চিন্তার স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করত। এ অবস্থা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার জন্য খুবই অনুকুল। আর এ জন্যই সেযুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন ফারাবী, আল-বিরুনী, ইবনে সিনা, রুদাকী ও ফেরদৌসীর মত ক্ষণজন্মা এবং বিশ্ববিশ্রুত ইরানী চিন্তাবিদ ও মনীষী। সে যুগে শাসক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত সবাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদগুলোর উৎসকে ফার্সীতে রূপান্তরিত করতে চাইতেন। তাই সে সময় সাহিত্যসহ অনেক ধর্মীয় ও বিজ্ঞান সংক্রান্ত বই ফার্সীতে অনুদিত হয়েছে। ফার্সীতে অনুদিত গল্প-গ্রন্থ “কালিলা ও দিমনা” এর বড় দৃষ্টান্ত। বইটি এক সময় ফার্সীর প্রাচীন রূপ পাহলভী থেকেই আরবীতে অনুদিত হয়েছিল। কবি রুদাকি এর কাব্যানুবাদ করেন ফার্সীতে।

খ্রিস্টীয় দশম শতক বা সামানীয় শাসনামলে তাবারীর লেখা পবিত্র কোরআনের তাফসির ও ইতিহাস ফার্সীতে অনুদিত হয়েছিল। এ দুটি বই এখনও অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ যুগের প্রথম দিক ফার্সী কবিতার জনক রুদাকী এবং শেষের দিক মহাকবি ফেরদৌসীর জন্য খ্যাত। তাই এ যুগকে ফার্সী সাহিত্যের অন্যতম সেরা যুগ বলা যায়। সামানীয় যুগে আরো কয়েকজন কবি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এমনকি সামানীয় শাসক ও আমীর-ওমরাহদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কবি। এদের মধ্যে আবুল ফজল বালআমী ও শামসুল মাআলী কাবুসের কথা উল্লেখ করা যায়। ফার্সী ভাষা ও সাহিত্যের অন্য কোনো যুগে ফার্সী ভাষার এত কবি ও পন্ডিত দেখা যায় না। সামানীয় যুগেই ইরানের ইসলাম-পূর্ব যুগের গৌরবময় ইতিহাস ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে লিপিবদ্ধ বা গ্রন্থবদ্ধ করা শুরু হয়। পাহলভী ভাষা থেকে আরবীতে অনূদিত উৎস বা মূল পাহলভী ভাষায় লিখিত উৎসগুলো থেকে এসব ঘটনা বা কাহিনী ফার্সীতে লেখা হয়েছে। আবুল মুয়িদ বালখী ও আবু মানসুরের “শাহনামা” এ ধরনের দুটি পৃথক বই। তুসের শাসক আবু মানসুরের নির্দেশে লেখা “শাহনামা”-কে খ্রিস্টীয় দশম শতকের সেরা শাহনামা বলে মনে করা হয়। সামানীয় যুগের অন্যতম বড় কবি দাকীকী এই শাহনামাকে কাব্য-রূপ দেয়ার কাজ শুরু করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি যৌবনেই মারা যাওয়ায় এই কাব্য লেখা শেষ করতে পারেন নি।

হিজরী চতুর্থ শতকের শেষের দিকে ফেরদৌসী তার শাহনামা রচনার ক্ষেত্রে আবু মানসুর ও দাকিকির শাহনামা ছাড়াও সামানীয় যুগে লেখা “অযাদ সার্ভ” ও “আখবারে রুস্তাম” শীর্ষক বই দুটিকেও ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
ফেরদৌসীর যুগে ঐতিহাসিক কাহিনী ও রূপকথার বাজার ছিল বেশ রমরমা। সে যুগের ইরানীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জাতীয়-গৌরব ও বীরত্বের প্রাচীন কাহিনীগুলো মুখস্ত করে রাখতো এবং এভাবে তা পরবর্তী প্রজন্মগুলোর মধ্যেও মুখে মুখে সংরক্ষিত থাকতো। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান বা বিনোদনের আসরে এসব গল্পের চর্চা হত। রুস্তমের মত পাহলোয়ানদের বীরত্ব-পূর্ণ কাহিনী ইরানীদের আশার প্রদীপকে করত উজ্জীবীত এবং সিয়াভাশ ও ইস্ফান্দিয়ারের দুঃখজনক পরিণতিতে তারা হত অশ্রু-সজল। সিয়াভাশের ট্র্যাজেডী নিয়ে বোখারা অঞ্চলে অনেক শোক-সঙ্গীত প্রচলিত ছিল বলে ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। ‌এসব গল্প যে কেবল কবিতা বা সঙ্গীত হিসেবে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল তা নয়, অনেক পন্ডিত ও শিল্পী সেগুলোকে গ্রন্থবদ্ধও করেছেন। এসব বইয়ের মধ্যে ইয়াদেগারে জারির, করনামে আর্দেশির ববকান ও বাহরাম চুবিন শীর্ষক কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করা যায়।

আমরা আগেই বলেছি, ফেরদৌসী তার শাহনামা রচনার ক্ষেত্রে তাবারী, ইবনে নাদিম ও মাসউদির মত বিভিন্ন ঐতিহাসিকের লেখা বই বা উৎসসহ লিখিত ও অলিখিত বা মৌখিক বহু উৎস ব্যবহার করেছেন। কবি দাকীকী তুসের শাসক আবু মানসুরের নির্দেশে লেখা “শাহনামা”র কাব্য-রূপ দেয়ার কাজ শুরু করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি যৌবনেই মারা যাওয়ায় এই কাব্য লেখা শেষ করতে পারেন নি। ফেরদৌসী এ বিষয়টি জানতেন। ফেরদৌসীর শাহনামার ভূমিকা থেকে জানা যায় তার রচিত শাহনামার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল খোদায়ানামাকের শাহনামা।

আবু মানসুর আবদুর রাজ্জাক পাহলভী ভাষায় প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনী, ইতিহাস ও বীরত্ব-গাঁথা সংগ্রহের জন্য হেরাত, তুস, সিস্তান ও নিশাপুর অঞ্চলের চারজন প্রবীণ পন্ডিতকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তারা এ ব্যাপারে প্রচলিত লিখিত ও অলিখিত উৎসগুলো সংগ্রহ করে গদ্য আকারে শাহনামা বা রাজা-বাদশাহদের কাহিনী সংকলন করেন।
ইরানের কৃষক বা স্বচ্ছল পরিবারগুলোর মধ্যে রুস্তম বংশের অনেক কাহিনী প্রচলিত ছিল। আবু মানসুরের শাহনামায় সেসব কাহিনীর মধ্যে কেবল একটি কাহিনী স্থান পেয়েছিল। এমনকি এ শাহনামায় সোহরাব ও রুস্তমের কাহিনীটিও স্থান পায় নি। ফেরদৌসী তার শাহনামায় রুস্তম সম্পর্কিত বাদ-বাকী প্রচলিত ও জনপ্রিয় কাহিনীগুলো মৌখিক উৎস থেকে তুলে ধরেন।

ফেরদৌসী তার শাহনামায় ইরানের বিভিন্ন কিংবদন্তী ও প্রাচীন গল্পগুলো তুলে ধরার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছিলেন। এমনকি তিনি এসব কাহিনীর নির্ভরযোগ্য সংকলন বা সংস্করণ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে সফর করেছিলেন এবং তার সমস্ত অর্থ-সম্পদ এর পেছনে ব্যয় করেন। তিনি আবু মানসুরের শাহনামার নির্ভরযোগ্য সংস্করণ সংগ্রহের জন্য বোখারায় গিয়েছিলেন। ফেরদৌসী যদি এভাবে ইরানের প্রাচীন ঐতিহ্য, বীরত্ব-গাঁথা ও কিংবদন্তীগুলো রক্ষার উদ্যোগ না নিতেন তাহলে এসব অমূল্য সম্পদের একটা বড় অংশই হয়ত কালের গর্ভে বিলুপ্ত হয়ে যেত। ফেরদৌসী ইরানের এসব গল্প, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কেবল রক্ষাই করেন নি, একইসাথে তিনি এগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন তার প্রজ্ঞাপূর্ণ বিশ্লেষণ, শৈল্পিক সাজ-সজ্জা এবং বিশ্বদৃষ্টির সুষমা, নান্দনিক কাব্যিকতা ও অনন্য শিল্প-মাধুরি দিয়ে। মহাকবি ফেরদৌসী ছিলেন এমন এক যুগের সন্তান যখন ইরানে স্বজাতি-প্রেম বা জাতীয়তাবোধ ও দেশ-প্রেমের জাতীয় জাগরণ ঘটছিল। ফেরদৌসীর শাহনামা এই জাতীয় জাগরণকে দান করে আরো দূর্বার গতি। ফেরদৌসীর জাগরণী মন্ত্রে উজ্জীবিত সামানীয় শাসকরা ইসলাম-পূর্ব যুগের সাসানীয়দের হারানো ঐতিহ্য এবং ইরানের স্বাধীনতাকে পুনরুজ্জীবিত করার দৃপ্ত শপথ নেয়। যে পরিবেশে এই মহাকাব্য-গাঁথা তিলে তিলে গড়ে উঠেছে সে বিষয়সহ সে যুগের পরিস্থিতি এবং শাহনামা রচনার প্রেক্ষাপট, এর বিষয়-বস্তু ও পদ্ধতির বিষয়ে আজ আমরা আরো কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলব।

আমরা আগেই বলেছি, কবি দাকীকী তুসের শাসক আবু মানসুরের নির্দেশে লেখা “শাহনামা”র কাব্য-রূপ দেয়ার কাজ শুরু করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি যৌবনেই মারা যাওয়ায় এই কাব্য লেখা শেষ করতে পারেন নি। ফেরদৌসী এ বিষয়টি জানতেন। তিনি মানসুর বিন নূহ সামানীর শাসনামলে শাহনামার কিছু গল্প নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন। ৩৭০ হিজরীতে কবি দাকিকি মারা যাবার পর ফেরদৌসী আবু মানসুরের শাহনামার আলোকে শাহনামা কাব্য লেখার কাজ শুরু করেন। ফেরদৌসীর বক্তব্য অনুযায়ী তার শাহনামা কাব্য লেখার কাজ শুরু হয়েছিল খ্রিস্টীয় ৯৯৫ সালের দশই মার্চ। অন্যকথায় তিনি মানসুর সামানীর পুত্র দ্বিতীয় নূহের শাসনামলে ৫৫ বছর বয়সে শাহনামা রচনায় নিয়োজিত হন। এ সময় সামানীয়দের শাসন-কর্তৃত্বের পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।

ফেরদৌসী প্রথমবারের মত যে শাহনামা সংকলন করেছিলেন তাতে কবির যৌবণের সোনালী দিনগুলোর ঔজ্জ্বল্য, তেজ-দৃপ্ততা ও উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছে। এ সংকলনের অধিকাংশ জুড়েই রয়েছে সজীবতা ও প্রানোচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ বীর বা পাহলোয়ানদের গল্প। ফেরদৌসীর রচিত শাহনামার প্রথম সংকলনে সাসানীয় যুগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস স্থান পেয়েছে। প্রথমবার শাহনামা সংকলন করেই ফেরদৌসী ক্ষান্ত হন নি। এরপর তিনি এর উন্নয়ন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনায় লিপ্ত হন। ফেরদৌসী শাহনামার প্রথম সংকলন কারো নামেই উৎসর্গ করেন নি, বরং শাহনামার মাধ্যমে ইতিহাসে তার নাম যে অমর হয়ে থাকবে সে আভাস দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,

چو اين نامور نامه آمد به بن
ز من روي کشور شود پر سَخُن
نميرم از اين پس که من زنده ام
که تخم سخن را پراکنده ام
هر آنکس که دارد هش و راي و دين

پس از مرگ بر من کند آفرين

ফেরদৌসীর শাহনামার প্রথম সংকলনে সামানীয় যুগের চিন্তাধারার প্রভাব ফুটে উঠলেও সামানীয় সম্রাটদের প্রসঙ্গ তাতে স্থান পায় নি বলা চলে। অতীতের রাজা-বাদশাদের কথা প্রসঙ্গে কেবল একবার বলা হয়েছে যে কোথায় আজ সাসানীয় ও সামানীয় রাজারা? সম্ভবতঃ ফেরদৌসী সামানীয় রাজাদের রাজধানী থেকে দূরে ছিলেন বলেই তাদের প্রসঙ্গ খুব একটা টানেন নি, কিংবা তার শাহনামায় সামানীয় শাসকদের কথা স্থান পেলেও খুব সম্ভবতঃ গযনভী শাসকদের যুগে শাহনামা থেকে সেসব পংক্তি বাদ দেয়া হয়।

ফেরদৌসীর শাহনামার প্রথম সংকলনের কাজ শেষ হয় তার ৫৫ বছর বয়সে। এর পর পরই এ সংকলনের অনেক কপি ফেরদৌসীর কবিতার প্রেমিক বা ভক্তদের হাতে পৌছে যায়। শাহনামার পংক্তি থেকে জানা যায়, ফেরদৌসী শাহনামার প্রথম সংকলনের কাজ শেষ করার পর এই মহাকাব্য পেশ করার জন্য উপযুক্ত বা মনের মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলে ঐ সংকলন নিজের কাছেই সংরক্ষিত রাখেন। সেযুগের বিশৃংখল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিই ছিল এর বড় কারণ। তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

زمانه سراسر پر از جنگ بود
به جويندگان بَر ، جهان تنگ بود
بر اينگونه يک چند بگذاشتم
سخن را نهفته همي داشتم
نديدم کسي کش سزاوار بود
به گفتار اين مر مرا يار بود

হিজরী ৩৮৭ সাল মোতাবেক খ্রিস্টীয় ৯৯৭ সালে সামানীয় সরকারের পতন ঘটে এবং ক্ষমতা দখল করে তুর্কী গজনভীরা। সামানীয় রাষ্ট্রের বিশেষ করে সামানীয়দের রাজধানী বোখারার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে আব্বাসীয়দের অসন্তুষ্টিই ছিল সামানীয়দের পতনের প্রধান কারণ। সামানীয় সাম্রাজ্যের ইরানীরা ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের পাশাপাশি জাতীয়তাবোধকে গুরুত্ব দিত।

ক্ষমতার এই পট-পরিবর্তনের পর ইরানীরা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে আশা করেছিল এবং তারা গজনভীদের সমর্থন জানায়। গজনভীরা একটি ঐক্যবদ্ধ ও কেন্দ্রীয় ইরানী সরকারের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করবে বলে তারা আশা করছিল। ফার্সী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রেমিক ফেরদৌসী তার শাহনামায় এ বিষয়ে ইঙ্গিত করতে ভুলেন নি। তিনি সুলতান মাহমুদ গজনভীর ক্ষমতা গ্রহণের প্রশংসা করেন এবং তাকে ঘিরে ইরানের জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত আশা-ভরসাগুলো নিজ কবিতায় তুলে ধরেন।
সুলতান মাহমুদ গজনভীও নিজেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-হিতৌষী , ফার্সী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রেমিক এবং শেষ সাসানীয় সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদগের্দের বংশধর বলেও দাবী করেন। যদিও তিনি সামানীয় শাসকদের নীতি অব্যাহত রাখবেন বলে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সুলতান ফার্সী ভাষা ও সংস্কৃতিতে অভিজ্ঞ ক’জন ব্যক্তিকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দিয়ে ইরানীদের মন জয়ের চেষ্টা করলেও আসলে তার উদ্দেশ্য ছিল নিজ ক্ষমতা সুদৃঢ় করা।

ফেরদৌসী এ সময় দ্বিতীয় বারের মত শাহনামা সংকলন ও সম্পাদনা শেষ করেন। তিনি কবি ও জ্ঞানী-গুণিদের প্রতি মাহমুদ গজনভীর সমাদরের কথা শুনতে পেয়ে সাত খন্ডের শাহনামা এই প্রতাপশালী সম্রাটকে উপহার দেন। এ সময় কবির বয়স ছিল ৭১। কিন্তু ফেরদৌসী সম্পর্কে মাহমুদ গজনভীর দরবারের কবিমহলসহ আরো কিছু পরশ্রীকাতর লোকের বদনামের কারণে তার কাছে এই শাহনামা সমাদৃত হয় নি। আসলে দরবারের কবিরা বুঝতে পেরেছিলেন যে ফেরদৌসীর মত কাল-জয়ী কবি মাহমুদ গজনভীর সুনজর পেলে তাদের কবি-খ্যাতি ম্লান হয়ে পড়বে। আবার অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন ফেরদৌসী ও মাহমুদ গজনভীর চিন্তাধারার পার্থক্যের কারণেই তিনি বাদশাহর সুনজর পান নি। আবার অনেকে মনে করেন সে যুগে আরবী ভাষা ব্যাপক গুরুত্ব পেতে থাকায় সুলতান মাহমুদ ফার্সীর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আব্বাসীয়দের বিরাগভাজন হতে চান নি। ফেরদৌসীর শাহনামায় বিধৃত ইরানী জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীনতাকামী চেতনাও বাদশাহর কাছে হয়ত গ্রহণযোগ্য হয় নি। ফেরদৌসী ও তার শাহনামার প্রতি এইসব উপেক্ষা আর অবহেলার বহু পরে সুলতান মাহমুদ নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হন। কিন্তু ততদিনে ফেরদৌসী ত্যাগ করেন ইহলোক, যদিও ইতিহাসে ও কাব্যলোকে তাঁর নাম চিরসমুজ্জ্বল।

ফেরদৌসীর অমর কাব্য শাহনামা ইরানের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রূপকথা আর বীরত্ব-গাঁথার বিশ্বকোষ-তুল্য এক অনন্য সংকলন। ইরানের প্রাচীন যুগের গোত্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থাসহ প্রাচীন প্রথা, সংস্কৃতি, দর্শন, বীরত্বপূর্ণ ঘটনা এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের অবস্থা বিধৃত হয়েছে শাহনামা শীর্ষক মহাকাব্যে। ইরানীদের জাতীয় জীবনের নানা চড়াই-উৎরাই শাহনামার প্রধান উপজীব্য। কিংবদন্তী যুগের বিভিন্ন ঘটনা বা জনপ্রিয় লোকশ্রুতিসহ ইরানের নানা যুগের অনেক বীরের উত্থান-পতন ও ট্র্যাজেডী নিয়ে গড়ে উঠেছে এই মহাকাব্য। কিংবদন্তী যুগের প্রথম ইরানী রাজা বা বীর কিউমার্সের ঘটনা দিয়ে এ বীরত্ব-গাঁথা শুরু হয়েছে এবং ফেরিদুনের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এই কাব্যের লোক-কাহিনী পর্ব। কর্মকার কাভের বিদ্রোহ থেকে রুস্তমের মৃত্যু পর্যন্ত নানা কাহিনী তুলে ধরে ফেরদৌসী সম্মান জানিয়েছেন ইরানের প্রাচীন পাহলোয়ানদের প্রতি। এ ছাড়াও ইরানের অংশ-বিশেষের ওপর আলেক্সান্ডারের কর্তৃত্ব এবং ইসলাম-পূর্ব যুগের সাসানীয় সম্রাটদের শাসন শাহনামায় উল্লেখিত ইরানের ইতিহাস সংক্রান্ত বিষয়। এইসব আকর্ষণীয় বিষয়গুলো ছিল যুগ যুগ ধরে ইরানীদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গৌরবময় বিষয়। কিন্তু ফেরদৌসী তার সুমিষ্ট ভাষা আর ছন্দের যাদু দিয়ে এসব কাহিনীকে করে তুলেছেন আরো অনেক আকর্ষণীয় ও শ্রুতিমধুর।

সত্য ও অসত্যের বা ন্যায় আর অন্যায়ের বিরামহীন সংগ্রাম, ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম ও অত্যাচার পরিত্যাগ, মানুষের জীবন ও বিশ্বের নশ্বরতা বা সিমীত আয়ু মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামায় বিধৃত কিছু প্রধান মানবীয়, প্রাকৃতিক ও নৈতিক দর্শন।
শাহনামায় লোক-কাহিনী বা উপকথা, ইতিহাস আর বীর ও পাহলোয়ানদের কাহিনী ছাড়াও কিছু স্বতন্ত্র কাহিনীও স্থান পেয়েছে। এসব কাহিনী সংযোজনের মাধ্যমে ফেরদৌসী ইতিহাসের ধারাবাহিকতা যথাসম্ভব রক্ষা করেছেন। ফেরদৌসীর আগেও শাহনামা জাতীয় বই লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেসবের সাথে ফেরদৌসীর শাহনামার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিল আবার কোনো কোনো দিকে অমিলও রয়েছে। এর কারণ, ফেরদৌসী লিখিত উৎসগুলো ছাড়াও মুখে-মুখে প্রচলিত লোককাহিনী ও পল্লী সাহিত্য যুক্ত করে তার মহাকাব্যকে করেছেন অনেক বেশী সমৃদ্ধ, বিচিত্রময় এবং চিত্তাকর্ষক। শাহনামার শুরুতেই ফেরদৌসী সৃষ্টিতত্ত্ব ও যে বিশ্ব-দর্শন তুলে ধরেছেন তা এরফান বা আধ্যাত্মিক রহস্যময় জ্ঞানের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফেরদৌসীর শাহনামার ঘটনাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জয়-পরাজয় বা সুখ ও দুঃখের রয়েছে নানা স্পষ্ট এবং সুপ্ত কারণ।

অনেক গবেষকের মতে, ফেরদৌসীর শাহনামার কারণে ফার্স ভাষা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। শাহনামা যে কেবল ইরানের প্রাচীন সংসকৃতি ও ঐতিহ্যের স্মারক বা আর্কাইভ তা নয়, একইসাথে তা বিশুদ্ধ ফার্সী শব্দ, বাক-রীতি ও অলংকারেরও অপূর্ব সম্ভার। হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী এমন এক যুগে শাহনামা রচনা করেন যখন এ অঞ্চলে আব্বাসীয় খলিফাদের কর্তৃত্ব চলছিল। মূলতঃ তখন আরবীই ছিল সমাজের অভিজাত শ্রেণীর ভাষা বা তাদের সাহিত্য চর্চার প্রধান মাধ্যম। আর এমনি এক যুগে ফেরদৌসী তার শাহনামার মাধ্যমে ফার্সী ভাষার ভাব প্রকাশের ব্যাপক ও বৈচিত্রময় ক্ষমতা তুলে ধরেন। এভাবে ফেরদৌসীর শাহনামা প্রায় হাজার বছরের জন্য ফার্সী ভাষার আদর্শ ও অভিজাত মানদন্ডে পরিণত হয়।
অন্যদিকে শাহনামার ফার্সী ভাষা এত বেশী মাত্রায় এ অঞ্চলের সাধারণ বা গণমানুষের ভাষা-কেন্দ্রীক যে অতীতের মত এ যুগেরও একজন অশিক্ষিত ইরানী বা ফার্সী-ভাষীও খুব সহজেই শাহনামার বক্তব্যগুলো বুঝতে সক্ষম। আর এটাই ফেরদৌসীর অন্যতম অলৌকিকত্ব। আজ ইউরোপের জাতিগুলো তাদের মাতৃভাষায় ও স্বদেশে লিখিত মাত্র দুই বা তিন শত বছর আগের সাহিত্য-কর্মের ভাষা সহজেই বুঝতে পারেন না। কিন্তু ফেরদৌসীর শাহনামার ভাষা যেন ইরানীদের এ যুগেরই ভাষা।

এ ছাড়াও শাহনামার জনপ্রিয় কাহিনীগুলো এত বেশী মুখে মুখে চর্চা হয়েছে যে এর শব্দগুলো বিস্মৃতির করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়েছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। অথচ একশত বছর আগের অনেক ফার্সী কাসীদাও বোঝার জন্য গভীর চিন্তা-ভাবনা কিংবা অভিধান ঘাটার দরকার হয়। শাহনামার বর্ণনা-ভঙ্গী ও ভাষা অত্যন্ত সহজ, প্রাঞ্জল, সংক্ষিপ্ত ও সাবলীল। ফেরদৌসী তার শাহনামায় অনর্থক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলার চেষ্টা করেন নি। এই কাব্যের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে সংলাপ বা কথোপকথনগুলো হিজরী চতুর্থ শতকে ইরানে প্রচলিত সাধারণ মানুষের মৌখিক ভাষার দৃষ্টান্ত। কিন্তু ফেরদৌসীর শাহনামার দুইশ বছর পর থেকে লিখিত ফার্সী কাব্যগুলো বোঝা উচ্চ-শিক্ষিত ফার্সী ভাষা-ভাষী লোকদের জন্যও বেশ কষ্টকর। সহজবোধ্যতা ও সহজ-সরল ভাষা-রীতির কারণে শাহনামার পংক্তি বা শ্লোকগুলো অতীত যুগ থেকে ফার্সীভাষী শিশুদের কাছেও জনপ্রিয় ছিল এবং শিশুরা শাহনামার শ্লোককে সংগীতের মত কণ্ঠস্থ ও আবৃত্তি করত বা গাইতো।

অতীতে ইরানের শ্রমিক ও সুলেখন শিল্পীরাও বিভিন্ন দালান-কোঠার টাইলসে শাহনামার পংক্তি ব্যবহার করতেন। এসবের অনেক নিদর্শন এখনও টিকে আছে। আর এ থেকেও বোঝা যায় শাহনামা ফার্সী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে কত বেশী জনপ্রিয়। ইরানের প্রাচীন ঐতিহ্য ও গৌরব তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফেরদৌসীর সাফল্য এবং ইরানের জাতীয় জাগরণে শাহনামার অবদানের কারণেই ফেরদৌসী ইরানের জাতীয় কবি হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন।

 

হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসীর অমর ও বিচিত্রময় কাব্য শাহনামা তার চল্লিশ বছরের সাধনার ফসল হলেও এ মহাকাব্যের সর্বত্র বিশ্বদৃষ্টির সূর ও ধারণাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। শাহনামার ছত্রে ছত্রে বিধৃত চিন্তাধারা ও আদর্শগুলো এমনই সমধর্মী যে মনে হবে যেন পুরো এই মহাকাব্যটি তিনি একই দিনে লিখেছেন। ফেরদৌসী শাহনামা নামক বীরত্ব-গাঁথা রচনায় আবু মানসুরির শাহনামাসহ অনেক প্রাচীন কাহিনীকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তিনি কেবল সেসব বিষয়ই বাছাই করেছেন যেগুলো ছিল জাতীয় গৌরবের অংশ এবং তার বিশ্বদৃষ্টির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বাদ-বাকী বিষয় তিনি বাদ দিয়েছেন। ফেরদৌসী নিজেই তার শাহনামায় ধর্ম, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে মানুষের মুক্তির তিন প্রধান চালিকা শক্তি বলে এই তিনটি বিষয়ের ওপর অশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন, তিনি লিখেছেন,

تو را دین و دانش رهاند درست
ره رستگاری بیایدت جست
به گفتار پیغمبرت راه جوی
دل از تیرگیها بدین آب شوی

অর্থাৎ,
সৌভাগ্যের পথ দেখ আছে কোন্ খানে?
মুক্তির সঠিক পথ সে তো ধর্ম ও জ্ঞানে,
পথ খুঁজে নাও নবীর বাণীতে
মনের যত কালিমা ধুয়ে ফেল এ পবিত্র পানিতে ।

ফেরদৌসীর মতে যুগে যুগে অজ্ঞতা আর এক আল্লাহর এবাদত তথা একত্ববাদ থেকে দূরে সরে যাবার কারণেই বহু জাতি মুক্তি বা সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার মতে অংশীবাদীতা বা শির্ক ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতার উৎস হল অজ্ঞতা। আর এ জন্য ফেরদৌসী প্রজ্ঞা ও সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তিনি তার অমর কাব্য শাহনামা শুরু করেছেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্রষ্টা হিসেবে মহান আল্লাহর প্রশংসা করে। জ্ঞান ও খোদাপ্রেমিক এ কবি লিখেছেন, به نام خداوند جان و خرد
کزین برتر اندیشه برنگذرد

অর্থাৎ,
শুরু করছি লয়ে নাম সে আল্লাহর,
স্রষ্টা যিনি প্রাণ ও প্রজ্ঞার
যিনি সৃষ্টি করেন নি বড় কিছু
প্রজ্ঞা ও চিন্তার মত মহীয়ান।
ফেরদৌসী তার মহাকাব্যের শুরুর দিকে জ্ঞানের প্রশংসা করে আরো লিখেছেন,

توانا بود هر که دانا بود
ز دانش دل پیر برنا بود

অর্থাৎ,
তারাই ছিল শক্তিশালী যারা ছিল জ্ঞানী
জ্ঞানের পরশে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মনও হয়ে পড়ে উদ্ভিন্ন তরুণ-তরুণী।

ফেরদৌসী এমন এক যুগে জ্ঞানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন যখন গজনীর শাসনকর্তা জ্ঞান ও জ্ঞানীদেরকে অর্থ দিয়ে কিনতেন। কিন্তু এভাবে নিজেকে বিকাতে রাজী না হলে জ্ঞানী ও গুণীদের ওপর নেমে আসত বন্দীত্ব বা মৃত্যুদন্ডের খড়গ।
জ্ঞানের ছত্রচ্ছায়ায় ভালবাসা, জীবন, কল্যাণ ও মানুষের সৌভাগ্যের কথা বলে গেছেন এই মহাকবি। অন্যকে কষ্ট না দেয়া, ধ্বংসযজ্ঞ, রক্তপাত ও যুদ্ধের প্রতি ঘৃণার বাণী ফুটে উঠেছে শাহনামার সর্বত্র। ফেরদৌসীর মতে মানুষের জীবন, চিন্তাধারা ও আচার-আচরণ হওয়া উচিত জ্ঞান বা প্রজ্ঞা-কেন্দ্রীক। আর জ্ঞানহীনতা মানেই অমানিষার অন্ধকার। শাহনামা যেন হিজরী চতুর্থ শতকের সাংস্কৃতিক অবস্থার দর্পন। এ শতক ছিল আলো আর জ্ঞান বিকাশের যুগ। এ যুগেই জন্মেছেন রাজী, ইবনে সিনা ও আল-বিরুনীর মত বিশ্ব-বিশ্রুত মনীষী। ঐ যুগের চিন্তাবিদ, পন্ডিত ও গুণীদের কাছে জ্ঞানই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়।
সত্য ও মিথ্যা তথা জ্ঞানের আলো ও অজ্ঞতার আঁধারের দ্বন্দ্বই শাহনামার বীরত্ব-গাঁথার প্রধান ভিত্তি। অন্য কথায় ফেরদৌসীর শাহনামায় মিথ্যা, অবিচার, ধ্বংসযজ্ঞ ও নেতিবাচক বিষয়গুলো প্রাকৃতিক দূর্যোগ, দৈত্য-দানব বা বিজাতীয় তুরানী হিসেবে এবং ন্যায়-বিচার, মানব-প্রেম, দয়া, আনন্দ ও সমৃদ্ধি চিত্রিত হয়েছে ইরানী বীরদের বীরত্ব হিসেবে। ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে চিন্তা-ভাবনাহীন ও জ্ঞানহীন মানুষ পশুর সমতুল্য। প্রতিটি মুহূর্তে এবং দোলনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান আহরণকে গুরুত্ব দিয়ে গেছেন এই বিশ্ববিশ্রুত কবি। তিনি শাহনামায় এটা বলতে চেয়েছেন যে মানুষ যদি নৈতিক মূল্যবোধগুলো থেকে দূরে থাকে তাহলে পৃথিবীটা পরিণত হবে হিংস্র জন্তু ও প্রাণীতে পরিপূর্ণ জঙ্গলে। আর এ জন্যই তিনি মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন সত্য, জ্ঞান অর্জন ও ন্যায়বিচারের দিকে।
এ প্রসঙ্গে ডক্টর গোলাম হোসেন ইউসুফী লিখেছেন, শাহনামার সর্বত্র ন্যায়বিচার, জ্ঞান ও স্বাধীনতার জয়গান স্পষ্ট। ফেরদৌসী তার বীরত্বগাঁথায় বর্ণিত ঘটনাগুলোর মাধ্যমে আমাদেরকে মুক্তিকামীতা, সত্যবাদীতা, সৎ-চিন্তা, জ্ঞান, সৎকর্ম ও দেশ-প্রেমের দীক্ষা দিয়ে গেছেন।
ফেরদৌসী তার শাহনামায় মানুষের মধ্যে যে প্রজ্ঞার দীক্ষা দিয়েছেন তা চিত্রিত হয়েছে ইরানী বীর বা পাহলোয়ানদের চরিত্রে। তারা স্বাধীনচেতা, মর্যাদাদীপ্ত ও নৈতিক গুণাবলীতে বিভূষিত। ইরানী বীর কিংবদন্তীর পাহলোয়ান রুস্তম এ রকমই এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি রাজা-বাদশাহদের বলদর্পিতা, অবিচার ও লুন্ঠণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং এ সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে দেশের বিদ্যমান অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

শাহনামা গবেষক মোঃ আমিন রিয়াহীর মতে, শাহনামা মানুষকে আরো ভালো মানুষে পরিণত করে এবং এ মহাকাব্য জীবনকে আরো সুন্দর করার পথ দেখায়। এ গ্রন্থ একদিকে শাসকদেরকে দেশ পরিচালনায় ন্যায়-বিচারক হবার শিক্ষা দেয় এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে সাধনা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে ওঠার উৎসাহ দেয়। দেখায় হিসেবে উপজীব্য।
শাহনামা গবেষক ডক্টর মানুচেহের মোর্তাজাভীর মতে, বিশ্বের সমস্ত বীরত্ব-গাঁথাগুলোর মধ্যে শাহনামার বীর বা পাহলোয়ানরা সংগ্রাম, প্রচেষ্টা, শক্তি, মানবীয় গুণাবলী ও জ্ঞান বা প্রজ্ঞার দিক থেকে নজিরবিহীন। বিশ্বের কাব্য-গ্রন্থগুলোর মধ্যে শাহনামার অনন্যতার এটাও অন্যতম প্রধান কারণ।

ফেরদৌসীর শাহনামার প্রথম দিকে মানব-সৃষ্টি, তার ক্রমবিকাশ ও সভ্যতার পূর্ণতার কথা স্থান পেয়েছে। এরপর বিভিন্ন গল্পের মধ্যে উঠে এসেছে অশুভ শক্তির তৎপরতার কথা। ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ও বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাহিনী বর্ণনার মধ্য দিয়ে এ বিচিত্র মহাকাব্যের বর্ণিল ও উর্মিমূখর স্রোতধারা অব্যাহত থেকেছে। আর এই অমর কাব্য শেষ হয়েছে ইরানের প্রাচীন যুগের শেষ সম্রাটের কাহিনী বর্ণনার মধ্য দিয়ে। মোট কথা প্রাচীন ইরানের ইতিহাস ও এই দেশটির নানা চড়াই-উৎরাই এ মহাকাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু। তবে শাহনামার মাধ্যমে গোটা মানবজাতির হৃদয়ে যে অমূল্য বাণী গেঁথে দিতে চেয়েছেন অমর কবি ফেরদৌসী তা হল দেশপ্রেম, যে দেশপ্রেমের শিখা ইরানে আজো প্রজ্জ্বোল ও প্রবর্ধমান।

বিজাতীয় আগ্রাসী শক্তি শাহনামায় সবচেয়ে ভয়াবহ অশুভ শক্তি হিসেবে চিত্রিত হয়েছে । ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে ইরানে বিজাতীয়দের হামলা ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং স্বাধীনতা রক্ষা ছিল পবিত্র ঐশী দায়িত্ব। এক্ষেত্রে ইরানীরা যে বীরত্ব ও দৃঢ়তা দেখিয়েছিল শাহনামা তারই স্মৃতিকথা। শাহনামা যেন ইরানীদের উচ্চতর, চিরস্থায়ী এবং মহান আশা-আকাংখা ও আদর্শের চিরনবীন রোজনামচা যা হাজার বছর পরও একটুও পুরোনো বা মলিন হয় নি, বরং ইরানের তরুণ ও প্রবীণ সবার ওপরই আজো এ কাব্যের প্রভাব অপ্রতিরোধ্য। তাই বলা যায়, প্রাচীন মহাকাব্যগুলোর আকাশেও শাহনামা যেন প্রধান নক্ষত্র বা নজিরবিহীন সূর্য।
ফেরদৌসী ছিলেন এমন এক যুগের সন্তান যখন ইরানে চলছিল এক শ্রেণীর দূরাচারী শাসকগোষ্ঠীর লুণ্ঠণ, অত্যাচার ও অবিচার এবং দেশটি তখন উত্তর-পূর্ব দিক থেকে কিছু বর্বর ও যাযাবর গোত্রের হামলার শিকার হচ্ছিল। ফেরদৌসী এসব বিপদের মোকাবেলায় ইরানীদের জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শাহনামার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত জাতীয় জাগরণের এই আহ্বান ধ্বনিত ও অনুরণিত হয়েছে। ইরানী সম্রাট কায়কাভুস ও ইরান যখন বিজাতীয় শক্তির হামলার মুখে বিপদাপন্ন তখন ইরানী বীর রুস্তম কিভাবে আগ্রাসীদের নাস্তানাবুদ করেন তা শাহনামায় দেখানো হয়েছে।
শাহনামায় ইরানের ওপর হামলাকারী তিনটি বিজাতীয় শক্তির কথা বলা হয়েছে। এ তিনটি শক্তি ছিল তাজি বা আরব, তুর্কী বা তুরানীয় ও রোমান। আরবদের হাতে শেষ সাসানীয় সম্রাট ইয়াজদেগার্দের পরাজয়, আলেক্সান্ডারের হাতে তৃতীয় দারিয়ুশের পতন ও তার নিহত হবার ঘটনাসহ আরো কয়েকটি বড় যুদ্ধের ঘটনা শাহনামায় স্থান পেয়েছে। ইরানীদের দীর্ঘ দিনের শত্রু ছিল তুর্কী সর্দাররা। ইরানে চীনের খাক্বানদের হামলাসহ তুর্কীদের সাথে ইরানীদের বহু যুদ্ধের ঘটনা স্থান পেয়েছে শাহনামায়।
ফেরদৌসী তার শাহনামায় জন্মভূমিকে স্বর্গের চেয়েও বড় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তিনি কখনও বর্ণবাদ বা জাতিগত বৈষম্যকে ঘুর্ণাক্ষরেও প্রশ্রয় দেন নি। তার দেশপ্রেমের চেতনা ছিল প্রজ্ঞা, মানব-প্রেম ও ন্যায়-বিচারে পরিপূর্ণ। বিজাতীয়রা অন্যায়ভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছিল এবং জুলুম-অত্যাচার ও লুন্ঠণে লিপ্ত হয়েছিল বলেই ফেরদৌসী তাদের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। “যাহ্ হাক” ও “আফ্রাসিয়াব”র প্রতি তার ঘৃণা প্রকাশের কারণ ছিল এটাই এবং ন্যায়-বিচারের প্রতি শ্রদ্ধার কারণেই ফেরদৌসী মজলুম ইরানীদের প্রতিশোধের প্রশংসা করেছেন।

ফেরদৌসী ইরানীদের শত্রু বাহিনীর কোনো কোনো নেতারও প্রশংসা করেছেন তাদের মহানুভবতা, স্বাধীনচেতা মনোভাব, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার জন্য। তুরানী সেনাপতি “পিরান ভিসেহ”র প্রশংসাই এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। আর এ থেকেও বোঝা যায় ফেরদৌসী জাতিগত বৈষম্যে বিশ্বাসী ছিলেন না।

যুদ্ধ ও রক্তপাতের প্রতি ঘৃণা ফেরদৌসীর শাহনামার আরেকটি বড় বার্তা । যুদ্ধের সাহসী বীরদের প্রশংসা করলেও তিনি শাহনামায় যুদ্ধকে বার বার তিরস্কার করেছেন । তার মানব-দরদী অন্তর যুদ্ধকে এড়িয়ে যাবার পক্ষেই রায় দিয়েছে বার বার। ইসফান্দিয়ার ও রুস্তমের কাহিনীতে দেখা যায় রুস্তম যুদ্ধে না নামার জন্য ইসফান্দিয়ারকে বহু বার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু ইসফান্দিয়ার তাতে কর্ণপাত করে নি। রুস্তম যখন শেষ মুহূর্তে ইসফান্দিয়ারের চোখ লক্ষ্য করে (সিমোরগের দেয়া গাছের ডাল দিয়ে তৈরি-করা বিশেষ) তীর নিক্ষেপ করেন, তখনও তিনি প্রভুকে সাক্ষী রেখে বলেন যে, এ হামলা ছিল অনিচ্ছাকৃত। রুস্তম ইসফান্দিয়ারের মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করেছিলেন। দূর্ধর্ষ ইসফান্দিয়ারের চোখ ছাড়া সমস্ত দেহই ছিল দূর্ভেদ্য।

শাহনামার বক্তব্য অনুযায়ী ইরানীরা অন্যের দেশ দখল ও তাদের সম্পদ লুটের জন্য যুদ্ধ করে নি, বা যুদ্ধের মাধ্যমে অন্যদের ওপর নিজের ধর্ম চাপিয়ে দিতে চায় নি। শাহনামা চেঙ্গিজ-নামা, তৈমুর-নামা বা ইস্কান্দার-নামা তথা আলেক্সান্ডারের বিজয়-অভিযানের কাহিনী নয়, যারা ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিজিত অঞ্চলে চালিয়েছিল ব্যাপক লুট-পাট ও হত্যাযজ্ঞ। বরং শাহনামা বিজাতীয় ও অশুভ শক্তির মোকাবেলায় ইরানীদের দৃপ্ত-প্রতিরোধ, বিজয় এবং বীরত্ব-গাঁথার সমাহার। মোটকথা, ইরানীদের যুদ্ধগুলোর উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠা।

পুরো শাহনামার বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরানীরা সব সময়ই শান্তির জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং শত্রুরা হামলা না করা পর্যন্ত তারা যুদ্ধ শুরু করে নি কখনও। এ ছাড়াও তারা আত্ম-সমর্পনকারী শত্রুর ওপর কখনও নির্যাতন চালায় নি। পরাজিত শত্রু বা বন্দী এবং তাদের পরিবার-পরিজন ও শিশু সন্তানদের সাথে দূর্ব্যবহার করে নি, বরং তাদের নিরাপত্তা দিয়েছে। এমনকি নিহত শত্রুদের দাফন-কাফন করেছে সসম্মানে এবং শত্রুদের শহর বা গ্রামগুলোও ধ্বংস করে নি।

ইরানী সম্রাট “কায়খসরু” “গুদরাজ”কে একটি যুদ্ধে পাঠানোর সময় যুদ্ধের এসব নিয়ম তথা মানব-প্রেম ও মানবীয় রীতিগুলো মেনে চলার উপদেশ দিয়েছিলেন। এমনকি প্রাচীন ইরানের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘকালের শত্রু তুরানী বা তুর্কীদের সাথে যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এইসব নীতি মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন কায়খসরু। এ প্রসঙ্গে শাহনামায় এসেছেঃ

 

نگرداني ايوان آباد پست / نگر تا نيازي به بيداد دست
برانديش از دوده و نام و ننگ / به کردار بد هيچ مگشاي چنگ
چنان ساز کز تو نبيند زيان / کسي کو به جنگت نبندد ميان
….. ز يزدان نيکي دهش ياد کن / به هر کار با هر کسي داد کن
دل از جنگ جستن پشيمان کند / ز ترکان هر آنکس که فرمان کند
مباشيد کس را به بد رهنمون / مسازيد جنگ و مريزيد خون
دل کينه دارش نيايد به راه / وگر جنگ جويد کسي با سپاه
به هر جاي تاراج و آويختن / شما را حلال است خون ريختن

শাহনামা একটি মানবীয় বীরত্ব-গাঁথা। ফেরদৌসীর সমস্ত মান-প্রাণ ছিল মানবীয় কোমল ও উচ্চাঙ্গের অনুভূতিতে টইটুম্বুর। ব্যথিত ও মজলুমের জন্য তার হৃদয় সব সময়ই ভারাক্রান্ত ছিল। মাতৃহীন অসহায় শিশু, আশ্রয়হীন বন্দী, ঋণগ্রস্ত সভ্রান্ত ব্যক্তি এবং অন্যদের কাছে নিজের দারিদ্র ঢেকে রাখতে অভ্যস্ত দরিদ্র বৃদ্ধ লোকদের জন্য তার প্রাণ সব সময়ই ছিল দলিত ও বিগলিত।

ফেরদৌসী তার পছন্দের বীর নায়ক বা পাহলোয়ানের দুঃখে দুঃখিত হন এবং তারা যদি অপছন্দনীয় বা অপ্রত্যাশিত কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য হন তাহলে ক্ষুব্ধ হন। রুস্তম ও সোহরাবের ট্র্যাজেডীতে রুস্তম যখন নিজের পুত্রের সাথে যুদ্ধ করেন এবং পুত্র নিহত হবার পর যখন জানতে পারেন যে এই বীর যুবক ছিল তারই পুত্র তখন ফেরদৌসীও ক্ষোভে ও দুঃখে আপ্লুত হন। এই ট্র্যাজেডীতে রুস্তম যে যারপরনাই নিজের ওপর ক্ষুব্ধ হন তাও উল্লেখ করতে ভুলেন নি ফেরদৌসী। সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের স্নেহ যে একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক দায়িত্বের মত সোহরাব-রুস্তমের ট্র্যাজেডীতে তিনি তা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন।

রাষ্ট্র বা দেশ পরিচালনার বিভিন্ন রীতি-নীতি ফেরদৌসীর শাহনামার আরেকটি প্রধান বার্তা। শাহনামায় স্বাধীন ইরানের ইতিহাস ও জাতীয় ঘটনা-প্রবাহ ৫০ টি পর্বে তুলে ধরা হয়েছে এবং এই ৫০ টি পর্বে প্রথম ইরানী রাজা কিউমার্স থেকে শুরু করে ইসলাম-পূর্ব যুগের শেষ ইরানী সম্রাট ইয়াজদেগার্দের কাহিনী স্থান পেয়েছে। অবশ্য এই পর্বগুলোর আকার সমান নয়। যেমন, শাহনামায় ইরানের ছয়জন বড় সম্রাট কায়কাভুস, কায়খসরু, গাশতাসভ, বাহরাম গুর, আনুশিরওয়ান এবং খসরু পারভেজের শাসনামলে সংঘটিত কাহিনীগুলোর বর্ণনা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ। ফেরদৌসীর শাহনামাকে অনেকেই রাজা-বাদশাহদের প্রশস্তি বা গুণ-কীর্তণের কাব্য মনে করেন। কিন্তু তা ঠিক নয়, আসলে এ কাব্যে ইরানের ইতিহাস তুলে ধরার জন্যই রাজা-বাদশাহদের কাহিনী স্থান পেয়েছে এবং জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মহান গুণাবলী, ইরানী জাতি ও ইরানের প্রশংসাই শাহনামার উপজীব্য। শাহনামার কাহিনীতে দেখা যায় রাজা-বাদশাহরা দেশ শাসন করলেও দেশের সব ক্ষমতাই তাদের হাতে নেই। শাহনামা জনকল্যাণ ও সমাজ পরিচালনার রীতি-নীতি বিষয়ে ফেরদৌসীর সূক্ষ্ম দৃষ্টি এবং অপূর্ব বিশ্লেষণী ক্ষমতারও স্বাক্ষর।

ফেরদৌসীর শাহনামায় বর্ণিত ৫০ জন রাজা-বাদশাহর মধ্যে কেউ কেউ ভালো এবং কেউ কেউ ছিলেন মন্দ প্রকৃতির মানুষ। ফেরদৌসী ভালো রাজা-বাদশাহদের প্রশংসা করেছেন, আর সমালোচনার চাবুক মেরেছেন খারাপ শাসকদের ওপর। ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে ভালো রাজা-বাদশাহরা মহান আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠাসহ দেশের সমৃদ্ধি ও জনকল্যাণে সচেষ্ট থাকেন। আর খারাপ রাজা-বাদশাহরা অশুভ বা শয়তানি শক্তির কূমন্ত্রণায় প্রভাবিত হয়ে রাজকীয় সম্মান ও জনসমর্থন হারিয়ে ফেলেন। ফেরিদুন, কায়খসরু, বাহরাম গুর ও আনুশিরওয়ান শাহনামায় উল্লেখিত কয়েকজন ভালো রাজা বা সম্রাটের দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে যাহহাক, কায়কাভুস, গাসতাসব, হরমুজ ও শিরোয়ে এ মহাকাব্যে উল্লেখিত কয়েকজন মন্দ শাসক বা রাজার উদাহরণ। ফেরদৌসী শাহনামায় ফেরিদুনের রাষ্ট্রনীতির প্রশংসা করেছেন এবং দান-দাক্ষিণ্য ও ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্যরাও তার মত মহৎ হতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি শাহনামায় বলেছেন,
فريدون فرخ فرشته نبود
به مشک و به عنبر سرشته نبود
به داد و دهش يافت اين نيکويي
تو داد و دهش کن فريدون تويي

অর্থাৎ ,
নয় ফেরেশতা বা দেবদূত সৌভাগ্যের বরপুত্র সুস্মিত ফেরিদুন
নয় সে মোশক্ ও আম্বরে সুবাসিত,
মহত্ত্বের উৎস তার দয়া আর ন্যায়ে আপ্লুত,
দয়ালু ও ন্যায়কামী হলে তুমিও হবে ফেরিদুন।

ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে ভালো শাসক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তাকে অবশ্যই জ্ঞানী, দয়ালু ও ন্যায়পরায়ন হতে হবে এবং মিথ্যাচার, অবিচার ও জুলুম পরিহার করতে হবে। তার মতে, শাসকের সবচেয়ে বড় জুলুম হল, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা। বিজ্ঞ ও জ্ঞানী সম্রাট কায়খসরুর শাসনামলে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল কারাদন্ড। কায়খসরুর মত জনদরদী ও ন্যায়পরায়ন শাসক শাহনামায় প্রশংসিত হয়েছেন এবং কায়কাভুসের মত শাসক নিন্দিত হয়েছে তার নিবুর্দ্ধিতার জন্য। নির্বুদ্ধিতার কারণে শাসক ও তার কর্মকর্তারা যখন অন্যায়-অবিচারে লিপ্ত হন তখনই তাদের ক্ষমতা বৈধতা হারায় এবং মহান আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়ে তারা জনপ্রিয়তা ও মর্যাদা হারান। ফেরদৌসী যাহহাকের গল্পে এটা দেখিয়েছেন, সে বহু যুবককে নিজের সাপের খাদ্যে পরিণত করলেও শেষ পর্যন্ত এটা বুঝতে পারে যে জনগণের সহায়তা ছাড়া শাসন-পরিচালনা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সে জনগণকে তার প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য করতে চাইলে কাভে নামক কর্মকারের নেতৃত্বে সূচিত গণ-বিদ্রোহে নিহত হয়।

ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে রাজা-বাদশাহদের অন্ধ-আনুগত্য করা ঠিক নয়। গাশতাসব রুস্তমকে গ্রেপ্তার করে তাকে দরবারে নিয়ে আসার জন্য ইসফান্দিয়ারকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু গাশতাসবের রাজদরবারেও রুস্তম ভীত হন নি, বরং অত্যাচারী রাজাদের হত্যা করাকে নিজের ও নিজ পূর্বপুরুষদের জন্য গৌরবের বিষয় বলে মন্তব্য করেন। ফেরদৌসীর মতে, শাসকের ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার জুলুম ও ধ্বংস ডেকে আনে। কায়খসরুর মুখ দিয়েই তিনি একথা বলেছেন। তার দৃষ্টিতে কায়খসরু ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। ন্যায়বিচার, দূরদর্শীতা ও বিজ্ঞতাসহ একজন ভালো শাসকের সব গুণ তার মধ্যে ছিল। ফেরদৌসী স্বেচ্ছাচারিতা বা আত্মস্বার্থকেন্দ্রীকতা দূর করার জন্য ক্ষমতা ভাগ করে দেয়ার কথা বলেছেন। শাহনামাতে দেখা যায় পাহলোয়ান ও জরাথ্রুস্ত পুরোহিতরা ছিলেন সমস্ত ইরানী রাজাদের ক্ষমতার অন্যতম শরীক। রাজা জনগণের ইহকালীন কল্যাণে ও পুরোহিতরা পারলৌকিক কল্যাণের দিক-নির্দেশনায় লিপ্ত ছিলেন।

কাভেহ, যাল ও রুস্তমের মত পাহলোয়ানরা ইরানীদের জাতীয় চেতনার প্রতীক বা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিজাতীয়দের হামলা ও শাসকদের অন্যায় তৎপরতা প্রতিহত করতেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে যাহহাকের বিরুদ্ধে কাভেহর নেতৃত্বে গণ-বিদ্রোহ, কায়কাভুসের প্রতি গুদার্জের সতর্কবাণী, কায়খসরুর প্রতি যালের উপদেশ এবং কাভুস ও ইস্ফান্দিয়ারের বিরুদ্ধে রুস্তমের প্রতিরোধের কথা বলা যায়।
শাহনামার আরেকটি বড় শিক্ষা হল, স্বেচ্ছাচারীতার পরিণতি ভাল হয় না। শাহনামায় দেখা যায়, প্রথম দিকে জামশিদ ছিলেন একজন যোগ্য ও ভালো শাসক। তিনি ইরানে জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ, প্রথা ও পেশার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা ও শক্তির মোহ নওরোজ উৎসবের প্রবর্তক জামশিদকে পথভ্রষ্ট করে এবং এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে খোদা বলে দাবী করে বসেন ও জনগণের সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। জামশিদের গভর্নর বা সেনাপতি সর্পযুক্ত কাঁধ-বিশিষ্ট “যাহহাক” ইরানীদের ওপর কর্তৃত্ব করতে থাকে।

 

অনেকেই মনে করেন সামানীয় ও গযনভী শাসনামলের অনুকূল সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতার কারণেই ফেরদৌসী শাহনামার মত অমর কাব্য রচনা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হল, হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসীর অসাধারণ প্রতিভার স্পর্শ ছাড়া শাহনামা হত কেবল অতি সাধারণ এক কাব্য অথবা ইরানী ঐতিহ্যের ইতিহাস সম্পর্কিত একটি নিষ্প্রাণ বই। এ অবস্থায় এ কাব্য এখন পর্যন্ত টিকে থাকা তো দূরের কথা, বরং বহু আগেই আবু মানসুরের শাহনামার মতই পুরোপুরি বিলুপ্ত হত অথবা এর সামান্য কিছু অংশ টিকে থাকত। জাতীয় ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এ বই ইরানীদের আবেগকে মোটেই উদ্বেলিত করত না এবং ফার্সী ভাষাকে ইরানীদের জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও কোনো ভূমিকা রাখতে পারত না ।

ফেরদৌসীর শাহনামার সর্বত্র জাতীয় জাগরণের আহ্বান এবং একইসাথে শাহনামার সর্বত্র এই মহাকবির কাব্য-প্রতিভার দিপ্তী ও ঔজ্জ্বল্যের চড়াই উৎরাইও স্পষ্ট। বিশেষ করে, পাহলোয়ানদের বীরত্ব-গাঁথা তুলে ধরার সময় তার সৃষ্টিশীলতা চরম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তার এই অনন্য সৃষ্টিশীলতাই শাহনামাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বীরত্ব-গাঁথায় পরিণত করেছে এবং একই কারণে এ মহাকাব্য পরিণত হয়েছে ইরানী ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করার এক মোক্ষম চালিকাশক্তিতে।
অন্যদিকে ফেরদৌসীর শাহনামার সর্বত্র বিষয়বস্তুর অভিন্নতা ও আদর্শিক ঐকতান রক্ষা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষ্য, প্রাণস্পর্শী উপদেশ ও শিক্ষামূলক কাহিনী তুলে ধরার পাশাপাশি বীরত্ব গাঁথা এবং জাতীয় জাগরণের উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে শাহনামার সর্বত্র বিষয়বস্তুর অভিন্নতা বা মূল সুর ও আদর্শিক ঐকতান অত্যন্ত জোরালোভাবে রক্ষা করেছেন মহাকবি ফেরদৌসী।

ফেরদৌসীর শাহনামা ছিল নিকট অতীতেও ইরানের জাতীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে গণমুখী প্রকাশ। ইরানের অন্যতম প্রধান কবি শেখ সাদীর সাহিত্য-কর্ম, বিশেষ করে তার রচিত “গোলেস্তান” কাব্যটি কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিত মহলে বেশী সমাদৃত এবং মাওলানা রূমির “মসনাভী” ও হাফিজের কবিতা সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু ফেরদৌসীর শাহনামা, বিশেষ করে এ কাব্যের পাহলোয়ান-প্রশস্তির অংশগুলো ইরানের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে, এমনকি নিরক্ষর ইরানীদের কাছেও অত্যন্ত সমাদৃত এবং তাদের জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম উদ্দীপ্ত করার অব্যর্থ মহৌষধ।
ফেরদৌসীর শাহনামা ইরানীদের জাতীয় পরিচিতি, গৌরবময় ঐতিহ্য এবং ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি ইরান অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐকতান রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ফেরদৌসীর স্বর্গীয় কাব্য শাহনামা ছিল তৎকালীন সামানীয় ও গজনভী শাসনামলের অন্য সাহিত্যকর্মগুলোর চেয়ে অনেক বেশী উন্নত ও সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। সে যুগের সাহিত্য-অঙ্গনে ফেরদৌসী ও শাহনামার আবির্ভাব ছিল ধুমকেতুর মত আকস্মিক, তবে অপ্রত্যাশিত নয়। ফেরদৌসী ও শাহনামা ছিল এমন এক ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নির আকস্মিক আত্মপ্রকাশের মত কিংবা এমন এক আগ্নেয়গির ঘুমন্ত লাভার মহা-বিস্ফোরণের মত যার প্রলয়ংকরী অভ্যুত্থানে অন্য সব কিছু ম্লান হয়ে যায় এবং যুগ-যুগান্তের সঞ্চিত বেদনা, গ্লানি ও ক্ষোভ-দুঃখ বিমোচিত হয়ে গোটা জাতি আবারও সবক্ষেত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ইরানী জাতি নব জাগরণ ও গণ-জাগরণের এমন এক সোনার জিয়ন-কাঠির জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল। তাই শাহনামা ইরানী সমাজে সৃষ্টি করেছিল অভূতপূর্ব সাড়া এবং আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন মহাকবি ফেরদৌসী। যতই দিন যেতে থাকে ততই ফেরদৌসী ও শাহনামার জনপ্রিয়তা ইরানে বাড়তে থাকে। ফেরদৌসী ও শাহনামা বিষয়ে বিখ্যাত গবেষক অধ্যাপক মানুচেহের মূর্তাযাভীর মতে ইরানের সাংস্কৃতিক জাগরণে শাহনামা ব্যাপক অবদান রেখেছে। ফেরদৌসী নিজেও নিজ অবদানের মূল্য ও গুরুত্ব বুঝতেন এবং এ জন্যই তিনি অবলীলায় বলতে পেরেছেনঃ « عجم زنده کردم بدين پارسي »-ফার্সী বা পারসিক ভাষার মাধ্যমে আমি ইরানকে জীবিত করেছি।

ইরানী জাতির সংস্কৃতির দর্পন হিসেবে ফেরদৌসীর শাহনামা ইরানীদেরকে নিজ গৌরব ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচতেন করে তোলে। গত এক হাজার বছরেও বিদেশীদের বহু আক্রমণ ও দেশের ভেতরের নানা সংকটে ফেরদৌসীর শাহনামা মুক্তির দিশারী হিসেবে ইরানী জাতিকে শক্তি যুগিয়েছে। শাহনামার এই শক্তি আজো অম্লান। ইরানের গৌরবময় প্রাচীন ইতিহাস এবং প্রাচীন ইরানী সম্রাট ও বীরদের নামও শাহনামার সুবাদে ইরানী গণ-সংস্কৃতি ও গণ-মানসে স্থায়ী আসন করে নিতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের সুবিস্তৃত, বিচিত্রময় ও সমৃদ্ধ ভূখন্ড যুগে যুগে নানা জাতির হামলার শিকার হয়েছে। আর্য জাতিসহ অনেক জাতি বা গোত্র এ দেশে এসে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছে। এভাবে ইরানী জাতির সাথে তাদের মিশ্রণে নতুন ইরানী সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফেরদৌসীর শাহনামা এই নবগঠিত ইরানী জাতির বিভিন্ন অংশ তথা নতুন ও পুরনো ইরানী জাতির মধ্যে ঐক্যের সাংস্কৃতিক সেতু-বন্ধন হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।

শাহনামায় একদিকে যেমন ইসলাম-পূর্ব যুগের ইরানী সুশাসক ও জনদরদী সম্রাট এবং বীরদের বিভিন্ন মানবিক বা ভালো গুণের প্রশংসা রয়েছে। তেমনি আবুল কাসেম ফেরদৌসী ইরানের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ইরানীদের নতুন ধর্ম তথা মহান ইসলাম ধর্মের পবিত্র নীতিমালার সাথেও সম্পর্কিত বা সংযুক্ত করেছেন। শাহনামার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ইরানী সংস্কৃতি ইরানের বিভিন্ন গোত্র ও জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যে সহমর্মিতা, সংহতি এবং ঐক্য সৃষ্টিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে। বিজাতীয়দের হামলার ফলে তাদের বিভিন্ন রূপকথা ইরানে প্রচলিত হয়ে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও ইরানী সংস্কৃতি এবং ফার্সী ভাষার স্থান দখল করতে পারত। বিজিত জাতির ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে মধ্য এশিয়ায়, পূর্ব রোম ও মার্কিন আদিবাসীদের ক্ষেত্রে। ফেরদৌসীর শাহনামা ইরানে এই বিপদ দূর করেছে। রাশিয়ার বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ “বার্টেলস”‌-‌’র মতে, “যত দিন বিশ্বে ইরানী ভাবধারা বজায় থাকবে ততদিন দেশটির মহান কবির গৌরবময় নামও অমর হয়ে থাকবে। এই ইরানী কবি দেশের প্রতি নিজের সমস্ত ভালবাসা উজাড় করে দিয়েছিলেন। ফেরদৌসী শাহনামা রচনা করেছিলেন নিজ হৃদয়ের রক্ত দিয়ে এবং এরই প্রতিদানে জাতির চিরস্থায়ী ভালবাসা ও সম্মান অর্জন করেছেন।”

ফেরদৌসীর শাহনামা এক হাজার বছর ধরে ইরানের কাব্য-আকাশকে প্রদীপ্তমান ও প্রজ্জ্বোল করে রেখেছে। ফেরদৌসী তার এই অমর কাব্য রচনা শেষ করেছিলেন সুলতান মাহমুদ গযনভীর শাসনামলে। দুঃখজনকভাবে শাহনামা গযনভী ও সেলযুকদের শাসনামলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শত্রুতা বা বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হয়। ফলে পরবর্তীকালে এর আদি ও নির্ভরযোগ্য কপি সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবশ্য শাহনামা জনগণের কাছে খুবই সমাদৃত হয়। বিভিন্ন সমাবেশে জনগণের কাছে শাহনামার গল্পগুলো যারা আবৃত্তি করতেন তারাই এ মহাকাব্যের বিভিন্ন কপি লিখে নিতেন। এ প্রসঙ্গে ইরানের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক আমিন রিয়াহী বলেছেন, গত এক হাজার বছরে শাহনামা অন্য যে কোনো ফার্সী বইয়ের চেয়ে বেশী পঠিত হয়েছে। এইসব কবিতা হস্তান্তরিত হয়েছে হাতে হাতে ও মুখে মুখে। তাই গযনভী শাসকদের যুগে হাতে লিখিত অন্য যে কোনো বইয়ের চেয়ে ফেরদৌসীর শাহনামার কপির সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী টিকে আছে। ফেরদৌসীর শাহনামা অতিরিক্ত গণমুখী ও জনপ্রিয় হবার কারণেই এর কপি বা অনুলিপিগুলোতে দেখা দিয়েছে নানা বিকৃতি বা পরিবর্তন।
ফেরদৌসীর শাহনামার সন তারিখযুক্ত ও সন-তারিখবিহীন কপির সংখ্যা এক হাজারেরও বেশী। বিভিন্ন শতকে হাতে লেখা এসব শাহনামার অনুলিপিকাররা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মূল কাব্যের সাথে অনেক কিছু যোগ-বিয়োগ করেছেন।
শাহনামার এসব অনুলিপি ফেরদৌসীর যুগ থেকে যত বেশী পরে লেখা হয়েছে সেগুলো ততই বেশী ভুল-ত্রুটিপূর্ণ এবং কম নির্ভরযোগ্য। অনুলিপিকাররা অনেক সময় কঠিন বা অপ্রচলিত ও পুরনো শব্দ বা দূর্বোধ্য কোনো পংক্তি বাদ দিয়ে নতুন এবং প্রচলিত শব্দ ও নিজস্ব পংক্তি ব্যবহার করেছেন। আবার কোনো কোনো অনুলিপিকার কখনওবা স্মৃতি-বিভ্রাটের কারণে বা ভুলবশতঃ কিংবা কখনও ফেরদৌসীর কোনো একটি বক্তব্য বা গল্পকে অসমাপ্ত মনে করে কিছু নিজস্ব পংক্তি যোগ করেছেন শাহনামার সাথে।

শাহনামার সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ সোহরাব ও রুস্তমের কাহিনীতেই সবচেয়ে বেশী বিকৃতি ঘটেছে। ফেরদৌসীকে শাহনামার প্রত্যেক পংক্তির জন্য একটি করে প্রতিশ্রুত স্বর্ণমুদ্রা না দিয়ে সুলতান মাহমুদ যে ঐতিহাসিক অবিচার করেছিলেন, ফেরদৌসীর ভক্তরা তা কখনও ভুলতে পারেন নি। এইসব ভক্তকুলের অনেকেই এ ব্যাপারে ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছেন। এসব কবিতা ফেরদৌসীর মূল ব্যঙ্গ কবিতার সাথে যুক্ত হয়েছে। ফলে এসব কপিতে মূল কবিতার অনেকাংশ হ্রাস পেয়েছে।

শাহনামার শেষ এক-তৃতীয়াংশে সাসানীয় সম্রাটদের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। শাহনামার বিভিন্ন কপির এই অংশে বিকৃতি বা পার্থক্য খুব একটা দেখা যায় না। অনুলিপিকাররা ঐতিহাসিক তথ্য-ভিত্তিক এসব পংক্তিতে কাট-ছাট বা কোনো কিছু জুড়ে দেয়ার সাহস করেন নি। অষ্টম হিজরীর কবি ও ইতিহাসবিদ হামদুল্লাহ মাস্তুফি সর্বপ্রথম শাহনামার এসব অসঙ্গতি দূর করাতে এ মহাকাব্য সম্পাদনার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি ছয় বছর ধরে শাহনামার ৫০ টি কপি বিশ্লেষণ করে শাহনামা সম্পাদনা করেন। মূল শাহনামা রচনার সময়কাল ও তার সম্পাদিত শাহনামা প্রকাশের ব্যবধান তিনশ বছর। হামদুল্লাহ মাস্তুফির যাচাইকৃত শাহনামার কপিগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই ও পুরনো শাহনামার আসল কপিটিও ছিল।
দ্বিতীয়বারের মত শাহনামা সম্পাদনা করা হয় ৮২৯ হিজরীতে তৈমুর লংয়ের নাতী বাইসানগারের নির্দেশে। অনেকগুলো হস্তলিখিত কপি যাচাই করে এই সম্পাদিত শাহনামা প্রকাশ করা হয়। শাহনামার এই কপির অনুলিখন করেছিলেন জাফর বাইসানগারী নামের একজন অনুলিপিকার। শাহনামার এই সংস্করণের মূল কপি এখনও টীকে আছে।

বাইসানগারের এ শাহনামার ভূমিকা ছাড়া মূল কাব্যের কবিতাগুলোকে খুব একটা নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় না। কারণ, বাইসানগারের শাহনামার সম্পাদকরা সম্পাদনার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি বা এ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন না। শাহনামার এই কপির ভূমিকায় ফেরদৌসীর জীবনী ও শাহনামা রচনা সম্পর্কিত যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে পরবর্তীকালে ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ শাহনামায় সেসব তথ্যই ব্যবহার করা হয়েছে। সুন্দর হাতের লেখা, ছবি ও সাজ-সজ্জা এই কপির কিছু আকর্ষণীয় দিক।
ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা ভারতে আসার পর ভারতীয়দের সংস্কৃতি ও জনগণের মানসিকতা বোঝার জন্য ফেরদৌসীর শাহনামার বিশুদ্ধতর সংস্করণ প্রকাশ এবং শাহনামার বিষয়বস্তু সম্পর্কে গবেষণার উদ্যোগ নেয়। ভারতে ফার্সী ছিল রাষ্ট্র-ভাষা ও শিক্ষিত সমাজের ভাষা। এখানে শাহনামা ছিল খুবই জনপ্রিয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নির্দেশে কোলকাতায় ফার্সী ভাষার শিক্ষক মসিও ল্যামসডন শাহনামার সম্পাদনার কাজ শুরু করেন। তিনি এ কাজে ফার্সী ভাষায় অভিজ্ঞ কয়েকজন ভারতীয় ব্যক্তির সাহায্য নেন। শাহনামার ২৭ টি কপি যাচাই করে কোলকাতা থেকে ১৮১১ সালে ল্যামসডনের সম্পাদিত ফেরদৌসীর শাহনামার প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয়।
১৮২৯ সালে ইংরেজ কর্মকর্তা টার্নার ম্যাকানের সম্পাদনায় শাহনামার ফার্সী ভূমিকাসহ এর সবগুলো কবিতা নিয়ে চার খন্ডের পুরো শাহনামা কাব্য কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। শাহনামার এই সংস্করণকে সে যুগে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করা হত। পরবর্তীকালে এই সংস্করণের ভিত্তিতেই ইরান ও ভারতে পাথরের তৈরি হরফের বা লিথোগ্রাফিক ছাপাখানায় শাহনামার অনেক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
১৮৩৬ সালে জার্মান বংশদ্ভুত ফরাসী নাগরিক জুল মোল তৎকালীন ফরাসী সম্রাটের সহায়তায় শাহনামা সম্পাদনা ও ছাপানোর উদ্যোগ নেন। তিনি ১৮৩৮ থেকে ১৮৭৮ সাল অর্থাৎ চল্লিশ বছর ধরে শাহনামার ৩৫ টি হস্তলিখিত কপি থেকে যাচাই-বাছাই করে শাহনামা সম্পাদনা করেন। ফরাসী সরকারের ছাপাখানা থেকে তার সম্পাদিত ফেরদৌসীর শাহনামা সাতখন্ডে প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন সময়ে মুদ্রিত এ শাহনামার ছাপার কাগজ, মুদ্রণের মান ও হরফের সৌন্দর্য্য ছিল অসাধারণ। জুল মোলের এ শাহনামার এক পৃষ্ঠায় ছিল মূল ফার্সী টেক্সট এবং অন্য পৃষ্ঠায় ছিল ফরাসী অনুবাদ। এ অনুবাদের ভিত্তিতেই ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ উলফ ফেরদৌসীর শাহনামার অভিধান রচনা করেছিলেন।
কোলকাতা ও প্যারিস থেকে প্রকাশিত শাহনামার ভিত্তিতে হল্যান্ডর ওভলার্স শাহনামা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তিনি এ কাজ শেষ করতে পারেন নি। ১৮৭৭ ও ১৮৭৯ সালে লিডেনে ওভলার্স’র শাহনামা দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়। তার ছাত্র ল্যান্ডওয়ের ১৮৮৪ সালে এ শাহনামার তৃতীয় খন্ড প্রকাশ করেন। মস্কোয় প্রাচ্য পরিচিতি সংস্থার উদ্যোগে শাহনামা নয় খন্ডে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ থেকে ১৯৭১ সালে। প্রথমে এর সম্পাদক ছিলেন রুশ বিশেষজ্ঞ বার্টেলস। তার মৃত্যুর পর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন আবদুল হোসাইন নুশিন।

শাহনামার সম্পাদনা ও ভারত উপমহাদেশসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে শাহনামা চর্চার ধারাবাহিকতায় ফেরদৌসী ও তার অমর কাব্য শাহনামা সম্পর্কে অনেক মূল্যবান গবেষণা হয়েছে। এটা সত্য, দেশী-বিদেশী অনেক গবেষকের এ সংক্রান্ত গবেষণার কোনো কোনোটি এখন আর নির্ভরযোগ্য ও হাল-নাগাদ নয়, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা বা গবেষণা সত্যিই অবিস্মরণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ।
থিওডোর নোল্ডের ইরানের জাতীয় বীরত্ব-গাঁথা শীর্ষক বইয়ের গবেষণামূলক ভূমিকা লিখেছেন জার্মান বংশদ্ভুত ফরাসী নাগরিক জুল মোল। ফেরদৌসী ও তার শাহনামা শীর্ষক বইয়ে অনেক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন সাইয়েদ হাসান তাকীজাদেহ। এইসব প্রবন্ধ পরবর্তীকালে ফেরদৌসী ও তার অমর কাব্য শাহনামা সম্পর্কে আরো ব্যাপক গবেষণার পথ খুলে দেয়। কিন্তু আধুনিক গবেষণার সুবাদে ঐসব প্রবন্ধ বা নিবন্ধের অনেক ভুল-ত্রুটি প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আর তাই সেইসব প্রবন্ধ ও নিবন্ধের গ্রহণযোগ্যতাও হ্রাস পেয়েছে।

১৯৩৫ সালে ফ্রিটস উলফের শাহনামার অভিধান প্রকাশিত হয় জার্মানীর বার্লিনে। তিনি তার পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এ অভিধানের পেছনে। এ অভিধানে প্রতিটি শব্দের অর্থ ব্যবহারসহ দেখানো হয়েছে। কিন্তু শাহনামার এ ধরনের অভিধান তখনই পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠবে যখন এর পংক্তি বা লাইনগুলো যথাযথভাবে সম্পাদিত হবে। বর্তমান যুগে এ জন্যে বড় ধরনের কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেমন, ইরানী গবেষক ডক্টর মীর জালাল উদ্দিন কাজ্জাজী এ লক্ষ্যেই লিখেছেন, প্রাচীন চিঠি বা ন’মেহ বস্তান শীর্ষক বই। এ বইয়ে তিনি শব্দের অর্থ তুলে ধরার পাশাপাশি প্রাচীন রূপকথাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন এবং প্রতিটি পংক্তির নান্দনিক দিকগুলোও উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও এ গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ের জন্য মীর জালাল উদ্দিনের লেখা ভূমিকাগুলোও শাহনামা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে সহায়তা করেছে।

আধুনিক যুগে শাহনামা সম্পাদনার সবচেয়ে বড় কাজটি করেছেন ইরানী গবেষক ডক্টর জালাল উদ্দিন খালেক্বী মোত্বলাক্ব। তার সম্পাদিত দশ-খন্ডের শাহনামাটি প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে ফার্সী ১৩৮৭ সালে। ইসলামী বিশ্বকোষ কেন্দ্র ছাপিয়েছে এই শাহনামা। সবচেয়ে বিশুদ্ধ শাহনামা উপহার দেয়ার জন্য ডক্টর খালেক্বী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরী থেকে শাহনামার ৪৫ টি প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য কপি সংগ্রহ করে সেগুলোর ছবি এবং মাইক্রোফিল্ম তৈরি করেছেন। তিনি ৬১৪ হিজরীতে সম্পাদিত ফ্লোরেন্সের শাহনামার ভিত্তিতে এর সম্পাদনা সংক্রান্ত সমালোচনা উপহার দেন। জনাব খালেক্বী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কেবলমাত্র শাহনামার প্রামাণ্য প্রাচীন কপিগুলো সংগ্রহ ও সেগুলো বাছাইয়ের পেছনে দশ বছর সময় ব্যয় করেন। শাহনামার ৪৫ টি কপি থেকে তিনি বেছে নেন অধিকতর নির্ভরযোগ্য ১৬ টি কপি। এসব কপির মধ্যে যেসব পার্থক্য দেখা যায় সে বিষয়ে জনাব খালেক্বী প্রামাণ্য মতামত দিয়েছেন।
ডক্টর জালাল উদ্দিন খালেক্বী মোত্বলাক্ব হিজরী নবম শতক পর্যন্ত লিখিত শাহনামার আরো ত্রিশটি কপি সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন ও প্রয়োজনে সেসব কপি থেকেও দলিল-প্রমান তুলে ধরেছেন। তবে তিনিও তার সম্পাদনাকৃত শাহনামাকে চূড়ান্ত বা বিশুদ্ধতম সম্পাদনা বলে দাবী করেন নি। ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য তার সম্পাদিত এ শাহনামা একটি আকর-গ্রন্থ হিসেবে কাজে লাগবে বলে জনাব খালেক্বী আশা প্রকাশ করেছেন। সমালোচকদের মতামতের ভিত্তিতে তিনি অধিকতর সংশোধিত শাহনামা প্রকাশ করতে আগ্রহী বলে জানান।
ফেরদৌসীর শাহনামা নিয়ে আধুনিক যুগে যেসব গবেষণা হচ্ছে তাতে শাহনামার পরিচিতি আরো স্পষ্ট, প্রামাণ্য ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। গত ৫০ বছরে শাহনামা নিয়ে যেসব কাজ বা গবেষণা হয়েছে তাতে ফেরদৌসীর জীবনী ও তার জীবনের নানা দিক সম্পর্কে অনেক কল্পনা বা রূপকথার অবসান ঘটেছে।
শাহনামা সংক্রান্ত গবেষণার একটি বড় ভিত্তি হল, এ সংক্রান্ত অভিধান রচনা। গত ত্রিশ বছরে এ সংক্রান্ত নানা গবেষণা ও লেখালেখির সুবাদে শাহনামার অভিধানিক জটিলতা অনেকটাই কমেছে। এক্ষেত্রে দর্শনীয় অবদান রেখেছেন ইরানী গবেষক ডক্টর জালাল উদ্দিন খালেক্বী মোত্বলাক্ব, ডক্টর মাহইয়ার নাওয়ায়ী এবং ডক্টর আলী রাওয়াক্বী। শেষোক্ত গবেষক এ ব্যাপারে ফেরদৌসীর লেখা অজানা শব্দ-ভান্ডার শীর্ষক একটি চমৎকার বই লিখেছেন।

শাহনামা সংক্রান্ত প্রাথমিক গবেষণাগুলোতে ঐতিহাসিক, সাহিত্য-শৈলী, অভিধান ও ব্যাকরণ সংক্রান্ত দিক গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেরদৌসীর চিন্তাধারা ও শিল্প-নৈপুন্য নিয়ে অনেক সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ দেখা যায়। যেমন, শাহনামায় উল্লেখিত রুস্তম ও ইস্ফান্দিয়ার সংক্রান্ত গল্পের ব্যাপারে অনেক নতুন ও মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গির কথা উঠে আসছে।

ফেরদৌসীর চিন্তাধারা ও শিল্প-নৈপুন্য নিয়ে আধুনিক যুগে লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের তালিকায় শীর্ষস্থান পাবার মত বইটির নাম “ফেরদৌসী”। এর লেখক ডক্টর মোহাম্মাদ আমিন রিয়াহী। আমাদের এই ধারাবাহিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উৎসও হচ্ছে এই বই। এ বইয়ে রয়েছে ১৪ টি অধ্যায়। কথিত জনশ্রুতি বা রূপকথার ওপর নির্ভর না করে তিনি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে ফেরদৌসী ও তার সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ইরানী লেখক ডক্টর মোহাম্মাদ আমিন রিয়াহী খুবই প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভাষায় এ বই লিখেছেন। ডক্টর শাফিয়ীর মতে, এ বই ছাড়া শাহনামা সংক্রান্ত গবেষণার অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে এবং শাহনামা ও ফেরদৌসীর ভক্ত বা প্রেমিকদের জন্য কেবল এ বই ও একমাত্র এ বই পাঠই যথেষ্ট হতে পারে।

গত এক হাজার বছর ধরে অনন্য শিল্পকর্ম ও কালোত্তীর্ণ কাব্য হিসেবে দেশে দেশে শাহনামার চর্চা এবং এ নিয়ে গবেষণা চলছে অদম্য উৎসাহে। গত কয়েক সপ্তার আলোচনায় আমরা ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফেরদৌসী ও শাহনামা-চর্চা সম্পর্কে কথা বলেছি। আজ আমরা ইরানের জননন্দিত কিংবদন্তী বা রূপকথা ও বীরত্ব-গাঁথা এবং এসবের চর্চা সম্পর্কে আলোচনা করব।

মানব জাতি ছিল আদিতে একই জাতি। পরে তাদের বিভিন্ন পরিবার থেকে সৃষ্টি হয়েছে নানা গোত্র । পরবর্তীতে এইসব গোত্রই এক একটি জাতির রূপ নিয়েছে। আর এ জন্যই একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বা জাতিগুলোর রয়েছে অনেক অভিন্ন রূপকথা। সম্ভবতঃ এ কারণেই বাংলাদেশের পল্লীতে প্রচলিত “রাখালের পিঠাগাছ” সম্পর্কিত গল্প কিছুটা পরিবর্তিত রূপে বৃটেনের ওয়েলসের পল্লীতেও শোনা যায়। বাংলায় প্রচলিত রাক্ষস-খোক্কসের গল্পে বলা হয়, হাউ মাউ খাউ মানুষের গন্ধ পাউ। আর বৃটেনে বলা হয়, ফাই ফি ফো ফিউ ফান, আই স্মেল দ্যা ব্লাড অফ অ্যা বৃটিশ ম্যান।
দেশে দেশে প্রচলিত রূপকথাগুলোর মধ্যে মিল আর অমিলের দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্থানীয় পরিবেশ, ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক পার্থক্যের কারণে গল্পের কাঠামোর পাশাপাশি চিন্তাধারায়ও কিছু পার্থক্য দেখা দেয়। কোনো জাতি যখন অন্য অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাদের পুরনো রূপকথাগুলোও স্থানীয় লোকদের প্রথা, রীতি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। ফলে পরবর্তী কিংবদন্তী বা রূপকথাগুলোও ধারণ করে কিছুটা নতুন রং, কিছুটা ভিন্ন স্বাদ ও বৈচিত্র।

নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইরানীরা মূলতঃ আর্য জাতি। ভারতীয় আর্যসহ ভারতের অন্য জাতিগুলোর অতীত রূপকথা বা লোক-কাহিনী, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রীতি ও প্রথাগুলোর সাথে ইরানীদের এসব বিষয় ছিল অভিন্ন। পরে আর্যরা যখন অভিবাসী হিসেবে ইরান ও মেসোপটেমিয়া বা ইরাক অঞ্চলে আসে তখন তাদের ওপর স্থানীয় লোকদের প্রথা, রীতি ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মোহাজির হবার আগে ইরানী গোত্রগুলোর উপকথা ছিল সহজ-সরল ও প্রাকৃতিক কাঠামো-ভিত্তিক। পরবর্তীতে সামাজিক রূপ নেয়া এসব উপকথা বা রূপকথাগুলো পরিবর্তিত হয়ে আরো সমৃদ্ধ হতে থাকে। ইরাক ও ইরান অঞ্চল ছাড়াও দেশ জয়ের সুবাদে ইরানীরা উত্তর আফ্রিকার সংস্কৃতির সাথেও পরিচিত হয়। দেশ জয়, সংঘাত ও নানা জাতির সংস্কৃতি ইরানী রূপকথায় দিয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ইরান ও এ সংলগ্ন অঞ্চলে ইরানীদের আগমন ঘটেছিল খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে। তারা কাস্পিয়ান সাগর ও ভলগা নদীর আশপাশে, বর্তমান ইরান উপত্যকা ও মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। যুগে যুগে বহু জাতি নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ এইসব অঞ্চলে আসা যাওয়া করেছে ও বসতি স্থাপন করেছে। এ অঞ্চলে উত্থান ও পতন ঘটেছে নানা জাতির। এ অঞ্চলে ইরানীরাও আস্বাদন করেছে উত্থান ও পতন। শত-সহস্র বছর ধরে ইরানীরাই ছিল এ অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎপরতার মূল কেন্দ্র-বিন্দু। ধীরে ধীরে ইরানীরা ইরান ও এ সংলগ্ন অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়। সে সময় ইরানীরা যেসব বীরত্বপূর্ণ ও সংগ্রামী বৈশিষ্ট্য অর্জন করে তা তাদের সংস্কৃতি এবং কিংবদন্তীর প্রধান উপকরণে পরিণত হয়।

ইরানী কিংবদন্তীগুলোর স্বকীয়তা সেগুলোর চিন্তাগত ও সামাজিক বিষয়বস্তুতে সমুজ্জ্বল। পারস্যের কিংবদন্তীতে প্রভু বা খোদা বস্তুগত অথবা মূর্তির মত নয়। “আহুরামাজদা” ও “এমেশ’সেফান্দ” বস্তুগত অথবা মূর্তিমান নন। ইরানী রূপকথাগুলোকে বিভিন্ন দিক থেকে কয়েক শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন, পূর্ব ইরানের ও পশ্চিম ইরানের কিংবদন্তী। শাহনামার কিংবদন্তীগুলো মূলতঃ পূর্ব ইরানের। এ অঞ্চলের রূপকথাগুলোর নানা উপাদান ও চরিত্রগুলো বর্ণনামূলক, ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যধর্মী। ফেরদৌসীর শাহনামার অধিকাংশ বিষয়বস্তুই রূপকথামূলক এবং পূর্ব ও উত্তর ইরানের ইতিহাসের অন্ধকার যুগের ঘটনাবলী। আদি ইরানী গোত্রগুলোর সাথে বহিরাগত আক্রমণকারীদের সংঘাত শাহনামায় ইরানী ও তুরানীদের সংঘাত হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইরানে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও রূপকথা রচনার উপযুক্ত প্রেক্ষাপট থাকায় এখানে বীরত্ব-গাঁথা রচনা বা বীরত্ব গাঁথার চর্চা চতুর্থ হিজরীরও অনেক আগে শুরু হয়েছে। ধর্মগ্রন্থ “আভেস্তা”য় স্থানীয় সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে কিংবদন্তীতূল্য কয়েকজন ব্যক্তিত্ব ও কিছু বৈশিষ্ট্যের আভাস দেখা যায়। এরই ভিত্তিতে ঐসব ব্যক্তিত্ব প্রাচীন ইরানের বিশিষ্ট কিংবদন্তীতে পরিণত হন। ফেরদৌসী, ঐতিহ্য ও নব-উদ্ভবন শীর্ষক বইয়ে ডক্টর এবাদিয়ান লিখেছেন,
“ইরানে বীরত্ব-গাঁথা রচনা বা বীরত্ব গাঁথার চর্চা শুরু হয় পার্থিয়ানদের শাসনামলে এবং তা সাসানীয়দের যুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পার্থিয়ানদের যুগে আভেস্তার অংশবিশেষ সংগৃহীত, বিন্যস্ত ও সংকলিত হয়। “ওয়েইস (দরবেশ) ও রমিন” শীর্ষক পদ্য সংকলনটি এ যুগেরই ফসল। সাসানীয় যুগে গদ্যে লেখা গল্পগুলোও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ যুগে রচিত হয়েছে “দিনকারদ”, “খোদায়ীনামেহ”,ও “আর্দেশির ব’বাকানের তৎপরতা” শীর্ষক ধর্মীয় এবং রূপকথামূলক বইসহ “অসুরিক বৃক্ষ” শীর্ষক ছন্দবদ্ধ গল্প। এইসব বইয়ের অধিকাংশই শাহনামার বীরত্ব-গাঁথা ও বিষয়বস্তুর মাল-মশলার যোগান দিয়েছে।”
বিশ্ব-সাহিত্যে ফেরদৌসীর শাহনামার অবস্থান রয়েছে মেসোপটেমিয়া, গ্রীস ও ভারতের রূপকথাগুলোর সারিতে। তবে শাহনামার গল্পগুলোর গুণগত ও পরিমাণগত দিকের সাথে সেগুলোর পার্থক্য রয়েছে। সাসানীয় যুগের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রচিত হয়েছে শাহনামা। এ মহাকাব্য রচনার সময় ইরানে ইসলামী সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছিল। শাহনামা ইরানের অতীত রাজা-বাদশাহ ও বীর বা পাহলোয়ানদের গল্প। এইসব গল্পের কিছু অংশের উৎস ঐতিহাসিক ঘটনা ও কিছু অংশের উৎস কিংবদন্তী। আসলে ফেরদৌসী শাহনামা রচনার মাধ্যমে আদর্শ সম্রাট বা শাসক সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন এবং এর মাধ্যমে যুগের চাহিদা মিটিয়েছেন।

নতুন জীবন শুরু-করা ইরানীরা অতীতের দিকে যে দৃষ্টিতে তাকাতো তারই প্রতিফলন ঘটেছে ফেরদৌসীর শাহনামায়। ইরানীরা অতীতের শিক্ষনীয় ঘটনাগুলোর সাথে গড়ে তুলতে চেয়েছিল স্থায়ী বন্ধন।
শাহনামা বিষয়ক গবেষকদের মতে, ফেরদৌসীর শাহনামা ইরানের অতীত ঐতিহ্যকে কালের কপোলে চিরসমুজ্জ্বল ও চিরশুভ্র করে রাখার সফল প্রচেষ্টা। কারণ, শাহনামা সাহিত্য ও জ্ঞানের এমন এক বিশ্বকোষ যাতে স্থান পেয়েছে অতীতের অভিজ্ঞতা বা ভূয়ো-দর্শন, ইতিহাস এবং স্মরণীয় ও শিক্ষনীয় নানা দিক।

 

সাধারণতঃ রাজা-বাদশাহ, বীর ও পাহলোয়ানরাদের নিয়েই রচিত হয় বীরত্ব-গাঁথা। সমাজের অন্য শ্রেণীর লোকজনের কথা এ ধরনের কাব্যে স্থান পায় ব্যতিক্রম হিসেবে। শাহনামাও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাচীন ইরানের সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসে শীর্ষে ছিল রাজা-বাদশা ও পুরোহিত শ্রেণী, তারপরে ছিল পাহলোয়ান এবং সেনা কর্মকর্তাদের অবস্থান। এরপরে ছিল কৃষক ও শ্রমিক। তাই ফেরদৌসীর শাহনামার মূল আলোচিত চরিত্রে রয়েছে রাজা-বাদশাহ, বীর ও পাহলোয়ান। ক’ভে নামক কর্মকারের উপস্থিতি ছিল এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ঘটনা।
ফেরদৌসীর শাহনামায় উল্লেখিত ইরানী রূপকথা অনুযায়ী কিউমার্স প্রথম মানব। তবে শাহনামায় তাকে প্রথম ইরানী বাদশাহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফেরিদুন, জামশিদ ও কাভুসের মত কোনো কোনো বাদশাহ ইরানীদের পাশাপাশি ভারতীয়দের রূপকথায়ও কিংবদন্তীর পূর্বপুরুষ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

কিউমার্স থেকে ফেরিদুন পর্যন্ত শাহনামায় উল্লেখিত সমস্ত রাজাই মূলতঃ প্রতীকধর্মী। তারা সবাই ইরানী জাতির অশুভ বা দানবীয় শক্তি বিরোধী চেতনার প্রকাশ এবং ন্যায়কামীতার প্রতীক। জনকল্যাণ বা উন্নয়ন এবং শিক্ষায় অবদান এইসব রাজা-বাদশাহদের দুটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য। শাহনামায় উল্লেখিত কিংবদন্তীর সমস্ত রাজাই ধর্মীয় নেতা বা পুরোহিতের ভূমিকাও রেখেছেন। তাদের সবার মধ্যে রয়েছে ঐশী মহত্ত্ব। এইসব রাজার মধ্যে কেবল জামশিদ অহংকারী হয়ে পড়ে এবং নিজেকে অন্য সবার চেয়ে বড় ভাবার রোগে আক্রান্ত হয়। অন্য কথায় দানবীয় শক্তি বা শয়তান তার ওপর কর্তৃত্বশীল হয়। ফলে সে নিজেকে প্রভু বলে দাবী করে এবং ঐশী গুণ ও মহত্ত্ব হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় ইরানীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অনৈক্য এবং জাহহাক নামক জালেম বা দূর্বৃত্ত তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পরে কর্মকার কাভের নেতৃত্বে জাহহাকের জুলুমের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ দেখা দেয়। এ ঘটনা শাহনামার অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় গল্প। জাহহাক জামশিদকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে। জাহহাকের অবিচার জনগণের সহ্য-সীমার বাইরে চলে গেলে কর্মকার কাভের নেতৃত্বে শুরু হয় বিদ্রোহ এবং ফেরিদুন তাকে দামাভান্দ পাহাড়ে বন্দী করেন।
এক খোদায় বিশ্বাসী এবং ঐশী গুণের অধিকারী রাজাদের মধ্যে শাহনামায় সর্বাগ্রে উল্লেখিত হয়েছে ফেরিদুনের কাহিনী। অনেক গবেষকের মতে, এর কারণ, জাহহাকের বিরুদ্ধে বা দানবীয় চক্রের সাথে লড়াইয়ে প্রধান সেনাপতি ছিলেন ফেরিদুন। শাহনামায় বিধৃত হয়েছে ফেরিদুনের শৈশবের কথা ও রাজা হবার আগে তার অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা। ফেরিদুনের আগে আর কোনো বাদশাহর কাহিনী শাহনামায় এত বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়নি। গবেষকরা ফেরিদুনের কাহিনীকে হযরত মূসা (আঃ)’র কাহিনীর সাথে তুলনা করে থাকেন। ফেরাউনের মত জাহহাকও নিজের ক্ষমতা হরণকারীকে স্বপ্নে দেখেছেন। এক রাতে জাহহাক স্বপ্নে দেখেন যে, রাজবংশের তিন যোদ্ধা তার সামনে উপস্থিত হয়ে গো-মুন্ডাকৃতির মুগুর দিয়ে তার মাথায় আঘাত করছেন। জাহহাক পুরোহিত ও পন্ডিতদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে বলেন। প্রধান পুরোহিত তাকে জানায়, একজন যুবক তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং তোমার ক্ষমতা দখল করবে, তবে সে যুবক এখনও জন্ম নেয় নি। তখন জাহহাকও ফেরাউনের মত নির্দেশ দেয় যাতে সমস্ত নবজাতক পুত্র সন্তানকে মেরে ফেলা হয়। কিন্তু জাহহাকের এইসব ব্যবস্থা সত্ত্বেও ঐ যুবক ঠিকই জন্ম নেয় ও নিরাপদ থাকে।

ফেরিদুন একাধারে বাদশাহ ও পাহলোয়ান। জাহহাককে পরাজিত করার পর তিনি সমাজ-সেবামূলক তৎপরতা বাড়িয়ে দেন। ফেরিদুনের প্রতি জনগণের সমর্থন থাকায় তার ডাকে সাড়া দিয়ে ইরানী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ জাহহাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফেরিদুনের গণ-বাহিনীতে যোগ দেয়। যুদ্ধ জয়ের পর ফেরিদুন সবাইকে অস্ত্র পরিত্যাগ করে নিজ নিজ পেশায় মনোযোগী হতে বলেন।
ফেরদৌসীর শাহনামায় ফেরিদুন বিজ্ঞতা বা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতার প্রতীক। আর এসব গুণের জন্য তিনি পরবর্তীতে বিশ্ব-খ্যাতি অর্জন করেন। বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর এবাদিয়ান “ফেরদৌসী, ঐতিহ্য ও বীরত্ব গাঁথা রচনায় অভিনবত্ব” শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, “ফেরদৌসীর শাহনামায় ফেরিদুন অনেক চড়াই-উৎরাই ডিঙ্গানো এক মহানায়ক। যন্ত্রণা ও সুখের যে অভিজ্ঞতা তার হয়েছে তার ফলে তিনি বিশ্ব সাহিত্যে শেক্সপীয়ারের কিং লিয়র ও গ্রীক রূপকথার ওডিপাসের মতই খ্যাতি অর্জন করেছেন। তবে পার্থক্য হল কিং লিয়র নিজের অজান্তেই দূর্ভাগ্যের শিকার হন এবং নিজ কন্যারা তার ওপর অবিচার করে। কিন্তু ওডিপাস নিজেই পাপে লিপ্ত হন।

ফেরিদুনের ছিল তিন সন্তান। সেলম্ ও তুর ছিল তার এক স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান এবং ইরাজ ছিল অপর স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তান। জীবনের শেষের দিকে তিনি নিজ সাম্রাজ্যকে পুত্রদের মধ্যে ভাগ করে দেন। তুরান বা তুরস্ক রাজ্য দান করেন তুরকে, সেলমকে দেন রোমান সাম্রাজ্য আর ইরান অঞ্চল দান করেন ছোট সন্তান ইরাজের কাছে।
কিছু দিন না যেতেই ভাইদের মধ্যে দেখা দেয় বিরোধ ও হিংসা। সেলম্ ও তুর হিংসার কারণে এবং ইরান থেকে দূরে থাকায় ইরাজকে হিংসা করত। ইরাজ ভাইদের প্রতি সদিচ্ছা দেখিয়ে ইরানের ক্ষমতা তাদের হাতে তুলে দেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তুর তাকে হত্যা করে।
ফেরিদুন এ ঘটনা শুনে খুবই মর্মাহত হন এবং অতি শোকে অন্ধ হয়ে যান।
মানুচেহের ইরাজের রক্তের বদলা নিতে আগ্রহী হন এবং সেলম্ ও তুরকে দমন করেন। মানুচেহের ছিলেন কেবলই বাদশাহ। তিনি পাহলোয়ান ছিলেন না। তার দরবারেই প্রথমবারের মত পাহলোয়ান ও লড়াকু শীর্ষক পেশার নাম উল্লেখিত হয়। স’ম ছিলেন পূর্ব ইরানের একজন বড় পাহলোয়ান। তিনি মানুচেহেরকে রাজত্ব দেখার এবং যুদ্ধের ভার পাহলোয়ানদের ওপর ছেড়ে দিতে বলেন।
শাহনামায় কায়কাভুসের কাহিনী সবচেয়ে ঘটনাবহুল। এই রাজা ছিলেন স্বার্থান্ধ, সুযোগ-সন্ধানী ও উচ্চাভিলাসী। তার উচ্চাকাংখার কারণে ইরান ও ইরানের জনগণ বেশ কয়েকবার বিপদাপন্ন হয়। তিনি আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং মাজান্দারানে সেনা অভিযানের আয়োজন করে খ্যাতি কুড়ানোর চেষ্টা করেন। গবেষকদের মতে কায়কাভুস শাহনামায় উল্লেখিত অত্যন্ত বাস্তবতা-ঘনিষ্ঠ চরিত্র। ইতিহাসের বেশীর ভাগ রাজারাই ছিলেন কায়কাভুসের সমধর্মী।

রাজকীয় পাহলোয়ান কায়খসরু সিয়াওয়াশ ও ফেরেনগিসের পুত্র এবং কায়কাভুসের নাতি। তার দাদা তাকে রাজপুত্র হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। কায়খসরু তার যোগ্যতা প্রমাণের জন্য একটি সামরিক দূর্গ নির্মাণ করেন। তিনি সেখানে এক বছর ছিলেন। এ দূর্গে তার বসবাস ছিল নিঃসঙ্গতা ও প্রভুর জন্য সাধনা বা ধ্যানের চর্চা । কাভুসের স্থলাভিষিক্ত ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও কায়খসরু ক্ষমতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। জীবনের শেষের দিকে ক্ষমতার প্রতি তার এ অনীহা তাকে একজন উচ্চ পর্যায়ের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। শাহনামার বেশীর ভাগ গবেষকই কায়খসরুকে শাহনামার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী রাজার আদর্শ বা আদর্শ রাজা বলে মনে করেন। কায়খসরুর মধ্যে অতীতের রাজা-বাদশাহদের অধিকাংশ ভালো গুণই দেখা গেছে। তিনি অদৃশ্য জগতের কথা বলেন এবং ফেরিদুন অশুভ বা মন্দ শক্তিগুলোর সাথে লড়াই করে বিশ্ব থেকে এসব অশুভ শক্তি নির্মূল করেন।

শাহনামার কায়খসরু একজন ন্যায়পরায়ন শাসক। কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতি-মুক্ত নন। ফেরদৌসী কায়খসরুর ত্রুটি বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করে তাকে কিংবদন্তীর বাধা-ধরা গন্ডী থেকে মুক্ত করেছেন। ফলে কায়খসরু হয়ে উঠেছেন স্বাভাবিক ও মাটির মানুষ। তিনি শাসন ও জীবন পরিচালনা করেছেন বিজ্ঞতা বা দূরদর্শিতার মাধ্যমে। ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে কায়খসরু ছিলেন জীবন সম্পর্কে অসাধারণ দূরদর্শি। অন্য অনেক রাজা-বাদশাহর মত তিনি চাকচিক্য ও আভিজাত্য বা দরবারী জাঁকজমকের পেছনে ছুটেননি। এ ছাড়াও অন্য অনেক রাজা-বাদশাহর বিপরীতে নিজ সেনা ও পাহলোয়ানদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বসুলভ।

শাহনামার কায়খসরু মনে করতেন নিজেদের ভেতরেই যদি শত্রু থাকে কেবল তখনই বাদশাহীসুলভ ক্ষমতা দেখানো ও সেনাশক্তির ব্যবহার করা উচিত। অর্থাৎ শত্রু মোকাবেলার ক্ষেত্রেই রাজশক্তি ও সেনাশক্তি ব্যবহার করা জরুরী। শত্রু দমনের পর শান্তির সময় রাজা বা সম্রাট তার ক্ষমতা রক্ষা করতে গিয়ে অহংকারী ও স্বার্থপর হয়ে পড়ে এবং মানুষকে অপবিত্রতার মধ্যে ঠেলে দেয় বলে কায়খসরু মনে করতেন। এ নীতির আলোকেই কায়খসরু তুরানের আফ্রাসিয়াবকে দমনের পর জীবন যাপনের সহজ-সরল ও সাধাসিধে পথ বেছে নেন। তার মতে আফ্রাসিয়াবের পরাজয়ের পর পৃথিবী থেকে সকল মন্দ বিদায় নিয়েছে, তাই ভালো কাজের জন্য যুদ্ধ করার বা সশস্ত্র বাহিনীকে সতর্ক রাখার দরকার নেই। ঐ যুদ্ধের পর কায়খসরু নিঃসঙ্গ-প্রিয় হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। ফলে পাহলোয়ান ও জনগণ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। যারা রাজকীয় দায়িত্ব পালন না করার ও সেনাবাহিনীর প্রতি সম্রাটের উদাসীনতার এ পদক্ষেপকে সঠিক মনে করতেন না তারা কায়খসরুর এ ধরনের চিন্তাধারাকে শয়তানের প্রভাবিত চিন্তাধারা বলে মনে করতেন। তাই তারা সম্রাটের এ পদক্ষেপে বাধা দিতে জাল ও রুস্তমের প্রতি আহ্বান জানান।
এ প্রসঙ্গে ফেরদৌসী লিখেছেন,

بگفتند با زال و رستم که شاه
بگفتار ابلیس گم کرده راه

জাল ও রুস্তমকে বললো ওরা,
ইবলিসের ধোকায় শাহ পথ-হারা।

শাহনামার কায়খসরু শিল্প, জাতি ও প্রজ্ঞার প্রতীক। পিতা সিয়াভাশের জিদের জের ধরে তিনি আফ্রাসিয়াবের সাথে যুদ্ধে নামেন। আফ্রাসিয়াব বেশ ক’ বার পালিয়ে যায় এবং সাগর- তলায় আত্মগোপন করে। কায়খসরু কৌশলে তাকে সাগর থেকে বের করে আনেন। তিনি দানবীয় চরিত্রের শাস্তি হিসেবে আফ্রাসিয়াবকে দ্বিখন্ডিত করেন। ইরানের সবচেয়ে বড় শত্রুকে দমনের পর কায়খসরু অন্য রাজা-বাদশাহর মত ভোগ-বিলাসে মেতে উঠেননি, বরং দিন-রাত ধর্মকর্মে মশগুল হন এবং সেনাবাহিনী ও পাহলোয়ানদের ধর্মীয় উপদেশ দিতে থাকেন। প্রভু যেন তার আত্মাকে গ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর মাধ্যমে নশ্বর এই পৃথিবী থেকে তাকে মুক্তি দেন এই প্রার্থনা জানাতে থাকেন কায়খসরু।

ঐশী ফেরেশতা স্বপ্নে দেখান যে প্রভু কায়খসরুর প্রার্থনা মেনে নিয়েছেন । এই ঘটনার পর শাহনামার কায়খসরু তার দরবারের কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পাহলোয়ানকে নিয়ে বরফ ও কুয়াশার মধ্যে মিশে যান এবং আর কখনও ফিরে আসেননি। দৃশ্যতঃ কায়খসরু এভাবে অমরত্ব লাভ করেন। এভাবে দেখা যায়, শাহনামার কায়খসরু জীবনে সচেতন মৃত্যুর প্রতীক। শাহনামা গবেষক ডক্টর মীর জালাল উদ্দিনের মতে, শাহনামার কায়খসরু পবিত্র আত্মার অধিকারী, তিনি পার্থিব শরীর বা নফসকে দমন করেছিলেন বলে বেহেশতে স্থায়ী জীবনের অধিকারী তথা চিরজীবন্ত ও জাগ্রত।

আফ্রাসিয়াব ছিলেন তুরানী বা তুর্কী অথবা অ-ইরানী সম্রাট এবং ইরানীদের সবচেয়ে বড় শত্রু । প্রাচীন ইরানী সাহিত্যে তিনি সব সময়ই মৃত্যুদন্ড পাবার মত দাগী অপরাধী ও কখনও জাদুকর হিসেবেও চিত্রিত হয়েছেন। জাহহাকের মত আফ্রাসিয়াবও অশুভ বা দানবীয় ব্যক্তিত্ব। প্রাচীন বর্ণনা অনুযায়ী ক্ষরার দানব বা দেবতা হিসেবে তিনি কখনও কখনও ইরানে বৃষ্টি বর্ষিত হতে দেন নি। মোট কথা আফ্রাসিয়াব ইরানীদের জন্য সমস্ত অকল্যাণ ও মন্দের প্রধান উৎস। শাহনামায়ও তিনি এভাবেই চিত্রিত হয়েছেন। শাহনামার দৃষ্টিতে সে ছিল অসম্ভব প্রতিহিংসাপরায়ন ও হিংস্র। সে কখনও সন্ধি বা শান্তির প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিত না। সে এ ধরনের মন্দ স্বভাবের লোকদেরই নিজের বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ সহচর করত। বন্দীদের সাথে অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখানোর দায়ে আফ্রাসিয়াব নিজের ভাইকে হত্যা করেছিল।
আফ্রাসিয়াব যেখানে শক্তি দিয়ে লক্ষ্য পূরণ করতে পারত না সেখানে সে ধোকার আশ্রয় নিত এবং প্রয়োজনে সন্ধির প্রস্তাবও বাহ্যিকভাবে মেনে নিত। কিন্তু বাস্তবে সে এভাবে নৈরাজ্য, সহিংসতা ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হত। আফ্রাসিয়াব ইরান-বিরোধী সমস্ত শক্তির নেতা। সে অন্য দেশগুলোকে ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত করত। কেবল একবার সিয়াভাশকে আশ্রয় দেয়ায় তার প্রভাবে সে কিছুকাল যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকে বিরত ছিল। কিন্তু গেরসিউজের হিংসা ও চক্রান্তে আফ্রাসিয়াব সিয়াভাশকে হত্যার নির্দেশ দেয়। ডক্টর আবেদিয়ানের মতে, “আফ্রাসিয়াব ইরানী রাজা ও পাহলোয়ানদের ঠিক বিপরীত চরিত্র। এই খলনায়ক শাহনামার আকর্ষণ বহুলাংশে বাড়িয়েছে। শুভ ও অশুভ শক্তির লড়াইয়ে আফ্রাসিয়াব অশুভ শক্তির প্রধান চরিত্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয়ী হয়। আফ্রাসিয়াব, কায়খসরু, কাভুস এরা ফেরদৌসীর শাহনামার বীরত্ব-গাঁথার মূল চাকার অংশ।”

শাহনামায় উল্লেখিত কিংবদন্তীর যুগে রাজা ও পাহলোয়ানরা ছিলেন একই ব্যক্তির দুই রূপ। ফেরিদুনই এর বড় প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তী যুগে রাজা বা সম্রাটরা তাদের বহুমুখি ঔজ্জ্বল্য বা ক্ষমতা হারাতে থাকেন। ফলে পাহলোয়ানরা হয়ে ওঠে আলাদা এক শ্রেণী এবং রাষ্ট্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র। সম্রাট মানুচেহেরের শাসনামলে সম্রাট ও পাহলোয়ান পরস্পরের সহযোগী হিসেবে রাজত্ব পরিচালনা শুরু করেন। অর্থাৎ ঐ সময় পর্যন্ত সম্রাট ছিলেন পাহলোয়ান ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের মাধ্যম। কিন্তু এরপর থেকে পাহলোয়ানরাই হয়ে পড়েন রাষ্ট্রের প্রধান কর্মী। পাহলোয়ানরা এ সময় থেকে এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েন যে কারো সম্রাট হবার বিষয়টি পাহলোয়ানদের মতামতের ওপর নির্ভর করত এবং তারাই হতেন রাজা বা সম্রাট নির্বাচক। যেমন, পাহলোয়ানরাই কেইকোবাদকে সম্রাট নির্বাচিত করেন। বিশেষ করে, এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন জাল ও রুস্তম নামক পাহলোয়ান।
কেইখসরু ও কাভুসের মত রাজারাও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বা নেতৃত্ব ও আভিজাত্য খুঁজতেন পাহলোয়ানদের মধ্যে। ফেরদৌসীর দৃষ্টিতে বীরত্ব ও প্রজ্ঞার পাশাপাশি একজন যোগ্য বা সেরা পাহলোয়ানের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসার মত মানবিক গুণাবলীও থাকা উচিত। ফেরদৌসীর শাহনামায় উল্লেখিত সমস্ত পাহলোয়ানই ন্যায়বিচারকামী ও অবিচারের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত। জাল, রুস্তম ও গুদার্জের মত পাহলোয়ানরা সম্রাটের হাতের পুতুল ছিলেন না। রাজা নিজেও কখনও অবিচারে জড়িয়ে পড়লে তারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং সতর্ক-বাণী বা উপদেশ দিয়েছেন। প্রাগৈতিহাসিক ও কিংবদন্তীর যুগে পাহলোয়ানদের যে উন্নত গুণাবলী ছিল পরবর্তী যুগে তা ম্লান হয়ে গেছে এবং সততা ও বীরত্বের জায়গা দখল করেছে মিথ্যাচার ও চক্রান্ত বা প্রতারণা।
তাই ফেরদৌসীর পছন্দনীয় পাহলোয়ানদের দেখা যায় কেবল প্রাগৈতিহাসিক ও কিংবদন্তীর যুগে। এ যুগের বীর পাহলোয়ানরা উচ্চাভিলাসী ছিল না। রুস্তম শাহনামায় উল্লেখিত এ ধরনেরই অন্যতম সেরা পাহলোয়ান। পাহলোয়ানসুলভ অনেক আদর্শ গুণ তার মধ্যে দেখা গেছে। সিয়াভাশ ও ইসফান্দিয়ার ফেরদৌসীর শাহনামায় উল্লেখিত আরো দুজন খ্যাতনামা ও শ্রদ্ধাভাজন পাহলোয়ান।
রুস্তমের দাদা স’ম ছিলেন সিস্তান ও বালুচিস্তান অঞ্চলের পাহলোয়ান। তিনি সেলম্ ও তুরের মধ্যে অনুষ্ঠিত যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জাল ছিল তার পুত্র। জালের সাদা চুল স’মকে অস্থির করে তোলে। তিনি একে অশুভ শক্তির লক্ষণ বলে মনে করেন এবং তাকে নির্জন প্রান্তরে ফেলে আসেনে। ফলে জনগণ স’মকে তিরস্কার করে। অবশ্য কয়েক বছর পর এই কাজের জন্য অনুতপ্ত হন স’ম এবং জালকে সান্তনা দেয়ার পাশাপাশি তার ক্ষতি পূষিয়ে দেয়ারও আশ্বাস দেন।

বীর পাহলোয়ান জাল শাহনামার ফেরদৌসীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর চরিত্রের মধ্যে অন্যতম। সে অনেক বছর বেঁচে ছিল। শাহনামায় তার চেয়েও দীর্ঘজীবী একমাত্র চরিত্রটি হল সিমোরগ। জালের আচার আচরণ ও কথাবার্তায় কখনও কোনো ভুল-ত্রুটি দেখা যায় নি। এদিক থেকে শাহনামায় তার এ চরিত্রটি অনন্য। তার অসাধারণ প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও প্রতিভার জন্য সে সি মোরগের কাছে ঋণী। কিংবদন্তীর সি মোরগ তার অন্য সন্তানদের সাথে রূপকথার শিশু জালকেও বড় করতে থাকে এবং যোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলে।

জাল নামটির অর্থ বৃদ্ধ। কারণ জন্মের সময়ই তার চুল সাদা ছিল। তার বাবা স’ম তাকে অলক্ষুণে বা অশুভ শক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত মনে করে আলবুর্জ পর্বতে রেখে আসেন। এখানে সি মোরগের তত্ত্বাবধানে ও কঠিন পরিবেশে সে হয়ে ওঠে বিভিন্ন দিকে অসাধারণ যোগ্য ব্যক্তিত্ব। জাল জ্যোতির্বিদদের ও পুরোহিতদের সমস্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারত। যুদ্ধ-বিগ্রহের চেয়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রেই তার যোগ্যতা বেশী প্রকাশিত হয়েছে। পাহলোয়ান ও রাজাদেরকে তিনি তার জ্ঞান দিয়ে সহায়তা করেছেন।

কেইকাভুস জঙ্গলে দানবদের হাতে বন্দী হবার পর জালকে স্মরণ করেন। জাল তাকে সহায়তা করার জন্য পুত্র রুস্তমকে পাঠান। তার মতে জনসেবা বা এ ধরনের মহতী কাজের জন্যই আল্লাহ রুস্তমকে সৃষ্টি করেছেন এবং এগুলোই তার স্বাভাবিক কাজ। শাহনামার বীর বা পাহলোয়ানরা সবাই জনদরদী ছিলেন। অন্য কথায় ফেরদৌসীর মতে পাহলোয়ানদের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য অবশ্যই থাকা উচিত।
জাল ছিলেন সব-সময়ই ধীর-স্থির এবং কোনো অবস্থাতেই ক্ষিপ্ত হতেন না। তিনি সব সময় মানুষের কল্যাণের কথা ভাবতেন। তিনি নিজের বা নিজ পরিবারের স্বার্থের কথা ভেবেছেন শাহনামায় এমন একটি দৃষ্টান্তও দেখা যায় না।

 

ফেরদৌসীর শাহনামার সবচেয়ে বিখ্যাত পাহলোয়ান হলেন রুস্তম। সিস্তানের ইতিহাসে এসেছে সুলতান মাহমুদ শাহনামার কাহিনীগুলো শুনে ফেরদৌসীর এ কাব্যের গুরুত্বকে খাটো করার জন্য বলেছিলেন, “শাহনামা তো কোনো কিছুই নয়, অবশ্য রুস্তমের গল্পটি ছাড়া এবং আমার সেনাদের মধ্যে রুস্তমের মত হাজারো বীর পুরুষ রয়েছে।”
এর জবাবে ফেরদৌসী বলেছিলেন,” রুস্তম তুলনাহীন বা অপ্রতিদ্বন্দ্বি পাহলোয়ান, আল্লাহ রুস্তমের মত আর কাউকে সৃষ্টি করেননি।”

ইরানের প্রাচীন বীরত্ব-গাঁথাগুলো শুরু হত পাহলোয়ানদের বর্ণনা দিয়েই। কিন্তু শাহনামা এর ব্যতিক্রম। ফেরদৌসীর শাহনামায় উল্লেখিত রুস্তম প্রাচীন ইরানী বীরত্ব-গাঁথার সেরা মহানায়ক ও কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু তাই বলে শাহনামার সমস্ত ঘটনা বা কাহিনী তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়নি। শাহনামা নামক সুস্বাদু কাব্যের মূল ক্রীম বা ননিটুকু যেন এর পাহলোয়ান-বৃত্তান্ত। ফেরদৌসী শুধু জরুরী সময়ে বা ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াইয়ের চরম মুহূর্তে পাহলোয়ানদের নিয়ে এসেছেন। তাই ইরানী জনগণের কাছে সবচেয়ে পরিচিত বা খ্যাত পাহলোয়ান হলেন রুস্তম। তিনি বিভিন্ন শক্তি, বীরত্ব, উদারতা বা মহানুভবতাসহ সব ধরনের মানবীয় গুণের প্রতীক। দীর্ঘদেহী ও দীর্ঘ জীবনের অধিকারী রুস্তমের জন্মও ছিল বিস্ময়কর। তার শক্তি বা ক্ষমতাগুলোও ছিল অবিশ্বাস্য। যেমন, ফেরদৌসী লিখেছেন:

زمین گرد رخش تو را چاکر است
زمان بر تو مهربان مادر است
ز تیغ تو خورشید بریان شود
ز گرز تو ناهید گریان شود

বৃত্তাকার এ ধরা যেন ভৃত্য রুস্তমের
সময় ছিল দয়াদ্র জননী রুস্তমের
তার তলোয়ারে সূর্য ঝলসাতো
মুগুরের মারে শুকতারা কাঁদতো

ফেরদৌসী তার অপূর্ব শিল্প-নৈপুণ্য দেখিয়ে শাহনামার চরিত্রগুলোকে এত প্রাণবন্ত ও প্রাকৃতিক করে তুলে ধরেছেন যে তারা যেন আমাদের চোখের সামনেই রয়েছেন। রুস্তমের বিস্ময়কর কাহিনী ও বৈশিষ্ট্যগুলো পাঠকের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। শাহনামার রুস্তম প্রসঙ্গে সমকালীন যুগের বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর মীর জালাল উদ্দিন বলেছেন, ” বহুমুখী অলৌকিক যোগ্যতার অধিকারী এই রুস্তম কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, বরং কিংবদন্তীর চরিত্র। অতি প্রাচীন যুগে বিশ্বে এ নামে কোনো পাহলোয়ান থেকে থাকলেও তিনি রূপকথার জগতের অলৌকিক বীরে পরিণত হয়েছেন। যুগে যুগে নাম না জানা বহু বীর ইরানের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন বা জীবন দিয়ে গেছেন। আর এইসব বীরের সমস্ত গুণসহ তাদের একীভুত সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন মহাবীর রুস্তম।”

ফেরদৌসীর শাহনামায় কবির সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও সুন্দর শব্দের অলংকারে বিভুষিত হয়েছেন মহাবীর রুস্তম। তিনি যেন ফেরদৌসীর আকাংখিত আদর্শ মানব। অলৌকিক অনেক বৈশিষ্ট্য ছাড়াও অনেক প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক মানবীয় গুণাবলীও দেখা গেছে রুস্তমের চরিত্রে। যেমন, দেশপ্রেম, দায়িত্বশীলতা, দয়া, নেতৃত্বের যোগ্যতা প্রভৃতি। ডক্টর মাহমুদ এবাদিয়ান “ফেরদৌসী, ঐতিহ্য ও বীরত্ব গাঁথা রচনায় অভিনবত্ব” শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ইরানের জাতীয় বীরত্ব গাঁথার জমিনে রুস্তম যেন স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। সে যোদ্ধাদের দেয় জীবন ও প্রাণশক্তি। সে ছিল ইরানের রাজনৈতিক কেন্দ্রের বা রাজধানীর প্রধান অক্ষ। রুস্তমের তৎপরতা যোগাত প্রশান্তি ও নির্ভরতা। মানবিকতা, মানবীয় মর্যাদাবোধ ও বীরত্ব এবং জীবনের প্রতিকূলতাসহ সব ধরনের মন্দ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক ছিলেন রুস্তম। ”

ফেরদৌসীর শাহনামায় রুস্তম সব সম্রাট বা রাজার চেয়েও মহান। ফেরদৌসী তাকে মানবীয় ও ইরানী গুণাবলীর সর্বোচ্চ স্থানে বসিয়েছেন। তিনি ছিলেন বীর-পাহলোয়ানদের সব যুগেই বিপদের দিনে ত্রাণকর্তা, আশা-ভরসার স্থল ও ইরানের প্রতিরক্ষার মূল স্তম্ভ। রুস্তম নিজের ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ব সম্পর্কে ছিলেন সদা-সচেতন। তিনি কাভুসের খেয়ালীপনা বা ছেলেমানুষি-সুলভ আচরণের মোকাবেলায় বীরত্বপূর্ণ দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন। গাশতাসবের মোকাবেলায়ও তার আচরণ ছিল নির্ভিক ও স্বাধীনচেতা। দয়ালু, প্রজ্ঞাময় ও দেশপ্রেমিক রুস্তম সিয়াভাশকে লালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং সে নিহত হলে এর প্রতিশোধ নেয়ার উদ্যোগ নেন। এমনকি তিনি ইস্ফান্দিয়ারের মৃত্যুর পর তার ওসিয়ত অনুযায়ী বাহমানকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আকর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী রুস্তম জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তেও রসিকতা করেন, ভালোবাসায় বিভোর হন, উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং আনন্দ উপভোগ করেন। সঙ্গীত-প্রিয় রুস্তম গানও গেয়েছেন এবং কবিদের মত নির্বিঘ্ন জীবনের অধিকারী হতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সবুজ প্রান্তরে জাদুর ঝর্ণার পাশে রুটি ও ঝলসানো মুরগী এবং তানপুরা নামক বাদযন্ত্র নিয়ে তার গান গাওয়ার বর্ণনা রয়েছে ফেরদৌসীর শাহনামায়।
জুল মোলের অনূদিত ফেরদৌসীর শাহনামার সুবাদে বিখ্যাত ফরাসী কবি লা মার্টিন রুস্তমের কাহিনী জানার পর বলেছেন, ” রুস্তম শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্তই পাহলোয়ান। সে দোলনায়ও লড়েছে , কবরের পাশেও লড়েছে এবং তার বংশধররাও তারই মত। নজিরবিহীন গুণের জন্য তিনি মহান এবং বীরত্বের জন্য বড় পাহলোয়ান। তিনি যাদের উদ্ধার করেছেন তাদের সবার জন্য তিনিই সম্রাট। রুস্তম একই সাথে মহাবীর ও একইসাথে ধার্মিক ব্যক্তিও বটে। দেশের বিচ্ছিন্নতা ও নৈরাজ্যের সময় তিনি তার বীরত্ব ও প্রতিভাকে দেশের সেবায় নিয়োজিত করেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্র ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। এরপর কৃতজ্ঞচিত্ত ইরানী জাতি ও রুস্তম বা পাহলোয়ানদের নাম একাকার হয়ে যায়। এইসব বীর বা পাহলোয়ানরা ধার্মিকতা বা খোদাভীরুতার কারণে ক্ষমতা নেয়া থেকে বিরত থাকেন, কিন্তু তারা সম্রাট বা বাদশাহদের চেয়েও বড় মানুষ। রাজা-বাদশহরা অল্প কিছু দিন শাসন করে যান। কিন্তু এইসব বীর বা পাহলোয়ান ভবিষ্যতেও মানুষের মনের রাজা হয়ে থাকবেন। আজ রুস্তম ও ইরান একাকার হয়ে গেছে।”

যুগে যুগে নাম না জানা বহু বীর ইরানের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন বা জীবন দিয়ে গেছেন। আর এইসব বীরের সমস্ত গুণসহ তাদের একীভুত সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন শাহনামার মহাবীর রুস্তম। দীর্ঘদেহী ও দীর্ঘ জীবনের অধিকারী রুস্তমের জন্ম ছিল বিস্ময়কর। তার শক্তি বা ক্ষমতাগুলোও ছিল অবিশ্বাস্য।
রুস্তমের বাবা ছিলেন বিখ্যাত পাহলোয়ান জাল এবং মাতা ছিলেন রুদাবেহ। রুস্তম মাতৃগর্ভেই অত্যন্ত বড় আকৃতির ছিলেন। ফলে তাকে প্রসব করতে রুদাবেহ’র অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল। এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে জাল তাকে দেখতে আসেন। অশ্রুভারাক্রান্ত জাল সেখানে অন্যদেরও কান্নারত অবস্থায় দেখলেন। হঠাৎ তার মনে পড়ল সিমোরগের কথা। বিপদের সময় ব্যবহারের জন্য সিমোরগ তার একটি পালক দিয়েছিল জালকে, সে কথাও তার মনে পড়ল। জাল রুদাবেহর মাকে সংকট- মুক্তির এ উপায়ের কথা জানান। এরপর জাল আগুনে সিমোরগের পালকের কিছু অংশ পোড়ান। সাথে সাথে চারদিক আঁধার করে আকাশ থেকে সিমোরগ নেমে এল। জালের দুঃখের কথা শুনে সিমোরগ বলল, এখন তো তার কান্নার সময় নয়, বরং আনন্দের সময়, কারণ রুস্তমের মত বিশ্বখ্যাত বীর পাহলোয়ানের পিতা হতে যাচ্ছে জাল।

এরপর সিমোরগের পরামর্শে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছুরি দিয়ে একজন দক্ষ ডাক্তারের মাধ্যমে অস্ত্রপচার করে রুস্তমকে রুদাবেহর পাঁজর থেকে বের করে আনা হয়। অস্ত্রপচারের আগে ও পরে কি করতে হবে বা কোন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করতে হবে তাও সিমোরগ জানিয়ে দিয়েছিল। জালই নবজাতকের নাম রাখেন রুস্তম। প্রাচীন ইরানের পুরো জাবোলেস্তান ও কাবোলেস্তানে রুস্তমের জন্ম উপলক্ষ্যে উৎসব পালিত হয়।

হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী তার শাহনামায় রুস্তমের শৈশব সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছেন। রুস্তম অন্য শিশুদের মত ছিল না। দশজন ধাত্রী তাকে দুধ পান করাতেন। কিন্তু তারপরও অতিকায় শিশু রুস্তমের ক্ষুধা মিটত না। দুধের শিশু রুস্তম পাঁচ জন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের সমান খাবার খেত। খুব অল্প দিনের মধ্যেই সে দীর্ঘদেহী হয়ে উঠে এবং পাহলোয়ানী শুরু করে। রুস্তমের চেহারা, দৈহিক উচ্চতা ও রুচি বা আচার-আচরণ তার দাদা স’মের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। এভাবে দৈহিক শক্তি ও বীরত্বের দিক থেকে অতুলনীয় রুস্তম বড় হয়ে উঠে।
জালের একটি সাদা হাতি ছিল। অত্যন্ত শক্তিশালী এ হাতি দিয়ে সে যুদ্ধের ময়দানে বহু শত্রু -সেনাকে হত্যা করত। এক রাতে হঠাৎ এই হাতি দড়ির বাঁধন ছিড়ে লোকজনের ওপর হামলা শুরু করল। তরুণ রুস্তম ঘুম থেকে উঠে দাদা স’মের মুগুর নিয়ে এই অবাধ্য হাতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল। প্রহরীরা তাকে বাধা দিল এই বলে যে হাতির হামলায় সে নিহত হতে পারে। কিন্তু রুস্তমের মুষ্ঠাঘাতে একজন প্রহরী মাটিতে পড়ে যায়। রুস্তম এরপর অন্য প্রহরীদের দিকে ছুটে আসে। ভীত-সন্ত্রস্ত অন্য প্রহরীরা পালিয়ে যায়। এরপর সে এগিয়ে যায় হাতীর দিকে। হাতি রুস্তমকে দেখে সুড় দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিতে চাইল। এ অবস্থায় রুস্তম হাতির মাথায় মুগুর দিয়ে এমন আঘাত হানল যে তাতে হাতির মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।

শাহনামার প্রধান আকর্ষণ রুস্তম তরুণ বয়সে খুব সহজেই সেপান্দ পর্বতের দূর্ভেদ্য দূর্গে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। তার আগে অন্য কোনো পাহলোয়ান এই অবিশ্বাস্য কাজটি করতে পারেননি। রুস্তম সেখানে দূর্গঅধিপতিদের শাস্তি দিয়ে নিজ পূর্বপুরুষ নারীমানের পরাজয় বা অবমাননার বদলা নেয়। রুস্তমের ঘোড়া নির্বাচন নিয়েও মজার ঘটনা রয়েছে। রুস্তম এমন ঘোড়া চাইত যা তার অস্ত্র ও মুগুর বহন করতে পারবে। জাবোলেস্তান ও কাবোলেস্তানে ঘোড়ার অনেক পাল তার সামনে আনা হয়। কিন্তু পরীক্ষার জন্য যখনই রুস্তম ঘোড়ার পিঠের ওপর হাত দিয়ে চাপ দিত তখনই সেই ঘোড়ার পিঠ রুস্তমের হাতের ভারে নুয়ে যেত এবং ঘোড়ার পেট মাটিতে লেগে যেত।

শাহনামার মহানায়ক রুস্তম এক পর্যায়ে একটি দূর্দান্ত তেজী অশ্ব শাবক দেখতে পায় এবং ঘোড়াটিকে দড়ির ফাঁদ দিয়ে হস্তগত করতে চায়। তখন রাখাল তাকে বলে যে, অন্যের ঘোড়া নিবেন না। রুস্তম জানতে চায়, ঘোড়াটি কার? উত্তরে সে জানায়, এর মালিক এখনও অজ্ঞাত। রাখশ নামের এই ঘোড়াটিকে যে-ই হস্তগত করতে চাইত, ঘোড়াটির মা তার দিকে সিংহের মত তেড়ে আসত ও কামড় দিত। ফলে গত তিন বছরে কেউই ঘোড়াটির মালিক হতে পারেনি। এইসব কথা শোনার পর রুস্তম ঘোড়াটির ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়ে উঠে। সে দড়ির ফাঁদ নিক্ষেপ করে ঘোড়াটিকে আয়ত্তে আনে। ঘোড়াটির মা তার দিকে সিংহের মত তেড়ে আসে। কিন্তু রুস্তমের ঘুষি খেয়ে মাতা ঘোড়াটি মাটিতে পড়ে যায় এবং পুনরায় উঠে শাবকের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়। রুস্তম রাখশের পিঠে চাপ দিয়ে দেখল, এতে তার পিঠ নুয়ে যায়নি। রাখশ যেন তার পিঠে কোনো কিছুর চাপই অনুভব করেনি। এতে রুস্তম খুশী হয়ে তার পিঠে চড়ে বসে। এরপর তিনি রাখালকে প্রশ্ন করেন, এ ঘোড়ার দাম কত? সে জানায়, ইরানই হল এর মূল্য, তুমি যদি রুস্তম হয়ে থাক, তবে এ ঘোড়া তোমার এবং এর মাধ্যমে ইরানের সমস্যার সমাধান বা ইরানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে। রুস্তম খুশী হয়ে মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।
এরপর রুস্তম এই ঘোড়াকে প্রতিপালন করতে লাগলেন। ঘোড়াটি এরপর এত বেশী তেজী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে লোকের বদ-নজর থেকে তাকে রক্ষার জন্য ইস্পান্দ নামক উদ্ভিদের দানা আগুনে পোড়ানো হত।

রুস্তমের দুঃসাহসী সাত অভিযান শাহনামার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। ইরানের রাজা কাভুস মাজান্দারানের রাজার সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনা অভিযান শুরু করেন। কিন্তু মাজান্দারানের রাজা শ্বেত দানবের মাধ্যমে কাভুসকে বন্দী করে। এ খবরটি ইরান ও বিশ্বের পাহলোয়ান জালের কাছে পৌঁছে। জাল তার পুত্র রুস্তমকে মাজান্দারান গিয়ে কাভুসকে মুক্ত করতে বলেন। রুস্তম রাখশ নামক ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ-যাত্রা শুরু করেন। শুরু হয় মহাবীর রুস্তমের দুঃসাহসী সাত অভিযানের প্রথম পর্ব।

খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেন শাহনামার মহানায়ক রুস্তম। রুস্তমকে নিয়ে রাখশ দুই দিনের পথ একদিনে পাড়ি দেয়। এ অবস্থায় খিদে পায় রুস্তমের। তিনি একটি প্রান্তরে অনেক জেব্রা দেখেন এবং একটি জেব্রা শিকার করে তা আগুনে ঝলসিয়ে খেয়ে নেন। এরপর তিনি রাখশকে ঘাস খাবার জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজে একটি সবুজ প্রান্তরে ঘুমিয়ে পড়েন। রুস্তম জানতেন না যে সেখানে একটি সিংহের গুহা রয়েছে। রাত নেমে আসার কিছুক্ষণ পর সিংহটি তার গুহায় ফেরার পথে রুস্তম ও রাখশকে দেখতে পেল। সিংহটি মনে মনে ভাবল, আগে ঘোড়াটাকে মারব, পরে মারব তার আরোহীকে। প্রথমে সে রাখশের ওপর হামলা চালায়। রাখশ ক্রুদ্ধ হয়ে সামনের দুটি পা উপরে তুলে সিংহের মাথায় আঘাত হানে এবং দাঁত বসিয়ে দেয় তার পিঠে। এরপর রাখশ সিংহটিকে মাটিতে ফেলে টুকরো টুকরো করে ফেলে। রুস্তম ঘুম থেকে উঠে টুকরো টুকরা হয়ে পড়া সিংহের লাশ দেখতে পান। এ দৃশ্য দেখে রুস্তম বললেন, হে অসতর্ক রাখশ! তুমি যদি সিংহের হাতে মারা পড়তে তাহলে আমি আমার অস্ত্র-শস্ত্র, মুগুর প্রভৃতি নিয়ে কিভাবে পায়ে হেটে মাজেন্দারান যেতাম? এরপর শুরু হয় রুস্তমের অভিযানের দ্বিতীয় পর্ব।
পরের দিন শাহনামার মহাবীর রুস্তম রাখশকে নিয়ে আবার রওনা হলেন। বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দেয়ার পর তিনি এক শুস্ক ও অগ্নিদগ্ধ মরু-প্রাণ্তরে পৌঁছেন। সেখানে বাতাস ছিল অসহনীয় গরম। তীব্র গরমে রুস্তমের জিভ যেন ফেটে যাচ্ছে। তার ঘোড়া রাখশও হয়ে পড়ে দূর্বল ও ক্লান্ত। তাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়ার জন্য রুস্তম রাখশের পিঠ থেকে নীচে নেমে এলেন। বিশাল ধু-ধু মরু প্রান্তরের কাঠ-ফাটা রোদে কোথাও সবুজ-শ্যামলিমার ছায়াও নেই। এ অবস্থায় কাতর হয়ে পড়া রুস্তম প্রভুর দরবারে প্রার্থনার হাত তোলেন এবং ইরানকে দানবীয় শক্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য সাহায্যের আবেদন জানান। রুস্তমের পথ চলা যেন শেষ হচ্ছিল না। তিনি যেন নিজ চোখে মৃত্যুকে দেখছিলেন। তার এত দৈহিক শক্তি দেশের এ দূর্দিনে কোনো কাজে আসছে না দেখে দুঃখ করতে লাগলেন। রুস্তম ভীষণ ক্লান্ত ও শ্রান্ত অবস্থায় এক পর্যায়ে একটি ছাগল দেখলেন। ছাগলটির পিছে পিছে এগিয়ে গিয়ে তিনি একটি ঝর্ণার সন্ধান পেলেন। রুস্তম বুঝলেন প্রভু তার প্রার্থণার জবাবে এ সাহায্য পাঠিয়েছেন। মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি পানি পান করলেন। ঝর্ণার পানিতে রাখশকে পরিচ্ছন্ন করলেন। এরপর একটি জেব্রা শিকার করে তার গোশত আগুনে ঝলসিয়ে খেলেন।
এবার ঘুমানোর পালা। ঘুমানোর আগে শাহনামার মহাবীর রুস্তম তার ঘোড়া রাখশকে কোনো সিংহ বা দানব কিংবা অন্য কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে নিষেধ করে বলেন, কোনো শত্রু দেখতে পেলে আমার কাছে ছুটে এসে আমাকে জানাবে।

এবারে রুস্তমের অভিযানের তৃতীয় পর্ব। মধ্যরাত পর্যন্ত রাখশ ঐ প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু শাহনামার মহাবীর রুস্তম যেখানে ঘুমাচ্ছিলেন সেটা ছিল এক দৈত্যের বিশ্রামাগার। সিংহ ও হাতীর মত জন্তুও ভয়ে সেখানে যেত না। দৈত্যটি নিজ বিশ্রামাগারে ফিরে এসে সেখানে রুস্তমকে ঘুমাতে দেখে ও আশপাশে তার ঘোড়া রাখশকে দেখতে পেয়ে ক্রুদ্ধ হল। এমন জায়গায় কেউ আসার স্পর্ধা দেখাতে পারে তা ছিল দৈত্যটির ধারণাতীত। ফলে সে ক্রুদ্ধ হয়ে এগিয়ে এল রাখশের দিকে। রাখশ সাথে সাথে ছুটে এল রুস্তমের কাছে এবং পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করে ও হ্রেষা ধ্বনি দিয়ে রুস্তমকে জাগিয়ে তুলল। কিন্তু রুস্তম জেগে ওঠার সাথে সাথে যাদুর বলে দৈত্যটি উধাও হয়ে যায়। ফলে রুস্তম কাউকে দেখতে না পেয়ে রাখশের ওপর বিরক্ত হয়ে আবার ঘুমাতে যায়। এরপর দৈত্যটি আবার ফিরে এলে রাখশ একই কাজ করে। এবারও রুস্তম কাউকে দেখতে না পেয়ে রাখশের ওপর আরো বেশী বিরক্ত হন। আর একবার একই কাজ করলে তাকে হত্যা করবেন বলে রুস্তম রাখশকে শাসিয়ে দেয়। তৃতীয়বারে যখন দৈত্যের আবির্ভাব ঘটে তখন রাখশ প্রথমে বুঝতে পারছিল না কি করবে। একদিকে দৈত্য এবং অন্যদিকে রুস্তমের ক্রুদ্ধ হবার আশঙ্কা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে রুস্তমের দয়ার ওপর ভরসা করে তাকে জাগিয়ে তোলে।
দৈত্যটি আবারও মাটির ভেতরে লুকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এবার প্রভুর অনুগ্রহে সে মাটিতে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হল। ফলে শাহনামার মহানায়ক রুস্তম তাকে দেখে ফেলে। এ অবস্থায় দৈত্যটি রুস্তমের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চায়। রুস্তম যখন শক্তিশালী এই দানবের সাথে যুদ্ধে সুবিধা করতে পারছিলেন না, তখন রাখশ দৈত্যের শরীরে কামড় বসিয়ে দিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। এই সুযোগে রুস্তম তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে এবং প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এবারে রুস্তমের অভিযানের চতুর্থ পর্বের গল্প। আরো অনেক পথ পাড়ি দিয়ে রুস্তম পৌঁছেন সবুজ প্রান্তরে লতা-পাতা ও ফুলের বাগানে ঘেরা ঝর্ণার পাশে। সেখানে ছিল ঝলসানো ছাগলের মাংসসহ রকমারী নানা খাবার ও পানীয়-ভরা পানপাত্র। রুস্তম পানীয় পান করার পর বাদযন্ত্র নিয়ে গান গাইতে শুরু করেন। এ গানে ফুটে উঠে করুণ রসে সিক্ত তার মনের নানা বেদনার কথা। এ গানের শব্দ পৌঁছে যায় এক ডাইনী বুড়ির কানে। সে কম বয়সী রুপসী যুবতীর সাজ নিয়ে রুস্তমের সামনে হাজির হয়। রুস্তম খুশী হয় এই যুবতীকে দেখে এবং এ জন্য প্রভুর নাম নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা প্রার্থনা শুরু করেন। প্রভুর নাম উচ্চারিত হবার সাথে সাথে ডাইনী বুড়ির আসল চেহারা প্রকাশ হয়ে পড়ে। ডাইনী পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু রুস্তম তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে।

রুস্তমের দুঃসাহসী সাত অভিযান শাহনামার শিহরণ-জাগানো কিছু মজার ঘটনা। ইরানের রাজা কাভুস মাজান্দারানের রাজার সাথে যুদ্ধ করার জন্য সেনা অভিযান শুরু করলে মাজান্দারানের রাজা শ্বেত দানবের মাধ্যমে কাভুসকে বন্দী করে। এ খবরটি ইরানে ও বিশ্ব-সেরা পাহলোয়ান জালের কাছে পৌঁছে। কাভুসকে মুক্ত করার জন্য পিতা জালের নির্দেশে রুস্তম তার ঘোড়া রাখশকে নিয়ে যুদ্ধ-যাত্রা শুরু করে। এভাবে শুরু হয় মহাবীর রুস্তমের দুঃসাহসী সাত অভিযান। এই সাতটি অভিযানের মধ্যে চারটির বর্ণনা আমরা গত সপ্তায় শুনেছি। এসব গল্পে দেখা যায় পৃথক দুই ঘটনায় রুস্তমের ঘোড়া সিংহকে পরাজিত করে এবং রুস্তম বিশাল শুস্ক মরু-প্রান্তর পেরিয়ে অবশেষে এক সমৃদ্ধ ও পানিপূর্ণ স্থানে পৌঁছে। এরপর রুস্তম তার ঘোড়ার সহযোগিতায় বিশাল আকৃতির দৈত্যকে হত্যা করে এবং চতুর্থ ঘটনায় যুবতীর ছদ্মবেশী ডাইনি বুড়িকে দ্বিখন্ডিত করে রুস্তম।

ডাইনি বুড়িকে হত্যার পর শাহনামার মহানায়ক রুস্তম আবারও এগিয়ে যেতে থাকে মাজান্দারানের দিকে। সারা রাত সফরের পর ভোর বেলায় রুস্তম সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামল এক প্রান্তরে পৌঁছে। রুস্তম যুদ্ধের পোশাক খুলে ও রাখশকে লাগাম-মুক্ত করে সবুজ ঘাসের ওপর ঘুমিয়ে পড়েন। এদিকে সেখানকার এক প্রহরী কৃষি-ক্ষেতে রাখশকে দেখতে পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়। সে একটি লাঠি নিয়ে রাখশকে মারতে আসে। এ অবস্থায় রাখশের হ্রেষা ধ্বনি শুনতে পেয়ে রুস্তম ঘুম থেকে উঠে যায়। ঐ প্রহরী তার ক্ষেতে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে ক্ষেতের ফসলের ক্ষতি করার অভিযোগ তুলে রুস্তমকে শয়তান বলে তিরস্কার করে । ওই প্রহরীর এ ধরনের কথায় রুস্তম ক্ষুব্ধ হন এবং তার দুই কান ধরে এত জোরে টান দেন যে কান দুটি ছিঁড়ে যায়। প্রহরী রক্তাক্ত অবস্থায় আওলাদ নামের স্থানীয় পাহলোয়ানের শরণাপন্ন হয় ও তার কাছে ঘটনা খুলে বলে। আওলাদ এ সময় নিজ পাহলোয়ানদের নিয়ে শিকারে বের হচ্ছিল। ঘটনা শুনে ক্ষিপ্ত আওলাদ তার সঙ্গীদের নিয়ে রুস্তমকে শাস্তি দেয়ার জন্য সে দিকেই রওনা দেয়।

আওলাদ ও তার সঙ্গীরা শাহনামার মহাবীর রুস্তমকে রাখশের ওপর যুদ্ধ-সাজে সজ্জিত দেখতে পেল। সে রুস্তমের কাছে প্রহরীর নালিশের ব্যাপারে কৈফিয়ত চেয়ে তাকে শাস্তি দেবে বলে ঘোষণা করে। রুস্তমও তাকে লড়াইয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ করে এবং তরবারী নিয়ে ভেড়ার পালের মধ্যে সিংহের মত আবির্ভূত হয়। তার তরবারীর প্রত্যেক আঘাতে আওলাদের দু-জন পাহলোয়ানের দেহ দ্বিখন্ডিত হচ্ছিল। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আওলাদের দল-বল ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু রুস্তম ফাঁদ নিক্ষেপ করে আওলাদকে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। এরপর রুস্তম আওলাদকে বলে যে সে যদি বাঁচতে চায় তাহলে তাকে শ্বেত দানব ও তার সেনাপতি পুলাদ গান্দীর অবস্থান এবং ইরানের শাহ কাভুসের অবস্থান জানাতে হবে। এ ব্যাপারে পথ দেখালে রুস্তম তাকে মাজান্দারানের রাজা হিসেবে নিয়োগ দেবে বলেও কথা দেয়। কিন্তু কোনো ছলনা বা মিথ্যার আশ্রয় নিলে তাকে হত্যা করবে বলেও রুস্তম আওলাদকে বলে রাখে।

আওলাদ শাহনামার মহানায়ক রুস্তমকে সহযোগিতা করতে ও তাকে তথ্য দিতে রাজী হয় এবং রুস্তমের পথ-প্রদর্শক হয়। বারো হাজার দানব সেনা-বেষ্টিত দৈত্য সম্রাট “শ্বেত-দানব” কত দূরে রয়েছে সে বিষয়সহ অত্যন্ত দূর্গম স্থানে তার সেনাপতিদের অবস্থান সম্পর্কেও সে তথ্য দেয়। পাহাড়ের সমান বিশাল আকৃতির শ্বেত দানবের সাথে যুদ্ধে রুস্তম জিততে পারবে না বলে সে আশঙ্কা ব্যক্ত করে। সে এটাও জানায় যে, মাজান্দারানের রাজার হাজার হাজার অশ্বারোহী সেনা রয়েছে এবং রয়েছে যুদ্ধের জন্য রক্ষিত ১২০০ হাতী। তাই রুস্তম যদি ইস্পাতের মত শক্তিশালীও হয় তবও তারা তাকে শেষ করে ফেলবে বলে আওলাদ মন্তব্য করে।

আওলাদের আশঙ্কার জবাবে শাহনামার মহাবীর রুস্তম তাকে বলে যে, যুদ্ধ বিষয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, তুমি কেবল আমাকে পথ দেখাও এবং দেখিয়ে দাও দৈত্যের হাতে বন্দী ইরানী রাজা কাভুস কোথায় আছে। রুস্তম ও আওলাদ দিন রাত এগিয়ে চলে। অবশেষে তারা এসপেরুজ পাহাড়ের পাদদেশে আসে। এখানে কাভুস দৈত্যদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল।
এরপর শুরু হয় রুস্তমের ষষ্ঠ অভিযান ।

মধ্যরাতে মাজান্দারানের দিক থেকে কলরব তীব্র হয়ে ওঠে। নানা স্থানে প্রদীপ ও আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে । শাহনামার প্রধান চরিত্র রুস্তম আওলাদকে ঐ জায়গার নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলে যে, ওইখান থেকেই শুরু হয়েছে মাজেন্দারান। দৈত্যরা সেখানে প্রহরা দিচ্ছে। আওলাদ আঙ্গুল উঁচিয়ে একটা গাছ দেখিয়ে বলে, আরঝাঙ্গ নামক দৈত্যের বাসা ওইখানে। এটা শুনে রুস্তম স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে যায়। সকালে রুস্তম আওলাদকে গাছের সাথে বেঁধে ফেলে। এরপর নিজের ও দাদার মুগুর নিয়ে আরঝাঙ্গ দৈত্যের আস্তানার দিকে এগিয়ে যায়। আস্তানার কাছে এসে রুস্তম এত জোরে হাঁক দেয় যে, মনে হচ্ছিল তার গর্জনে সমুদ্র ও পাহাড় চৌচির হয়ে যাবে। গর্জন শুনে বেরিয়ে আসে আরঝাঙ্গ। তাকে দেখা মাত্রই রুস্তম রাখশকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ও এই দানবের মাথা তার শরীর থেকে আলাদা করে দেয়। এরপর সে আরঝাঙ্গের মাথাটা নিক্ষেপ করে দৈত্য-সেনাদের মধ্যে। রুস্তমের অস্ত্র ও এ দৃশ্য দেখে ভয়ে দৈত্য-সেনারা পালাতে থাকে। রুস্তম তাদের মধ্যেও ঝাঁপিয়ে পড়ে সব দৈত্য-সেনা নির্মূল করে।
দুপুরের আগেই রুস্তম এসপেরুজ পাহাড়ে ফিরে আসে এবং আওলাদকে বন্ধন মুক্ত করে বলে যে, এবার আমাকে কাভুসের অবস্থান দেখিয়ে দাও। আওলাদ তাকে কাভুসকে যেখানে বন্দী রাখা হয়েছে সেদিকে নিয়ে যায়। ইরানীদের বন্দীশালা দেখেই শাহনামার প্রধান নায়ক রুস্তমের ঘোড়া রাখশ খুব জোরে হ্রেষা ধ্বনি দিতে থাকে। এই ধ্বনি শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠে কাভুস। কিন্তু তার সঙ্গী ইরানী বন্দীরা তখনও হতাশ হয়েছিল। কাভুসের আনন্দসূচক বক্তব্যকে তারা পাগলের প্রলাপ বলে ধরে নেয়। এমন সময় রুস্তম সেখানে হাজির হয়। ফলে বন্দী ইরানী বীর ও নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাড়া জাগে ও প্রাণ-চাঞ্চল্য দেখা দেয়। রুস্তম কাভুসকে সম্মান দেখান এবং কাভুস তাকে জড়িয়ে ধরে। এরপর তারা পরস্পরের সুখ-দুঃখের খোঁজ-খবর নেন।

মহাবীর রুস্তমের সাত উপাখ্যান বা দুঃসাহসিক সাতটি অভিযানের ঘটনা শাহনামার রোমাঞ্চকর কিছু ঘটনা। ইরানের রাজা কাভুস মাজান্দারানে অভিযান শুরু করলে মাজান্দারানের রাজা শ্বেত দানবের মাধ্যমে কাভুসকে বন্দী করে। এ খবরটি ইরানে ও বিশ্ব-সেরা পাহলোয়ান জালের কাছে পৌঁছে। কাভুসকে মুক্ত করার জন্য পিতা জালের নির্দেশে রুস্তম তার ঘোড়া রাখশকে নিয়ে যুদ্ধ-যাত্রা শুরু করে। এভাবে শুরু হয় মহাবীর রুস্তমের দুঃসাহসী সাত অভিযান। এসব অভিযানের মধ্যে ছয়টি অভিযানের বর্ণনা আমরা গত কয়েক সপ্তায় শুনেছি। আমরা শুনেছি যে, পৃথক দুই ঘটনায় রুস্তমের ঘোড়া সিংহকে পরাজিত করে এবং রুস্তম পানিবিহীন এক বিশাল ও দূর্গম মরু প্রান্তর পেরিয়ে অবশেষে এক সমৃদ্ধ ও পানিপূর্ণ স্থানে পৌঁছে। এরপর রুস্তম তার ঘোড়ার সহযোগিতায় বিশাল আকৃতির দৈত্যকে হত্যা করে এবং চতুর্থ ঘটনায় যুবতীর ছদ্মবেশী ডাইনি বুড়িকে দ্বিখন্ডিত করে রুস্তম। পঞ্চম ঘটনায় রুস্তম আওলাদ নামক পাহলোয়ানকে পরাজিত করে তাকে নিজ দলভুক্ত করে। ষষ্ঠ ঘটনায় দেখা যায় রুস্তম আওলাদের সহযোগিতায় আরঝাঙ্গ দৈত্যকে হত্যা করে এবং ইরানী বন্দীদের অবস্থান খুঁজে পায়। এর একটু পরই শুরু হয় রুস্তমের দুঃসাহসিক সপ্তম অভিযান।
আরঝাঙ্গ দৈত্যকে হত্যা পর শাহনামার মহাবীর রুস্তম এসপেরুজ পাহাড়ে ফিরে আসেন এবং এর পর আওলাদের সহায়তায় তিনি ইরানী বন্দীদের শিবিরে যান। সেখানে তাদের মধ্যে দেখা দেয় অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্য। রুস্তম সম্রাট কাভুসসহ তুস, গুদার্জ, গীভ ও বাহরামের মত ইরানী সর্দারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। পারস্পরিক খোঁজ-খবর নেয়ার পালা শেষ হবার পর সম্রাট কাভুস রুস্তমকে শ্বেত দানবসহ তার দৈত্য-সেনাদের ব্যাপারে তাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন ও তার ঘোড়াকে লুকিয়ে রাখতে বলেন । আরঝাঙ্গ দৈত্যকে হত্যার খবর শ্বেত দানব ও তার দৈত্য-সেনারা জানলে তারা চরম প্রতিশোধ নেবে বলে কাভুস আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। তাই শ্বেত দানবকে হত্যার অভিযান শিগগিরই শুরু করতে বলেন তিনি। কাভুস বলেন, শ্বেত দানবই সব দৈত্যের আশ্রয়দাতা। তিনি আরো জানান, শ্বেত দানবকে ধরতে হলে সাতটি পাহাড় পেরোতে হবে এবং এসব পাহাড়ের স্থানে স্থানে রয়েছে বহু ভয়ংকর সব দৈত্য-প্রহরী। সম্রাট ও তার সেনারা বন্দী শিবিরে অনেক কষ্টের মধ্যে রয়েছেন এবং সম্রাট নিজে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলে তিনি জানান। কেবল শ্বেত দানবের মগজ ও হৃদপিন্ডের রক্ত তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে পারে বলে ডাক্তাররা জানায়। শ্বেত দানবের ৩ ফোটা রক্ত চোখে দেয়া সম্ভব হলে কাভুস দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন বলে তারা জানিয়েছিল। রুস্তম মহান প্রভুর সহায়তায় শ্বেত দানব ও তার শক্তিশালী দানব-সেনাদের পরাজিত করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে।
এরপর রুস্তম তার ঘোড়া রাখশ ও আওলাদ পাহলোয়ানকে নিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলে এবং খুব দ্রুত সাতটি পাহাড় পেরিয়ে শ্বেত দানবের গুহার দ্ধার-প্রান্তে পৌঁছে যায়। বহু দানব-সেনা সেখানে প্রহরা দিচ্ছিল।
রুস্তম শ্বেত দানবকে পরাজিত করার ব্যাপারে আওলাদ পাহলোয়ানের কাছ থেকে কিছু কৌশল জানতে চাইলে আওলাদ তাকে জানায় যে, দৈত্যরা রাতে জেগে থাকে ও সূর্য ওঠার পর দিনে ঘুমিয়ে পড়ে, তাই দিনের বেলায় হামলা চালালে তাদের পরাজিত করা সহজ হবে।
রুস্তম আওলাদের কথা মেনে নিয়ে দিনের বেলায় সব দৈত্য যখন ঘুমাচ্ছিল তখন প্রভুর নাম নিয়ে প্রবল গর্জন তুলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার তরবারীর আঘাতে দৈত্য-সেনাদের মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। দৈত্য-প্রহরীদের সাফ করে রুস্তম পৌঁছে যায় শ্বেত-দানবের গুহার কাছে। বিশাল গুহাটিতে ঘুমিয়ে ছিল পাহাড় আকৃতির শ্বেত দৈত্য। তার পুরো শরীর ছিল কালো, আর মুখটা ছিল দুধের মত সাদা। রুস্তম কিছুটা প্রস্তুতি নিয়ে চিতা বাঘের মত গর্জে উঠে শ্বেত দানবকে জাগিয়ে তোলে ও তার ওপর হামলা শুরু করে। শ্বেত দানব একটা বড় পাথর হাতে তুলে নিয়ে রুস্তমের দিকে এগিয়ে আসে। রুস্তম সিংহের মত ক্রুদ্ধ হয়ে দানবটার ওপর তরবারির আঘাত হেনে তার একটা পা ও একটা হাত কেটে ফেলতে সক্ষম হয়। ক্রুদ্ধ শ্বেত দানব ও রুস্তমের মধ্যে বেশ ধ্বস্তাধস্তি হতে থাকে। উভয়ের শরীর থেকেই রক্ত বেরুতে থাকে। এক পর্যায়ে মহাবীর রুস্তম শ্বেত দানবকে মাটি থেকে উঠিয়ে তার মাথা চেপে ধরে ও আছাড় মেরে তাকে মাটিতে আঘাত করে। শ্বেত দানবকে মাটিতে ফেলার পর পরই তরবারি বের করে তার বুকের পাঁজর চিরে কলিজা বের করে নেয় রুস্তম। ফলে নীথর বা মৃত হয়ে পড়ে শ্বেত দানব। এরপর রুস্তম গুহা থেকে বের হয়ে আসে ও আওলাদকে নিয়ে কাভুসের কাছে পৌঁছে।
আওলাদ রুস্তমের বিজয়ে অভিভূত ও বিস্মিত হয়। এ যুদ্ধে বিজয়ী হলে তাকে মাজান্দারানের শাসনভার দেয়া হবে বলে রুস্তম যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওলাদ তা রুস্তমকে স্মরণ করিয়ে দেয়। রুস্তম তাকে শিগগিরই মাজান্দারানের শাসনভার দেয়া হবে বলে জানায়।
এদিকে কাভুস ও ইরানীদের বন্দী শিবিরে রুস্তমের বিজয়ে খবর পৌঁছে যায়। ফলে ইরানীদের মধ্যে যেন উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। তারা এতদিন মুক্তির প্রহর গুণছিল। রুস্তম সম্রাট কেইকাভুসের কাছে এসে বলে যে, শ্বেত দানবকে হত্যা করে তার কলিজা নিয়ে এসেছি। শুনে সম্রাট তার জন্য দোয়া করলেন এবং তার শাসনামলে এমন মহাবীরের উপস্থিতির জন গর্ব প্রকাশ করলেন। রুস্তম সম্রাটের চোখে শ্বেত দানবের কলিজার তিন ফোটা রক্ত ফেলার পর সম্রাট দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। এরপর সম্রাট হাতীর দাঁতের সিংহাসনে বসেন এবং পূর্বপুরুষদের দেয়া মুকুট মাথায় পরেন। সম্রাটসহ বাহরাম, তুস, গুদার্জ, ফারিবোর্জ ও গোরগিনের মত ইরানী সর্দারা আনন্দে মেতে ওঠেন। গেটা এক সপ্তাহ ধরে আনন্দ-উৎসব চলে। অষ্টম দিনে ইরানী সেনাসহ সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে আবারও মাজান্দারানে হামলা চালায় এবং সন্ধ্যার দিকে বহু দৈত্য ও যাদুকর নিহত হলে মাজান্দারান মুক্ত হয়। এভাবে শেষ হয় শাহনামার মহাবীর রুস্তমের দুঃসাহিক সপ্তম অভিযান।

সিয়’ভাশ ফেরদৌসীর শাহনামার আরো একটি আলোচিত ও জনপ্রিয় চরিত্র। তিনি ছিলেন ইরানের সম্রাট কাভুসের সন্তান । জন্মের পরই তাকে রুস্তম পাহলোয়ানের কাছে পাঠানো হয়। রুস্তমের তত্ত্বাবধানে সাত বছর থেকে যুদ্ধ-বিদ্যা ও শিকারে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সে বীরত্বপূর্ণ নানা গুণ অর্জন করে। এরপর সিয়’ভাশকে কাভুসের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।
এরপর থেকে দেশ রক্ষার জন্য আফ্রাসিয়াবের সাথে যুদ্ধে তুরানে যাবার সময় পর্যন্ত সিয়’ভাশ কে নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। কাভুসের ছিল সুদাবেহ নামক এক স্ত্রী। সে সুদর্শন ও বীর যুবক সিয়’ভাশের প্রণায়সক্ত হয়ে পড়ে। সুদাবেহ ছিল হামাভারানের রাজকন্যা। কিন্তু পিতার স্ত্রী তথা সৎ মায়ের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেন পবিত্র মনের অধিকারী সিয়’ভাশ । ফলে তার মন জয় করার জন্য সুদাবেহর সমস্ত সুযোগ-সুবিধার আয়োজন নিস্ফল হয়ে পড়ে। এ কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার জন্য সিয়’ভাশ এক আল্লাহ তথা মহান স্রষ্টার সাহায্য চেয়েছিলেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পিতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন।

কিন্তু সুদাবেহ সিয়’ভাশ কে পাবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং এ জন্য সে যে কোনো অন্যায় পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধা বোধ করেনি। এক পর্যায়ে সে সিয়’ভাশকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য অভিযুক্ত করে। কায়কাভুসও দূরাচারিনী স্ত্রীর অভিযোগে প্রতারিত হন। তিনি জানতেন যে সিয়’ভাশ নির্দোষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও সুদাবেহর দাবী অনুযায়ী সিয়’ভাশকে আগুনে ঝাঁপ দিতে হবে বলে কাভুস নির্দেশ দেন। সে যুগের রীতি অনুযায়ী কেউ নির্দোষ কিনা তা প্রমাণের জন্য তাকে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করতে হত। আগুন পাপী বা অপরাধী ছাড়া ভালো মানুষকে পোড়ায় না বলে তারা মনে করত। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য সিয়’ভাশ পিতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করেন। দেখা গেল তিনি অগ্নিকুন্ড থেকে বেরিয়ে এসেছেন এবং আগুনে তার একটি পশমও পুড়েনি। ফলে সুদাবেহর অপরাধই প্রমাণিত হয়। কাভুস সুদাবেহকে হত্যা করতে চাইলেন। সিয়’ভাশ জানতেন পিতা তাকে ভালবাসেন এবং সুদাবেহর মাধ্যমে প্রভাবিত আচরণের জন্য একদিন তিনি অনুতপ্ত হবেন। তাই তিনি নিজেই সুদাবেহকে হত্যা না করার জন্য পিতাকে অনুরোধ করেন। কাভুস এ অনুরোধ রক্ষা করেন।

এ ঘটনার পর তুরানের রাজা আফ্রাসিয়াব ইরানের সীমান্তে হামলা করেন এবং সীমান্তবর্তী জিহুন নদী পেরিয়ে ইরানে প্রবেশ করেন। সিয়’ভাশ পিতা কাভুসকে অনুরোধ করেন যাতে তাকে শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। এভাবে তিনি নিজেকে পিতা ও সুদাবেহ থেকে দূরে রাখতে চাইলেন। কাভুস রাজী হলেন। সিয়’ভাশ রুস্তমসহ ইরানের নামকরা পাহলোয়ানদের নিয়ে যুদ্ধ-যাত্রা শুরু করেন এবং যুদ্ধে আফ্রাসিয়াবকে পরাজিত করেন ও তুরানীরা পালিয়ে যায়। আফ্রাসিয়াবের বাহিনী বালখ পর্যন্ত পিছু হটে। সিয়’ভাশ বিজয়ের কথা জানিয়ে পিতার কাছে চিঠি লেখেন এবং তুরানে হামলা করার জন্য পিতার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু কাভুস অনুমতি দেননি, বরং তিনি ইরানের সীমানার বাইরে না যেতে সিয়’ভাশকে নির্দেশ দেন।

তুরানের রাজা আফ্রাসিয়াব পুনরায় সেনা সংগ্রহ করে ইরানে হামলার চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। কিন্তু তিনি এক ভয়ানক স্বপ্ন দেখার পর ইরানের সাথে সন্ধি করেন। আফ্রাসিয়াব সন্ধি লংঘন না করার গ্যারান্টি হিসেবে সিয়’ভাশের দাবী অনুযায়ী ১০০ জন তুরানী পাহলোয়ানকে পনবন্দী হিসেবে সিয়’ভাশের কাছে অর্পণ করেন। এরা ছিল আফ্রাসিয়াবের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি।
কিন্তু কায়কাভুস অতীতের মত আবারও হঠাৎ করে মত বদলে ফেলেন। তিনি সন্ধি ভেঙ্গে ঐ ১০০ জন তুরানী পাহলোয়ানকে ইরানে পাঠাতে সিয়’ভাশকে নির্দেশ দেন যাতে তাদের হত্যা করা যায় এবং তুরানেও হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। সিয়’ভাশ এ কাজকে অনৈতিক ও কাপুরোষোচিত বলে মনে করেন এবং পিতার এ নির্দেশ মান্য করতে অস্বীকার করেন। কিন্তু সম্রাট তথা পিতার নির্দেশ অমান্য করায় ইরানে ফিরে আসা সিয়’ভাশের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি সিয়’ভাশকে অনুরোধ জানান তাকে যেন তুরানের মধ্য দিয়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাবার সুযোগ দেয়া হয়।

আফ্রাসিয়াবের ছিল এক বুদ্ধিমান উজির। তার নাম ছিল পিরান ভিসেহ। তার পরামর্শ নিয়ে আফ্রাসিয়াব সিয়’ভাশকে তুরানেই থেকে যাবার আমন্ত্রণ জানান। সিয়’ভাশ তুরানে চলে আসেন । আফ্রাসিয়াব তাকে নিজ পুত্রের মত ভালবাসতে লাগলেন । কিছু দিন পর আফ্রাসিয়াব নিজ কন্যা ফারাঙ্গিসকে সিয়’ভাশের সাথে বিয়ে দেন এবং তাকে একটি রাজ্যও দান করেন। সিয়’ভাশ গাঙ্গদ্বেজ ও সিয়’ভাশ-গের্দ নামক দুটি শহর গড়ে তুলে সেখানকার শাসক হন।
গার্সিভেজ নামে আফ্রাসিয়াবের ছিল এক হিংসুটে ভাই। সে ভাবল যে চলতি অবস্থা বা ধারা অব্যাহত থাকলে সবাইই সিয়’ভাশের ভক্ত ও অনুসারী হয়ে উঠবে এবং কেউই তার প্রতি গুরুত্ব দেবে না। গার্সিভেজ মিথ্যা কথা প্রচার করে আফ্রাসিয়াব ও সিয়’ভাশের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করেন। আফ্রাসিয়াবের মধ্যে এ সন্দেহ ঢুকে গেল যে ইরানী শাহযাদা সিয়’ভাশ হয়ত তুরানের ওপর কর্তৃত্ব করতে চান ও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। গার্সিভেজের কুমন্ত্রণায় আফ্রাসিয়াব অত্যন্ত কাপুরোষোচিতভাবে সিয়’ভাশকে হত্যা করে।

পিরান ভিসেহর হস্তক্ষেপে সিয়’ভাশের স্ত্রী ফারাঙ্গিস প্রাণে রক্ষা পায়। কিছু দিন পর ফারাঙ্গিস ও সিয়’ভাশের পুত্র কেইখসরু জন্ম নেয়। পিরান ভিসেহ তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে। কারণ, আফ্রাসিয়ার তাকে ভয় পেত এই ভেবে যে সে পিতার হত্যার বদলা নিতে তাকে হত্যা করবে।
সিয়’ভাশের নিহত হবার খবর ইরানে পৌঁছুলে ক্ষুব্ধ রুস্তম প্রথমেই কাভুসের দরবারে গিয়ে সুদাবেহকে হত্যা করে। কারণ, এ নারীর জন্যই সিয়’ভাশ দেশ ত্যাগ করেন। এরপর মহাবীর রুস্তম তুরানে হামলা করেন। সিয়’ভাশ হত্যার জের ধরে ইরান ও তুরানের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে এ যুদ্ধ চলে এবং শেষ পর্যন্ত ইরানীরা বিজয়ী হয়। নতুন বাদশাহ হন সিয়’ভাশের পুত্র কেই খসরু।

ফেরদৌসীর মহাকাব্য শাহনামার সবচেয়ে করুণ ঘটনাগুলোর মধ্যে এ কাহিনীটি অন্যতম। ফেরদৌসীর অপূর্ব ভাষা-জ্ঞান ও বর্ণনাভঙ্গী এ অংশটিকে করেছে অনন্য। সিয়’ভাশের চরিত্র কিছুটা বিচিত্র ধরনের। তিনি সৎ ও বীর হওয়া সত্ত্বেও নিজ বন্ধু-বান্ধব ও স্বদেশ ছেড়ে শত্রুর দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন যা ইরানের পাহলোয়ানদের ধারার ব্যতিক্রম বা তাদের কাছে অপছন্দনীয়। আর এ জন্যই তাকে মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হতে হয়েছে বলে ফেরদৌসী মনে করেন।

 

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *