পৃথিবীর ছাদে বাস করা মানুষগুলো কেমন আছে

পৃথিবীর ছাদে বাস করা মানুষগুলো কেমন আছে [ আফগানিস্তানের এক প্রান্তে তাজিকিস্তান, পাকিস্তান ও চীন সীমান্তসংলগ্ন ২০০ মাইল লম্বা এক করিডোরে বসবাস আফগান কিরগিজ জনগোষ্ঠীর। যেখানে ডাক্তার নেই, শিক্ষক নেই, এমনকি একটা গাছও নেই, যেখানে ফসল ফলে না, সেখানে বসত করে ১৩০০ মানুষ। কী তাদের বর্তমান, কেমন তাদের ভবিষ্যৎ এ অনুসন্ধান চালিয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। অন্য দিগন্তের জন্য তারই ঈষৎ সংক্ষেপিত বাংলা রূপান্তর করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী ]

খানের সারা জীবনের স্বপ্ন একটি গাড়ি। অথচ তার এলাকায় গাড়ি চলাচলের উপযোগী কোনো রাস্তাই নেই। খানের পিতা, যিনি এর আগে খান ছিলেন, তিনি নিজ এলাকায় একটি রাস্তার জন্য দেনদরবার করেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। নতুন খানও সেই একই কাজ করছেন।
একটি রাস্তা হলে তার এলাকায় সহজে ডাক্তার আসবে, ওষুধপত্র আসবে। তাহলে এখন যে নানা রোগ-ব্যাধিতে প্রতিদিন গাদা গাদা মানুষ মরবে, সেটা কমবে। রাস্তা হলে বাইরে থেকে আসবে ব্যবসায়ীরা। তারা আনবে নানা রকম সবজি। তবেই না এলাকাবাসীর উন্নতি হবে। তাই একটি রাস্তার জন্য কাজ করে চলেছেন খান, আর স্বপ্ন দেখছেন নিজের একটি গাড়ির।

তবে রাস্তা ও গাড়ি দুটোই এখন পর্যন্ত স্বপ্ন। বাস্তবতা হলো চমরি গরু। ওর পিঠে চড়েই তাদের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন সব। এভাবেই জীবন চলে আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী কিরগিজ যাযাবর জনগোষ্ঠীর। পশুচারণই তাদের একমাত্র পেশা।

যেদিন খানের সাথে কথা হচ্ছিল, সেদিন তার অন্যত্র যাওয়ার কথা। যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনধারাই এ রকম। কোথায় তৃণভূমিতে নতুন ঘাস গজালো, খবর পেলেই তারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে ছোটে সেদিকে। খানও তা-ই করছিলেন। যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে চমরি গরুর নাকে দড়ি লাগানো হচ্ছিল। তার পিঠে তোলা হচ্ছিল পরিযায়ী সংসারের সব সামানা কয়েক ডজন টি-পয়, একটি লোহার স্টোভ, একটি গাড়ির ব্যাটারি, দু’টি সৌর প্যানেল, একটি বড় গোলাকার তাঁবু এবং ৪৩টি কম্বল। খানের ছোট ভাই এবং আরো ক’জন বাঁধাছাদায় ব্যস্ত।
কিরগিজ যাযাবরেরা তাদের জন্মভূমিকে বলে থাকে ‘পৃথিবীর ছাদ’। কথাটি শুনতে বেশ কাব্যিক ও সুন্দর। সুন্দর যে সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এখানকার যে পরিবেশ, তা মনুষ্যবাসের কতটা উপযোগী, সে কথা বলা বেশ কঠিন।

দু’টি উপত্যকা নিয়ে গঠিত এই এলাকার নাম পামির। একে চার দিক থেকে ঘিরে আছে হিমবাহ। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৪ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত এই এলাকায় বাতাস বয় ভয়ঙ্কর গতিতে। এখানে ফসল ফলানো অসম্ভব। বছরে ৩৪০ দিন তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের নিচে। অনেক কিরগিজ জীবনে কোনো দিন গাছ দেখেনি।

আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে বেরিয়ে থাকা সাঁড়াশি আকৃতির একখণ্ড ভূমিতেই এ দুই উপত্যকা। অনেকে একে বলেন ওয়াখান করিডোর। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে যুদ্ধে লিপ্ত হয় ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্য। সেই তথাকথিত ‘গ্রেট গেমের’ ফল এই করিডোর। ১৮৭৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে ‘বাফার জোন’ হিসেবে এর জন্ম। জারশাসিত রাশিয়া যাতে ব্রিটিশশাসিত ভারতে ঢুকতে না পারে, তারই কৌশলী একটা ব্যবস্থা। এর আগে কয়েক শতাব্দী ধরে এ এলাকা ছিল সিল্ক রুটের অংশ। এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত বাণিজ্যবহর, সৈন্যদল, পরিব্রাজক ও ধর্মপ্রচারক দল। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই পথ পাড়ি দেন বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো।

১৯১৭ সালে রাশিয়া ও ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর এসব সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়। একদার প্রশস্ত রাজপথ পরিণত হয় কানাগলিতে। বর্তমানে করিডোরের চার দিকে বেশ ক’টি দেশ উত্তরে তাজিকিস্তান, দক্ষিণে পাকিস্তান এবং পূর্বে চীন। মূল ভূখণ্ড আফগানিস্তানের অবস্থান পশ্চিমে; বহু দূরে। করিডোরটি ২০০ মাইল লম্বা। এই বিচ্ছিন্ন অবস্থানের কারণে অনেক কিরগিজ এটাকে আলাদা রাষ্ট্রও বলে থাকে। তারা নিজেদের ভেবে থাকে দূরের কোনো দ্বীপে আটকে থাকা জনগোষ্ঠী, যারা তুষারাবৃত পর্বত শ্রেণীর ভেতরে বন্দী এবং ইতিহাস, রাজনীতি ও সঙ্ঘাতের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছে।

এই করিডোর থেকে সবচেয়ে কাছের রাস্তাটিতে পৌঁছতে লাগে তিন দিন। যেতে হয় অনেকগুলো পর্বত পাড়ি দিয়ে। সেই রাস্তাটিকেই নিজের এলাকা পর্যন্ত নিয়ে আসতে চান খান। এই রাস্তার প্রান্ত থেকে সবচেয়ে কাছের যে শহর, যে শহরে আছে একটি হাসপাতাল ও কিছু দোকানপাট, সেটাও আরো এক দিনের পথ। কিরগিজদের অবস্থান বহির্বিশ্ব থেকে কত দূরে, এ থেকেই তা বোঝা যায়। এবং এই দূরত্বের কারণেই ওই অঞ্চলে মৃত্যুহার ভয়াবহ রকমের বেশি। কেননা সেখানে নেই কোনো ডাক্তার, নেই স্বাস্থ্য ক্লিনিক। ওষুধপত্র বলতে যা পাওয়া যায়, তা-ও নামেমাত্র। ফলে ছোটখাটো অসুখও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে সময় নেয় না। শিশুমৃত্যুর হার সেখানে বিশ্বের সর্বোচ্চ। অর্ধেকেরও বেশি শিশু বয়স পাঁচ হওয়ার আগেই মারা যায়। পাঁচ, ছয় বা সাতটি সন্তান মারা গেছে, এমন মা-বাবার সংখ্যা অনেক। প্রসূতিমৃত্যুর হারও ভয়ানকভাবে বেশি।

কিরগিজ দম্পতি আবদুল মোতালিব ও হালচা খানের কথাই ধরা যাক। তাদের একে একে ১১টি সন্তানই মারা গেছে। তাদের বেশির ভাগই এমন রোগে মারা গেছে, যা চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য। তাদের সর্বশেষ সন্তানটিও পাঁচ বছর বয়সে মারা যায়। এই শোক ভুলতে মোতালিব-হালচা দম্পতি আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকেন। কিরগিজরা এই নেশাটি ব্যাপকভাবে করে থাকে।

বাইরের দুনিয়ার খোঁজখবর কিন্তু মোটামুটি রাখেন খান। তিনি দু’বার ওয়াখান অঞ্চলের বাইরে গেছেন। এ ছাড়া বাইরে থেকে তার এলাকায় আসা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অনেক খবর পান তিনি। নিজেদের পালিত পশুর বিনিময়ে ওই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেন কাপড়চোপড়, গয়নাগাটি, আফিম, সানগ্লাস, ঘোড়ায় চড়ার জিন, কার্পেট এবং মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোনটি তাদের যোগাযোগের কাজে লাগে না। এটি দিয়ে তারা গান শোনে এবং ছবি তোলে।

এটুকু যোগাযোগের মধ্য দিয়েই খান বুঝতে পারেন, পৃথিবী কতটা এগিয়ে যাচ্ছে আর তারা কতটা পিছিয়ে। তিনি জানেন, পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই চিকিৎসাসেবার আওতায় আছে। তাদের মতো এভাবে আর কোথাও শিশুরা মারা যায় না। আরো জানেন, কারো কম্পিউটার গোটা পৃথিবীকে এক সূত্রে গেঁথে রেখেছে।

খানের বয়স এখন ৩২। ‘খান’ হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট কম বয়স। দেখতেও অনেকটা বালকসুলভ চেহারা। তেমন লম্বা-চওড়াও নন দেখতে। লিখতে-পড়তে জানেন না। তবে নিজ এলাকায় সম্প্রতি শিশুদের জন্য একটা স্কুল চালু করেছেন তিনি।

খানের নাম হাজী রোশন খান। তার স্ত্রী তৈলুক। তাদের চার মেয়ে। ১১ শ’ লোকের শাসক খান জীবনে মাত্র দুইবার নিজ এলাকার বাইরে গেছেন। একবার ২০০৮ সালে তার বাবা, তৎকালীন খান, আবদুল রশিদ খানের সাথে হজ করতে মক্কায় এবং দ্বিতীয় ও শেষবার গত বছর বসন্তকালে রাজধানী কাবুলে। সেবার তিনি আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও তার কয়েকজন মন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। তাদের কাছে আবেদন জানান তার এলাকায় একটি মেডিক্যাল ক্লিনিক, কয়েকটি স্কুল এবং অবশ্যই একটি রাস্তা তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দের।

রোশন যেভাবে খান হলেন
বর্তমান খান হাজী রোশনের বাবাও ছিলেন খান। তার ছিল ১৪ সন্তান। তবে পৈতৃক সূত্রে খান হননি হাজী রোশন। কেননা বংশানুক্রমিকভাবে এখানে কেউ খান হতে পারে না। কে খান হবে, তা নির্ধারণ করেন গোত্রের মুরব্বিরা। অবশ্য পূর্ববর্তী খান মৃত্যুর আগে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যেন তার এই ছেলেটিকেই পরবর্তী খান নির্বাচিত করা হয়।

যা হোক, নতুন খান নির্বাচনের উদ্দেশ্যে এক বসন্তে নিজের ক্যাম্পে গোত্রের মুরব্বিদের আমন্ত্রণ জানালেন আরেক মুরব্বি এর আলী বাই। এখানে বলে রাখি, কিরগিজ সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ক্যাম্প। একটি ক্যাম্পে তিন থেকে দশটি কিরগিজ পরিবার বাস করে। তারা একসাথে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। তাদের চমরি গাই, মোটা লেজঅলা ভেড়া ও লম্বা লোমঅলা ছাগলের মালিকানাও অভিন্ন।

আরো একটা কথা, এতক্ষণের বয়ান শুনে কিরগিজদের গরিব মনে করার কোনো কারণ নেই। যদিও ওখানে কাগজের টাকা প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু অনেক ক্যাম্পেই দেখতে পাওয়া যাবে শত শত মূল্যবান প্রাণী, যার মধ্যে আছে ঘোড়া ও গাধা। এ দু’টি প্রাণী পাহাড়ে চলাফেরার একটি বড় মাধ্যম। তবে কিরগিজ মুদ্রার মৌলিক ইউনিটটি হচ্ছে ভেড়া। যেমন ৫০টি ভেড়ার বিনিময়ে পাওয়া একটি সেলফোন সেট। দশটি ভেড়ায় মেলে একটি চমরি গাই। একটি উন্নত জাতের ঘোড়ার মূল্য ৫০টি ভেড়া। বিয়েতে যৌতুকের বর্তমান হার ১০০ ভেড়া। আর ধনী কিরগিজদের স্ট্যাটাস সিম্বল হচ্ছে উট। যার এক বা একাধিক উট আছে, তিনি কিরগিজ সমাজের একজন ধনাঢ্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তি।

এর আলী বাইয়ের আছে ছয়টি উট। তার বয়স ৫৭। হাঁটেন একটু খুঁড়িয়ে; একটি লোহার লাঠিতে ভর দিয়ে। লাঠিটি এক পর্যটক তাকে দিয়েছিল। ক্ষেপে গেলে কিংবা মজা করে ওই লাঠি উড়িয়ে কাউকে তাড়া করেন তিনি। তার খুব পছন্দের কাজ ওয়াকিটকিতে কথা বলা। বাইরের ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি এটি এখানে এনেছে। এর সাহায্যে এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে খবর আদান-প্রদান করা যায়। এ ছাড়া আলী বাই ‘কিরগিজ দেশে’র একমাত্র মুরগিরও গর্বিত মালিক। মুরগিটির মাত্র একটি পা আছে, অপরটি ফ্রস্টবাইটে নষ্ট হয়ে গেছে।
আগের কথায় ফিরে যাই। নতুন খান নির্বাচনের জন্য খানের দাওয়াতে তার ক্যাম্পে এলেন জনা চল্লিশেক মুরব্বি। তাদের আপ্যায়নের জন্য ভেড়া ও ছাগল জবাই করা হলো। ভেড়ার চর্বিদার লেজের স্যুপ ‘কুমুজ’ বানানো হলো। মুরব্বিরা গোল হয়ে বসলেন। আট ঘণ্টা বৈঠক শেষে স্থির হলো, হাজী রোশন খানই হবে গোত্রের নতুন নেতা।

মুরব্বিরা সবাই একমত হলেন বটে, তবে সবাই যে রোশনকে পছন্দ করেন, তা কিন্তু আদৌ নয়। কিরগিজরা নানা দল-উপদলে বিভক্ত হওয়ার জন্য কুখ্যাত। তারা স্বাধীনচেতাও। তারা কখনো একজন নেতার চার পাশে সমবেত হয় না। একটি কিরগিজ কৌতুক এ রকম : একটি তাঁবুতে তিনজন কিরগিজকে রেখে এসো। এক ঘণ্টা পর গেলে দেখবে, তাদের মধ্যে পাঁচজন খান (নেতা) দাঁড়িয়ে গেছে।
এ-ই যাদের খাসলত, তারা হাজী রোশনকে ‘খান’ বানাল কিভাবে? ব্যাপারটি অত সহজে হয়নি। আলী বাইয়ের ক্যাম্পে আট ঘণ্টার বৈঠকে উঠেছে অসংখ্য যুক্তি, পাল্টা যুক্তি ও কুযুক্তি। কেউ বলেছে, এ তো একেবারে শিশু ছেলে। কারো মতে, ওর অভিজ্ঞতা খুবই কম। কারো কারো অভিযোগ, সে আফিমখোর। আবার কেউ কেউ বলেছে, চেহারাট ‘সঙ্গিন’ (পাথুরে) নয়। শিশু শিশু ভাবটা এখনো মিলিয়ে যায়নি। একদল বলল, এলাকার অপর প্রান্তে বসবাসকারীদের মধ্য থেকেই এবার খান নির্বাচিত করা হোক। আরেক দল সব কিছুকে উড়িয়ে দিয়ে বলল, এখন ওসব খান-টানের দরকার নেই, খানের দিন আর নেই।

তবে হাজী রোশনের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন আলী বাই স্বয়ং। একদল যখন বলল, পাকা দাড়িঅলা কাউকেই এবার খান বানানো উচিত, তখন আলী বাই বললেন, ‘হ্যাঁ, লম্বা দাড়িঅলা লোক তো আছে। কিন্তু ছাগলেরও তো লম্বা দাড়ি আছে। আমরা কি ছাগলকে খান বানাব?’ এ কথা বলেই উপসংহারে চলে গেলেন আলী বাই, ‘অনেক হয়েছে। কথার আর দরকার নেই। রোশনই হবে নতুন খান। সে খুব ভালো করবে, আমি জানি।’

এভাবেই গোত্রপতি নির্বাচিত হলেন হাজী রোশন। তাকে এখন লোকজনকে এ কথা বোঝানোর জন্য লড়তে হচ্ছে, এ পদের জন্য তিনিই উপযুক্ত। পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্করুণ পরিবেশে বসবাসকারী নিজ গোত্রের অসংখ্য সমস্যা সমাধানে কাজ করে চলেছেন তিনি।
এলাকার পরিবেশের মতো কিরগিজরাও রসকষহীন, কাঠখোট্টা। তারা খুব একটা হাসে না। তারা বই পড়ে না, তাস খেলে না কিংবা অন্য কোনো খেলাধুলাও নয়। তাদের তেমন কোনো গান নেই। নাচ বলতে হাতে করে খুব ধীরে একটা রুমাল দোলানো। এর মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে আমি এক কিশোরের দেখা পাই, যার একটি নোটবই আছে এবং অসাধারণ সব স্কেচে এঁকে নোটবইটি সে ভরিয়ে ফেলেছে। ওই একজনই; এরকম আর কাউকে পাইনি আমি, যে চিত্রকলা বা আঁকাআঁকিতে আগ্রহী। একবার ওদের এক বিয়ের অনুষ্ঠানে যাই আমি। আশ্চর্য রকমের নিরানন্দ এক অনুষ্ঠান। ওখানে বুজকাশি নামে একটা খেলা হয়। দ্রুতগতির সহিংস এ খেলাটি খেলতে হয় ঘোড়ার পিঠে চড়ে। এতে বল হিসেবে ব্যবহৃত হয় মাথাবিহীন একটি ছাগলের মাংসের টুকরা।

কিরগিজদের আচরণকে অমার্জিতই বলা চলে। এখানে কথার মাঝখান থেকে কাউকে কিছু না বলে চলে যাওয়াটা দোষের নয়। আমার পকেটে কী আছে দেখার জন্য আমাকে না বলেই আমার নামের ডগা থেকে চশমা টেনে নেয়া হয়েছে। কিরগিজরা মাংস খায় বড় বড় টুকরা করে। যেটুকু পারল খেল, বাকিটা জমা রাখে জামার পকেটে।

তবে এসবের কারণ বোঝা যায়। খান বলেন, এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে আপনি দ্রুত বুড়িয়ে যাবেন। যখন আপনি সর্বক্ষণ শীতের কামড়ে অস্থির থাকবেন, আপনার পাঁচ-ছয়টি সন্তানকে অকালে মরে যেতে দেখবেন, আপনার মনের কিছু অনুভূতি তো লোপ পাবেই। এটা খুব ঝড়ো হাওয়ার দেশ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর অবস্থান, খুব কঠিন এখানে থাকা। এ দেশ আপনাকে মেরে ফেলবে না, কিন্তু ধ্বংস করে ফেলবে। আপনার জীবনের আনন্দ কেড়ে নেবে।

কিরগিজ তাঁবুর আশ্চর্য ভুবনে
মোটা পশমি কাপড়ের দরজা ঠেলে যদি ঢুকে পড়তে পারেন কোনো কিরগিজ তাঁবুতে, মনে হবে জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় সব বুঝি চোখের পলকে বদলে গেল। মনে হবে পৃথিবী ছেড়ে আপনি চলে এসেছেন এক কিরগিজ ওয়ান্ডারল্যান্ডে। কম্বল থেকে কার্পেট, ওয়াল হ্যাঙ্গিং থেকে ছাদ সবাই ঝলমলে ডিজাইনে সজ্জিত।

তাবুর মাঝখানে অনবরত জ্বলতে থাকে খোলা চুল্লি অথবা লোহার স্টোভ। ওই এলাকায় কাঠ পাওয়া যায় না। তাই তারা গোবরের ঘুঁটেকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, যার একটা সূক্ষ্ম মিষ্টি গন্ধ তাঁবুর ভেতর সর্বক্ষণ ছড়িয়ে থাকে। চুলার ওপর সারাক্ষণ থাকে চায়ের একটি কেটলি, কোনো কোনো তাঁবুতে কয়েকটিও। চা কিরগিজদের প্রধান পানীয়। তারা সর্বক্ষণ চা পান করে। চা পাতা সেদ্ধ পানিতে মেশায় লবণ ও চমরি গাইয়ের দুধ। আলী বাই একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি দিনে ১২০ কাপ চা পান করি’। খুব বাড়িয়ে বলেছেন বলে মনে হয়নি।

কিরগিজদের আরেকটি খাদ্য চমরি গাইয়ের দুধ থেকে তৈরি দই; ঠাণ্ডা ও ঘন। এ ছাড়া তারা ‘কুরুত’ নামের একটি শক্ত পনিরও খায়। এটি চোষার আগে নরম হওয়ার জন্য মুখের ভেতর কয়েক মিনিট রেখে দিতে হয়। এ ছাড়া খায় ইস্ট ছাড়া তৈরি এক ধরনের রুটির টুকরো, আকারে পিৎসার সমান। আর সবজি বলতে এক ধরনের ছোট বুনো পেঁয়াজ, আকারে মটরশুঁটির সমান। গোস্ত খায় কোনো উৎসবে, অনুষ্ঠানে। অন্য সময় কদাচিৎ।

কিরগিজ নারীগণ
কিরগিজ তাঁবুর চেয়েও আরেকটি দেখার জিনিস হলো তাদের নারীরা। সাধারণত কিরগিজ পুরুষেরা পরে কালো পোশাক। দেখে মনে হতে পারে, বুঝি তারা কারো শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। এর বিপরীতে নারীরা যেন কিরগিজ চিত্রকর্ম। এই নারীদের মাথায় থাকে লম্বা চোঙ্গাকৃতির টুপি, যাতে জড়ানো থাকে বিশাল ওড়না। অবিবাহিতা হলে ওড়নার রঙ লাল, বিবাহিতাদের সাদা। তারা যখন পথ চলে, সেই ওড়না ঝড়ো হাওয়ায় উড়তে থাকে, যেন তা কোনো মহাবীরের শিরস্ত্রাণের পুচ্ছ।

কিরগিজ মেয়েদের পোশাক লম্বা এবং উজ্জ্বল লাল রঙের। সচরাচর এর ওপর তারা পরে লাল রঙের কোটজাতীয় একটা পোশাক। এই পোশাক যেন নানা রঙের মোজাইক। এর কলারে থাকে নানা রঙের অসংখ্য প্লাস্টিকের বোতাম। গলায় থাকে গোলাকৃতির ধাতব ব্রৌচ, যাতে পবিত্র কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ থাকে। কোমরবন্ধের সাথে ঝোলানো থাকে চামড়ার তৈরি থলে। তার গায়েও থাকে নানা জিনিস মুদ্রা, চাবি, সুগন্ধির বোতল, ঈগলের নখ। ফলে কোনো কিরগিজ নারী যখন পথ চলে, তখন নানা ধরনের টুংটাং শব্দের তরঙ্গ তৈরি করতে করতেই চলে।

কিরগিজ নারীরা মাথায় দুই বা ততোধিক বেণী করে। তার সাথে জুড়ে দেয় রূপার গয়না। এ ছাড়া গলায় পরে হার। মধ্যমা ছাড়া হাতের প্রতিটি আঙ্গুলে একটি করে আংটি থাকে তাদের, এমনকি বুড়ো আঙুলেও। হাতে প্রচুর চুড়ি; কানে ইয়ারিং। একজনের হাতে মাত্র একটা ঘড়ি এমন নারীর দেখা মেলে কদাচিৎ। সবার হাতে দু’টি বা তিনটি। আমি একজনের হাতে ছয়টা পর্যন্ত ঘড়ি দেখেছি।
এভাবে সাজগোজ করে ফুলবৌটি হয়ে বসে থাকে কিরগিজ নারীরা, তা কিন্তু নয়। তারা অবিরাম কাজ করে। দিনে দু’ বেলা চমরি গাইয়ের দুধ দোয়, রান্না করে, সেলাই করে, ঘরদোর পরিষ্কার করে, ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করে। সব মিলিয়ে দিনভর ব্যস্ত থাকে তারা। আশপাশে কোনো পুরুষ মানুষ থাকলে মেয়েদের গলার আওয়াজ আর শোনা যায় না। একবার আমি এক কিরগিজ নারীর কাছে যথাসম্ভব বিনয়ের সাথে জানতে চেয়েছিলাম কেন তারা হাতে তিনটি ঘড়ি পরে। আধঘণ্টা চেষ্টার পর দু’শব্দে জবাব পেয়েছিলাম : ‘সুন্দর লাগে’। খানের ক্যাম্পে আমি ছিলাম এক সপ্তাহ। কিন্তু তার স্ত্রীর সাথে আমার একটি কথাও হয়নি।

যত কিরগিজ নারী আমি দেখেছি, তাদের বেশির ভাগই জীবনে কয়েক মাইলের বেশি ভ্রমণ করেনি। তাদের সবচেয়ে বড় ভ্রমণ বিয়ের পর স্বামীর ক্যাম্পে যাওয়া। কেন? জানতে চাইলে খান বলেন, মেয়েরা যেখানে চাইবে সেখানে যেতে দেবো, এমন লোক আমরা নই।
আমার সাথে যে অল্প ক’জন কিরগিজ নারী খোলাখুলি কথা বলেছে, তাদের একজনের নাম বাস বিবি। তার স্বামী, পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যার সবাই মারা গেছে। তার বয়সও এখন আনুমানিক ৭০। তার কথা, পুরুষেরা কখনো দুধ দোয় না, কাপড় ধোয় না, রান্না করে না। মেয়েরা না থাকলে ওই পুরুষগুলো এক দিনও বেঁচে থাকতে পারত না।

অন্য কোনোখানে
১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে এক সামরিক অভ্যুত্থানে বাদশা জহির শাহর পতন ঘটে। এ সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে অনুপ্রবেশ করবে এমন কথা জোরেশোরে আলোচনা হতে থাকে। আফগানিস্তান কমিউনিস্ট দেশ হয়ে যাবে এমন ভীতি পেয়ে বসে কিরগিজদের। তারা এ সময় তাদের খান রহমান কুনের নেতৃত্বে হিন্দুকুশ পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানে চলে যায়। তারা সংখ্যায় ছিল ১৩শ’র মতো। শরণার্থী জীবনের প্রথম বসন্তে নানা রোগে ভুগে তা থেকে এক শ’ জনের মতো মারা যায়। অন্যদের অনেকে তাদের ফেলে আসা জন্মভূমিতে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। পৃথিবীর ছাদে সেই আবাল্যের জীবন তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। রহমান কুল তাদের বোঝান, পাকিস্তানে থেকে যাও। দেশে ফিরে গেলে সোভিয়েত সৈন্যরা তাদের ধর্ম, স্বাধীনতা সব কেড়ে নেবে।

কিন্তু তবুও গৃহকাতর কিরগিজদের মন মানে না। বর্তমান খানের পিতা আবদুল রশিদ খানের নেতৃত্বে প্রায় এক শ’ কিরগিজ এক দিন ‘দেশে’ ফিরে আসে। এর আলী বাইও এই দলে ছিলেন। এ সময় কিরগিজরা আবদুল রশিদ খানকে তাদের খান নির্বাচিত করে। দেশে ফিরলে সোভিয়েত সৈন্যরা তাদের সাথে সদয় আচরণ করে। তারা নিশ্চিন্ত হয়।

অন্য দিকে রহমান কুলের নেতৃত্বে যেসব কিরগিজ পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিল, ঘটনাক্রমে তাদের পুনর্বাসিত করা হয় তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে। সেখানকার একটি গ্রামে সারি ধরে বানানো বাড়িতে এখন তাদের বসত। সেসব বাড়িতে আছে বিদ্যুৎ, আছে ক্যাবল টিভি। গ্রামে আছে চওড়া রাস্তা, আছে গাড়ি। তারা এখন নিজেদের নামের শেষে তুর্কি নাম লাগিয়ে নিয়েছে। ভিডিও গেম, আধুনিক টয়লেটÑ এসব তাদের ভালো লেগেছে। তারা পোষ মেনেছে।

মাঝে মধ্যে দূরবর্তী পোষমানা স্বজনদের কথা ভাবে ও বলে আফগান কিরগিজরা। বিশেষ করে, রাতের বেলায় তাবুর ভেতরে চুলার আগুন পোহাতে পোহাতে ও চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এ জায়গা ছেড়ে অন্য কোনো খানে চলে গেলে কেমন হয়? সত্যি বটে, গোটা আফগানিস্তানে যে সঙ্ঘাত চলছে, তা’ থেকে এ এলাকা সম্পূর্ণ মুক্ত, কিন্তু এখানকার জীবনেও কোনো স্থিরতা নেই। সর্বক্ষণ গড়িয়ে চলা। কেউ কেউ বলে, ‘কিরগিজস্তানে চলে যাওয়া যেতে পারে। ওরা আর আমরা একই গোত্র, একই ভাষা’। বলে বটে, কিন্তু এটাই তাদের মনের কথা কিনা, বোঝা মুশকিল।

সুখবর এলো
খানের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে একদিন খবর এলো, কাবুল থেকে দু’জন সরকারি ইঞ্জিনিয়ার এসেছেন। তারা কিরগিজ এলাকা পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের সম্ভাব্যতা জরিপ করে দেখবেন। খবর পেয়ে খানের উত্তেজনা আর ধরে না। তিন দিনের পথ পেরিয়ে তিনি যাবেন তাদের কাছে। খানের স্ত্রী তাকে ট্রাঙ্ক থেকে বের করে দিলেন সবচেয়ে ভালো পোশাক ও জুতা। দিলেন সুগন্ধির বোতল এবং চিবিয়ে খাওয়ার তামাক। খান ঘোড়ায় উঠলেন। বললেন, রাস্তা এবার হবেই। আমি এক শ’ ভাগ নিশ্চিত।

দেখলাম, খানকে পিঠে নিয়ে তার ঘোড়া ছুটে চলেছে। ভাবি, অসংখ্য সমস্যায় আকীর্ণ একটা ছোট দেশ আফগানিস্তান। এই দেশ কী করে এবং কেন বানাবে হাজারখানেক লোকের জন্য এই রাস্তা, যে রাস্তা নির্মাণে ব্যয় হবে কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার!

এর আলী বাই যেন আমার মনের কথাটি বুঝতে পেরেই বললেন, কেউ এ রাস্তা বানাবে না। খানের বাবার সময়ও ইঞ্জিনিয়ারেরা এসেছিল। বলেছিল, রাস্তার বিষয়ে জরিপ চালাতে এসেছে। তারপর কিন্তু আর কেউ কিছু করেনি।

‘রাস্তা হলে অনেক সমস্যাও হবে’, বললেন এর আলী বাই। ‘বুঝলাম রাস্তা হলে সহজে ডাক্তার আসতে পারবে, মাস্টার আসতে পারবে। কিন্তু তাদের আগে-পিছে তো পর্যটকও আসবে, সৈন্যদলও আসবে। বাইরের দুনিয়ার হাওয়া ঢুকে আমাদের তরুণদের মাথা বিগড়ে দেবে। তাদেরকে ঠেলে দেবে আরো কম চ্যালেঞ্জিং কাজে, কাউকে কাউকে এমনকি এদেশ থেকে বের করেও নিয়ে যাবে।’

আলী বাই বলেন, ‘কিছু লোক আছে, যারা মনে করে গাড়িতে চড়লেই বুঝি সুখী হওয়া যায়। কিন্তু ভেবে দেখো তো, আমাদের এই জায়গা কত সুন্দর। আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে কত সুখে শান্তিতে আছি। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখের জায়গা।’

আলী বাইয়ের কথা শুনতে শুনতে আমি দূর দিগন্তের দিকে তাকাই। দেখি, খানকে নিয়ে তার ঘোড়া ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে। আজকের দিনটি চমৎকার। ঈষৎ উষ্ণ, ঝড়ো হাওয়ার উৎপাত বলতে গেলে নেইই। হঠাৎ আমার কল্নায় ভেসে ওঠে একটি গাড়ি। তাতে বসে আছেন খান। গাড়ির জানালা নামানো, হাওয়ায় খানের চুল উড়ছে। গাড়ি দুরন্তবেগে ছুটে চলেছে। ভাবি, যদি সত্যিই রাস্তাটি হয়, যদি সত্যিই খানের একটি গাড়ি হয়। তাহলে?

বুঝতে পারি, তাহলে চিরকালের জন্য শেষ হয়ে যাবে অমার্জিত, গর্বিত কিরগিজ যাযাবর জনগোষ্ঠীর দিন, যারা এই ভূখণ্ডে দুই হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *