কুরআন সংকলনের ইতিহাস

কোরআন মূলত আল্লাহর কালাম। এজন্য কোরআনে কারিম লৌহে আমল থেকে লৌহে মাহফুজে সংরক্ষিত ছিল।

যেমন কোরআনে আছে, বরং এটাতো সম্মানিত কিতাব যা লৌহে মাহফুজে সংরক্ষিত। অতঃপর বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী পুরো কোরআনে কারিমকে কদরের রজনীতে লৌহে মাহফুজ থেকে সামায়ে দুনিয়ায় বা প্রথম আকাশে বাইতুল ইজ্জত নামক ঘরে অবতীর্ণ করা হয়।

বাইতুল ইজ্জতকে বাইতুল মামুরও বলে, যা কাবা শরিফের ঠিক বরাবর প্রথম আসমানে অবস্থিত। অতঃপর জিবরাইল (আ.) বাইতুল ইজ্জত থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প নিয়ে হুজুর (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হতেন। যার ধারাবাহিকতা ২৩ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে।

পবিত্র কোরআনের সংকলন পদ্ধতি: পবিত্র কোরআন একত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে আরবিতে জমউল কোরআন বলা হয়। জমা শব্দটি দু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সে হিসেবে আল কোরআন জমা করা দুই প্রকার- প্রথমত: হিফজ বা মুখস্থের মাধ্যমে আল কোরআন একত্র ও সংরক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত: লিখিত আকারে সমগ্র কোরআন একত্র ও সংরক্ষণ করা।

প্রথম প্রকার: হিফজ বা মুখস্থের মাধ্যমে আল কোরআন একত্র ও সংরক্ষণ করা। আল্লাহ তাআলার বাণী, কোরআন তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহ্বাকে দ্রুত আন্দোলিত করো না। নিশ্চয়ই এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমার দায়িত্বে। অতঃপর যখন আমি তা পাঠ করি তখন তুমি তার পাঠের অনুসরণ কর। তারপর তার বর্ণনার দায়িত্ব আমারই। [সূরা আল কিয়ামাহ:১৬-১৯] উক্ত আয়াতে জমা শব্দের অর্থ মুখস্থ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোরআন জমা ও সংরক্ষণ করা। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস এ ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা হিসেবে পেশ করা যায়।

তিনি বলেন, রাসূলের (সা.) প্রতি যখন কোরআন নাজিল হওয়া শুরু হতো, তিনি তা মুখস্থ করার জন্য অত্যধিক শ্রম দিতেন। তিনি তার জিহবা নাড়াতেন এই ভয়ে যে পাছে নাজিলকৃত ওহীর কোনো কিছু ছুটে না যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন- কোরআন তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহবাকে দ্রুত আন্দোলিত করো না। নিশ্চয়ই এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমার দায়িত্বে।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তোমার বক্ষে তা একত্র করা, অতঃপর তুমি তা পড়বে। অতঃপর যখন আমি তা পাঠ করি তখন তুমি তার পাঠের অনুসরণ কর। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এরপর থেকে তিনি মনোযোগসহ শুনতেন ও চুপ থাকতেন এবং জিবরাইল (আ.) চলে গেলে তিনি তা পড়তেন যেভাবে জিবরাইল (আ.) তাঁকে পড়িয়েছেন। [বুখারি, খণ্ড:-০১, পৃ:৪; মুসলিম, খণ্ড:-০১, পৃ:৩৩০-৩৩১]

চতুর্থ হিজরিতে বীরে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনায় ৭০ জন সাহাবির ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে, তারা সবাই ভালো কোরআন তেলাওয়াতকারী ছিল। তারা দিনের বেলায় কাঠ কেটে আহলে সুফফার লোকদের জন্য খাবার সংগ্রহ করত এবং কোরআন শিখত ও শিখাত আর রাতে আল্লাহর নিকট দোয়া ও নামাজ আদায়ে ব্যস্ত থাকত। সাহাবায়ে কিরামের এ আগ্রহের ফলাফল এই ছিল যে, রাসূল (সা.) -এর জীবদ্দশায়ই হাফেজগণের একটি বড় দল গড়ে উঠেছিল। ওই দলের মধ্যে ছিল- ১। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ২। ওমর ফারুক (রা.) ৩। ওসমান গনী (রা.) ৪। আলী (রা.) ৫। তালহা (রা.) ৬। সাদ (রা.) ৭। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ৮। হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) ৯। সালেম (রা.) ১০। আবু হুরায়রা (রা.) ১১। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমার (রা.) ১২। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) ১৩। মুয়াবিয়া (রা.) ১৪। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) ১৫। আব্দুল্লাহ ইবনে সায়েব (রা.) ১৬। আয়েশা (রা.) ১৭। হাফসা (রা.) ১৮। উম্মু সালামা (রা.) এই নামগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ১১ হিজরিতে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে ৭০০ হাফেজে কোরআনের শাহাদাত বরণে এ কথা স্পষ্ট যে, ওই সময় পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণ হাফেজ গড়ে উঠেছিল। মুখস্থ করার মাধ্যমে কোরআন মাজিদ সংরক্ষণের এ ধারা নবী (সা.)-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিদ্যমান আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চালু থাকবে। (ইনশাআল্লাহ)।

দ্বিতীয় প্রকার: লিখিত আকারে পবিত্র কোরআন জমা করা। লিখিত আকারে মোট তিনবার পবিত্র কোরআন জমা করা হয়েছে। প্রথম বার: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়। দ্বিতীয়বার: আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-র খেলাফত আমলে। তৃতীয়বার: উসমান (রা.) খেলাফত আমলে।

পবিত্র কোরআন সংকলনের ইতিহাস
মদিনায় চলমান কোরআন প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত কোরআনের সর্ব প্রাচীন পান্ডুলিপি এটি। ছবি: মহিউদ্দীন ফারুকী

প্রথমবার: রাসূল (সা.)-এর যুগে পবিত্র কোরআন জমা করা তথা লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা। শুধু বক্ষে সংরক্ষণের রীতি অনুসরণ করেই পবিত্র কোরআন সংরক্ষণের ব্যাপারে যত্ন নেয়া হয়নি। বরং লিখিত আকারে সংরক্ষণের ওপরও সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। লিখিত আকারে কোরআন সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী লেখার জন্য বড় বড় সাহাবীদের (রা.) দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং যখনই কোনো আয়াত নাজিল হত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের তা লিখে নেয়ার নির্দেশ দিতেন। কোন সূরার কোথায় তা রাখতে হবে তাও বলে দিতেন।  কোরআন মুখস্থ করার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া সত্ত্বেও কোরআন লিখে রাখার গুরুত্বের কথা রাসূল (সা.) মোটেও ভুলে যাননি। এ উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) শিক্ষিত সাহাবাগণকে এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন যে, অহি নাজিল হওয়া মাত্রই তারা তা লিখে রাখবে। যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) তার নির্দিষ্ট অহির লেখক ছিল। এ ছাড়াও তিনি সরকারি অন্যান্য বিষয়াবলি লিখে রাখার দায়িত্বপ্রাপ্তও ছিলেন। স্বয়ং রাসূল (সা.) তাকে বিদেশি ভাষা শেখার এবং লেখার জন্য দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

এ ছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অহি লেখকেরা হলেন- ১. আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ২. ওমর ফারুক (রা.) ৩. ওসমান (রা.) ৪. আলী (রা.) ৫. ওবাই ইবনে কা’ব (রা.) ৬. যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) ৭. মোয়াবিয়া বিন সুফিয়ান (রা.) ৮. মুগীরা ইবনে শো’বা (রা.) ৯. খালেদ ইবনে ওলীদ (রা.) ১০. আবান ইবনে সাঈদ (রা.) ১১. আব্দুল্লাহ ইবনে সাঈদ ইবনে আস (রা.) যায়েরদ ইবনে সাবেত (রা) জাহেলিয়াতের যুগেও লেখক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। [উলুমুল কোরআন, ড. মাওলানা শাসমুল হক সিদ্দিক]

রাসূল (সা.) তাকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে, সে যেন সাহাবা কেরামগণকে লিখা শিখায়, বলা হয়ে থাকে যে, নবী (সা.) এর যুগে অহি লেখকগণের সংখ্যা ৪০ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। রাসূল (সা.)-এর অভ্যাস ছিল যে, যখনই কোরআন কারীমের কোনো আয়াত অবতীর্ণ হতো তখন তিনি অহি লেখকদেরকে পরিপূর্ণভাবে নির্দেশ দিতেন যে, এ আয়াতটি ওমুক ওমুক সূরায় ওমুক ওমুক আয়াতের পরে লিখ, তখন ওহী লেখকগণ পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, গাছের পাতা, হাড্ডি বা কোনো কিছুর ওপর লিখে রাখতেন। এভাবে নবী (সা.)-এর যুগে কোরআন কারীমের এমন একটি কপি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল যা রাসূল (সা.) নিজের তত্ত্বাবধানে লিখেয়েছেন। বলা হয়ে থাকে যে, রাসূল (সা.) -এর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত অগোছালোভাবে ১৭টির অধিক মাসহাফের (কোরআনের কপি) সন্ধান পাওয়া যায়। [দেখুন: ইবনে হাযম, জাওয়ামিউস সীরা, পৃধ২৬-২৭; ইবনুল কাইয়েম, যাদুল মাআদ, খণ্ড:১, পৃ:২৯]

দ্বিতীয় বার: আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফত আমলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খলিফা হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামের ওয়াফাতের সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাপকহারে আরবদের ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়ার অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতির  মোকাবিলা করা। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠান। এ সূত্রেই ১২ হিজরিতে ইয়ামামার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে হাফেজ সাহাবীদের (রা.) বড় একটি সংখ্যা অংশ নিয়েছিলেন। হাফেজ সাহাবীদের ৭০ জন তাতে শাহাদতবরণ করেন। বিষয়টি উমর ইবনুল খাত্তাবকে (রা.) আতঙ্কিত করে তুলল। তিনি আবু বকর সিদ্দীক (রা.) -এর কাছে গেলেন এবং লিখিত আকারে সমগ্র কোরআন একত্রীকরণের ব্যাপারে পরামর্শ দিলেন; কেননা অন্যকোনো যুদ্ধে এভাবে হাফেজ সাহাবীদের শাহাদত বরণ হলে আল কোরআন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। শুরুতে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বিষয়টি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম করে যাননি, তা করা উচিত হবে না। তবে উমর (রা.) তার প্রস্তাব বার বার উপস্থাপন করে গেলেন। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা আবু বকর সিদ্দীক (রা.) অন্তরকে এ ব্যাপারে খুলে দিলেন। তিনি সম্মত হলেন এবং যায়েদ ইবনে ছাবেতকে (রা.) ডেকে পাঠালেন। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) উমরের (রা.) পরামর্শের ব্যাপারে তাকে জানালেন। শুরুতে আবু বকর সিদ্দীকের (রা.) মতোই যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা.) অসম্মতি জানালেন। যে কাজটি রাসূল (সা.) করে যাননি সে কাজে আবু বকর এবং উমর (রা.) কী করে হাত দিচ্ছেন, তা ভেবে তিনি নিজেকে বুঝাতে পারছিলেন না। উপরন্তু ছড়িয়ে থাকা কুরাআন একত্রীকরণ এমন এক কঠিন কাজ যা, যায়েদ ইবনে ছাবেতের (রা.) ভাষ্যানুযায়ী- এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কোনো পাহাড় সরিয়ে নেয়ার চেয়েও কঠিন। (বুখারী) তবে পরবর্তীতে তিনি সম্মত হলেন এবং হিফযকৃত ও লিখিত আকারে ছড়িয়ে থাকা আল কোরআননের নানা অংশ একত্রীকরণের মহান কাজে হাত দিলেন। যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা.) যথার্থরূপে তার দায়িত্ব পালন করে একত্রীকৃত কোরআন আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কাছে সোপর্দ করেন। আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-র মৃত্যু পর্যন্ত এ কোরআন তার কাছেই সংরক্ষিত থাকে। ১৩ হিজরিতে যখন তিনি ইন্তেকাল করেন তখন তা উমর (রা.)-এর কাছে চলে যায়। উমর (রা.)-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত এ কোরআন তার কাছেই থাকে। এরপর তা উমর (রা.)-এর মেয়ে হাফসার (রা.) কাছে সংরক্ষিত থাকে। উসমান (রা.)-এর খিলাফতের প্রাথমিক পর্যায়ে এ কোরআন তার কাছেই থাকে। [উলুমুল কোরআন, ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক]

পবিত্র কোরআন সংকলনের ইতিহাস
মদিনায় চলমান কোরআন প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত কোরআনের সর্ববৃহৎ পান্ডুলিপি এটি। ছবি: মহিউদ্দীন ফারুকী

তৃতীয় বার: উসমান (রা.) খেলাফত আমলে। আল কোরআন নাজিল হয়েছিল মূলত কুরাইশদের আরবি উচ্চারণ অনুযায়ী। তবে এর পাশাপাশি আরও ছয়টি আরবি উপভাষায়ও কোরআন চর্চা ও তিলাওয়াতের অনুমোদন ছিল। জিবরাইল আলাইহিস সালাম সে উপভাষাগুলোতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোরআন চর্চা শেখান। বরং কোরআন নাজিলের সময় সাত ভাষার প্রত্যেকটির উচ্চারণ ভঙ্গির ও শব্দের গঠনাকৃতির পার্থক্যসহ-ই নাজিল করতেন। সে হিসেবে পবিত্র কোরআন সাত হরফ বা ভাষায় নাজিল হয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসছে। উসমানের (রা.) খেলাফতের পূর্বেই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানার আওতাভুক্ত হয় নতুন নতুন বহু অঞ্চল। ফলে কোরআনের হাফেজগণ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েন। হাফেজদের সবাই যে কুরাইশদের আঞ্চলিক উচ্চারণে কোরআন মুখস্থ করেছিলেন বিষয়টি সে রকম নয়। বরং প্রত্যেকেই যার অঞ্চলের উচ্চারণরীতি অনুযায়ী কোরআন মুখস্থ করেছেন।

পরিশেষে তারা যখন বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়লেন, নিজ নিজ উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী ওই শহরের লোকদেরকে কোরআন শেখাতে থাকেন। এরপর যখন কোনো উপলক্ষে- যেমন কোনো দাওয়াতী অভিযানে- বিভিন্ন শহরের লোকজন একত্র হতেন, এক অঞ্চলের লোকজন অন্য অঞ্চলের লোকদের কিরাত শুনে আশ্চর্য হতেন।  মূলত আরবদের কেউ যেন- তার ভাষার উচ্চারণরীতি বা শব্দের গঠন যাই হোক না কেন- এই অজুহাতে যাতে কোরআন থেকে দূরে না থাকে যে, কোরআন আমাদের ভাষায় নাজিল হয়নি, আমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা নজর দেননি। অথবা কুআইশদের ভাষায় নাজিল হওয়া আরবি আমাদের পক্ষে তিলাওয়াত করা সম্ভব নয়। এসব বিবেচনায় রেখে এবং আরও অনেক কারণে আল কোরআন সাত ভাষা তথা আঞ্চলিক উচ্চারণরীতির অনুবর্তিতায় নাজিল করা হয়।

সাত আরব্য আঞ্চলিক ভাষায় কুআরান শেখা লোকদের প্রথম লক্ষ্যণীয় সমাবেশ ঘটে আরমেনিয়া আজারবাইন যুদ্ধে। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন ইরাকবাসী ও সিরিয়াবাসী মুসলমানরা। ইরাকবাসীরা কোরআন শিখতেন আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-র উচ্চারণরীতি অনুযায়ী আর সিরিয়াবাসীরা কোরআন শিখতেন উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর উচ্চারণরীতি অনুযায়ী। তারা যখন একে অপরের কোরআন শুনে ভাবলেন যে, অপর পক্ষ আল কোরআন পাঠে মারাত্মক ধরনের ভুল করছে। তারা একে অপরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করতে লাগলেন। [দেখুন ইবনে হাজার আল আসকালানী, ফাতহুল বারী, খণ্ড:৯, পৃ:১৮]

হুযায়ফা ইবনে ইয়ামানও এ যুদ্ধদ্বয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন আঞ্চলিক উচ্চারণ কোরআন শেখা লোকদের পরস্পরে ঝগড়া-বিতণ্ডা প্রকটভাবে লক্ষ্য করলেন এবং বিষয়টি উম্মতের মধ্যে বিশাল ইখতিলাফের কারণ হবে ভেবে উসমান (রা.)-এর কাছে ছুটে গেলেন। তিনি উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে উসমানকে (রা.) বললেন, ‘ইহুদি নাসারাদের ন্যায় ইখতিলাফ-মতানৈক্য লিপ্ত হওয়ার পূর্বেই আপনি উম্মতকে বাঁচান। অতঃপর উসমান (রা.) হাফসাকে (রা.) এই বলে বার্তা পাঠান যে আপনি আমাদের কাছে কোরআনের সহীফাগুলো পাঠিয়ে দিন। আমরা তা থেকে অনুলিপি তৈরি করে আপনার কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেব। হাফসা (রা.) তা উসমান (রা.) -এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এমনকি খোদ মদীনা মুনাওরায় কোরআন পাঠ নিয়ে এ ধরনের ইখতিলাফ-মতানৈক্য শুরু হয়ে গিয়েছিল। মদীনায় যারা বাচ্চাদের কোরআন শেখাতেন তাদের প্রত্যেকেই যার যার উচ্চারণরীতি অনুযায়ী শেখাতেন। এরপর বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে কোরআন-শেখা বাচ্চারা যখন একত্র হতো, একজন অপরজনের কোরআন পাঠকে ভুল বলত, অশুদ্ধ ভেবে তা অস্বীকার করত। উসমান (রা.) এ কথা জানতে পেরে বক্তব্য দিয়ে বললেন, ‘আপনারা আমার পাশেই মতানৈক্য ও ভুলভ্রান্তি করছেন। আর যারা আমার থেকে দূরে বিভিন্ন অঞ্চলে তারা তো আরও কঠিন ভুলভ্রান্তি ও মতানৈক্য করছে। হে মুহ্ম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ, আপনার মানুষের জন্য একটি ‘ইমাম’ লিখে দিন। [ইবনে আবি দাউদ, আল মাসাহেফ, পৃ:২৯]

উসমান (রা.)-এর শাসনামলের পর কোরআন সংকলনের চিত্র: উসমান (রা.) কোরআন মাজীদের যে কপিটি প্রস্তুত করিয়েছিলেন তা ছিল যের, যবর, পেশ এবং নোক্তা (ফোটা) বিহীন। আরবি ভাষীদের জন্য এ ধরনের কোরআন তেলাওয়াত করা ততটা কঠিন ছিল না। কিন্তু অনারবদের জন্য তা যথেষ্ট কষ্টকর ছিল। বলা হয়ে থাকে যে সর্বপ্রথম বসরার গভর্নর যিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান একজন আলেম আবুল আসওয়াদ আদদুয়াইলীকে এ বিষয়ে একটি সমাধান খোঁজার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি অক্ষরগুলোর ওপর নোক্তা (ফোটা) দেয়ার পরামর্শ দিলেন এবং তা করা হল। আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান (৬৫-৮৬ হি.) তার শাসনামলে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ ইবনে ইয়ামার এবং নাসার বিন আসেম লাইসী ও হাসান বাসরী (রাহিমাহুমুল্লাহর) পরামর্শক্রমে যের, যবর, পেশ সংযোগ করেছে। আবার বলা হয়ে থাকে যে, হামযা এবং তাশদীদের আলামতসমূহ খালীল ইবনে আহমদ (রা.) স্থাপন করেছেন।

সাহাবা আজমাইন এবং তাবেয়ীনগণের অভ্যাস ছিল যে, তারা সপ্তাহে একবার কোরআন মাজীদ খতম করতেন। এ উদ্দেশ্যে তারা পূর্ণ কোরআন মাজীদকে সাত ভাগে ভাগ করেছেন, যাকে হিযব বা মানজীল বলা হয়। মূলত এই হিযব বা মানজীলের ভাগ সাহাবায়ে কিরামের যুগে হয়েছিল। অবশ্য কোরআন মাজীদকে ৩০ পারায় ভাগ করা, প্রত্যেক পারাকে চার ভাগে ভাগ করা অর্থাৎ চতুর্থাশে, অর্ধেক, তৃতীয়াংশ, এমনকি রুকুর আলামত, আয়াত নাম্বার, ওয়াকফ (থামার চিহ্ন) যোগ করা ইত্যাদি মাসহাফ উসমানী তথা উসমান (রা.)-এর যুগে একত্রীতকরণ কোরআনের পরে করা হয়েছে। যার সংযোজন একমাত্র কোরআন মাজীদের তেলাওয়াত এবং মুখস্থ করাকে সহজ করার জন্য করা হয়েছে। কোরআন মাজীদ অবতীর্ণের সময়কালের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই এবং শরীয়তের দৃষ্টিতেও এর কোনো বিশেষ বিধান নেই।

পবিত্র কোরআনে যের, যবর, পেশ ও নুকতা সংযোজন: হযরত উসমান রা. যে মুসহাফ তৈরি করেছেন তাতে হরফসমূহে নুকতা ও হরকত যের, যবর ও পেশ ছিল না। পরবর্তীতে কে এই মহৎ কাজটি করেছেন-এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ আছে। তবে আল্লামা তকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম ‘উলূমুল কোরআন’-এ বলেন, এ সম্পর্কিত সকল বর্ণনা সামনে রাখলে প্রতীয়মান হয় যে, হরকত (যের, যবর ও পেশ) সর্বপ্রথম হযরত আবুল আসওয়াদ দুয়ালী রাহ. আবিষ্কার করেন। কিন্তু হরকতের রূপ এখন যেমন দেখা যায় তেমন ছিল না। তখন ছিল ফোঁটার মতো। যবরের জন্য উপরে এক ফোঁটা দেওয়া হতো, যেরের জন্য নিচে এক ফোঁটা আর পেশের জন্য সামনে এক ফোঁটা দেওয়া হতো। তানভীনের জন্য দুই ফোঁটা ব্যবহৃত হত। এরপর খলীল বিন আহমদ রাহ. হামযাহ ও তাশদীদের বর্তমান রূপটি আবিষ্কার করেন। এরপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইয়াহইয়া বিন ইয়ামার (রহ.) ও নাসর বিন আসেম (রহ.) -এর মাধ্যমে কোরআনে কারীমে হরফসমূহে নুকতা লাগানোর ব্যবস্থা করেন। এই সময়ই মূলত নুকতা ও হরকতের পার্থক্যের উদ্দেশ্যে হরকতের বর্তমান রূপটি অবলম্বন করা হয়। [আলইতকান ২/৪১৯; সুবহুল আ‘শা ৩/১৬০-১৬১; আলবুরহান ১/২৫০; উলূমুল কোরআন পৃ. ১৯৫]

কোরআন মুদ্রণের ইতিহাস: কোরআন নাযিলের সূচনালগ্ন থেকে আরম্ভ করে দীর্ঘকাল পর্যন্ত হস্তলিপির সাহায্যে এর সঙ্কলনের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। একদল নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান এ কাজটিকে নিজেদের জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেন। তারা কোরআনের অসংখ্য কপি তৈরি করে মুসলিম বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণ করতে থাকেন। ফলে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার বহু পূর্বেই বিশ্বের আনাচে-কানাচে কোরআনের লক্ষ লক্ষ কপি পৌঁছে যায়। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ ‘হিংক্যাল ম্যান’ ‘হ্যামবুগ’ শহরে সর্বপ্রথম কোরআন মুদ্রণের কাজ সম্পন্ন করেন। অবশ্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেছেন, এরও বহু পূর্বে জনৈক প্রাচ্যবিদের বিশেষ উদ্যোগে ‘আল-বান্দকিয়া’ নামক স্থানে কোরআন মুদ্রিত হয়েছিল। তবে তখন কে এই মুদ্রণকাজ সম্পাদন করেছিলেন, তা নিশ্চিত জানা যায় নি। যাক, এরপর ‘মারাকি’ নামক আরেক প্রাচ্যবিদ ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে ‘পাডু’ শহরে কোরআন মুদ্রণ করেন। কিন্তু খ্রিস্টানরা চরম ইসলাম বিদ্বেষী হওয়ার কারণে তাদের মুদ্রিত এসব কপি মুসলিম বিশ্বে আদৌ সমাদৃত হয়নি।

মুসলমানদের মাঝে সর্বপ্রথম মাওলায়ে ওসমান রহ. কোরআন মুদ্রণের গৌরব অর্জন করেন। তিনি ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার সেন্টপিটার্স শহরে ইসলামী ছাপাখানায় তা সম্পন্ন করেন। তার মুদ্রিত কপি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত হয়। উপরন্তু প্রায় একই সময়ে ‘কাযান’ শহরেও মুসলমানদের ছাপাখানায় কোরআন মুদ্রিত হয়েছিল বলে জানা যায়। তৎপরবর্তীতে ইরানের তেহরান ও তিবরিয শহরে আঞ্চলিক মুলমানদের উদ্যোগে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে নতুনভাবে কোরআন মুদ্রিত হয়। এ দিকে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘লিপযিগ’ শহরে প্রাচ্যবিদ মিস্টার ফ্লুযিল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নতুনভাবে কোরআন মুদ্রণ করেন। তার মুদ্রিত কপি ইউরোপে ব্যাপক সমাদৃত হলেও মুসলিম বিশ্বে কোনো গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এর কিছুকাল পর পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর কয়েকবার কুরআান মুদ্রিত হয়।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কোরআন মুদ্রিত হয় ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে। এরপর মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিজের তত্ত্বাবধানে নতুনরূপে কোরআন মুদ্রণ করেন; যা পুরো বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত হয়। এরপর থেকে পৃথিবীর সর্বত্র কোরআন মুদ্রণের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। বর্তমানে বিশ্বে কোরআন শরিফের সবচেয়ে বড় ছাপাখানা হল ‘বাদশাহ ফাহাদ কোরআন মুদ্রণ প্রকল্প’। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ খাদিমুল হারামাইনিশ শরিফাইন ফাহাদ ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) তা প্রতিষ্ঠা করেন। যা দৈনিক ৫০ হাজার কপি কোরআন ছাপার ক্ষমতা রাখে। এ প্রকল্প থেকে শুধু মূল কোরআন শরিফই নয় বরং বিভিন্ন ভাষায় কোরআনের অনুবাদ ও তাফসির ছেপে সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষীদের অঞ্চলে বিতরণ করা হয়।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

২ thoughts on “কুরআন সংকলনের ইতিহাস

  • নভেম্বর ৩, ২০১৮ at ৬:৫২ অপরাহ্ণ
    Permalink

    Hey. I sent a screenshot. Did you get it?

    Reply
    • নভেম্বর ৮, ২০১৮ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
      Permalink

      No i can’t get any screenshot plz re send it

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *