পরমবন্ধু প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা প্রসঙ্গে

বৈচিত্রময় প্রাকৃতিক সৌন্দযের্র উপাদান দ্বারা আবৃত বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক পরিবেশই আমাদের দেশকে করে তুলেছে আরও মোহনীয়, লাবণ্যময় ও ঐশ্বর্যপূর্ণ স্বর্গপুরী। সোনার মাটিতে সোনা ফলে, নদীমাতৃক এই দেশে। আর ষড়ঋতুর প্রকৃতির সঙ্গে পরিবর্তনশীল রূপ, বর্ণ, গন্ধে বাঙালীর জীবনযাত্রার গতিধারা চলমান। এই দেশ প্রকৃতির দেশ, প্রকৃতির দান। তাই প্রকৃতির সাথেই মানুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রকৃতির প্রশান্তিতে মানুষ ঘুমাতে যায়, আবার প্রকৃতির ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙ্গে, প্রভাতে জেগে ওঠে। প্রকৃতির কালচক্রে পূর্বকাশে উদিত হয় সুর্যি মামা, আবার প্রকৃতির নিয়মে গোধূলি লগ্নে তার অস্তাচল।পরিবেশ নিয়েই আমাদের জীবন। আমরা যে পরিবেশেই থাকি না কেন সেই পরিবেশ দ্বারাই আমরা প্রভাবিত ও গঠিত। প্রাকৃতিক পরিবেশের নিয়ম নিয়ন্ত্রিত গতি দ্বারা জীবন প্রবাহমান। এই দেশের প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান বা বৈশিষ্ট্য আমাদের জীবন গঠনে অপরিহার্য এবং তা অমূল্য সম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদের অপূর্ব সমাহার আর তার ব্যবহার দ্বারা জীবনকে আমরা করে তুলি আনন্দময়। প্রকৃতির সক্রিয়তা ও সজীবতা জীবনে এনে দেয় অফুরন্ত অভিজ্ঞতা। আমরা প্রকৃতির কাছ থেকেই শিখি, আর প্রকৃতির পরিবেশেই গড়ে উঠি।মাটির কোলেই আমাদের জন্ম আবার তাতেই আমাদের জীবনাবসান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের আনন্দ দান করে, উপকার করে, আমরা সদ্ব্যবহার করে লাভবান হই। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সম্পদের উপকারের প্রতিদানে অপকার করি, হয়ে উঠি অকৃতজ্ঞ, দুর্বিনীত, অত্যাচারী, নির্দয়! হয়ে যাই নিকৃষ্ট মানুষ। প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যতম সৌন্দর্য তার বনরাজি ও বৃক্ষরাশি। সবুজ গাছ আর তরুলতা আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে অক্সিজেন নরবরাহ করে। বৃক্ষ যেখানে আমার পরম আত্মীয়, পরম বন্ধু, সেখানে আমরা হয়ে যাই গাছের প্রতি ভালবাসাহীন। আমরা তা সমূলে উৎপাটিত করে বা কর্তন করে, তাকে চিরতরে বিলীন করে, ততার ভালবাসাকে মূল্যহীন করে দিচ্ছি। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে বিলীন করে গড়ছি ইমারত, আসবাব, কত কি? আর এজন্য শুধু আমরা কেটেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছি না, জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে শুকাচ্ছি তামাক, বানাচ্ছি ইট। তামাক চুল্লী আর ইটের ভাটার ভাসমান কালো বিষাক্ত ধোঁয়া আকাশে-বাতাসে মিশ্রিত হয়ে সৃষ্টি করছে জীবন বিনাশী গ্যাস আর আমরা মনের অজান্তে শ্বাস-প্রশ্বাসে-নিঃশ্বাসে টেনে নিচ্ছি সেই বিষাক্ত গ্যাস একেবারে ফুসফুসের ভিতরে। মানুষ চিন্তা করেনি বায়ুবাহিত ঐ গ্যাসে ঘুরে বেড়ায় বিষাক্ত জীবাণু, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।বাংলাদেশ জনাকীর্ণ ঘনবসতির দেশ। এখানে সামান্য অনিয়মে খুব সহজেই জনজীবনে নেমে আসে অসহনীয় দুর্ভোগ। রাস্তা-ঘাটে অসংখ্য চলন্ত গাড়ীর বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও মানব স্বাস্থ্যহানীর উপযোগ হয়ে আছে। আগে মনিুষ জানতো না, এখন জেনেও উদাসীন। বিষাক্ত ধোঁয়া তাই প্রতি মুহুর্তে মানুষের জন্য সাক্ষাৎ মরণ ফাঁদ।দুষ্কর্ম আমাদের আরও অছে। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, খানা-খন্দ, জলাভূমি ভরাট করে, অপরিকল্পিত ভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে, অপরিমিত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে, ডিমওয়ালা মাছ ও ‘গুড়ো’ মাছ ধরে, আমরা যে আমাদের জীবিকাই ধ্বংস করে চলেছি, তার খবরই বা কে রাখে?আমাদের দেশের সম্পদকে আমরা যথাযথ সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহার করি না বলেই আমাদের চরম দারিদ্র্যের শিকার হতে হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের আমরা যত যত্ন নেব, সংরক্ষণ করব, সদ্ব্যবহার করব ততই উন্নয়নের ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাব। আমরা যেন প্রাকৃতিক সম্পদকে সদ্ব্যবহার করি, মানব কল্যাণে ব্রতী হই, প্রাকৃতিক সম্পদকে যেন দেশ ও জাতির বন্ধুরূপে কাছে টেনে নেই, পরম যত্নে লালন করি।পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার, আমাদের চেয়েও বড় বড় প্রকৃতি-পাপী এ পৃথিবীতে আছে। তাদের কারণে শুধু আমাদের একক প্রচেষ্টায় প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাদেরও শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, তাদেরও যেন আমরা হেদায়েত হরতে পারি! হেদায়েত করতে না পারলেও যেন প্রতিরোধ করতে পারি!

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *