ওআইসি সম্মেলন : মুখোশ উম্মোচনের দিন

আজ থেকে কুদস ফিলিস্তিনের রাজধানী” – এরদোগানের এই বক্তব্য এবং “যে-সব রাষ্ট্র কুদসকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেবে সেগুেলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা নেয়া হোক” – লেবাননের খ্রীষ্টান প্রেসিডেন্ট মিশেল আওনের এই বক্তব্য, কিংবা ওআইসি সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণার বেশ কিছু ইতিবাচক এবং জোরালো কথা দুনিয়ার হাজারও কুদস এবং আল-আকসা প্রেমিকের অন্তরকে কিছুটা হলেও প্রশান্তি দিয়েছে এমন মনে করা বেশ যৌক্তিক। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর থেকে এরকম বলিষ্ঠ ঘোষণা ওআইসি থেকে এসেছে বলে আমার জানা নেই। সম্মেলনে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রনেতার বক্তব্যও খুবই ইতিাচক ছিল। মাহমুদ আব্বাসকে আগের যেকোন সময়ের তুলনায় বেশী সাহসী মনে হয়েছ। “আমেরিকা এই ঘোষণার পর থেকে আর শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পক্ষ নয়” বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এটা অনেক বড় কথা। যদি অটল থাকতে পারেন তাহলে অনেক কাজ দেবে। তবে, অসলোকে ছুড়ে ফেলে না দিলে কাজের কাজ কিছু হবে না। যে উদ্দেশ্য নিয়ে আরাফাত অসলোতে সাক্ষর করেছিলেন তার সে লক্ষ্য আজ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। প্রমানিত হয়েছে যে আলোচনার নামে আমেরিকা-ইসরাইল সবাইকে বোকা বানিয়েছে।কিসিন্জারের কথাকে আমলে না নেয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে আজকে ফিলিস্তীনকে। যা পেশীশক্তি দিয়ে ওরা দখল করেছে তা কোন দিন আলোচনার মাধ্যমে ছেড়ে দিবে এমনটি মনে করা বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়। আজ থেকে বিশ বছর পূর্বে মিসরী একজন মন্ত্রী বলেছিলেন- “যে জাতী একটি গরুর বাছুর নিয়ে খোদার সাথে তিন দিন ধরে দেন-দরবার করতে পারে তারা যে একটি দেশ, একটি শহর এমনি এমনি ছেড়ে দিবে তা কিভাবে বিশ্বাস করা হয়?” তাই, সর্বাত্মক ইন্তিফাদা ছাড়া কোন গতি নাই। মুসলমানদের রক্ত ছাড়া আর কিছুই ফিলিস্তিনকে ফিরিয়ে আনবে না। আল-আকসার শৃঙ্খল একমাত্র আরেকটি হিত্তীনই ভাঙ্গতে পারে। এই সত্যটি যতো দ্রুত বুঝে আসবে ততোই মঙ্গল।

কিন্তু, রাজনৈতিক সংগ্রামও আবশ্যক। উত্তর-আধুনিক যুগে রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশ্বফোরাম এগুলোও গুরুত্বপূর্ন। এই দিক দিয়ে ওআইসির গতকালের সম্মেলনের বেশ গুরুত্ব আছে। ২৩ টি ঘোষাণার মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটিই প্রয়োজনীয় প্রস্তাব। মাঠে কতোটুকু বাস্তবায়ন হয়, ফলাফল কী হয়, তা সময়ই বলে দেবে। তবে, যতোটুকু হয়েছে তাও এই খরার যুগে বেশ বড় প্রাপ্তি বলে মনে হচ্ছে। অন্তত মুসলিম উম্মাহর প্রতিকী একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখানো গেছে। এটা বেশ জরুরী ছিল।

কিন্তু, পাশাপাশি এই সম্মেলনকে ওআইসির ইতিহাসের সবচেয়ে দৃষ্টিকটু সম্মেলনও বলতে হবে। ১৯৬৯ সালে অস্ট্রেলীয় ইহুদী কর্তৃক আল-আকসায় আগুন লাগানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মরোক্কোর রাবাতে মুসলিম দেশগুলো মিলে ফিলিস্তিনকে রক্ষা করার জন্য ওআইসি প্রতিষ্ঠা করে। যে সংস্থাটির জন্মই হয়েছিল ফিলিস্তিনকে বাঁচানোর জন্য সেই সংস্থার গতকালের সামিটে ৫৭ টি মুসলিম সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বসাকুল্যে উপস্থিত হয়েছে মাত্র ৪৮ টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধী। ৯ টি রাষ্ট্র মোটেও অংশগ্রহন করেনি। যেগুলো অংশগ্রহণ করেছে সেগুলোর মধ্যে মাত্র ১৯ টি দেশের সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রের প্রধান ব্যাক্তি প্রতিনিধিত্ব করেছে। সেগুলো হচ্ছে- তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সুদান, জর্দান, লেবানান, ফিলিস্তিন, কাতার, কুয়েত, ইয়েমেন, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, ইন্দোনেশিয়া, সোমালিয়া, গিনি, জিবুতি এবং টোগো। অতিথিরাষ্ট্র হিসেবে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো। এর মানে হলো, ২৯ টি মুসলিম রাষ্ট্র কোনরকম নিম্মমানের প্রতিনিধি পাঠিয়ে দায় সেরেছে। সবচেয়ে বেশী দৃষ্টি কেড়েছে মিশর, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, মরোক্কোর সরকার প্রধান পর্যায়ের অনুপস্থিতি। মিশরের অবস্থাটা কিছুটা বোধগম্য। কারণ, সিসির সাথে এরদোগানের যা সম্পর্ক তাতে দু’জন কোলাকুলি করার সময় এখনো আসে নি। তবে, মিশর অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়েছে। কিন্তু, সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের বাদশাহ, আমীর কিংবা ক্রাউন প্রিন্স তো আসেন নাই, বরং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিও প্রেরণ করেনি। গতকাল যখন ইস্তাম্বুলে ‘কুদস সম্মেলন’ চলছিল তখন এই দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয় প্যারিসে ফরাসী প্রেসিডেন্টের ডাকে সাড়া দিয়ে “পশ্চিম আফ্রীকায় ইসলামী সন্ত্রাস মোকাবেলা” শীর্ষক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন এবং সেখানে ইসলামী জিহাদীদের রুখতে সৌদি আরব ১০০ মিলিয়ন ইউরো এবং আরব আমিরাত ৩০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা প্রধান করবে বলে অঙ্গীকার করেছেন। মুসলিম জংগীদের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়তে প্যারিসে ছুটে যেতে পারেন, ১৩০ মিলিয়ন ইউরো দান করতে পারেন, কিন্তু ইহুদী সন্ত্রসীদেরকে রুখতে ইস্তাম্বুলে যেতে পারেন না। ওআইসির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে মরক্কোর রাবাতে। তখন থেকে মরক্কো ওআইসির কুদস বিষয়ক কমিটির প্রধান। সেই মরোক্কোই অনুপস্থিত। বৃহৎ আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র আলজেরিয়াই এখনো পর্যন্ত প্রকাশ্যে ইসরাইলের সমালোচনা করে। তারাও অনুপস্থিত। এই হলো অবস্থা।

এবার আরও দুটি সম্মেলনের উপস্থিতির পরিসংখ্যান দেখেন। গতবছর ২০১৬ সালেও ইস্তাম্বুলে ওআইসির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে স্বয়ং বাদশাহ সালমানসহ ৩২ টি রাষ্ট্রের সরকার প্রধান পর্যায়ের প্রতিনিধি অংশগ্রহন করেছিল। কারণ সেই সম্মেলনটি হয়েছিল অঘোষিতভাবে ইরানেকে শায়েস্তা করার জন্য। পরে ইরানী প্রতিনিধিদল এক পর্যায়ে সম্মেলন থেকে ওয়াক আউট করতে বাধ্য হয়। যারা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এক হতে পারে, ইস্তাম্বুলে দৌড়ে আসতে পারে, তারা কেন আজ ইসরাইলের বিরুদ্ধে এক হতে পারে না? কুদসের জন্য ইসতাম্বুলে আসতে পারে না? এই প্রশ্নটি করলে কি আমাকে শিয়া হতে হবে?

দ্বিতীয় আরেকটি সম্মেলনের পরিসংখ্যান দেখুন। গত জুন মাসে রিয়াদে অনুষ্ঠিত হয় “ইসলামিক আমেরিকান সম্মেলন”। সেখানে ট্রাম্পের সাথে মুসাফাহা করানোর জন্য বাদশাহ সালমান ৫৫ টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধি জড়ো করেন। তার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন প্রেসিডেন্ট, বাদশাহ এবং আমীর। ৫ জন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং ১১ জন ছিলেন মন্ত্রী পর্যায়ের। অর্থাৎ ৪১ জন মুসলিম সরকার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। কুদসের মূল্য কি তাদের কাছে ট্রাম্পের শক্ত হাতের বৈচিত্রময় হ্যান্ডশেকের চেয়েও কম হয়ে গেল? হারামাইনের খাদেমদের কাছ থেকে এমন জঘন্য কর্মকান্ড প্রকাশ পাবে তা কোন মুসলমানই আশা করে না। বাদশাহ সালমান রিয়াদে বসে ঠিকই ওআইসির বিবৃতিটার পূণরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু, ইস্তাম্বুলে না গিয়ে তিনি কি বোঝাতে চাইলেন- তাও অবশ্য সবার জানা আছে। সৌদি আরব মুসলমি বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চায়। একসময় নাসেরের মিশর যা দাবী করতো। ইরান শিয়া হওয়ার কারণে আর মিশর বর্তমানে দূর্বল হওয়ার কারণে সৌদি আরবের পথে বাধা নয়। বাধা একমাত্র তুরষ্ক। তুরষ্কের যে কোন প্রচেষ্টা ঠেকানো, এরদোগানকে রুখা সৌদি রাজনীতির বড় একটি মিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাই বলে কুদসের জন্যও কি তারা তাদের পঁচা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না? ইসলামের প্রথম কেবলার জন্য যে দেশ নিজেদের অহমিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না সে-দেশটি মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার খায়েশ পোষণ করে কোন বিবেকে? আল্লাহর লা’নত কি পড়বে না এদের নেতৃত্বলিস্পার উপর? ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইয়াসির আল-যায়াতারাহ তাই বলেছেন- “যারা আজ আকসার জন্য আসেনি তারা আয়োজক রাষ্ট্রকে ছোট করে নি; বরং নিজেদেরকেই ছোট করেছে, বিবস্ত্র করেছে, জাতির সামনে, ইতিহাসের সামনে।” এরদোগান বলেছেন, “যারা আজ কুদসের ডাকে সাড়া দিয়ে আসেন নি তারা ইতিহাসে একটি স্থান নির্ধারণ করে নিযেছেন। ইতাহাসে তাদের নাম থাকবে।” হ্যাঁ, অবশ্যই থাকবে। আবু আব্দিল্লাহ আস সাগীররা এখনো মরে নি। এদের প্রেতাত্বারা কখনো মরে না। এরা বার বার ফিরে আসে। ভিন্ন কোন নামে। ভিন্ন কোন রুপে। এখনো গ্রনাডা আছে। এখনো পলাশী আছে। এখনো মহীশুর আছে। ১৯৪৮ সালের প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিশর, জর্দান, সিরিয়া এবং ইরাক অংশগ্রহন করে। সেই যুদ্ধে এইসব দেশের সরকারগুলো নিচক মুখ রক্ষা করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠায়। এই সত্যটি প্রকাশ পেয়েছিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। যখন মিসরীয় জেনারেল আব্দুল মুনইম রিয়াদ অপর্যাপ্ত হাতিয়ার দিয়ে লড়াই করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করছিলেন, তখন তিনি বার বার বলছিলেন, “যুদ্ধ এখানে নয়, কায়রোতে করো। ফিলিস্তিনের চাবি ইহুদীদের পকেটে নয়, আমাদের রাজধানীগুলোতে”। কালকের সামিট আবারও আব্দুল মুনইম রিয়াদের কথারই যেন পূনরাবৃত্তি করলো। আগে আমাদের তখতগুলো পরিস্কার করা দরকার। এখানেই ফিলিস্তিনের চাবি।

স্পেনের তাওয়ায়েফী শাসকদেরকে ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে নি। মুসলিম স্পেনকে ডুবানোর কারণে এখনো ইতিহাসে তারা ঘৃনিত নিন্দিত। কিন্তু আজকের তাওয়ায়েফী শাসকদের চেয়ে তো তারা হাজার গুণে ভাল ছিল। তাওয়ায়েফীদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক ছিলেন কর্ডোভা এবং সেভিলের শাসক মু’তামিদ ইবনে আব্বাদ। কিন্তু তিনি যখন দেখলেন যে, আলফানসুর তরবারী তাঁর গর্দান স্পর্শ করছে, তাঁর একার পক্ষে আলফানসু-ঝড় মোকাবেলা করা সম্ভব নয়, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন উত্তর আফ্রীকা থেকে মুরাবিতীনদের শাসক ইউসুফ বিন তাশফীনকে ডেকে আনবেন স্পেনকে রক্ষা করতে। দরবারীরা অনেক বিরোধীতা করেছিল। ভয় দেখিয়েছিল যে, মুরাবিতীনরা বনু আব্বাদের শাসন বিলুপ্ত করবে। ওরা উগ্র, বর্বর, অসভ্য। কিন্তু, মু’তামিদ অটল ছিলেন এবং ইউসুফ বিন তাশফীনকে ডেকে আনেন। যাল্লাকার যুদ্ধে মু’তামিদ এবং বিন তাশফীনের যৌথবাহীনির হাতে খ্রীষ্টানরা কচুকাটা হয় এবং পরবর্তী আরও দুইশ বছর টিকে থাকার জন্য ইসলামী স্পেন রসদ পায়।

হায়, আজকের তাওয়ায়েফীরা কি মু’তামিদের চেয়েও অথর্ব হয়ে গেল? ইতিহাস এদেরকে কী বলে স্বরণ করবে?
এরদোগান বলেছেন- “যারা আজকে কুদসকে দিচ্ছে, নিচ্ছে, তারা কি জানে যে, একদিন তারা লুকানোর জন্য গাছের আড়ালও খুঁজে পাবে না?” এই কথাটি ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ারকেও তার একজন সেক্রেটারী বলেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন- “মুসলমানদের এই আক্বীদা সম্পর্কে আমি জানি। তবে, তুমি নিশ্চিত থাক এই ঘটনা তুমি আর আমি দেখবো না। কারণ, এই মুসলমানরা সেই মুসলমান নয়।”

লেখক:মোহাম্মাদ নোমান
কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়,মিশর

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *