তৈমুর লং; এক রহস্যময় দ্বিগ্বিজয়ী

“আমি যেদিন জাগব, সমগ্র পৃথিবী প্রকম্পিত হবে।” (“When I rise from the dead, the world shall tremble.”)
“যে আমার কবর খুলবে, সে আমার চেয়েও ভয়াবহ এক আক্রমণকারীকে লেলিয়ে দিবে।”(“Who ever opens my tomb, shall unleash an invader more terrible than I.)

প্রথম কথাটি লেখা আছে তৈমুর লং এর কফিনের উপরে। আর পরেরটি আছে কফিনের ভেতরে একটি ফলকে লেখা। যখন কৌতূহলবসে তার কফিন কয়েকশ বছর পর খোলা হয়েছিল তখন বিশ্ববাসী দেখেছে তৈমুর লং এর এই ভবিষ্যৎ বানীর সত্যতা। এই বীর যোদ্ধাকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনী বা মিথ। এগেুলোর অন্যতম হচ্ছে তার কবর উত্তোলনের কাহিনীটি।
১৪০৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী দেহত্যাগকারী তৈমুর লং তখনকার পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫% কে হত্যা করে এই কফিনে ঘুমিয়ে আছেন যা ছিলো প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। হিটলারের আগমনের পূর্বে তৈমুরই ছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় ত্রাস। তৈমুর তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করিয়ে যান যার নাম তুজুক ই তৈমুরী।

তৈমুর-লং

তুর্কী-মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর লং ছিলেন তিমুরীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৭০ থেকে ১৪০৫ সাল পর্যন্ত পঁয়ত্রিশ বছর ছিলো তার রাজত্ব। আজকের দিনের তুরষ্ক, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, ইরান থেকে মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অংশ (কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, ভারত, এমনকি চীনের কাশগর পর্যন্ত) তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই তৈমুরই ছিলেন আর্ট ও কালচারের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক। তিনি সমাজবিদ্যার (Sociology) প্রতিষ্ঠাতা ইবনে খলদুন ও পার্শী কবি হাফিজের মত মুসলিম পন্ডিতদের সংস্পর্শে আসেন।

১৩৬০ সালে তৈমুর সেনা অধ্যক্ষ হিসাবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তিতে ১৩৬৯ সালে সমরকন্দের সিংহাসনে আরোহন করেন। সে সময় যেকোন শাসকই সিংহাসনে আরোহনের পর দ্বিগিজ্বয়ে বের হতেন, তৈমুরও তাই করেন।

১৩৯৮ সালে তৈমুর দিল্লি সুলতানাত আক্রমণ করেন। এবং কয়েকমাসের মধ্যে দিল্লি জয় করেন। এখানে তিনি এক লক্ষ যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করেন। তিনি অটোমান সাম্রাজ্য, মিশর, সিরিয়া, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ইত্যাদি দেশেও সামরিক অভিযান চালান। সব জায়গাতেই ব্যপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় ও অনেক জনপদ বিরান করে ফেলা হয়।তার সেনারা যে স্থানই জয় করত সেখানেই ধ্বংসযজ্ঞের প্রলয় তুলত।

তৈমুর লংয়ের সাথে ওসমানীয় সুলতান বায়েজিদের বিরোধ শুরু হয় সাম্রাজ্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। শুরুতে পরিস্থিতি অতটা উত্তপ্ত ছিলো না। কিন্তু তৈমুরের এক চিঠির জবাবে বায়েজিদের রাগান্বিত প্রত্যুত্তর আস্তে আস্তে ঘোলাটে করে ফেলে পুরো ব্যাপারটিই। বিশাল রক্তক্ষয়ী এবং ঘটনাবহুল যুদ্ধ শেষে তৈমুর ওসমানী সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। সর্বশেষ তৈমুর চীন জয় করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন সেখানে রাজত্ব করছিল মিং ডাইনাস্টি। তিনি মিং-দের আক্রমণের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন, কিন্ত শির দরিয়া পর্যন্ত পৌছে ছাউনি স্থাপন করার পরপরই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। বিশ্বজয়ী কঠোর শাসকের এটিই ছিল শেষ অভিযান।

তৈমুরের মৃত্যুর কয়েক শ বছর পরের ঘটনা। ১৯৪১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার কবর থেকে তার মৃতদেহ তোলার সিদ্ধান্ত নিল। উদ্দেশ্য দেহাবশেষ থেকে তার সত্যিকারের চেহারার ছবি আঁকা। কোন কঙ্কাল বা দেহাবশেষ থেকে সেই ব্যক্তিটি জীবদ্দশায় দেখতে কেমন ছিল তার চিত্র অংকন করার বিজ্ঞানটি ইতিমধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নে যথেষ্ট উন্নতি লাড করেছিল। এটা প্রথম করেছিলেন সোভিয়েত প্রত্নতত্ববিদ ও নৃবিজ্ঞানী মিখাইল গেরাসিমভ। তিনি সবমিলিয়ে দুই শত জনেরও বেশি মানুষের দেহাবশেষ থেকে তাদের চেহারা অঙ্কন করেছিলেন। তারই নেতৃত্বে একটি টীম গঠন করেন সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্তালিন।

তৈমুর-লং

কিন্ত সমস্যা হচ্ছে তাকে কোথায় সমাহিত করা হয়েছে তার কোনো হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। একের পর এক কবর খুঁড়েন আর হতাশা বাড়ে গেরাসিমোভ ও তার নৃবিজ্ঞানী দলের। অবশেষে তারা সমরকন্দের একটি স্থান চিহ্নিত করলেন। তারা এক প্রকার নিশ্চিত যে, এটিই হচ্ছে তৈমুরের আসল কবর।তারা কবর খুঁড়তে শুরু করলেন। কিন্তু খোড়াখুঁড়ির পর আগের চাইতেও বেশি হতাশ হলেন নৃবিজ্ঞানীরা। এটিও শূণ্য কবর। হতাশ গেরাসিমভ এবার গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল গেরাসিমোভের মাথায় – ‘আমরা থেমে গেলাম কেন? আরো গভীরে খুঁড়িনা। দেখিনা, কি আছে সেখানে।’

পরদিন তারা ফিরে গেলেন কফিনে। নব উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। খুঁড়তে খুঁড়তে আরো গভীরে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, কিছু একটা আছে ওখানে। এবার ভারী কয়েকটি পাথরের পাটাতন নজরে পড়ল। স্পস্ট হলো যে, কবরটি কৌশলে নির্মিত। প্রথমে একটি ফাঁকা কবর তারপর আরো গভীরে কিছু আছে। ঐ পাটাতন সরালে কিছু একটা পাওয়া যেতে পারে। ওগুলো সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এরকম সময়ে গেরাসিমোভের কাছে সংবাদ এলো যে, আপনার সাথে তিন বুড়ো দেখা করতে চায়।

কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা বিস্মিত হলেন গেরাসিমোভ, কে এলো আবার এই চূড়ান্ত সময়ে। সংবাদদাতা জানালেন, এটা খুব জরুরী, আপনাকে তাদের সাথে দেখা করতেই হবে। কাজ রেখে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। দেখলেন তিনজন বৃদ্ধ বসে আছে। সেই প্রাচীন কালের রূপকথার মত দেখতে তারা । আবার তিন বৃদ্ধ দেখতে ছিল একই রকম, যেন মায়ের পেটের তিন ভাই। তারা রুশ ভাষা জানত না। ফারসী ভাষায় কথা বলতে শুরু করল। অনুবাদক অনুবাদ করে দিল। তারা গেরাসিমভকে তৈমুরের মৃতদেহ তুলতে বারণ করলেন। জবাবে ওই রুশ বিজ্ঞানী বললেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী স্বয়ং স্তালিন আমাদের পাঠিয়েছেন। মিশন শেষ না করে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না।’ ক্ষেপে গিয়ে বৃদ্ধরা বললেন, ‘সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী উপরওয়ালা, স্তালিন নয়। তার কথা না শুনলেও চলবে।’ তিনি তখন জানতে চাইলেন, সামান্য একটা মৃতদেহ তুলতে তাদের অত আপত্তি কিসের। জবাবে তারা বললেন,‘এটি তৈমুর লং-এর মৃতদেহ।

এরপর তারা আরবিতে লেখা অতি প্রাচীন একটি বই দেখালেন। বইয়ের একটি জায়গায় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে শান্ত সৌম্য তৃতীয় বৃদ্ধটি বললো,‘এই দেখ, এখানে লেখা “আমি যেদিন জাগব, সমগ্র পৃথিবী প্রকম্পিত হবে।” (“When I rise from the dead, the world shall tremble.”)

কিন্তু গেরাসিমোভ বললেন আপনাদের কথা রাখা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আপনারা যেতে পারেন আমার হাতে এখন অনেক কাজ।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গেরাসিমোভের দিকে তাকালেন তারা। এরপর ফারসী ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন গেরাসিমোভকে। দ্বিগুন বিরক্তিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন গেরাসিমোভ। গালমন্দ করতে করতে চলে গেল তিন বৃদ্ধ। যে উৎফুল্ল মনে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি তা আর রইল না। মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল। দিনটি ছিল ১৯৪১ সালের ২০শে জুন।কিন্তু কি আশ্চর্য! তৈমুরের সমাধির গায়ে এটি কি লেখা! ফারসি ও আরসি ভাষায় লেখা, ‘আমি যেদিন জাগব, সমগ্র পৃথিবী প্রকম্পিত হবে (“When I rise from the dead, the world shall tremble.”)। যত্ত সব কল্প কাহিনী! অবশেষে ১৯৪১ সালের ২২শে জুন সমাধির পাটাতন সরিয়ে ওঠানো হল কফিন। গভীর আগ্রহ নিয়ে কফিনের ডালা খুললেন গেরাসিমভ। কফিনে শায়িত পাঁচশত বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া, মহাশক্তিধর তৈমুরের নিথর-নীরব দেহ। মৃতদেহের পাশে ওটা কি পড়ে আছে? ফলকটি হাতে তুলে নিলেন গেরাসিমোভের। সেখানে লেখা, ‘যেই আমার কবর খুলুক না কেন, সে আমার চাইতেও ভয়াবহ এক আগ্রাসীকে পৃথিবীতে ডেকে আনলো (Who ever opens my tomb, shall unleash an invader more terrible than )।’
মন খারাপ হয়ে গেল গেরাসিমোভের। তবুও তৈমুরের দেহাবশেষ নিয়ে গভীর মনযোগের সাথে কাজ চালিয়ে গেলেন। তিনি দেখেন, তৈমুর বেঁটে বলে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে তা সত্য নয়। তিনি ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা যা তার যুগের মানুষদের গড় উচ্চতার চেয়েও বেশি। তবে তার এক পা খোঁড়া। কোনো এক যুদ্ধে আঘাত পাওয়ার পর তিনি খোঁড়া হন।

গেরাসিমোভ যেদিন তৈমুরের মৃতদেহ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন সেদিনই জার্মানির হিটলার বাহিনী হামলা চালায় সোভিয়েত ইউনিয়নে। দুনিয়া তোলপাড় করা যে অভিযানের নাম অপারেশন বারবারোসা।হতবাক হয়ে গেলেন গেরাসিমোভ। কফিনের গায়ের লেখাটি মনে পড়ল তার।রাতের বেলায় গেরাসিমোভ ফোন করলেন স্তালিনকে। সব কিছু শুনে কি প্রতিক্রিয়া হলো তার বোঝা গেল না। শুধু বললেন, “আপনি মুখচ্ছবিটি তৈরী করুন”

প্রভুর নির্দেশ পেয়ে কাজ শুরু করলেন গেরাসিমোভ।বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো দেখলো লৌহমানব তৈমুরের কঠিন মুখচ্ছবি। এদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন ভয়াবহ রূপ ধারন করেছে। বিংশ শতকের ত্রাস হিটলার বাহিনীর কাছে একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে সোভিয়েত বাহিনী। তখন তৈমুরের দেহ ফের কবরে ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন গেরাসিমোভ। ১৯৪২ সালের ২০শে নভেম্বরে পূর্ণ মর্যাদায় ইসলামী রীতি মেনে তৈমুরের মৃতদেহ পুণরায় দাফন করা হয় গুর-ই-আমির সমাধিতে। কি আশ্চর্য, তার দফনের পরপরই স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে এলো প্রথম আনন্দ সংবাদ। অপারেশন ইউরেনাস-এ হিটলার বাহিনীকে পরাস্ত করেছে সোভিয়েত বাহিনী।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *