নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিতর্কিত বিজয়ীরা

সভ্যতা ও জ্ঞানের অগ্রগতিতে নোবেল পুরস্কারের অবদান অনেক। বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি- এই ক্ষেত্রগুলোতে অলংকার হিসেবে নোবেল পুরস্কার যে পরিমাণ অবদান রেখেছে তা আসলেই পরিমাপ করে শেষ করা যাবে না। আজকে আমরা যে যুগে বসবাস করছি তার ভীত রচিত হয়েছে গত শতাব্দীতে। আধুনিক প্রযুক্তি, আয়েশি জীবন, কালজয়ী সাহিত্য, যুদ্ধ-বিগ্রহ পেরিয়ে শান্তির সময়ে প্রবেশ ইত্যাদি অনেক কিছুরই শেকড় ছড়িয়ে আছে গত শতাব্দীতে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে গত শতাব্দীর বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তির সকল ক্ষেত্রে অলংকার হিসেবে আলোকিত হয়ে আছে নোবেল পুরস্কার।

নিঃসন্দেহে নোবেল পুরস্কার অনেক প্রশংসনীয় ব্যাপার, কিন্তু তারপরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই পুরস্কারকে ঘিরে জন্ম হয় বিতর্ক। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের পুরস্কারগুলো নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই, যতটা শান্তির পুরস্কারের বেলায় আছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে সবসময়ই কিছু না কিছু প্রশ্ন উঠে। এসব প্রশ্ন মাঝে মাঝে পুরো নোবেল কমিটিকেই বিতর্কের মুখে ফেলে দেয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির কিছু লোক দেখলে আপনার আমারও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছে মনে জাগতে পারে। এবং তা অযৌক্তিকও নয়। শান্তিতে নোবেলজয়ী এরকম কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়েই আজকের আয়োজন।

সুয়েডীয় বিজ্ঞানী আলফ্রেদ নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইল-এর মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। নোবেল মৃত্যুর পূর্বে উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান। এই তো আমাদের সবার জানা বিষয়। আগে ভাল কাজের সব চেয়ে পুরস্কার ‘নোবেল’ ভাবা হতো কিন্তু গত কিছু বছর আগ থেকে নোবেল পুরস্কারটা যেন হাসি মজার বিষয় হয়ে গেছে। দেখুন না শান্তির জন্য যাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে তার হাতে গণহত্যা হচ্ছে। সব নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা আসে সুইডেনের স্টকহোম থেকে। কিন্তু শুধু নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা আসে নরওয়ের অসলো থেকে। সম্পূর্ণ আলাদা একটি কমিটি ঠিক করে দেয় কে পাবে শান্তিতে নোবেল। আর এখানেই হয় কুটিল ও স্বার্থের রাজিনীতি।

দীর্ঘদিনের আলোচনা

১৯০১ সালে যখন প্রথম সুইজারল্যান্ডের হেনরি ডুনান্ট (বামে) এবং ফ্রান্সের ফ্রেডেরিক প্যাসিকে (ডান দিকে) নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়, তখনই এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিল নোবেল কমিশন৷ ডুনান্ট আন্তর্জাতিক রেড ক্রস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং প্যাসির সঙ্গে একযোগে জেনেভা কনভেনশনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ নোবেল কমিশনের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধকে মানবিক করার কথা বলে জেনেভা কনভেনশন হয়ত যুদ্ধের গ্রহণযোগ্যতাই বাড়িয়ে দেবে৷


১৯০১ থেকে শুরু করে ১৯০৫ পর্যন্ত শান্তিতে নোবেল পায় ৫ জন। পরবর্তীকালে দুটি সংগঠনের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। নোবেল কমিটির অধিকাংশ সদস্যই ওই দুটি সংগঠনকে সাপোর্ট করত। ফলে বিতর্কের ঝড় ওঠে বিশ্বজুড়ে।

যুদ্ধবাজ এবং শান্তিকামী

মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধপ্রিয় মানুষ ছিলেন।  থিওডর রুজভেল্টকে কখনোই খুব শান্তিকামী হিসেবে দেখা যায়নি৷ তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে আমেরিকাকে সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আহ্বান করেছিলেন৷ এরপর উপনিবেশবাদ থেকে কিউবাবাসীদের মুক্ত হতে সাহায্য করেন৷ তবে মার্কিন সেনাবাহিনী গিয়েই প্রথমে নিশ্চিত করেন যে, ওই ভূখণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে৷তবে রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় শান্তির উদ্যোগের জন্য রুজভেল্ট শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান৷তার সময়ে ২৯ জন শর্টলিস্টে স্থান পায় এবং এদের মধ্য থেকে পরবর্তীকালে ৬ জনই নোবেল পুরস্কার পান, সালটা ১৯০৬।

বর্ণবাদী শান্তিকামী

‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা’য় অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ২8 তম প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়৷ তবে তিনি সব সময়ই সাদা চামড়ার মানুষদেরই সেরা মনে করতেন৷ সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সাদাদের স্বর্গরাজ্য’ বানাতে চেয়েছিল ‘কু ক্লুক্স ক্ল্যান’ নামের যে প্রতিষ্ঠানটি, তাদের পক্ষে ছিলেন উইলসন৷

শান্তি ছাড়াই শান্তি পুরস্কার

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল হেনরি কিসিঞ্জারকে শান্তিতে নোবেল প্রদান করা। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তাকে নোবেল প্রদানের প্রতি প্রতিবাদ স্বরূপ নোবেল কমিটির দুজন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধে তার অবস্থান ও কর্মকাণ্ড কেমন অনৈতিক ছিল তা বাংলাদেশের ইতিহাস অনুসন্ধানী সকল মানুষেরই জানা। যুদ্ধবাজ ও অশান্তির কারিগর এই ব্যক্তিকে নোবেল প্রদান করা মানে শান্তিতে নোবেলজয়ী অন্যান্যদেরকে অপমান করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনামের পলিটব্যুরোর সদস্য লি ডুক থো ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন৷যুদ্ধ বন্ধের জন্যই এ চুক্তি করা হলেও ডুক থো পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান, কেননা চুক্তি হলেও যুদ্ধ তখনো থামেনি৷চুক্তি সম্পাদনের দু’ বছর পরেও ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়াতে সংঘাত চলেছে৷

কেন তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছিল তা জানতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। পূর্বে ভিয়েতনাম দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম। একসময় তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চলে এই যুদ্ধ। উত্তর ভিয়েতনাম ও আমেরিকান মদদপুষ্ট দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে সংঘটিত হয় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ (১৯৫৯-৭৫)। আমেরিকা যোগ দেয় দক্ষিণ ভিয়েতনামের হয়ে।  কিন্তু আমেরিকার মদদপুষ্ট হয়েও হেরে যায় উত্তর ভিয়েতনামের কাছে। উত্তর ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে এক হয়ে যায় দুই ভিয়েতনাম। যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আমেরিকার তৎকালীন সেক্রেটারি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনামের রাজনৈতিক নেতা লে দু থো একটি শান্তি চুক্তি করেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা মুছে ফেলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব লে দোউ থো ও যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেটের হেনরি কিসিঞ্জার সন্ধি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তাদের এরূপ অবদানে নোবেল ফাউন্ডেশন ১৯৭৩ সালে একই সঙ্গে দুজনকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন। কিন্তু লে দোউ থো পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। ভিয়েতনামের যুদ্ধ নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, ‘কিসিঞ্জার শান্তি প্রয়োগ নয়, যুদ্ধবাজ ছিলেন।সারা বছর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে শেষ বেলায় চুক্তি করে পেয়ে যাবে নোবেল পুরস্কার, তাও আবার শান্তিতে, এ কেমন নৈতিকতা? এ কেমন সিদ্ধান্ত?

অভ্যুত্থানকারীর ভাগ্যেও শান্তি পুরস্কার

৬০ এর দশকে ইজরায়েল ও মিশরের মাঝে যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে আরবদের অনেক স্থান দখল করে নেয় ইজরায়েল। সেজন্য আনোয়ার সাদাত শান্তি চুক্তি করেন ইজরায়েলের সাথে। এর ফলে এলাকা ফিরে পায় মিশর। এই চুক্তির জন্য ১৯৭৯ সালে দুজনকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। অথচ দুজনেই ছিলেন বিতর্কিত। দুজনেই ছিলেন সহিংস আন্দোলনের সাথে জড়িত।মিশর-ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একমত হয়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাত (বামে) ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন (ডানে)৷ ১৯৭৮ সালে এ কারণে শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় তাঁদের৷ সাদাতের এই পুরস্কার সে সময় বেশ আলোড়ন তোলে৷ কারণ, ১৯৫২ সালে বাদশাহ ফারুককে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন আনোয়ার সাদাত৷মেনাহেম বেগিন তরুণ বয়সে ইহুদিবাদী জঙ্গি সংগঠন ইরগানের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের প্রধান কার্যালয়ে বোমা হামলার পেছনেও তার হাত ছিল। উল্লেখ্য, ওই হামলায় ৯১ জন নিহত হন। অথচ কী আশ্চর্য ওই একই ব্যক্তি (তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী) ১৯৭৮ সালে এসে বিতর্কিত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির জন্য মিসরের প্রেসিডেন্ট আনওয়ার আল সাদাতের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এই দুজনকে ডেকে নিয়ে এসে জোর করে একটা চুক্তি করায়- বিখ্যাত বা কুখ্যাত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি। বিনিময়ে আনোয়ার সাদাতের হাতে ধরে দেওয়া হয় শান্তিতে নোবেল।
মিশর হল মুসলিম বিশ্বের উপরসারির শক্তিশালী দেশ। ব্যস, মিশর তারপর থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঠাণ্ডা।

শান্তিরক্ষা এবং নোংরামি

‘দ্য ব্লু হেলমেট’ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী৷ ১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় তাঁদের৷ তবে নোবেল জয়ের পরই তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় নারী ও শিশুদের যৌন নির্যাতন ও তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে৷ রুয়ান্ডায় গণহত্যা এবং স্রেব্রেনিকায় ব্যাপক হত্যাকান্ডের সময় নির্লিপ্ত থাকার অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে৷

দুই মুখো মানুষ

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে এফ.ডব্লিউ ডি ক্লার্ক এক সময় সে দেশে সরাসরি বর্ণবাদের পক্ষে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে৷ পরে বর্ণবিদ্বেষ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন৷নেলসন ম্যান্ডেলাসহ ন্যাশনাল কংগ্রেসের অনেক নেতাকে মুক্তি দেন তিনি৷ তা সত্ত্বেও ১৯৯৩ সালে ম্যান্ডেলার সঙ্গে তাঁকেও শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করায় বিস্মিত হয়েছেন অনেকে৷

‘সন্ত্রাসী’ পেলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার!

১৯৯৪ সালের পুরস্কার নিয়ে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়৷ সে বছর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন প্রধান ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেসকে যৌথভাবে শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়৷যে ইয়াসির আরাফাত পশ্চিমাদের চোখে সন্ত্রাসী ছিল, তাকে হঠাৎ নোবেল দেওয়া হল!! কেন? ইসরাইল জোর করে যে ফিলিস্তিন দখল করেছিল, এর প্রেক্ষিতে সৃষ্ট দু’পক্ষের মধ্যে গণ্ডগোল কমিয়ে শান্ত করার উদ্দেশ্যেই আরাফাতকে নোবেল হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। ব্যালান্স তৈরির জন্য দেওয়া হল ইসরাইলেরও দু’জনকে। আরাফাতকে ‘অযোগ্য বিজয়ী’ আখ্যায়িত করে এর প্রতিবাদে নোবেল কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন নরওয়ের এক রাজনীতিবিদ৷এরপর জোর করে ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে চুক্তি করে দেওয়া হল- অসলো চুক্তি। ব্যস, সব ঠাণ্ডা। মাঝখান থেকে লাভের লাভ ইসরাইলের জোর করে দখল করে নেওয়া ফিলিস্তিনের সেই ভু-খন্ড।

জাতিসংঘও পেয়েছে শান্তি পুরস্কার

‘আরো ভালো এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব’ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার জন্য ২০০১ সালে জাতিসংঘ ও এর মহাসচিব কোফি আনানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয৷ তবে অনেকগুলো চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে তাদের ব্যাপক সমালোচনা তাতে থামেনি৷

যুদ্ধাপরাধে সহায়তাকারী থেকে নারী অধিকার কর্মী

হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নির্যাতনের হাজার হাজার মামলাসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলর৷ তার সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হওয়া এলেন জনসন সিরলেফের বিরুদ্ধেও টেইলরকে ওইসব কর্মকাণ্ডের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে৷২০১১ সালে ‘নারীদের নিরাপত্তার জন্য অহিংস সংগ্রাম’ এর কারণে সিরলেফকেও দেয়া হয় শান্তি পুরস্কার৷

 

অং সান সু চি (১৯৯১)

সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে এতদিন কোনো বিতর্ক ছিল না। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার নির্ভীক অবস্থান ও আন্দোলনের কৃতিত্বস্বরূপ তাকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই দিক থেকে নেলসন মেন্ডেলার পরেই তার অবস্থান। কিন্তু বর্তমানে  রোহিঙ্গা নাগরিকদের নির্যাতন ও বিতারণ সমস্যার প্রেক্ষাপটে তার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের ‘শান্তি’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রোহিঙ্গা সমস্যা আরো অনেক আগে থেকেই ছিল, তখনও তার পুরস্কার নিয়ে প্রশ্ন উঠেনি। যখন থেকে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন এবং রোহিঙ্গা সমস্যায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকছেন, সর্বোপরি রোহিঙ্গা সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নে নীরব থাকছেন তখন প্রশ্ন উঠেছে- শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ব্যক্তি আসলে কতটা শান্তি বজায় রাখছেন? নোবেল শান্তি পুরস্কার কি আসলে তার প্রাপ্য?

                   রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চির বিতর্কিত অবস্থানের প্রতিবাদে তাকে রাক্ষস হিসেবে তুলে ধরেছে পোস্টারে।

১৯৬২ সাল থেকে মিয়ানমারে সেনা শাসন, সবে সুচি মায়ের সেবা করার জন্য দেশে আসে (১৯৮৮ সালে) এবং গৃহবন্দি হয়ে যান, ১৯৯১ সালে এসে গৃহবন্দি আং সান সুচিকে শান্তির জন্য নোবেল দেয়া হয়, উদ্দেশ্য পশ্চিমা মদদপুষ্ট সুচিকে ক্ষমতায় বসানো।
১৯৯১ সালে অং সান সুচিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে নোবেল কমিটির প্রেস রিলিজে যা বলা হয়েছিল-
১. নরওয়ের নোবেল কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৯৯১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার অং সান সুচিকে (মিয়ানমার) দেওয়া হবে। এটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য তার অহিংস সংগ্রামের জন্য দেওয়া হচ্ছে।
২. তিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে একজন আদর্শ হিসেবে পরিণত হয়েছেন।
৩. ১৯৯১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি নোবেল কমিটি অং সান সু চিকে সম্মান জানাতে চায় বিশ্বের বহু মানুষের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম মানবাধিকার ও জাতিগত শান্তি বজায় রাখায় তার শান্তিপূর্ণ সমর্থন ও অবিরত প্রচেষ্টার জন্য।
এখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি পাল্টেছে। সমালোচকরা বলছেন, যিনি বহু বছর ধরে নির্যাতিত মানুষের প্রতীক হিসেবে ছিলেন, তিনিই এখন ক্ষমতায়। আর তার সরকারই যখন রোহিঙ্গাদের নির্যাতন নিপীড়নের জন্য দায়ী তখন নিপীড়ক হিসেবে তার নামও চলে আসে।
রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০১৬ সালেই সুচির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে। সে সময় অনলাইনে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার জন্য এক আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন লক্ষাধিক মানুষ। চেঞ্জ ডট অর্গে এই আবেদনটি করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক শান্তি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ রক্ষায় যারা কাজ করেন, তাদেরকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ পুরস্কার দেয়া হয়। সুচির মতো যারা এই পুরস্কার পান, তারা শেষ দিন পর্যন্ত এই মূল্যবোধ রক্ষা করবেন, এটাই আশা করা হয়। যখন একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শান্তি রক্ষায় ব্যর্থ হন, তখন শান্তির স্বার্থেই নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির উচিত এই পুরস্কার হয় জব্দ করা নয়তো ফিরিয়ে নেয়া।’ ২০১২ সালে সুচি তার পুরস্কার গ্রহণ করেন।

আল গোর (২০০৭)

১৯৯৩ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন আমেরিকার উপরাষ্ট্রপতি। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিল ক্লিনটন। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ২০০৭ সালে ‘ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর সাথে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রশ্নে তিনি নিজেই ছিলেন বিতর্কিত।২০ কক্ষের আলিশান প্রাসাদে গ্যাস ও বিদ্যুতের অতিরিক্ত অপচয়ের জন্য সমালোচিত ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আল গোর। অথচ তিনিই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতনতা বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। মুখে মুখে বিদ্যুৎ সাশ্রয়য়ের কথা বলে গেছেন কিন্তু নিজেই অন্যান্য সাধারণ বাড়ির তুলনায় ২০ গুণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিগত জেটপ্লেন ছিল তার। কার্বন নিঃসরণ, সবুজ পৃথিবী প্রভৃতি নিয়ে বুলি আওড়ানো এই ব্যক্তি নিজের জেটপ্লেনে পুড়িয়েছেন মাত্রাতিরিক্ত কার্বন। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী। পরিবেশ ও জলবায়ু নামক এজেন্ডাকে পুঁজি করে কামিয়েছেন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। ভক্ষককেই যখন রক্ষকের আসনে বসিয়ে পুরস্কৃত করা হয় তখন বিতর্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

বারাক ওবামা (২০০৯)

ইদানীংকালে সবচেয়ে সমালোচিত হয়ে আসছে ২০০৯ সালের বারাক ওবামার নোবেল পুরস্কারটি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ১১ দিন পর মনোনয়ন বন্ধ করা হয়। অবশ্য সত্যিকারের মূল্যায়ন করা হয়েছিল পরবর্তী ৮ মাস। ওমাবা নিজেই জানান, ‘ওই পুরস্কারের যোগ্য তিনি নন।’ বিশ্বজুড়ে এটা নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করে তখন থেকেই।

obama

এবার আসি ২০১৪ তে শান্তিতে নোবেল পাওয়া মালালা প্রসঙ্গে। যার পাওয়ার কথা ছিল অস্কার, সে পেল নোবেল পুরস্কার !!! তাও আবার শান্তিতে !!
আসলে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে আক্রমণের একটা কারণ তৈরি করার জন্য মালালার ঘটনাটি পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মাধ্যমে সাজানো হয়েছিল।
পাকিস্তানের একজন নোবেল পেল, ভারত আবার নাখোশ হবে। ব্যালান্স তৈরির জন্য ভারতের কৈলাস বাবুর হাতেও যৌথভাবে ধরিয়ে দেওয়া হল নোবেল।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবার পরপরই ২০০৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান বারাক ওবামা। আমেরিকার নির্বাচনের সময় সারা পৃথিবীতেই তোলপাড় হয়। তখনকার সময়ে যারা নির্বাচনের খবর রেখেছে তারা দেখেছে নির্বাচন নিয়ে মাতামাতি শেষ হতে না হতেই ওবামা পেয়ে গেছেন নোবেল। নোবেল কমিটি বলছে- দুর্নীতি দমনে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, অস্ত্র ও যুদ্ধ নিরসনকল্পে গৃহীত পদক্ষেপের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার অফিসিয়ালি কাজকর্মের বয়স মাত্র কয়েক মাস। এত স্বল্প সময়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এত জটিল ব্যাপারসমূহের সমাধান সম্ভব নয়। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্ক হিসেবে থাকবে ওবামার এই পুরস্কার।

২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি আত্মজীবনীতে নোবেল কমিটির প্রাক্তন সদস্য গেয়ার লান্ডেস্টাড এই ব্যাপারে কিছু কথা বলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল যেন আন্তর্জাতিকভাবে তার প্রভাব শক্তিশালী হয় এবং তার ক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

রিগোবার্তা মেঞ্চু

রিগোবার্তা মেঞ্চু, যিনি গুয়াতেমালা থেকে পালিয়ে মেক্সিকো চলে গিয়েছিলেন এবং অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে একটি বই লিখেছিলেন। বইতে উল্লেখ করা গুয়াতেমালার বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন এবং মানুষের সংগ্রামের বর্ণনার জন্য তাকে শান্তিতে নোবেল প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে গবেষণায় বেরিয়ে আসে তার বইয়ের বর্ণনা মিথ্যা, ভুল ও বানোয়াট তথ্যে ভরা। এই মর্মে বিতর্ক বিদ্যমান যে, তিনি এর জন্য শান্তিতে নোবেল পাবার যোগ্যতা রাখেন না।

মালালা ইউসুফজাই (২০১৪)

পাকিস্তানের শিশুদের জন্য শিক্ষা নিয়ে কাজ করার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৪ সালে তাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কনিষ্ঠ নোবেলজয়ী। তার নোবেল পুরস্কারের প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী প্রভাব রেখেছে তালেবান সন্ত্রাসী কর্তৃক তার আক্রান্ত হওয়া। শিশু বয়সে নারী শিক্ষার জন্য কাজ করে যাওয়া এবং এর জন্য সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসা আসলেই সাড়া জাগানো ঘটনা ছিল। কিন্তু নোবেল পুরস্কার অর্জন করা? এখানে অনেকেরই প্রশ্ন। কারণ মালালার মতো হাজার হাজার মানুষ আছে যারা নারী ও নারী শিক্ষার জন্য কাজ করে গেছেন, কাজ করছেন। মালালার মতো অনেক নারী আছে যারা এসব কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছেন এবং এর চেয়েও জঘন্যভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদেরকে তো নোবেল কমিটি মনোনয়নও করেনি। শুধুমাত্র হাইপ তোলা এবং দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া নিশ্চয় নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্যতার মাপকাঠি নয়। তাই দুনিয়াজুড়েই মালালার পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুরস্কারও বিতর্কের ঊর্ধে নয়

শরণার্থী ক্যাম্পে বেশ অমানবিক অবস্থার জন্য বহু বছর ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বাস্তু নীতির সমালোচনা করে আসছেন মানবাধিকার কর্মীরা৷ তারপরও ‘শান্তি, মীমাংসা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকার জন্য’ ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও দেয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার৷

শান্তির পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অযোগ্যদের পুরস্কৃত করা হয় মাঝে মাঝে। আবার মাঝে মাঝে অতি-যোগ্যদেরকেও পুরস্কার দেয়া হয় না। সত্যিকারের যোগ্যরা পুরস্কার পাক এবং নোবেল কমিটিও থাকুক বিতর্কের ঊর্ধ্বে, এমন আশাই করি আমরা সকলে।

 

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *