ওজুর মাসায়েল / মাওলানা শিব্বীর আহমদ

যেসব কারণে ওজু ভেঙ্গে যায়
১) প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে যে কোনো কিছু বের হওয়া।
২) শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত পুঁজ বা পানি বেরিয়ে গড়িয়ে পড়া।
৩) মুখ ভরে বমি করা।
৪) দাঁত দিয়ে রক্ত বের হলে তা থুথুর সমান বা বেশি হওয়া।
৫) চিৎ-কাত হয়ে কিংবা কিছুতে হেলান দিয়ে ঘুমানো।
৬) বেহুঁশ অচেতন বা পাগল হয়ে যাওয়া।
৭) নামাজে শব্দ করে হাসা।
মাসআলা : কোনো ক্ষতস্থান থেকে যদি রক্ত-পুঁজ ইত্যাদি বের হয়ে গড়িয়ে না পড়ে, তাহলে এতে ওজু ভাঙবে না। ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়লে ওজু ভাঙবে। এমনকি যদি অল্প অল্প করে বের হয় আর সঙ্গে সঙ্গে কেউ তা মুছে ফেলে, তাহলে দেখতে হবে, যদি মুছে ফেলা না হতো, তাহলে গড়িয়ে পড়ত কি না। যদি গড়িয়ে পড়ার পরিমাণ রক্ত-পুঁজ ইত্যাদি বের হয় তাহলে ওজু ভেঙে যাবে। আর যদি গড়িয়ে পড়ার পরিমাণ না হয় তাহলে ওজু ভাঙবে না।
মাসআলা : একাধিক ক্ষতস্থান থেকে যদি এগুলো বের হয় তাহলে প্রত্যেক ক্ষতস্থানের রক্ত-পুঁজ ভিন্ন ভিন্ন হিসাব করতে হবে। সবগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে না।
মাসআলা : মুখ ভরে বমি করার অর্থ হলো, বমির পরিমাণ এত বেশি হওয়া, যা মুখে আটকে রাখা কষ্টকর। এভাবে মুখ ভরে বমি করলে ওজু ভেঙ্গে যায়। বমি যদি মুখ ভরে না হয় তাহলে ওজু ভাঙ্গে না। যদি থেমে থেমে অল্প অল্প করে বমি হয়, তাহলে দেখতে হবে, যতটুকু বমি হয়েছে তা যদি একসঙ্গে হতো তাহলে তা মুখ ভরে হতো কি না। যদি মুখ ভরে হওয়ার মতো হয় তাহলে ওজু ভেঙ্গে যাবে, অন্যথায় ভাঙবে না।
মাসআলা : দাঁতের মাড়ি থেকে যদি রক্ত বের হয় তাহলে দেখতে হবে, তা কমপক্ষে থুথুর সমান হয় কি না। থুথুর সমান বা বেশি হলে ওজু ভেঙ্গে যাবে। এর চেয়ে কম হলে ওজু ভাঙবে না।
মাসআলা : শুয়ে বা কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে ঘুমালে ওজু ভেঙে যায়। হেলান না দিয়ে কেউ যদি সোজা বসে বসে কিংবা দাঁড়ানো অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তাহলে ওজু ভাঙ্গবে না। সোজা চারজানু হয়ে বসে কেউ যদি ঘুমায় তাহলে এতেও ওজু ভাঙ্গবে না।
মাসআলা : নামাজে দাঁড়ানো রুকু বসা কিংবা সেজদায় কেউ যদি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয় আর তার অঙ্গগুলো স্বাভাবিক জায়গায় থাকে, তাহলে ওজু ভাঙ্গবে না।
মাসআলা : নামাজে উচ্চস্বরে হাসলে ওজু ভেঙ্গে যায়। আর ওজু ভেঙ্গে গেলে নামাজ তো ভাঙবেই। তবে কেউ যদি মুচকি হাসে তাহলে ওজু ভাঙবে না।

এসব কারণেও ওজু ভাঙ্গে না
১) ওজু করার পর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালে কিংবা দুধ নিংড়িয়ে বের করলে।
২) লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে বা দেখলে।
৩) ওজু করার পর হাত-পায়ের নখ কাটলে।
৪) বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি খেলে।
৫) সতরের পুরোটা কিংবা আংশিক খুলে গেলে।
৬) কোনো কারণে অন্য কারও লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে বা দেখলে।
৭) ওজু করার পর নখ-চুল কাটলে।
৮) হাত-পা বা শরীরের অন্য কোনো জায়গার চামড়া কাটলে, উঠিয়ে ফেললে কিংবা উপড়িয়ে ফেললে (যদি এতে রক্ত বের না হয়)।

ওজুর আরও কয়েকটি মাসায়েল
১) ওজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত। কেউ চাইলে আউযুবিল্লাও পড়তে পারে।
২) নখের ভেতর সাধারণত যে মাটি বা ময়লা থাকে, সেগুলো থাকলে ওজুতে কোনো সমস্যা হবে না।
৩) নখে যদি নেইল পলিশ দেয়া থাকে তাহলে ওজু হবে না। তবে মেহেদি দেয়া থাকলে কোনো সমস্যা নেই।
৪) কারও দাড়ি যদি এত ঘন হয়, যার ভেতর দিয়ে চেহারার চামড়া দেখা যায় না, তাহলে সেসব দাড়ির নিচের চামড়া ধোয়া জরুরি নয়। কিন্তু যদি দাড়ি পাতলা হয়, তাহলে চেহারার চামড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে।
৫) দাড়ি যদি ঘন হয় তাহলে দাড়ির নিচের চামড়া ধোয়া জরুরি নয় ঠিক, কিন্তু চেহারার সীমার মধ্যে যতটুকু দাড়ি আছে সেগুলো যেন ধোয়া হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
৬) রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে তো ওজু ভেঙ্গে যায়। যদি পরীক্ষা করার জন্যে কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করা হয় তাহলেও ওজু ভেঙ্গে যাবে।
৭) স্বাভাবিক কোনো ইঞ্জেকশন পুশ করলেও সামান্য রক্ত বের হয়। তবে এর পরিমাণ খুবই কম বলে তাতে ওজু ভাঙবে না। আর যদি এতটুকু রক্ত বের হয়, যা মুছে না ফেললে গড়িয়ে পড়ত, তাহলে ওজু ভেঙ্গে যাবে।
৮) নাক বা চোখ দিয়ে পানি পড়লে ওজু ভাঙ্গবে না।
৯) ওজুতে যে কাজগুলো তিনবার করা সুন্নত, সেগুলো ইচ্ছাপূর্বক তিনবারের বেশি করা মাকরুহ।
১০) ওজু যে উদ্দেশ্যেই করা হোক, সে ওজু দিয়ে পরবর্তীতে অন্য সব আমলই করা যাবে। কুরআন তেলাওয়াত কিংবা জানাজার নামাজের জন্যে ওজু করলে সে ওজু দিয়ে ফরজ নামাজ পড়তেও কোনো সমস্যা নেই।
১১) এমনকি যদি নিয়ত ছাড়া এমনিতেই কেউ ওজুর অঙ্গগুলো ধুয়ে নেয়, তাহলেও তার ওজু হয়ে যাবে। এ ওজু দিয়েও সে নামাজ পড়তে পারবে। তবে ওজুর নিয়ত না করার কারণে ওজু করার সওয়াব পাবে না।

মাজুর বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির ওজু
যে সকল কারণে ওজু ভেঙ্গে যায়, যদি কারও সেগুলোর কোনো একটি বিষয় অনবরত কিংবা খুব ঘন ঘন ঘটতে থাকে যার কারণে সে ওজু করে নামাজ পড়ারও সুযোগ পাচ্ছে না, এর মধ্যেই আবার ওজু ভেঙ্গে যাচ্ছে এমন ব্যক্তিকে ‘মাজুর’ বলা হয়। যেমন, কারও নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে অথবা কারও প্র¯্রাবের ফোটা বন্ধ হচ্ছে না ইত্যাদি।
এমন কোনো সমস্যা ও ওজরের কারণে নামাজের সম্পূর্ণ ওয়াক্তের মধ্যে যদি এতটুকু সময় না পাওয়া যায়, যাতে ওজুর শুধু ফরজ অঙ্গগুলো ধুয়ে শুধু ফরজ নামাজটুকু আদায় করা যায় তাহলে সে ব্যক্তি মাজুর বলে গণ্য হবে। আর যদি শেষ সময়ে হলেও এভাবে নামাজ আদায় করার মতো সময় পাওয়া যায় তাহলে সে ব্যক্তি মাজুর হবে না।
মাজুর ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের জন্যে নতুন নতুন ওজু করবে। কোনো এক নামাজের ওয়াক্ত আসার পর একবার ওজু করলে সেই ওজু দিয়ে ওয়াক্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত যত ইচ্ছা নামাজ পড়তে পারবে। এক নামাজের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী ওয়াক্তের জন্যে নতুন করে আবার ওজু করতে হবে।
যে কারণে কেউ মাজুর হলো, এক নামাজের ওয়াক্তে একবার ওজু করার পর সে কারণ যতই ঘটুক এতে ওজু ভাঙ্গবে না। যেমন, কারও নাক দিয়ে অনবরত রক্ত ঝড়ছে। একারণে সে মাজুর। জোহরের সময় শুরু হওয়ার পর যদি সে ওজু করে তাহলে জোহরের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত নাক দিয়ে রক্ত পড়ার কারণে তার ওজু ভাঙ্গবে না। তবে ওজু ভাঙার অন্য কোনো কারণ যদি ঘটে থাকে, তাহলে ওজু ভেঙ্গে যাবে।
একবার মাজুর হওয়ার পর (অর্থাৎ কোনো একটি নামাজের সম্পূর্ণ ওয়াক্ত এমনভাবে অতিক্রান্ত হলো, যাতে সে ওজু করে নামাজ আদায় করার মতো কোনো সুযোগ পায় নি) যদি পরবর্তী ওয়াক্তগুলোতে একবার করে হলেও সেই ওজর প্রকাশ পায় তাহলেই সে মাজুর। ওয়াক্তের শুরুতে একবার ওজু করে নিলে সেই ওজরের কারণে তখন আর ওজু ভাঙ্গবে না। কিন্তু যদি একটি সম্পূর্ণ ওয়াক্ত এমন যায় যাতে সে ওজরটি একবারও দেখা দেয় নি, তাহলে সে আর মাজুর থাকবে না।

যে পানি দিয়ে ওজু করা যাবে
ওজু করার জন্যে অবশ্যই পবিত্র পানি ব্যবহার করতে হবে। বৃষ্টির পানি, টিউবওয়েলের পানি, সাগর-নদী কিংবা বড় পুকুর-ডোবা ইত্যাদির পানি―এসব পানি সাধারণত পবিত্র। নাপাক কোনো কিছু যদি এগুলোর সঙ্গে মিশ্রিত না থাকে তাহলে এগুলো দিয়ে ওজু করা যাবে।
কোনো গাছ পাতা বা ফলের রস, তা যদি পানির মতোও দেখা যায়, তবুও তা দিয়ে ওজু হবে না।
যদি পানির সঙ্গে কোনো কিছু মেশানোর কারণে এর নাম পাল্টে যায়, যেমন, শরবত বা গোলাপজল ইত্যাদি, তাহলে তা দিয়েও ওজু হবে না।
একবার ওজুতে ব্যবহৃত পানি দিয়ে আরেকবার ওজু করা যাবে না। অনেকে ওজু করার সময় নীচে একটি পাত্র রাখে। হাত-মুখ ধোয়া পানি সেখানে জমা হয়। এরপর সেই পানি দিয়ে পা ধুয়ে নেয়। এমন করলে ওজু হবে না। এ পানি যদিও পবিত্র, কিন্তু ওজুতে একবার ব্যবহৃত হওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার তা দিয়ে ওজু করা যাবে না।

মোজার উপর মাসেহ করা
ওজুতে টাখনুসহ দুই পা ধোয়া ফরজ। তবে যদি কারও পায়ে চামড়ার মোজা পরিহিত থাকে তাহলে শর্তসাপেক্ষে মোজা না খুলে মোজার ওপর মাসেহ করারও সুযোগ আছে।
প্রথমে পূর্ণ ওজু করার পর মোজা পরতে হবে। যদি কেউ প্রথমে পা ধুয়ে মোজা পরে নেয়, এরপর ওজু ভেঙ্গে যায় এমন কোনো কারণ ঘটার পূর্বেই বাকি ওজু পূর্ণ করে তাহলেও চলবে। এভাবে একবার মোজা পরার পর যখন ওজু ভেঙ্গে যাবে তখন থেকে পূর্ণ এক দিন (অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা) মোজার ওপর মাসেহ করতে পারবে। তবে কেউ যদি মুসাফির হয় তাহলে সে পূর্ণ তিন দিন এ সুযোগ পাবে। মোজা এতটুকু বড় হতে হবে, যা দিয়ে টাখনু ঢাকা যায়, যা ছেড়া-ফাটা নয়, এমন পাতলা নয় যা ভেদ করে ভেতরে পানি ঢুকতে পারে এবং পায়ের চামড়া দেখাও যায় না।

মাসেহ করার পদ্ধতি
হাতের আঙ্গুলগুলো ভিজিয়ে পায়ের আঙ্গুলের মাথার দিক থেকে বিছিয়ে দিতে হবে, যেন মোজার উপর হাতের আঙ্গুলগুলোর ছাপ পড়ে। এরপর পেছনের দিকে পায়ের টাখনু পর্যন্ত টেনে আনবে। এসময় হাতের তালু আঙ্গুলগুলোর মতো পায়ের পাতার উপর বিছিয়ে রাখা যেতে পারে, আবার আঙ্গুলগুলো বিছিয়ে রেখে হাতের তালু উঠিয়ে রাখা যেতে পারে। হাতের আঙ্গুলগুলোর মাঝে সামান্য ফাঁক থাকবে। পায়ের পাতার উপরের দিক মাসেহ না করে কেউ যদি নিচে মাসেহ করে তাহলে মাসেহ শুদ্ধ হবে না।

যে কারণে মাসেহ বাতিল হয়ে যায়
১) যেসব কারণে ওজু ভেঙ্গে যায়, সেসব কারণেও মাসেহও ভেঙ্গে যায়।
২) মাসেহের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে, অর্থাৎ ওজু করে মোজা পরার পর যখন তার ওজু ভেঙ্গে যাবে, তখন থেকে এক দিন এক রাত আর মুসাফিরের জন্যে তিন দিন তিন রাত অতিবাহিত হলে মাসেহ ভেঙ্গে যায়।
৩) কোনো একটি মোজা অথবা উভয় মোজা খুলে ফেললে মাসেহ বাতিল হয়ে যায়।
৪) মোজার উপর মাসেহ করার পর যদি মোজার ভেতর পানি ঢুকে সম্পূর্ণ পা অথবা অর্ধেকের বেশি অংশ ভিজে যায়, তাহলেও মাসেহ বাতিল হয়ে যাবে।
উপরোক্ত কোনো কারণে যদি মাসেহ বাতিল হয়ে যায়, তাহলে উভয় মোজা খুলে উভয় পা ধুয়ে নিতে হবে। তখন যদি ওজু থাকে, তাহলে শুধু পা ধোয়ার মাধ্যমেই ওজু আবার পূর্ণ হয়ে যাবে।
মাসআলা : সাধারণ কাপড়ের বা সুতার মোজার উপর মাসেহ করা জায়েজ নয়।
মাসআলা : হাতমোজা কিংবা বোরকার উপর মাসেহ করাও জায়েজ নয়।
মাসআলা : শুধু ওজুর সময়ই পা ধোয়ার পরিবর্তে শর্তসাপেক্ষে মাসেহ করা যায়। যদি কারও গোসল ফরজ হয় তাহলে পা ধোয়া আবশ্যক। তখন মাসেহ করলে হবে না।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *