ওসামা বিন লাদেন তার শেষ সাক্ষাৎকারে কী বলেছিলেন পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীরকে

ইসলামাবাদ: ওয়াশিংটন আর নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার প্রতিশোধ নিতে আফগানিস্তানে যখন আমেরিকান নেতৃত্বে বোমা হামলা চলছে, যখন আমেরিকা খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের চোখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ওসামা বিন লাদেনকে, তখন লাদেনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন পাকিস্তানের এক সাংবাদিক হামিদ মীর।

ওসামা বিন লাদেনের একাধিক সাক্ষাৎকার নেওয়া মীরকে অনেক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। খবর বিবিসির

তবে মীর বলেছেন ‘ওসামা বিন লাদেনের আদর্শের সঙ্গে অনেকে একমত না হলেও সাংবাদিকদের জন্য তিনি ছিলেন খবরের উৎস। কাজেই আমি মনে করি সাংবাদিক হিসাবে আমি একটা ইতিহাসের সাক্ষী। ’

এগারোই সেপ্টেম্বর ২০০১এ টুইন টাওয়ারে হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ বলেছিলেন ধ্বংস ও মৃত্যুর ন্যায় বিচার চান তিনি। জীবিত অথবা মৃত – ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে চায় আমেরিকা।

হামিদ মীর, পাকিস্তানের এক সুপরিচিত সাংবাদিক সেসময় গিয়েছিলেন আফগানিস্তানে।

‘আমি যখন আফগানিস্তানে ঢুকলাম – সেখানে তখন ভয়ঙ্কর অবস্থা । ঘটনাস্থলের দৃশ্য অবর্ণনীয়, চারিদিকে ধ্বংসলীলা, মৃতদেহ। নিজেকে আমি বলছিলাম- তুমি পাগল নাকি- এখানে কেন এসেছো?’

ওসামা বিন লাদেনের শেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন যে পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীর শুনুন তার স্মৃতি নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী

২০০১এ নভেম্বরের গোড়ার দিকে হামিদ মীরের পরিচিত আল কায়েদার ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি তাকে সঙ্গে করে কাবুলে নিয়ে যাবার জন্য আল কায়েদার একজন লোককে ঠিক করে দেন। হামিদ মীরের ধারণা তাকে কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাতের অন্ধকারে অ্যাম্বুলেন্সে করে চোখ বেঁধে। তাকে যেখানে নেওয়া হয় সেখানে আমেরিকা তখন প্রচণ্ড বিমান হামলা চালাচ্ছে।

‘সে রাতটা ছিল আমার জন্য খুবই কঠিন। যেসব আল কায়েদা যোদ্ধা সেখানে ছিল তারা প্রত্যেকেই প্রাণ দিতে চায়। প্রত্যেকেই শহীদ হতে চায়। ভবনটির ওপর মুহুর্মুহু হামলা চালানো হচ্ছে। আমি তখন আমার স্ত্রীকে একটা চিঠি লিখে বলেছিলাম – আমি দু:খিত- আমি হয়ত এখানে মারা যাব – বাচ্চাদের দেখো।‘

হামিদ মীর এর আগে দুবার ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। মীর, বিন লাদেনের কাজের ধারা নিয়ে খোলাখুলিই সমালোচনা করতেন, কিন্তু বিন লাদেন তাকে বলেছিলেন তার বক্তব্য বাইরের বিশ্বের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারায় মীর তার আস্থা অর্জন করেছেন।

তবে ১৯৯৭ সালে হামিদ মীর যখন প্রথম বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তখন বিন লাদেন সম্পর্কে তিনি বিশেষ কিছুই জানতেন না।

‘তার কাছে আমি পৌঁছেছিলাম তৎকালীন তালেবান নেতা মোল্লা উমরের মাধ্যমে। বিশ্বাস করুন সে সময় আমি ওসামা বিন লাদেনের কথা জানতামই না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- উনি কে? উমর আমাকে বলেছিলেন উনিই তো সেই ব্যক্তি যিনি সোমালিয়ায় আমেরিকানদের ওপর হামলা চালিয়েছেন এবং তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদেরও হত্যা করেছেন।‘

মোল্লা উমর তাকে বলেছিলেন লাদেন আফগানিস্তানে তার অতিথি। তিনি লাদেনের সঙ্গে হামিদ মীরের বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে বলেছিলেন। ‘এরপর ওরা আমাকে নিয়ে গেল তোরাবোরা পাহাড়ে।’

‘আমার মনে আছে সময়টা তখন সন্ধ্যে। যখন আমি পাহাড়ে একটা গুহায় ঢুকলাম, তখন কয়েকজন আরব আমাকে থামাল। আমার সারা শরীরে তল্লাশি শুরু করল, এমনকী আমার জাঙ্গিয়ার মধ্যে হাত ঢুকিয়েও তারা তল্লাশি চালাচ্ছিল। আমি চেঁচামেচি শুরু করলাম। কারণ ওদের আচরণ খুব একটা সভ্য ছিল না। হঠাৎ করে একজন লম্বা লোক এসে হাজির হলেন – জিজ্ঞেস করলেন – কী হয়েছে? ওরা তার সঙ্গে আরবী ভাষায় কথা বলছিল। বুঝলাম উনি ওসামা বিন লাদেন।

মীর বলেন লাদেন খুব ভদ্র ও নম্র ছিলেন। তিনি তার কাছে দু:খপ্রকাশ করে বলেছিলেন – ‘এটা তাদের নিরাপত্তা পরীক্ষার একটা অংশ। বলেছিলেন তার পরিবারের লোকজন দেখা করতে এলেও এভাবেই তাদের পরীক্ষা করা হয়।’

তাদের আবার দেখা হয় ১৯৯৮ সালে। ধারণা করা হয় সে সময়ের মধ্যেই লাদেন বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলা সমর্থন করে তার জন্য অর্থ জুগিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন তিনি আরও সহিংস – আরও নাটকীয় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন- বিশেষ করে আমেরিকার ওপর।

এরপরই আসে ২০০১ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারের ওপর ঐতিহাসিক ও নাটকীয় হামলা।

ওই হামলার ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন হামিদ মীর?

মীর বলছেন তিনি ছিলেন নিজের অফিসে।
‘বিকেলের শেষ দিক তখন। একজন আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। আগে তাকে কখনও দেখিনি। তিনি আমাকে একটা ঘড়ি দিয়ে বললেন ওটা শেখের উপহার। হাতঘড়িটা আমি ওসামা বিন লাদেনকে পরতে দেখেছিলাম যখন দ্বিতীয়বার আমি তার সাক্ষাৎকার নিই। যখনই নামাজের সময় হচ্ছিল ওই ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজছিল। ঘড়িটা আমি চিনতে পারলাম । বুঝলাম ওসামা বিন লাদেন উপহারটা পাঠিয়েছেন।’

ওই ব্যক্তিকে মীর জিজ্ঞেস করেছিলেন- শেখ তাকে কেন পাঠিয়েছেন? লোকটি তাকে বলেছিল- সে মীরকে একটা চিঠি দেব। কিন্তু আপাতত তার অফিসে একটু বসার অনুমতি চেয়েছিল আর বলেছিল টিভিতে সিএনএন বা বিবিসি কোন একটা চ্যানেল একটু ছাড়তে।

‘কিছুক্ষণ পরে ঘরে গিয়ে দেখি লোকটি লাফাচ্ছে, নাচছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- কী হল? সে বলল – দেখো টিভিতে দেখো আমেরিকার ওপর হামলা হয়েছে! আমি বললাম- ওটা তো একটা বিমান দুর্ঘটনা। কিন্তু দেখলাম সে খুশিতে চেঁচাচ্ছে। আর বলছে -বা: আরেকটা আক্রমণ- দ্বিতীয় আক্রমণ। তার সে কী উল্লাস- আমার মনে হচ্ছিল সে বিরাট বিপদজনক একটা মানুষ।’

১১ই সেপ্টেম্বরের ওই জোড়া হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় তিন হাজার মানুষ। নজিরবিহীন ওই আক্রমণ বিশ্বকে হতভম্ব করে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিমান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারে আঘাত হানার পর আফগানিস্তান থেকে আসা ওই দূত হামিদ মীরের হাতে একটা চিঠি তুলে দেয়। চিঠিটি লিখেছিলেন ওসামা বিন লাদেন।

‘সেটা ছিল ছোট্ট একটি বিবৃতি। লেখা ছিল যারা এই অভিযান চালিয়েছে তাদের আমি প্রশংসা করি। কিন্তু আমি এ হামলার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী নই।’

হামিদ মীর চিঠিটি প্রকাশ করেন। তোলপাড় পড়ে যায় সারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে। অনেক সংবাদ অনুষ্ঠান তার সাক্ষাৎকার নেয়। অনেকে তার ব্যাপক সমালোচনা করে সন্দেহ প্রকাশ করে যে তিনি আল কায়েদার খুবই ঘনিষ্ঠ।

আফগানিস্তানে তালেবান নেতৃত্বের ওপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের আক্রমণ শুরুর এক মাস পর হামিদ মীর তৃতীয়বার যান বিন লাদেনের কাছে।

‘আমি হাতে লেখা একটা চিঠি পেয়েছিলাম- জালালাবাদ আসতে পারবে? আমি ভেবেছিলাম এটা হয় একটা ফাঁদ- নয়ত কেউ আমার সঙ্গে মস্করা করছে। আমি ভয় পেয়েছিলাম চিঠিটা হাতে পেয়ে- কারণ ব্যাপারটা ছিল খুবই ঝুঁকির।’

কেমন দেখেছিলেন তিনি বিন লাদেনকে?
মীর বলছেন পুরো আবেগহীন আর শান্ত ছিলেন লাদেন। নর্দান অ্যালায়েন্স আর আমেরিকান বাহিনী তখন কাবুলের দখল নিতে যাচ্ছে।
‘আমার মনে আছে তিনি আমাকে বলেছিলেন আমেরিকানরা আমাকে জীবিত ধরতে পারবে না।’

মীর বলেছেন বিন লাদেনের সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে প্রতিবারই তিনি সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করে লাদেনকে তার কাজের ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

‘এমনকী প্রথমবার সাক্ষাৎকারের সময়ও আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি সোমালিয়ায় পাকিস্তানি সৈন্যদের কেন মেরেছিলেন? দ্বিতীয়বার আমি প্রশ্ন করেছিলাম ইসলামী আদর্শের দোহাই দিয়ে তিনি কোন্ যুক্তিতে নিরীহ অমুসলিম মানুষদের হত্যাকে তিনি সমর্থন করছেন? তৃতীয়বারেও আমি তাকে বলেছিলাম আমেরিকায় যারাই থাকে তারা সবাই খারাপ একথা তিনি কীভাবে বলেন?’

মীর বলেন তৃতীয়বারের ওই সাক্ষাৎকারে নেবার সময় তারা যখন কথা বলছেন তখন বিন লাদেনের নিরাপত্তা রক্ষীরা সন্দেহ করে যে বাইরে একজন গুপ্তচর রয়েছে এবং হামলা হতে পারে। মুহুর্তে একটা ত্রাস তৈরি হয়।

‘হঠাৎ শুনলাম তারা চিৎকার করছে পালাও পালাও । তখনও বিন লাদেন খু্বই শান্ত ছিলেন। তারপরেই তিনি বললেন ‘ইয়েল্লা- ইয়েল্লা- ইয়েল্লা- যাও যাও যাও। ওনার সঙ্গে আমার সেটাই ছিল শেষ কথোপকথন।’

তারা সবাই সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে পালিয়েছিলেন ৫ মিনিটের মধ্যে। তার ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে সেখানে শুরু হয়েছিল বোমাবর্ষণ । বিন লাদেন আর মীর দুজনেই বেঁচে গিয়েছিলেন।

হামিদ মীরকে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি গেলেন একদিকে আর ওসামা বিন লাদেন ও তার দলবল আরেকদিকে। এর কয়েকদিনের মধ্যে বিন লাদেন গোপন আস্তানায় চলে যান। এর দশ বছর পর পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তার সন্ধান মেলে একটি সেনা ঘাঁটির কয়েকশ মিটার দূরত্বে এক গোপন ডেরায়।

ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কারণে হামিদ মীরকে অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অনেকে বলেছে আল কায়েদার হয়ে তিনি ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু হামিদ মীর মনে করেন তিনি সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘আমি একমাত্র সাংবাদিক নই যে ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিতে আগ্রহী ছিল। সেসময় সব সাংবাদিকই তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে কারণ তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার আদর্শের সঙ্গে আপনি একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকের জন্য তিনি খবরের উৎস। কাজেই আমি মনে করি সাংবাদিক হিসাবে আমি একটা ইতিহাসের সাক্ষী।’
হামিদ মীরই শেষ সাংবাদিক যিনি ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *