দার্জিলিং কি জাতি-বিদ্বেষের পথে চলেছে!

ঢাকা: ব্রিটিশবিরোধী ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ৭৫তম বর্ষপূর্তিতে ৯ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ভারত সরকার পালন করছে ‘তেরঙ্গা যাত্রা’ কর্মসূচি। তবে দার্জিলিং পাহাড়ে এই কর্মসূচি এবার ভিন্নভাবে পালন করছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা।

মোর্চা নেতা বিমল গুরুং বলেছেন, ৯ থেকে ১৫ আগস্ট তেরঙ্গা যাত্রায় শামিল হব আমরা। পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সে তেরঙ্গা যাত্রা করব। তবে আমাদের প্রধান শ্লোগান হবে ‘বাংলা (পশ্চিমবঙ্গ) তুমি পাহাড় ছাড়ো’। সেইসঙ্গে ‘জয় গোর্খা, জয় গোর্খাল্যান্ড’ ধ্বনিতে মুখরিত হবে পাহাড় থেকে সমতল।

তিনি আরো বলেন, ব্রিটিশ সরকার যেমন ভারতবাসীকে কৃতদাস করে রেখেছিল, মানুষ স্বাধীনভাবে চলতে-ফিরতে পারত না, এখন বাংলার সরকারও আমাদের কোনো স্বাধীনতা দিচ্ছে না। তাই আমাদের এই আন্দোলন।

আলাদা গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে মোর্চার ডাকে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলছে অনির্দিষ্টকালের বন্ধ। চলছে অনশন আন্দোলনও। আলাদা গোর্খা রাজ্যের আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলনের এলাকাকে প্রসারিত করেছে ডুয়ার্স ও তরাইয়ে। প্রতিদিনই গোর্খা আন্দোলন মারমুখী রুপ নিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার হিংসা ছেড়ে আলোচনায় বসার  আহ্বান জানালেও গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের নেতারা রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী নয়। কারণ তারা শুধুমাত্র গোর্খাল্যান্ড নিয়েই আলোচনা চাইছে।

আর তাই ভারত সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল আলোচনার জন্য। কিন্তু সেই সময়সীমা ৮ আগষ্ট পেরিয়ে গেলেও ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনো বার্তা আসেনি। দার্জিলিং থেকে নির্বাচিত বিজেপির এমপি এস পে আলুওয়ালিয়াও এখন চুপ করে বসে রয়েছেন। ফলে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে জোরদার আন্দোলনের পথে যাওয়া ছাড়া আন্দোলনকারীদের সামনে কোনো পথ নেই। এর ফলে আরো অশান্ত হয়ে উঠছে দার্জিলিং।

রাজ্য প্রশাসনও আলাদা রাজ্যের দাবিতে অন্দোলনকারীদের শায়েস্তা করতে সমতলে আন্দোলনের প্রভাব যাতে না পড়তে পারে সেজন্য তৈরি হয়ে রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্কুলে বাংলা পড়া বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা থেকেই দার্জিলিং পাহড়ে আশান্তির আগুন জ্বললেও এখন এই আন্দোলন আলাদা রাজ্যের দাবিতে সংঘবদ্ধ আকার নিয়েছে। বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্ব নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকলেও পাহাড়ের বিভিন্ন দল মিলে তৈরি করেছে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন সমন্বয় কমিটি। এই কমিটিতে সমস্ত বিবাদ আপাতত দূরে সরিয়ে রেখে গোর্খা জাতীয় মুক্তি মোর্চা জিএনএলএফ যেমন যোগ দিয়েছে তেমনি যোগ দিয়েছে অন্যান্য দলও। এই আন্দোলনের সমর্থনে দেশের নানা প্রান্তে যেমন আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে বিদেশেও এর সমর্থনে মানুষ সমবেত হচ্ছেন।

অথচ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এই আন্দোলনকে মোকাবিলার জন্য চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে বলেছেন যে, তিনি জীবন থাকতে বাংলা ভাগ হতে দেবেন না। কিন্তু কোনোভাবেই বোঝার চেষ্টা হচ্ছে না যে এটা নিছকই রাজ্য ভাগের আন্দোলন নাকি এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন?

অবশ্য গোর্খাল্যান্ডের দাবি প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল একশ দশ বছর আগে। ১৯০৭ সালে হিলমেনস অ্যাসোসিয়েশন ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রথম গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেছিল। এর পর গত এক দশকে বেশ কয়েক বার এই দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হযেছে। রক্তও ঝরেছে। নিহত হয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। কিন্তু কখনো হিল কাউন্সিল আবার কখনো গোর্খাল্যান্ড টেরিটেরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্র্রেশনের সমঝোতায় ইতি টানার চেষ্টা হয়েছে।

আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হবার ৫ বছরের মধ্যে পাহাড়ে শক্তি বিস্তারের পথ নিয়েছেন। রাজনৈতিক লড়াই শুরু করেছেন কোথাও দল ভাঙিয়ে, কোথাও উপঢৌকন দিয়ে। পাহাড়ের জন্য একাধিক উন্নয়ন পর্যদ গঠন করে অ-গোর্খা জনজাতির মানুষকেও খুশি করার রাস্তায় হেঁটেছেন। কিন্তু এই ভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমাজসত্তার আন্দোলনকে পুরোপুরি দমানো যায় না।

বিশিষ্ট ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র বলেছেন, ‘দার্জিলিং বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ’ জাতীয় ঘোষণা শতবর্ষ ধরে গড়ে ওঠা পাহাড়ি জনসত্তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার অবমাননাকর প্রতিস্পর্ধী। ‘রাফ ও টাফ’ প্রশাসনের নানা নিষেধ, আদালতি আদেশ ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভেদ ঘটানোর জন্য সরকারি উপঢৌকন নীতি ক্রমশ শোধ-প্রতিশোধের বৃত্তকেই বড় করে চলেছে। শতেক ব্যাপী অনীহায় ড্রাগনের দাঁত বোনা হয়েছে, সেগুলোকে গুনে তোলা উচিত। আজকে প্রয়োজন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিছক উন্নয়নের শ্রুতিকথা উচ্চমন্যের খয়রাতি ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। সময় তো বেশি নেই, লোকপ্রবাদই আছে, ‘শিরে হৈলে সর্পঘাত, তাগা বাঁধবি কোথা?’

দার্জিলিং পরিস্থিতিকে যে কখনো অখণ্ড এক সামগ্রিকতায় ধরা হয় নি সেটাই আজ সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। তাই ‘নুন চা’ উপন্যাসের লেখক বিমল লামা এক নিবন্ধে বলেছেন, কোনো জনগোষ্ঠী যদি মনে করেন মৌলিক অধিকারগুলো থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন, তাকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করাটা একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব। দায়িত্ব দেশের সংবিধানের। যে রাষ্ট্রের তারা অধীন, সেই রাষ্ট্রের কোনো প্রাদেশিক সরকারের অংশ হলে, সেই সরকারেরও।

কিন্তু এখনো পর্যন্ত বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্র হিসেবেই গোটা আন্দোলনকে দেখার ফলে ক্রমশ এই আন্দোলন জাতি বিদ্বেষের দিকে চলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। অবশ্য এই সম্ভাবনার কথা অনেক আগেই বলে গিয়েছেন অনেকে।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটার

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *