ইহুদি সম্প্রদায় : অত্যাচারিত থেকে অত্যাচারী

ইতিহাসে একটি দুর্ধর্ষ জাতি ইহুদি, প্রাক ঐতিহাসিক যুগ হতে এরা বেশ বেপরোয়া ও হিংস্র প্রকৃতির। অত্যাচার, আক্রমণ, জিঘাংসা ও অন্য ধর্মের প্রতি ক্ষোভ আদিকাল হতেই এদের মনে বিরাজ করে আসছে। বিশ্বের বুকে জাতি হিসেবে ইহুদিদের চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও অপকর্মের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। কোরআনে কারিমে তাদের অভিশপ্ত ও লাঞ্ছিত জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জঘণ্য মনোবৃত্তি ওদের। চড়া সুদখোর ও ধনলিপ্সু জাতি হিসেবেও তাদের একটা পরিচয় রয়েছে। বর্বর এ জাতি যুগ যুগ ধরে খোদাদ্রোহিতা, কুফরি ও তাদের খারাপ কর্মকান্ডের জন্য মানুষের কাছে ঘৃণাভরে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। তারা অন্যের ওপর দিয়ে যুগে যুগে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।ইহুদিদের মেধা আছে, যোগ্যতা ও আছে কিন্তু তা ভাল কাজে ব্যবহারের ইতিহাস নগণ্য। নিজেদের স্বার্থ ব্যতিত সমগ্র মানবতার কল্যাণ তারা তো চিন্তা করেই না বরং তারা সেই আদিকাল থেকে ই পৃথিবীর বুকে নানান অশান্তি, যুদ্ধ – বিগ্রহ বাধঁতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

প্রায় চার হাজার বছরের ইতিহাসে ইহুদি জনগণ এবং ইহুদি ধর্মের সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় দিক ছিল এর অভিযোজন এবং অবিচ্ছিন্নতা। প্রাচীন মিসর বা ব্যাবিলনিয়া সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক পশ্চিমা খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সাথে মিথস্ক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছে ইহুদিবাদকে। প্রতিটি গোষ্ঠী এবং মতাদর্শ থেকে বেশ কিছু জিনিস ইহুদি সমাজ-ধর্মীয় কাঠামোতে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যও কখনও ক্ষুন্ন হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাস টেনে আনলে দেখা যায়, ইহুদিরা হলো সবচেয়ে অত্যাচারিত সম্প্রদায়, যাদের উপর শুধু বছরের পর বছর, শতশত বছর ধরে অত্যাচার করা হয়েছে। একটি নির্যাতিত ও অত্যাচারিত সম্প্রদায় কিভাবে নিজেরাই অত্যাচারী হয়ে উঠল সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চার হাজার বছর আগে ইহুদি সম্প্রদায়ের যাত্রা শুরু হয়। ইহুদীধর্ম পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম ধর্ম যা এখনো অনেক মানুষ পালন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরেলিদের আদি নিবাস ছিল। তবে তারা এখন যে জায়গা চিহ্নিত করছে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। আল্লার নবী মুসা (আঃ) বা মোজেস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সুন্দর সময় গিয়েছে খৃষ্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে (হজরত) সম্রাট দাওদ (আঃ) বা ডেভিডের সময়। দাবি করা হয় বর্তমান সময়ের লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান ও মিশরের বড় অংশই ছিল তখনকার কিংডম অব ইসরেলের অংশ। ডেভিডের ছেলে (হজরত) সলোমন বা সোলাইমান (আঃ) এর সময়ও তাদের অবস্থা ভালো ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এ-জাতি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এ-সময় আসিরিয়ানরা ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে ঢুকে পড়ে ও দখল করে নেয়। এরপর বিভিন্ন সময় ব্যাবিলনিয়ান, পার্সিয়ান, হেলেনেষ্টিক, রোমান, বাইজেনটাইন, অটোম্যান, বৃটিশ শাসনসহ বিভিন্ন পর্যায় পাড়ি দেয় এই অঞ্চল। আর এর প্রায় অনেকটা সময় জুড়েই ইহুদিদের তাড়া থেতে হয়। ঈজিপশিয়ান ফারাওদের (আল কুরআনে-ফেরাউন-মুসা আঃ এর ঘটনা) সময় থেকে শুরু করে জার্মানির হিটলারের সময় পর্যন্ত তাদের বিতাড়িত হতে হয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের ওপর আরোপ করা হলো লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এ জন্য যে তারা আল্লাহর বিধানের সঙ্গে কুফরি করত এবং নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত। কারণ তারা ছিল নাফরমান ও সীমা লঙ্ঘনকারী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৬১) ইহুদি নামকরণ ও ইহুদি জাতির গোড়ার ইতিহাস- হজরত ইসহাক (আ.)-এর পুত্র হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধররা বনি ইসরাইল নামে পরিচিত। বনি ইসরাইল হচ্ছে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধরদের একটি শাখা। এ শাখারই একটি অংশ পরবর্তীকালে নিজেদের ইহুদি নামে পরিচয় দিতে থাকে। হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর এক পুত্রের নাম ছিল ইয়াহুদা। সেই নামের অংশবিশেষ থেকে ‘ইহুদি’ নামকরণ করা হয়েছিল। (তাফসিরে মাওয়ারদি : ১/১৩১) যুগে যুগে ইহুদিদের অপকর্ম ও ইহুদি জাতিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্টে ভুগেছেন হজরত মুসা (আ.)।

8 বছর আগে প্রাচীন পৃথিবীর ইহুদিরা নিজেদের একেশ্বরবাদী ধর্মের ঐতিহ্যে লালিত ‘শ্রেষ্ঠ’ জাতি তথা ‘বনি ইসরাইল’ মনে করত। তাদের ধর্মীয় প্রধান পুস্তক ‘তৌরাত’ অনেকগুলো অনুচ্ছেদে বিভক্ত ছিল যথাক্রমে পয়দায়েশ, হিজরত, লেবীয়, শুমারী ইত্যাদি। তৌরাতের নবীদের কাহিনীর অনুচ্ছেদগুলো ছিল যথাক্রমে ইউশা, কাজীগণ, রূত, শামুয়েল, বাদশানামা, খান্দাননামা, উযায়ের, নহিমিয়া, ইস্টের, আইয়ুব, জবুর শরীফ, মেসাল, হেদায়েতকারী, সোলায়মান, ইশাইয়া, ইয়ারমিয়া, মাতম, ইহিষ্কেল, দানিয়েল, হোসিয়া, যোয়েল, আমোস, ওবদিয়, ইউনুস, মিকাহ্, নাহুম, হাবাক্কুক, সফনিয়, হগয়, জাকারিয়া, মালাখি ইত্যাদি। এ ছাড়াও তৌরাতে দুনিয়ার ইতিহাস, সৃষ্টি, আদম ও হাওয়া, আদন বাগান, হাবিল কাবিল, শিস ও তার বংশধর, নুহ, হাম-সাম, ভাষার জন্ম, ব্যাবিলন, ইসরাইল জাতির আদি পিতারা, ইব্রাহিম, লুত জাতি, হাজেরা ও সারা, আবিমালেক, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ, ফেরাউন, এহুদা, বনি ইসরাইল, মুসা ও ইশাইয়া নবী, ইয়ারমিয়া, ইহিস্কেল, দানিয়েল, হোসিয়া, যোয়েল, মিকাহ, হাবাক্কুক, সফনিয়, জাকারিয়া, মালাখি, মিসরের ঘটনা, ইমাম, কোরবানি, ঈদ, বিশ্রাম, মানত, তুর পাহাড়, আদম শুমারি ইত্যাদি উপ-ভাগ ছিল। ‘তৌরাত’ ছাড়াও ইহুদিরা প্রাচীন ধর্মীয় পুস্তক হিসেবে ‘জবুর’কেও পবিত্র আসমানি কিতাব মনে করত। জবুরে ১৫০টি ধর্মীয় গান ছিল, যার রচনাকাল ছিল ১০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। তাদের মতে, এর ৭৩-টির রচয়িতা ছিল ‘দাউদ নবী’ নিজে। এ ছাড়া আসফ ১২টি, কারুণের ছেলে ১০টি, সোলায়মান নবী ২টি, মুসা ১টি, এথন ১টি ও উযায়ের নবী ১টি গান রচনা করেছিলেন। সোলায়মান, হিস্কিয়ের, আগুর ও বাদশাহ লমুয়েলের উপদেশ গ্রন্থ ‘মেসাল’ নামে বিখ্যাত ও পাঠ্য ছিল ইহুদি জাতির কাছে। যা পরবর্তীতে খ্রিস্টানরা ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ হিসেবে বাইবেলে লিপিবদ্ধ করে। আসলে বাইবেল ছিল নিউ ও ওল্ড টেস্টামেন্টের সমন্বয়, তথা ইহুদি ধর্ম ও যীশুর জীবন কাহিনীর ইতিহাস ছিল।

ইহুদিরা পবিত্র ও সতী-সাধ্বী নারী হযরত মরিয়ম (সা.)-এর ওপর ব্যভিচারের জঘন্য অপবাদ আরোপ করেছিল। তারা এ অপবাদ রটিয়ে হযরত ঈসা (আ.) কে মরিয়মের ব্যভিচারের ফসল হিসেবে তুলে ধরে এবং এর মাধ্যমে এটা দেখাতে চেয়েছে যে, ঈসা (আ.) নবী বা পথ-প্রদর্শক হওয়ার উপযুক্ত নন। আর এ অপবাদের ভিত্তিতেই ইহুদিরা ঈসা (আ.)-কে রাসূল হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। তারা হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে এমন জঘন্য অপবাদ প্রচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, এমনকি তাঁকে হত্যারও ষড়যন্ত্র করে। ইহুদি ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে হত্যা করতে পেরেছিল বলেও এক ধরনের ধাঁধা বা ভুল ধারণার শিকার হয়। আর ওই হত্যার ভিত্তিতে অত্যন্ত দম্ভ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে তারা বলেছিল, আমরাই ঈসাকে হত্যা করেছি। কিন্তু মহান আল্লাহ কোরআনে বলছেন যে, আসলে তারা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল যে ছিল দেখতে ঈসার মত এবং তারা ধোঁকা বা সন্দেহের শিকার হয়েই ওই হত্যাকা- ঘটায়।

কোরআন শরিফের বহু জায়গায় এর বিশদ বর্ণনা এসেছে। সুরা বাকারার শুরুর দিকে ইহুদি জাতির ওপর আল্লাহর রহমত এবং প্রায় ১২টি কুকর্ম ও আল্লাহর পক্ষ থেকে এর শাস্তির বিবরণ রয়েছে। আল্লাহ তাদের মিসরের ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করার পর মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওরাত আনার জন্য গেলে তারা গরুর বাছুরের পূজা আরম্ভ করে। আল্লাহ তাদের এর শাস্তি দিয়ে ক্ষমা করার পর আবার তারা বায়না করে বসে আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখার জন্য। এ জন্য তাদের ওপর ফেরেশতার মাধ্যমে তুর পাহাড় উঠিয়ে শাস্তির ভয় দেখানো হয়। মুসা (আ.)-এর দোয়ায় তাদের জন্য কুদরতি খাবারের ব্যবস্থা করা হলে তারা অকৃতজ্ঞ হয়ে তা খেতে অস্বীকার করে। কখনো তারা মুসা (আ.)-এর ওপর খারাপ অসুস্থতা ও ব্যভিচারের অপবাদ দেয়। এভাবে হজরত মুসা (আ.) আজীবন তাদের নিয়ে কষ্ট করেন।
হজরত ইলিয়াস (আ.) ইহুদিদের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ইহুদিদের বিরাগভাজন হয়ে নির্যাতনের শিকারই শুধু হননি, তারা তাকে হত্যার জন্যও উদ্ধ্যত হয়। পরিণামে আবার তাদের ওপর মিসরের জনৈক স¤্রাট চড়াও হয়ে হত্যা ও লুণ্ঠন চালায়। তারপর অবস্থার কিঞ্চিৎ উন্নতি হয়। অতঃপর আবার অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে তাদের ওপর বাবেল সম্রাট বুখতে নসর চড়াও হয়। সম্রাট বায়তুল মাকদিসে আক্রমণ চালিয়ে মসজিদে আকসা ধ্বংস করে দেয়। হত্যাযজ্ঞ ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে শহরটি উজাড় করে দেয়। এরপর ইহুদিরা বায়তুল মাকদিস থেকে নির্বাসিত হয়ে বাবেলে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে চরম লাঞ্ছনা ও দুর্গতির মধ্যে ৭০ বছর পার করে। অতঃপর জনৈক ইরান সম্রাট বাবেল দখল করে ইহুদিদের ওপর দয়াপরবশ হয়ে তাদের আবার সিরিয়ায় পৌঁছে দেয়। এ সময় তারা আবার মসজিদে আকসা নির্মাণ করে। অতঃপর ঈসা (আ.)-এর জন্মের ১৭০ বছর আগে আবার তারা পাপে লিপ্ত হলে আন্তাকিয়ার স¤্রাট তাদের ওপর চড়াও হয়ে ৪০ হাজার হত্যা করে এবং ৪০ হাজার বন্দি করে। সম্রাট মসজিদে আকসারও অবমাননা করে। এর অনেক বছর পর বায়তুল মাকদিস রোম সম্রাটের দখলে চলে গেলে সে ইহুদিদের সাহায্য করে।
ইহুদি ধর্মের মূল শিক্ষা প্রায় সবসময়ই একেশ্বরবাদকে করে আবর্তিত হয়েছে। ইহুদিদের মধ্যে অনেক শ্রেণি-উপশ্রেণী থাকলেও এই একটি বিষয়ে কারও মধ্যে দ্বিমত নেই। সবাই একবাক্যে কেবল এক ঈশ্বরকে মেনে নেয়। একেশ্বরবাদ প্রকৃতপক্ষে সর্বজনীন ধর্মের ধারণা দেয় যদিও এর সাথে কিছুটা স্বাতন্ত্র্যবাদ (particularism) যুক্ত রয়েছে। প্রাচীন ইসরাইলে এই স্বাতন্ত্র্যবাদ নির্বাচনের রূপ নিয়েছিল। নির্বাচন বলতে ঈশ্বর কর্তৃক মানুষের মধ্য থেকে কাউকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করাকে বোঝায়। সেই তখন থেকেই ইহুদিরা মনে করত, ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে একটি পূর্বপরিকল্পিত চুক্তিপত্র (কোভেন্যান্ট) থাকতে বাধ্য; সবাইকে এই চুক্তিপত্র মেনে চলতে হবে; না চললে পরকালে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। ইহুদিদের এই চিন্তাধারার সাথে messianism এর সুন্দর সমন্বয় ঘটেছিল।

তবে এখন যেমন ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের সংঘাত চলছে এক সময় তা ছিল কৃশ্চিয়ান ও ইহুদি সংঘাত। স্পেনে মুসলমানদের রাজত্বে ইহুদিরা খুবই ভালো ছিল। তারা এ-সময় তাদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করার ব্যাপক সুযোগ পায়। মুসলমানদের এই উদারতার কথা ফুটে উঠেছে ইহুদিদের লেখা ইতিহাস বইয়ের পাতায়।শুরু থেকেই বিভিন্ন সমাজে ইহুদিদের ঘৃণিত, অবহেলিত ও খারাপভাবে দেখা হতো। প্রায় প্রতিটি জায়গায় তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকতো। উগ্র কৃশ্চিয়ানরা তাদের কখনোই সহ্য করতে পারেনি। এদের অনেকেই যিশুর হত্যাকারী হিসেবে ইহুদিদের চিত্রিত করেছে। অনেকেই তাদের অভিশপ্ত জাতি মনে করে।

ইহুদিরা যেহেতু তাড়া খেত বেশী সেহেতু তারা যাযাবর জীবনে স্থায়ী কাজের চেয়ে বুদ্ধিনির্ভর ও কম শারীরিক পরিশ্রমের কাজ বেছে নেয়। ব্যবসার প্রতি কৃশ্চিয়ানদের অনিহা তাদের সামনে বড় সুযোগ এনে দেয়। তাদের বসবাসের পরিবেশ ছিল খুব খারাপ। ভালো খাবার দাবারও ছিল না। ফলে তারা এমন কাজে আত্মনিয়োগ করে যেখানে বুদ্ধির চর্চা বেশী। ব্যবসা, টাকাপয়সা, লেনদেন, দালালি – এসব কাজে তারা এগিয়ে যায় বেচে থাকার সহজাত প্রবৃত্তির জন্য। ইহুদি সম্প্রদায়কে ইউরোপে কিভাবে দেখা হতো তার বড় উদাহরণ হতে পারে উইলিয়াম শেকসপিয়ারের “ মার্চেন্ট অব ভেনিস “ নাটকের শাইলক চরিত্রটি। যে শরীরের মাংশ কেটে তার পাওনা আদায়ের দাবী জানায়। সম্পূর্ণ ভিন্ন সমাজের প্রেক্ষাপটে নিয়ে লেখা রাশিয়ান লেখক নিকোলাই গোগল তার তারাস বুলবা উপন্যাসে আরেক ইহুদি সুযোগ সন্ধানী চরিত্র ইয়ানকেল-কে সৃষ্টি করে দেখিয়েছেন তাদের সম্পর্কে তখনকার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবিদের মনোভাব। ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত তাড়া খেয়ে তাড়া মিডল ইস্টে ঢুকতে থাকে। এর মধ্যে ইউরোপিয়ান একটি চালও ছিলো। কৃশ্চিয়ানরা যেহেতু ইহুদিদের পছন্দ করতো না তাই তারাও চাচ্ছিল মুসলমানদের এলাকায় তাদের ঢুকিয়ে দিতে। আর প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে যাযাবর জীবনের অবসানও চাচ্ছিলো ইহুদিরা।
এতোগুলো বছর তাদের ঐক্য ধরে রাখার বড়া শক্তি ছিল ধর্ম। বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়লেও ইহুদি সম্প্রদায়ের সব সময় স্বপ্ন ছিল তারা তাদের নিজ দেশ ইসরেলে ফিরে যাবে যদিও তখনো এর কোনো ভৌগলিক অস্তিত্ব ছিল না। ইসরেল তাদের মাতৃভূমি ও ধর্মভূমিই শুধু নয়, তাদের স্বপ্ন ভূমিও বটে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্বপ্ন দেখেছে ইসরেল নামের দেশের। নেক্সট ইয়ার ইন জেরুজালেম – এই শ্লোগান মাথায় রেখে বহু ইহুদি মারা গিয়েছে। ইসরেলের জন্য তারা সাধ্যমতো দান করেছে, ধর্ম ও বিশ্বাস দিয়ে নিজেদের এক করে রেখেছে। সংখ্যায় অত্যন্ত কম হওয়ার পরও ক্ষুরধার বুদ্ধি, কৌশল ও মেধার বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে নিজেদের বসিয়েছে।

কোনো মেধাবী ইহুদী ছাত্র বা ছাত্রীর পড়াশুনার জন্য চিন্তা করতে হয় না। এখনো বহু ওয়েব সাইটে এদের জন্য দান গ্রহণ করা হয়। তারা প্রধানতঃ মাতৃতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখে। কমিউনিটির কেউ বিপদে পড়লে তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন অনেক ওয়েব সাইট আছে যেখানে ইহুদি পরিবারগুলোর বংশলতিকা বা ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে সাহায্য করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধাওয়া খেয়ে ইহুদিরা বহু দেশে ছড়িয়ে পড়লেও তাদের স্বপ্নভূমির কথা কখনো ভোলোনি। এক্ষেত্রে তারা কট্টর ও চরমপন্থি। কারণ মিডল ইস্টের কোনো এক জায়গায় তাদের জন্মভূমি ছিলো চার হাজার বছর আগে সেই যুক্তিতে একটি জায়গার দখল নেয়া একটি অবাস্তব বিষয়। কেননা এর কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কিন্তু ইহুদিরা তা তৈরি করে নিয়েছে। তারা বিশ্ব শক্তিকে তাদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছে।

ইরাক যখন কুয়েত দখল করে নেয় তখন সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, কুয়েত ঐতিহাসিকভাবে ইরাকের অংশ। কিন্তু সে যুক্তি বাতিল হলেও ইহুদিদের যুক্তি বাতিল হয়নি। এ-কারণে ইসরেল রাষ্ট্রটির জন্ম হলো ১৯৪৮ সালে তখন একসঙ্গে আরব দেশগুলো আক্রমন চালিয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
বর্তমান বিশ্বে ইহুদি সম্প্রদায়ের লোক সংখ্যা দেড় কোটির কিছু বেশী। তা-ও তারা ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন দেশে। যেমন আমেরিকায় আছে প্রায় ৬১ লাখ, ইসরেলে আছে প্রায় ৫২ লাখ, কানাডায় আছে প্রায় ৪ লাখ, বৃটেনে প্রায় ৩ লাখসহ ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, অষ্ট্রেলিয়া, পোল্যাণ্ড, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ইউক্রেন, ওয়েস্টার্ণ ইউরোপ, ইথিওপিয়া প্রভৃতি দেশে।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা শহরের কাছাকাছি হলেও বিশ্বে ইহুদি সম্প্রদায় থেকে যুগে যুগে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য প্রতিভাবান ব্যক্তি। প্রধান ধর্মগুলোর পর পৃথিবীতে যে মতবাদটি সবচেয়ে প্রভাব ফেলেছে সেই কমিউনিজমের স্বপ্নদ্রষ্টা কার্ল মার্কস ইহুদি সম্প্রদায় থেকে এসেছেন। বিশ্বের মানুষকে মুগ্ধ করে রাখা যাদু শিল্পি হুডিনি ও বর্তমানে ডেভিড কপারফিল্ড এসেছেন একই কমিউনিটি থেকে। আর আছে, মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড। লেখকদের মধ্যে আর্থার মিলার, ফ্রানজ কাফকা, জন ষ্টাইনব্যাক যেমন এসেছেন তেমনি এসেছেন সাইন্স ফিকশান জগতের সবচেয়ে আলোচিত লেখক আইজাক আসিমভ। মিউজিকে ইহুদি মেনুহিনের অসাধারণ ভায়োলিনের পাশাপাশি রিঙ্গো ষ্টার, মার্ক নাফলারের মতো বাদক যেমন এসেছেন তেমনি বব ডিলান, বব মার্লির মতো গায়কও এসেছেন। এসেছেন ম্যাজিক জিনিয়াস আইনষ্টাইন,জগৎ বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা-পরিচালক স্পিলবার্গ,যাদুশিল্পী ডেভিড কপারফিল্ড,পুলিৎজার পুরষ্কার প্রাপ্ত আমেরিকান লেখক জন ষ্টাইনব্যাক মাত্র কয়েকজনের নাম দেওয়া হলো। এ-ধরণের নাম অসংখ্য আছে।
ইহুদি কমিউনিটির সদস্যদের হাতে মেডিসিন, ফিজিক্স, কেমিষ্ট্রি, ইকোনোমিক্স, লিটারেচার ও পিচ বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৭৫টিরও বেশী নোবেল পুরষ্কার এসেছে। এ থেকে তাদের মেধার বিস্তার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ইসরেলের প্রয়োজনে এসব বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, মিডিয়া মুঘল, রাজনীতিবিদ সবাই মিলিতভাবে তাদের স্বপ্নভূমিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। তারা যে যেই মতেরই হোক না কেন, এ-বিষয়ে তাদের কোন মতভেদ থাকে না। ফলে হাজার অপরাধ করার পরও ইসরেলকে স্পর্শ করা যায় না। শুধু আবেগ বা অভিশাপ দিয়ে ইসরেলকে দমন করা সম্ভব নয়। কেননা এর ভূমিটুকু আছে মিডল ইস্টে কিন্তু এর নিয়ন্ত্রকরা আছেন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে।

মুসলমান অধ্যুষিত মিডল ইস্টে ছোট একটি রাষ্ট্র হলেও ইসরেলকে স্পর্শ করতে পারে না কেউ। ইসরেল প্রতিষ্টার সময় ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৬, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৩ সালে আরবদের সঙ্গে ইসরেলের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধগুলোতে ইসরেল এগিয়ে যায়। আরবরা কিছুই করতে পারেনি বরং অনেক সময় নিজেদের জায়গা হারিয়েছে।
প্যালেষ্টিনিয়ানদের নিজ আবাস ভূমি থেকে উৎখাত করে জুইশ (Jewish) কমিউনিটি বা ইহুদি সম্প্রদায়ের নিজস্ব আবাসভূমি ইসরেল সৃষ্টি ও তাকে রক্ষা করার প্রতিটি পর্যায়ে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে আমেরিকা, সবসময়ই সর্বাত্মক সমর্থন যুগিয়ে এসেছে।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেছিলেন, পরোক্ষভাবে ইহুদিরাই বিশ্বকে শাসন করছে। একটি সম্প্রদায়ের অল্প কিছু মানুষ কিভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরো বলা হয়, আমেরিকা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে আর আমেরিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে জুইশ কমিউনিটি।
বিশ্বের অস্ত্র, মিডিয়া, ব্যাংক থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জুইশ কমিউনিটির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পুরোপুরি। আর এ কারণে গত ৫০ বছরেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের উপর যে নিপীড়ন তারা চালিয়েছে তাকে ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন (Clash of Civilization)-এর মোড়কে ঢুকিয়ে বৈধ করে নিয়েছে পশ্চিমি সমাজ।

 মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ : হাতের মুঠোয় পৃথিবী

বিশ্বের এবং বিশেষ করে আমেরিকার জনগনের মূল নিয়ন্ত্রক মিডিয়া। তারা টিভি দেখে, মুভি দেখে, অনলাইনে কিছু নির্দিষ্ট সাইট দেখে এবং পেপার পড়ে। স্কলারদের বাদ দিলে সাধারণ আমেরিকানদের মন এবং মনন পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে মিডিয়া, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলো।
আমেরিকার অন্যতম বড় মিডিয়া গ্রুপের নাম টাইম-ওয়ার্নার। এ গ্রুপের অধীনে পত্রিকা, অনলাইন বিজনেস, মুভি প্রডাকশন হাউজ এবং টিভি চ্যানেল সবই আছে। যারা নিয়মিত টিভি দেখেন বা মুভি সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তাদের কাছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স নামটা খুবই পরিচিত। প্রায় ১০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ইহুদি এর গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব পদই ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে।

টাইম ওয়ার্নারের আরেক প্রতিষ্ঠান আমেরিকা অনলাইন (AOL)। এই প্রতিষ্ঠানটি ৩৪ মিলিয়ন আমেরিকান সাবস্ক্রাইভার (Subscriber) নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে পরিচিত। টিনএজার, নারী ও শিশুদের টার্গেট করে নামা এওএল (AOL) এখন জুইশ কমিউনিটির প্ল্যাটফরমে পরিণত হয়েছে।
নব্বই এর দশকে ইরাক ওয়ার কাভার করে আমেরিকায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে CNN টিভি চ্যানেলটি। এর মালিক টেড টার্নার বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেলেও এক পর্যায়ে চ্যানেলটি চালাতে ব্যর্থ হয়ে আত্মসমর্পণ করেন টাইম ওয়ার্নার গ্রুপের কাছে। তিনি নামে থাকলেও মূল ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে টাইম ওয়ার্নার। ৭০ মিলিয়ন দর্শকের চ্যানেল CNN কিভাবে খবর বিকৃত করে তার একটি ছোট উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে নাইন ইলেভেন টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর। এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিলো প্রতিক্রিয়া হিসেবে। হঠাৎ দেখা গেল প্যালেষ্টাইনিরা আকাশে গুলি ছুড়ে আনন্দ প্রকাশ করছে। এতে বোঝা যায় তারা টুইন টাওয়ার ধ্বংসে খুশী। কিছুদিন পর CNN খুব গুরুত্বহীনভাবে টেলপে জানায়, প্যালেষ্টিনিয়ান ফুটেজটি ছিলো পুরনো। তা ভুল করে সেদিন দেখানো হয়। কিন্তু ততদিনে পৃথিবীতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে এ কাজ মুসলমানদের।
আমেরিকার সবচেয়ে বড় পে-টিভি চ্যানেলের নাম এইচবিও (HBO) । যা বাংলাদেশেও খুবই জনপ্রিয়। আমেরিকায় এর দর্শক ২৬ মিলিয়ন। HBO চ্যানেলটি টাইম ওয়ার্নার-এর অর্থাৎ পুরোপুরি ইহুদি নিয়ন্ত্রিত এবং এর কথিত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে পরিচিত CINEMAX আরেকটি টাইম ওয়ার্নারের অঙ্গ সংগঠন। আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিউজিক রেকর্ড কোম্পানি পলিগ্রাম মিউজিকও তাদের দখলে।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ম্যাগাজিনের নাম এলে প্রথমেই উচ্চারিত হয় যে নামটি তা হলো টাইম। এই পত্রিকাসহ টাইম ওয়ার্নার গ্রুপে আছে লাইফ, স্পোর্টস ইলাসট্রেটেড, পিপল – এর মতো বিশ্বনন্দিত পত্রিকাসহ ৫০ টি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন। টাইমসহ এ-ম্যাগাজিনগুলোর মাথার উপরে বসে এডিটর ইন চীফ হিসেবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন নরম্যান পার্লষ্টাইন। যিনি একজন ইহুদি।

বিশ্বজুড়ে শিশুকিশোরদের মনে রঙিন স্বপ্ন তৈরি করে যে প্রতিষ্ঠানটি তার নাম ওয়াল্ট ডিজনি কম্পানি। এই কম্পানির ওয়াল্ট ডিজনি টেলিভিশন, টাচষ্টোন টেলিভিশান, বুয়েনা ভিসটা (Buena Vista) টেলিভিশনের আছে কমপক্ষে ১০০ মিলিয়ন নিয়মিত দর্শক। সিনেমা তৈরিতে কাজ করছে ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্স, টাচষ্টোন পিকচার্স, হলিউড পিকচার্স, ক্যারাভান পিকচার্সসহ আরো অনেক কিছু। ইনডিপেনডেন্ট মুভি তৈরিতে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান Miramax Films-ও কিনে নিয়েছে ডিজনি। বিকল্প ধারার মুভি তৈরিতে Miramax অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওয়াল্ট ডিজনি কম্পানির বর্তমান সিইও একজন ইহুদি। তার নাম মাইকেল আইসনার।
আমেরিকার আরেকটি প্রভাবশালী মিডিয়া গ্রুপের নাম ভিয়াকম (Viacom)। এর প্রধান সুমনার রেডষ্টোন-সহ বড়বড় অধিকাংশ পদেই আছেন ইহুদিরা। জনপ্রিয় সিবিএস টেলিভিশন নেটওয়ার্কসহ ৩৯টি টেলিভিশন ষ্টেশন, ২০০টি সহযোগী ষ্টেশন, ১৮৫টি রেডিও ষ্টেশন, সিনেমা তৈরির বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট পিকচার্স, – তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। ভিয়াকমের আর এক ইহুদি কো-প্রেসিডেন্ট টম ফ্রেসটন-এর নিয়ন্ত্রণে আছে মিউজিক চ্যানেল এমটিভি। মুভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল মিলে গিয়েছে এনবিসি গ্রুপের সঙ্গে। এনবিসি খুবই প্রভাবশালী টিভি চ্যানেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এদের মূল সংগঠন সিগ্রাম (Seagram) সহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন ইহুদি মিডিয়া মুগল এডগার ব্রনফম্যান জুনিয়র। তার বাবা এডগার ব্রনফম্যান সিনিয়র হলেন ওয়ার্ল্ড জুইশ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট।
ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার আগ্রাসনকে আমেরিকানদের কাছে বৈধ হিসেবে চিত্রায়িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ফক্স নিউজ। বিশ্ববিখ্যাত মিডিয়া মুগল রুপার্ট মারডকের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই জুইশদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। কথিত আছে,মারডকের মা ইহুদি ছিলেন। মূলতঃ ফক্স নিউজ যিনি পরিচালনা করেন তার নাম পিটার শেরনিন। অবধারিতভাবেই তিনি ইহুদি। রুপার্ট মারডকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সারা বিশ্বের অসংখ্য পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেল।

বাংলাদেশে জনপ্রিয় ষ্টারপ্লাস-সহ বিভিন্ন দেশে নানান ধরণের এমনকি বিপরীতধর্মী চ্যানেলও তিনি পরিচালনা করেন। ভারতের ষ্টার প্লাস চ্যানেলের লোগো এবং ইহুদিদের প্রধান ধর্মীয় প্রতীক ষ্টার অব ডেভিড এর সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়। টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে এবিসি, স্পোর্টস চ্যানেল, ইএসপিএন, ইতিহাস বিষয়ক হিস্টৃ চ্যানেলসহ আমেরিকার প্রভাবশালী অধিকাংশ টিভি-ই ইহুদিরা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।
আমেরিকায় দৈনিক পত্রিকা বিক্রি হয় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫৮ মিলিয়ন কপি। জাতীয় ও স্থানীয় মিলিয়ে দেড় হাজার পত্রিকা সেখানে প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ পত্রিকা যে নিউজ সার্ভিসের সাহায্য নেয় তার নাম দি এসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি (AP)। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন এর ইহুদি ম্যানেজিং এডিটর ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিলভারম্যান। তিনি প্রতিদিনের খবর কী যাবে, না-যাবে তা ঠিক করেন।
আমেরিকার পত্রিকাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী তিনটি পত্রিকা হলো নিউইয়র্ক টাইমস্ , ওয়াল ষ্টৃট জার্ণাল এবং ওয়াশিংটন পোষ্ট। এ তিনটি পত্রিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন ইহুদিদের হাতে।
ওয়াটারগেট কেলেংকারীর জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলো ওয়াশিংটন পোষ্ট। এর বর্তমান সিইও ডোনাল্ড গ্রেহাম ইহুদি মালিকানার তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে কাজ করছেন। উগ্রবাদী ইহুদী হিসেবে তিনি পরিচিত। ওয়াশিংটন পোষ্ট আরও অনেক পত্রিকা প্রকাশ করে। এর মধ্যে আর্মিদের জন্যই করে ১১টি পত্রিকা। এই গ্রুপের আরেকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত। পত্রিকাটির ইনটারন্যাশনাল এডিশনের সম্পাদক হিসেবে মুসলমান নাম ফরিদ জাকারিয়া দেখে বা কিছু ক্ষেত্রে এর উদারতার জন্য অনেকেই একে লিবারাল পত্রিকা বা ডেমক্রেট সমর্থক হিসেবে মনে করেন। টাইম এর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রভাবশালী এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির নাম নিউজউইক।
আমেরিকার রাজনৈতিক জগতে প্রভাবশালী নিউইয়র্ক টাইমস্-এর প্রকাশক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইহুদিরা হয়ে আসছেন। বর্তমান প্রকাশক ও চেয়ারম্যান আর্থার শুলজবার্জার প্রসিডেন্ট ও সিইও রাসেল টি লুইস এবং ভাইস চেয়ারম্যান মাইকেল গোলডেন সবাই ইহুদি।
বিশ্বের অর্থনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াল ষ্টৃট জার্নাল। আঠার লাখেরও বেশী কপি চলা এই পত্রিকার ইহুদি প্রকাশক ও চেয়ারম্যান পিটার আর কান তেত্রিশটিরও বেশী পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন।
আমেরিকান মুভি ইণ্ডাষ্টৃ-র শুধু নির্মাতা প্রতিষ্ঠানই নয়, এর মুভি নির্মাতা, পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যেও রয়েছে ইহুদিদের প্রাধান্য। বিশ্বখ্যাত অভিনেতা মার্লোন ব্রান্ডো কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, হলিউড চালায় ইহুদিরা। এর মালিকও ইহুদিরা।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ট্যালেনটেড পরিচালক হিসেবে পরিচিত ষ্টিভেন স্পিলবার্গ আরো দুই ইহুদি ব্যবসায়ী ডেভিড গেফিন ও জেফরি ক্যাজেনবার্গ-কে নিয়ে গড়ে তুলেছেন তার কোম্পানি ডৃমওয়ার্কস্ এসকেজি।
হলিউডে এমন অসংখ্য ব্যক্তি আছেন যারা জুইশ কমিউনিটি থেকে এসেছেন। পরিচালক বিলি ওয়াল্ডার, স্ট্যানলি কুবরিক, রোমান পোলানস্কি, উডি এলেন যেমন আছেন এই তালিকায় তেমনি আছেন কার্ক ডগলাস, মাইকেল ডগলাস, পিটার সেলার্স, জেসিকা টেনডি, এলিজাবেথ টেইলর, পল নিউম্যান, বিলি কৃস্টাল, ডাস্টিন হফম্যান, জেরি লুইস, রবিন উইলিয়ামস্। মায়ের দিক থেকে জুইশ কমিউনিটি থেকে এসেছেন রবার্ট ডি নিরো, হ্যারিসন ফোর্ড, ড্যানিয়েল ডে লুইস এর মতো সুপারষ্টাররা। এই তালিকা অনেক লম্বা। সহজে শেষ হবে না।
এসব ষ্টারের অংশগ্রহণই শুধু নয়, জুইশদের পক্ষে জনমত গঠনে হলিউড বা অন্যান্য অঞ্চলের মুভিগুলো ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এসব মুভির নির্মাণ কৌশল, গুণগত মান, বুদ্ধির প্রয়োগ ও বক্তব্য সবই উঁচু মাপের। ইহুদিদের নিয়ে যে বিষয়টি বেশী জায়গা করে নিয়েছে তা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি নির্যাতন বা হলোকস্ট (Holocaust) । বলা হয়, এ সময় প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা ও অসংখ্য ইহুদি নর-নারী ও শিশুকে নির্যাতন করে হিটলার-মুসোলিনির অক্ষ শক্তি। যুদ্ধ চলার সময়ই বিশ্বখ্যাত মুভি নির্মাতা চার্লি চ্যাপলিন দি গ্রেট ডিকটেটর নির্মাণ করে দুনিয়া কাপিয়ে দেন। হিটলার এবং গরীব ইহুদি নাপিত দুই চরিত্রে তিনি অভিনয় করেন। জুইশদের প্রতি তিনি অনুরক্ত কি-না এই ধরণের প্রশ্ন করা হলে চ্যাপলিন উত্তর দিয়েছিলেন, হিটলারের বিরোধী হওয়ার জন্য ইহুদি হওয়ার প্রয়োজন নেই।
যুদ্ধের ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো হলোকস্ট নিয়ে অসংখ্য মুভি তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে এ ধরনের একাধিক মুভি অস্কার পুরষ্কার পেয়েছে। রোমান পোলানস্কির দি পিয়ানিস্ট, ইটালিয়ান মুভি ডিরেক্টর রবার্টো বেনিনির আধুনিক ক্লাসিক মুভি হিসেবে বিবেচিত লাইফ ইজ বিউটিফুল, এর আগে স্পিলবার্গের শিলডার্স লিস্ট এর অন্যতম। স্পিলবার্গ বছর কয়েক আগে তৈরি করেছেন মিউনিখ নামের একটি মুভি যেখানে প্যালিস্টিনিয়ান গেরিলাদের হামলায় ইসরেলি এথলেটদের হত্যা করার বিষয়টি এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে টেন কমান্ডমেন্টস্ , ফিডলার অন দি রুফ , ফেটলেস , ডাউনফল-এর মতো মুভিগুলোতে ইহুদিদের দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠেছে।এসব মুভির ক্ষমতা এত বেশী যে, তা যে কোন দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে। তারা যেভাবে চিন্তা করতে বলবে, সবাইকে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে। শক্তি, বুদ্ধি এবং আবেগ সবকিছুই জুইশ কমিউনিটি মুঠোবন্দী করে রেখেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে ব্যাপকভাবে ইহুদি নিধন শুরু হয়। এসময় অসংখ্য ইহুদি জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে আছেন গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। বিশ্ব জুড়ে ইহুদিদের উপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন, – There are no German Jews, there are no Russian Jews, there are no American Jews …….. There are in fact only Jews.
অর্থাৎ জার্মান ইহুদি বলে কিছু নেই, রাশিয়ান বা আমেরিকান ইহুদি বলেও নয় …. আসলে ইহুদিরা সবাই এক।
মাত্র ৫০/৬০ বছর পেরিয়ে এসেই কথার মানেটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। আসলেই জুইশরা সব এক। তবে তারা এখন নির্যাতিত হচ্ছে না। আর নিয়তির পরিহাস এই যে এখন তারা নির্যাতন করছে এবং বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

ঈজিপশিয়ান ফারাওদের সময় থেকে শুরু করে জার্মানির হিটলারের সময় পর্যন্ত তাদের বিতাড়িত হতে হয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে। তবে এখন যেমন ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের সংঘাত চলছে এক সময় তা ছিল কৃশ্চিয়ান ও ইহুদি সংঘাত। স্পেনে মুসলমানদের রাজত্বে ইহুদিরা খুবই ভালো ছিল। তারা এ-সময় তাদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করার ব্যাপক সুযোগ পায়। মুসলমানদের এই উদারতার কথা ফুটে উঠেছে ইহুদিদের লেখা ইতিহাস বইয়ের পাতায়।
শুরু থেকেই বিভিন্ন সমাজে ইহুদিদের ঘৃণিত, অবহেলিত ও খারাপভাবে দেখা হতো। প্রায় প্রতিটি জায়গায় তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকতো। উগ্র কৃশ্চিয়ানরা তাদের কখনোই সহ্য করতে পারেনি। এদের অনেকেই যিশুর হত্যাকারী হিসেবে ইহুদিদের চিত্রিত করেছে। অনেকেই তাদের অভিশপ্ত জাতি মনে করে।
উপরের কথাগুলোর আলোকে ইহুদিদের প্রধানতম শত্রু খৃস্টানরা হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিলো, কিন্তু, মুসলমানদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব বা বৈরিতার কারণ কী?

আরব-ইসরেল দ্বন্দ্বের কারণ

ইহুদি খৃস্টানদের মধ্যে স্বজাতির প্রতি উগ্র শ্রেষ্ঠত্বের (Racism) অনুরাগ জন্মে বাইবেলের বিকৃত পাঠ হতে। দেখুন নিচে:
But he who was of the bondwoman was born after the flesh; but he of the free woman was by promise. (Galatians: 4:23): Bible, King James Version: 18 Feb 1997)
Now we, brethren, as Isaac was, are the children of promise (Galatians: 4:28): Bible, King James Version: 18 Feb 1997)
So then, brethren, we are not children of the bondwoman, but of the free. (Galatians 4:31): Bible, King James Version: 18 Feb 1997)
বাংলায় অনুবাদ ও বিস্তারিত লিখলে দাড়ায়, হজরত ইব্রাহিম (আঃ) (বাইবেলে, Abraham) – এর সারা ও হাজেরা (বাইবেলে, Sarah এবং Hagar) নাম্নী দু’জন স্ত্রী ছিলেন। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী ইহুদিদের ধারণা এই যে, সারা ছিলেন ইব্রাহীম (আঃ)-এর স্বাধীন স্ত্রী আর হাজেরা ছিলেন তাঁর বাঁদী। উল্লেখ্য যে ইহুদিরা সারার মাধ্যমে এবং আরবরা হাজেরার মাধ্যমে ইব্রাহীম (আঃ) এর বংশধর। কাজে কাজেই ইহুদি-খৃস্টানদের বদ্ধমূল ধারণা এই যে, স্বাধীন স্ত্রীর ছেলে হজরত ইসহাক (আঃ) (Issac)-এর বংশধর “ইয়াহুদিরা” হল উৎকৃষ্টতর আর বাঁদীর ছেলে ইসমাইলের বংশধর “আরবরা” নিকৃষ্টতর।

প্রকৃতপক্ষে, হাজেরার বংশগত আভিজাত্য কম নয়। তিনি ছিলেন মিশরের সম্রাটের কন্যা। সম্রাট নম্রতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্বীয় কন্যাকে খাদেমা বলে হজরত সারার হাতে তুলে দিলেও পরে তো তিনি ইব্রাহীম (আঃ)-এর স্বাধীন স্ত্রী হয়েছিলেন। (ফয়জুল বারী/ বুখারী শরীফ)

বাইবেলেও এর স্বীকৃতি আছে। দেখুন : Gen.16 (3 , 15, 16 )
And Sarai Abram’s wife took Hagar her maid the Egyptian, after Abram had dwelt ten years in the land of Canaan, and gave her to her husband Abram to be his wife.
And Hagar bare Abram a son: and Abram called his son’s name, which Hagar bare, Ishmael.
And Abram was fourscore and six years old, when Hagar bare Ishmael to Abram.
আর হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর আদি পিতা হজরত ইসমাইল (আঃ) সম্পর্কে নকল তৌরাতে বর্ণনা এসেছে এভাবে, –
And he will be a wild man; his hand will be against every man, and every man’s hand against him; and he shall dwell in the presence of all his brethren. (Gen 16:12)
(… একটি মানুষের আকৃতিতে বন্য গর্দভ। তার হাত ও কাজ পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের বিরুদ্ধে এবং পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের ঘৃণা ও প্রতিরোধ তার বিরুদ্ধে ………………… ) (Gen 16:12)
কিন্তু, কোরআনে হজরত ইসমাইল (আঃ) এর চরিত্র সম্পর্কে আছে ভিন্ন বর্ণনা:
And mention in the Book (the Qur’ân) Ismâ’il (Ishmael). Verily! he was true to what he promised, and he was a Messenger, (and) a Prophet. (54) And he used to enjoin on his family and his people As-Salât (the prayers) and the Zakât, and his Lord was pleased with him. (19:54)
(এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা বর্ণনা করুন, তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রসূল, নবী। তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে পছন্দনীয় ছিলেন।) (১৯:৫৪)
(86) And also some of their fathers and their progeny and their brethren, We chose them, and We guided them to a Straight Path. (6:86)
(আর ও তাদের কিছু সংখ্যক পিতৃপুরুষ, সন্তান-সন্ততি ও ভ্রাতাদেরকে; আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল পথ প্রদর্শন করেছি।) (৬:৮৬)
And, when he (his son) was old enough to walk with him, he said: “O my son! I have seen in a dream that I am slaughtering you (offer you in sacrifice to Allâh), so look what you think!” He said: “O my father! Do that which you are commanded, Inshâ’ Allâh (if Allâh will), you shall find me of As-Sâbirun (the patient).” (37:101)
(অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। ) (৩৭:১০১)
ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে স্বজাতির উগ্র শ্রেষ্ঠত্বের (Racism) আর একটি নমুনা দেখুনঃ
Deuteronomy 11:18-25, (তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য তোমাদের সামনে জাতির পর জাতিকে পতন ঘটিয়ে দেবে। তোমরা তোমাদের চাইতে সংখ্যায় বৃহত্তর জাতিকে পদানত করবে, পৃথিবীর যে যে স্থানে তোমাদের পদচিহ্ন পড়বে, তোমরা সে সব স্থানের মালিকানা প্রাপ্ত হবে। তোমাদের ভূমিটির সীমানা হবে লেবাননের বনাঞ্চল হতে এবং নদী হতে ইয়োফ্রেতিশ (ইরাক) নদী পর্যন্ত। কোন জাতি তোমাদের সামনে দাড়াবে না, তোমাদের প্রভু জগৎবাসীর মনে তোমাদের সম্পর্কে ভীতি সৃষ্টি করে দেবেন ……………. ।
অন্য দিকে, হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে বাইবেল কী বলছে দেখুনঃ
[হে মুসা] আমি উহাদের জন্য উহাদের (ইহুদিদের) ভ্রাতৃ [আরব] গণের মধ্য হইতে তোমার সদৃশ এক ভাববাদী [নবী] উৎপন্ন করিব (Deut 18:18)
[18] I will raise them up a Prophet from among their brethren, like unto thee, and will put my words in his mouth; and he shall speak unto them all that I shall command him. (Deut 18:18)
একই কথা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়ও বর্ণিত হয়েছে বাইবেলে যেমন,
For Moses truly said unto the fathers, A prophet shall the Lord your God raise up unto you of your brethren, like unto me; him shall ye hear in all things whatsoever he shall say unto you. (The Acts 3:22)
This is that Moses, which said unto the children of Israel, A prophet shall the Lord your God raise up unto you of your brethren, like unto me; him shall ye hear. (The Acts7:37)
অথচ, প্রায় তিন হাজার বছর যাবৎ ইহুদিরা তাদের আরব ভাইদের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞার ভাব পোষণ করে আসছে; বিশেষ করে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত প্রতিশ্রুত (Promised) নবী মোহাম্মদ (সাঃ) ইহুদি বংশ হতে না-এসে আরব জাতির মধ্য হতে আসায় ইহুদি-খৃস্টানদের বৈরী মনোভাব চরমে পৌঁছে গেল। তাই ইসমাইল (আঃ) এবং তাঁর বংশধর মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কিত বিষয় সমূহ বিকৃত করে, আর না-হয় মুছে ফেলে বাইবেল রদবদল করতে শুরু করে দিল। ( এ নিয়ে পরে পৃথক একটি পর্ব বা আলাদা পোস্ট দেয়ার ইচ্ছা রইলো)। উল্লেখ্য বাইবেলের অনেকগুলো ভারশান (Version) বাজারে প্রচলিত আছে। অর্থাৎ “ বাইবেল ” মুসলমানদের মত একটি মাত্র ধর্মগ্রন্থ “কোরানের ” মতো নয়। ছোট্ট একটি রেফারেন্স দিলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। খৃস্টধর্মতত্ত্ববিদ এবং প্যারিসের ক্যাথলিক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ফাদার কানেনগিয়েসার বাইবেল সংকলিত হওয়ার বিবরণ দিয়েছেন নিম্নরুপেঃ
( “ বাইবেলের কোন বর্ণনাই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার মতো নয়। ওইসব রচনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অথবা এসব রচনা বিরুদ্ধপক্ষীয়দের (মুসলমানসহ খৃস্টান-ইহুদিদের নানান দল উপদল) মোকাবেলায় রচিত……….. ”)
বাইবেল, কোরান ও বিজ্ঞান: ডঃ মরিস বুকাইলি
(তাঁর রেফারেন্সঃ ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা)

পূর্বোক্ত কথার ধারাবাহিকতায় বলা যায়, ইহুদিরা মোহাম্মদ (সাঃ) জন্মের দিনক্ষণ সম্পর্কে অবগত ছিল; তাই তারা মক্কা ও মদীনায় ভিড় জমায়। সমস্ত মক্কা ও মদীনায় তখন আনন্দের ঝড়। এই ঘটনাটি কোরানে এসেছে এভাবেঃ বনী ইসরাইলের পণ্ডিতগণ পূর্ব হতে এ-সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিল, এটা তাদের জন্য একটি নিদর্শন নয় কি? (২৬:১৯৭)

কিন্তু, যখন সময়ক্ষণ অনুসারে জন্মটি একটি “ একটি ইহুদি পরিবারে ” নয় অর্থাৎ “ জেন্টাইল ” পরিবারে ঘটেছে – তা দেখে তারা (ইহুদিরা) চরম হতাশ হয়ে পড়ে। তারা প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় মোহাম্মদ (সাঃ)-এর নবুয়ত দাবীর পরপর। কোরআন এই সত্য ও তথ্যকে এভাবে তুলে ধরেছে – “ কত নিকৃষ্ট উহা যার বিনিময়ে তারা তাদের আত্মাকে বিক্রয় করে দিয়েছে এই জন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, অহংকারের বশবর্তীতায় তাকে তারা প্রত্যাখান করতো এই কারণে যে আল্লাহ তাহার বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। (২:৯০)

তারা (ইহুদিরা) ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। সর্বশেষ ষড়যন্ত্র হয় খাইবারে নবী মোহাম্মদ (সাঃ)-কে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে। যদিও আল্লাহ তাঁকে (সাঃ) বিষাক্ততা থেকে বাঁচিয়েছন – তবু মৃত্যু অবধি এই বিষের ক্রিয়া তাঁকে (সাঃ) বহন করতে হয় যা তিনি (সাঃ) মুসলমান জাতির কাছে একটি আপীল হিসেবে রেখে যান- “ হে আমার জাতি! জেনে রেখো! খাইবারে ইহুদিদের দেয়া বিষ যেন আমার হৃদয়-শিরাকে কেটে দিচ্ছে মৃত্যু শয্যায়”।
ইহুদিরা পৃথিবীতে মূল ছাড়া জাতি। কোরানের নীতি ব্যবহার করে তারা কোরানের ফর্মূলায় একটি জাতিসত্তায় পরিণত হয়েছে – শুধু তাই নয়, তারা সমস্ত দুনিয়ার মানুষকে এখন ভীতি প্রদর্শন করছে। বলা দরকার কোরআনের নীতি যে ব্যবহার করুক, সে উপকৃত হবে – এর জন্য ঈমান আনা জরুরি নয়। ঈহুদিরা এই নীতিটিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে রাষ্ট্র, নেতৃত্ব ও জগৎভীতি সৃষ্টির কৃতিত্বে এসেছে তার চিত্রটি ফুটে উঠে – “ আমি ইচ্ছা করলাম – দুনিয়াতে যাদের হীনবল করা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদের নেতৃত্ব দান করতে এবং তাদেরকে রাষ্ট্রের উত্তরাধিকারী করতে এবং পৃথিবীতে তাদেরকে ক্ষমতাসম্পন্ন করতে এবং ফিরআওন-হামান বাহিনীকে দেখিয়ে দিতে যাদের নিকট হতে ভীতির আশঙ্কা ছিল। ” (২৮: ৫-৬)
এই নীতি অনুসারে – যাদের হীনবল করা হয় ( ইহুদিরা এই বিপাকে পড়েছিলো ) , এবং দুর্বলতার কারণে নেতৃত্ব থাকে না, রাষ্ট্রের পরিচয় থাকে না ও পৃথিবীর ক্ষমতার মঞ্চে যাদের স্থান নেই – তারাও এই পৃথিবী শাসনের কৃতিত্বে আসতে পারে; দুনিয়ায় যারা ছিল অপরাপর শক্তির নিকট ভীত – তারা সৃষ্টি করতে পারে বিপরীত ভীতি প্রবাহ; অর্থাৎ পরিণামে তাদেরকে সকল রাষ্ট্রীয় শক্তিরা ভয় করবে- এই অবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব। আর এই নীতিকে কাজে লাগিয়েছে ইহুদি জাতি জেহাদেরই ফর্মূলায় – “ ওয়াতুজা হিদুনা ফি সাবিলিল্লাহি বিআমওয়ালিকুম ওয়াআনফুসিকুম ” ; বিজয়ের যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন দু’টি বস্তু – একটি ‘ সম্পদ ’ অপরটি ‘ ব্যাক্তি ’। ১৫ মিলিয়ন ইহুদি – ১৫ মিলিয়ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক। আর দুনিয়ার সব সম্পদের মালিক আজ তারা। তারা আমেরিকারও মালিক। কোরআনকে তারা তাদের নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করে কৃতকার্য হয়েছে। ইহুদিরা কীভাবে কোরাআনের ফর্মূলা ধরেছে এবং তাদ্বারা একাট ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মালিক হয়েছে এবং তথা হতে আমেরিকাকে ডিঙ্গিয়ে সমগ্র বিশ্বকে শাসন করবে তার চিত্রটি ক্ষুদ্রাকারে তুলে ধরছি।
ইহুদি জাতি পৃথিবীতে যে সকল রাষ্ট্রসমূহের উপর অসামান্য প্রভাব ও প্রভুত্ব বিস্তার করেছে – তাদের একটি “ অষ্ট্রেলিয়া ” । এই দেশটিতে বসবাসরত ইহুদিরা নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের যে সংগঠন সৃষ্টি করে – তার সর্বনিম্ন সংগঠনকে তারা বলে ‘স্টেইট’। প্রতিটি স্টেইটে বসবাসকারী ইহদিরা তাদের মাসিক আয়ের ৫% অংশ অত্যাবশ্যকীয়ভাবে “স্টেইট” নিকট জমা রাখে। তবে সচরাচর অধিক আয় সম্পন্নরা বাধ্যতামূলক এই দানের বাইরেও অর্থায়ন করে থাকেন। এই অর্থ সরাসরি বিশ্বজোড়া জায়নবাদী প্রচার ও পরিকল্পনা চরিতার্থকরণের জন্য ব্যয় হয়। এই অর্থ ইসরাইল রাষ্ট্রের সংহতিকরণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যয় হয়। এভাবে দীর্ঘদিনের সাধনায় আজ তারা এমন একটি অবস্থানে এসেছে যে বিশ্বের তথ্য, সম্পদ, যুদ্ধ, অর্থনীতি, ইত্যাদি সবই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। খোদ আমেরিকা একটি ক্ষুদ্র ইসরাইল রাষ্ট্রের বাধ্যতার দাস। এটা হলো কোরআনের ফর্মূলায় মুসলমানদের উপর ধার্য্য “জাহাদু বি আমওয়ালি” – এর প্রতি পূর্ণ মান্যতা; তারা কোরাআনের ফর্মূলাকে নিজেদের ফর্মূলা করে নিয়েছে। পাশাপাশি “জাহাদু বি নাফসি” বা ধর্মের জন্য ব্যক্তির সেবাকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রেও তারা অগ্রগামী। ১৫ মিলিয়ন ইহুদি – ১৫ মিলিয়ন সৈনিক ও যোদ্ধা। কিন্তু কতটা চমৎকার পদ্ধতিতে তারা “ওয়া’তাছিমু বি হাবলিল্লাহি জামিআ” এই নীতিটিকে অবলম্বন করছে তার একটি চিত্র আমরা প্রদর্শন করতে পারি।
সাধারণতঃ ওরা চাকুরির চাইতে ব্যবসার প্রতি বেশী আকর্ষণ বোধ করে। যখনই ‘স্টেইটে’ নতুন কোন ইহুদি ব্যবসা/দোকান খোলে, তখনই ‘স্টেইট’ হতে তার সমস্ত অধিবাসীগণের জন্য এটি ধার্য হয়ে যায় যে, এই নতুন ব্যবসায়ী যে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে, ৩ মাসের জন্য প্রত্যেক ইহুদি নাগরিক ন্যুনতম ২০০ ডলারের পণ্য কিংবা সেবা ক্রয় করবে বাধ্যতামূলকভাবে। এই বাধ্যবাধকতা প্রসূত ‘খরিদ’ নতুন ইহুদি ব্যবসায়ীকে শুরু করার মুহূর্ত হতেই একটি সাবলীল সমর্থন ও শক্তি যোগায়; পরবর্তীতে যা তাকে সফল ব্যবসায়ী হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করে। ইন্নাল মু’মিণীনা ইখওয়াতুন, ফা আছলিহু বাইনা আখাওয়াইকুম (মুমিন পরষ্পরের ভাই- একে অপরের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হও) , এই ফর্মূলাটি এ যুগের কোনো মুসলমান মান্য করেনি, ইহুদিরা পরিপূর্ণভাবে মান্য করে চলছে।

“ আর যারা এই পথ প্রদর্শনকে মান্য করে চলবে- তাদের ভয় নেই, তারা দুঃখিত হবে না ” (২:৩৮) । ইহুদি জাতি এই পথ প্রদর্শন মান্য করে চলছে। তারা আজ ভীত নয়; দুঃখিতও নয়। বলা বাহুল্য যে, বর্ণিত ‘স্টেইট’ এর এক হাজার ইহুদি যদি ৩ মাসে সেই নব্য ব্যবসায়ীর নিকট হতে ১০০০ x ২০০ = ২ লাখ ডলারের ব্যবসা পেয়ে যায়, যা নিশ্চিত, তা অস্ট্রেলিয়ায় পরবর্তীতে তার টিকে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্ট।

ব্যক্তি ও সামষ্টিক সমাজে ইহুদিরা কোরআনের নির্দেশ মান্য করে চলে। তাই প্রতিশ্রুতি অনুসারে তারা ভীতির শিকার নয় এবং তারা দুঃখিতও নয়। কাফির হয়েও তারা কোরআনকে বা কোরআনের নীতিকে তাদের কল্যানে ব্যবহার করেছে।

ইসলামের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে হিজরতের পর। ইসলামের শেষ নবী চিরাচরিত কিবলা মক্কাকে পিছনে ফেলে দীর্ঘ ১৭ মাস মসজিদুল আকসাকে কিবলা ঘোষণা করেন এবং সে অনুসারে নিজে এবং অনুসারিগণ তথা সমস্ত মুসলমান মসজিদুল আকসার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন। ইহুদি-খৃষ্টান মূলত মুসলমানদের এই প্রতিশ্রুত নতুন আইনেরই আওতাভূক্ত এক অভিন্ন জাতি; তাদের মূল ইসলামের আদি সত্তায় প্রোথিত এবং নামে ইহুদি ও খৃষ্টান হলেও তাদের আত্মার উৎস রয়েছে ইসলামে এবং নতুন অবতীর্ণ কোরআনের সাথে – এই সংবাদ তাদেরকে এই কেবলা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পৌঁছে দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এর মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলো বনি ইসরাঈল। বনি ইসরাঈল অস্বীকার করেছে ঈসা (আঃ)-কে। তৌরাতের সাথে কোরাআনের সম্পর্কের বিষয়ে তারা পূর্ব হতেই অবগত এবং অপর পক্ষে খৃষ্টানগণ তাদেরই তৌরাতকে তাদের পুস্তকের অংশ হিসেবে মান্য করে। সুতরাং বনি ইসরাঈলের ঈমান আনয়ন খৃষ্টান ও অপরাপর পৌত্তলিকদের প্রভূতভাবে সাহায্য করতে পারে। বনি ইসরাঈল (এবং খৃষ্টানগণও) বিশেষভাবে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্ম ও আগমনের বিষয়ে পূর্বাহ্নেই অবগত ছিলো। তারা নবীজী (সাঃ)-এর আগমন প্রতীক্ষায় মক্কায় ও ইয়াসরিবে (মদীনায়) দলে দলে ভিড় জমিয়েছিলো। আল্লাহপাক তাদের এই পূর্ব আয়োজন ও প্রস্তুতিকে কোরআনের বাণীতে মোহরান্কিত করে রেখেছেন – “ পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে অবশ্যই ইহার (কোরআন) উল্লেখ আছে। (২৬:১৯৬)। বনি ইসরাঈলের পণ্ডিতগণ পূর্বাহ্ণেই ইহা অবগত আছে – ইহা কি উহাদিগের জন্য নিদর্শন নহে?” (২৬:১৯৭)
ইহুদিরা অত্যন্ত আত্মাভিমানি জাতিতে পরিণত হয়ে যায়। তারা দাম্ভিকতায় পৃথিবীতে যারপরনাই বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে। তাদের দাম্ভিক প্রত্যাশা ছিলো – শেষ নবী তাদের বংশেই এবং ইহুদি ঔরসেই জন্ম নেবেন। বনি ইসরাঈলের এই দাম্ভিকতার কারণ ছিল যে ইতিহাসের শক্তিশালী নবীগণ তাদের মধ্যে এসেছে সুতরাং তারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি, আল্লাহ পাকের একমাত্র পছন্দপাত্র জাতি হিসেবে তারা পৃথিবীতে চির উন্নত। ইসরাঈলের বাইরে স্বর্গীয় দয়া নেই এবং শেষ নবী যা তৌরাতে বহুল প্রতিশ্রুত, সে নবীর জন্ম তাদের ভিন্ন অন্য কোন জাতিতে নয়।

অথচ ইতোমধ্যেই তারা হয়ে পড়েছে সীমা লংঘনকারী। যখন তারা দেখলো যে দিনক্ষণের নির্ধারিত জন্মটি ইহুদি পরিবারে নয়, একটি আরব পরিবারে, তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। শেষ নবীর আগমন নিয়ে মাতামাতি কেটে যায় কিন্তু সমস্যার সূচনা হয় কেবল যখন মুহাম্মদ (সাঃ) নবুয়তের বাণী প্রচার শুরু করেন। তারা মুহাম্মদুর রসুল (সাঃ)-কে অস্বীকার করে। আল্লাহপাক ঘটনাটি কোরআনে লিপিবদ্ধ করে দেন – “ উহা কত নিকৃষ্ট যাহার বিনিময়ে তাহারা তাহাদের আত্মাকে বিক্রয় করিয়াছে উহা এই যে, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন, ঈর্ষান্বিত হইয়া তাহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিত শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের মধ্য হইতে যাহাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তাহারা ক্রোধের পাত্র হইল। (২:৯০)

ইহুদিদের রোষানল নবীজী (সাঃ)-কে বিভিন্ন হত্যা-ষড়যন্ত্রের শিকার করলো যদিও আল্লাহপাক প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তাঁর রাসুলকে প্রয়োজনীয় তথ্য পূর্বাহ্ণেই অবগত করেছিলেন এবং নিরাপত্তা বিধান করলেন। কিন্তু ইহুদিদের প্রতি আল্লাহপাকের করুণার দরজা বন্ধ করার পূর্বে নবীজী (সাঃ) কর্তৃক কিবলা পরিবর্তন ছিল এক বিশেষ ও সর্বশেষ ছাড়। ইহুদীরা এই শেষ সুঝোগটুকু গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহপাক কিবলাকে আবার কাবা ঘরের দিকে প্রবর্তন করেন। এই ঘটনা ইহুদী জাতির প্রতি ইসলামের উন্মুক্ত দরজাকে রুদ্ধ করে দেয়। তারা হয়ে পড়ে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত জাতি। তাদের বিষয়ে আল্লাহপাক কোরআনে সুস্পষ্ট ফয়সালা প্রকাশ করেন-“ অতঃপর আমি বনি ইসরাঈলকে বলিলাম- পৃথিবীতে তোমরা বসবাস করিতে থাক এবং যখন তোমাদের প্রতি আল্লাহর শেষ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হইবে তখন তিনি তোমাদের সকলকে  একত্রিত করিবেন”। (১৭:১০৪)
কোরআনের  সূরা যেভাবে সন্নিবদ্ধ করা হয়েছে সেভাবে কখনোই অবতীর্ণ হয়নি। বিশেষভাবে বড় সূরাগুলি। সময় ও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। বিশ্বের বিস্ময়কর গ্রন্থ আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে এক অভিনব পদ্ধতিতে। আজ একটি সূরার দু’টি আয়াত, কাল অন্য একটি সূরার পাঁচটি আয়াত, অনেকদিন পর অপর একখানি আয়াত যা অন্য একটি সূরার অন্তর্ভূক্ত, অনেকদিন পর হয় তো অন্য কোন একখানি আয়াতাংশ যা অপর কোন সূরার কিংবা পূর্বের কোন সূরার অংশ। এইভাবে ঝিগ্‌ঝাগ্ (Zigzag), মানবীয় শৃঙ্খলা হতে অতি ভিন্ন এবং ধারণার সাধ্যের অতীত এক পদ্ধতিতে মোট ২৩ বছরের বিস্ময়কর কোরআন, বিস্ময়কর অভিনবতায়, বিস্ময়কর সত্যে বিস্ময়করভাবে বিশ্বের বিস্ময়কর পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর মানুষ মুহাম্মদ(সাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়। যিনি এই বিশাল গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছেন একবারে এবং যার কোন দ্বিতীয় খসড়ার প্রয়োজন পড়েনি এবং যাতে একটি ভুলের ঘটনা ঘটেনি সেই বিশাল গ্রন্থের (মানবীয় দৃষ্টিত) প্রণেতা কিংবা সন্নিবেশকারী মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একজন ইতিহাস স্বীকৃত নিরক্ষর উম্মী! উদাহরণস্বরূপ বলা যায় – “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করিলাম” (৫:৩)। এই বাণীটুকু একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র অবতীর্ণ বাণী যা বিদায় হজ্জে নবীজী (সাঃ) যখন উপস্থিত জনতার সাক্ষী গ্রহণ করার পর আকাশের দিকে তাকালেন- ঠিক তখনই তা অবতীর্ণ হয়েছিলো এইটুকুতেই। কিন্তু কোরআনে তা স্থান পেল এক বিস্ময়কর ভঙ্গিতে – তার পূর্বে এক সুবিশাল বক্তব্য এবং তার পর অন্য এক বক্তব্য, মাঝখানে স্থান পেল বিদায় হজ্জের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা একটি বড় আয়াতের অংশ হিসেবে। আর সেই সুবিশাল আয়াত একটি সাধারণ খাদ্য আইন। কি বিস্ময়! অতএব, ১৭:১০৪ আয়াতকে পূর্ববর্তী আয়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে যদি পাঠ করা হয়, তবে এই আয়াতের ঘোরতর ঘোষণা যেন প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রিয় পাঠক, The Holy Quran, A. Yusuf Ali-র ভাষ্যে এ আয়াতের টীকা কিংবা অন্যান্য তফসিরে প্রদত্ত টীকা সমূহে যে টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করা যায় তার দিকে দৃষ্টি রেখে ১৭:১০৪ আয়াতকে একটি স্বাবলম্বী আয়াত হিসেবে পাঠ করার জন্য অনুরোধ করছি।

কোরআনের বাস্তব প্রায়োগিক পদ্ধতি একজন রাসুল (সাঃ)-এর দ্বারা ব্যবহারিক বলয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ব্যবস্থায় কিভাবে যোগ্যতা ও কৃতকার্যতার সাথে কাজ করে, তার উদাহরণ সেই রাসুল (সাঃ) ইসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতে কোন অতিপ্রাকৃতিক ব্যবস্থার আশ্রয় নেন নি। তিনি ছিলেন একজন রাসুল (সাঃ) যাঁর জীবন ছিল অন্যান্য সাধারণ মানুষেরই মত, ক্ষুধা, দুঃখ, যন্ত্রণা, অসুস্থতা, ব্যর্থতা, যুদ্ধ, শান্তি, জ্ঞান, শিক্ষা, বিনয় ইত্যাদি যা কিছু কল্পনা করা যায় অপরাপর মানুষের জীবনের জন্য- সেই সমস্ত ব্যবহারের সমষ্টিতেই। এমনি স্বাভাবিক ব্যবহার, প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনা করেই উৎসারিত হয়েছিল ইসলামের জীবন ব্যবস্থা। তারপর অর্ধ বিশ্ব বিজয় করেছিলো মুসলমান তাঁরই শেখানো পদ্ধতিতে। আল্লাহ্পাক এই রাসুলের (সাঃ) পদ্ধতিতেই ইসলামের বিজয় দেবেন এই প্রতিশ্রুতি করেছিলেন- “কাতাবাল্লাহু লাআগলিবান্না আনা ওয়া রাসুলী”- এই আয়াতে। বিজয় যখন অর্ধেক- তখন মুসলমান পথচ্যুত হল, পরিণামে পদচ্যুত হল। যদি বিপর্যয় আসে, মুক্তি কোন পথে তারও পদ্ধতি দেয়া হলো- ‘জিহাদ’। কিন্তু মুসলমান আর আল্লাহর সৈনিক হিসেবে নিজ অবস্থান রক্ষায় সমর্থ হলো না। যখন মুসলমান ব্যর্থ হলো- তখন দায়িত্ব চলে আসে স্বয়ং আল্লাহর; তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পূর্ণ বিজয়ের। যদি মুসলমান ব্যর্থ হয়ে যায়, তবে পরিণতিটির গতি প্রকৃতি কী হবে, তা-ও কোরআন ও হাদীছে বর্ণিত রয়েছে নিখুঁতভাবে। তারই ক্রমধারায় নেমে আসবে দু’টি ঘটনা বা ‘ফেনোম্যানন’ বা প্রপঞ্চ যার একটি দাজ্জাল এবং অপরটি ইয়াজুজ মা’জুজ। পৃথিবী দাজ্জালের ফিৎনায় ভেসে যাবে, ইসলাম ইয়াজুজ মা’জুজের হাতে মার খাবে। ইসলাম হতে জিহাদী চেতনা যখনই বিদায় নেবে, তখনই ইসলাম আক্রান্ত হবে এ দু’টি প্রপঞ্চ দ্বারা। মানুষ উদাসীন হতে হতে চরম সীমালংঘনকারী হয়ে যাবে- যা আজকের নিত্যদিনের দৃশ্য। আর দূর্ভাগ্যজনকভাবে সীমালংঘন উৎসবে যোগ দেবে মুসলমান। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও অনৈসলাম এ দুয়ের পার্থক্য বিলীন হয়ে পড়বে এ দু’টি আঘাতে। স্রষ্টার অস্তিত্ব, প্রত্যাবর্তন, স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আনুগত্য, ভয় ইত্যাদি বিলুপ্ত হবে। ইসলাম যতটুকু বেঁচে থাকবে – ইসলাম হিসেবে নয়, একটি স্মৃতি হিসেবে। ইসলামের মৌলিকতা হারিয়ে গিয়ে অমৌলিক বিবেচনা সমূহ হবে ঘোরতর বিবেব্য বিষয়। ইসলামের প্রকৃতি প্রাকৃতিক গতিতে হারিয়ে বসবে মুসলমান, তাকে ধরে রাখতে প্রয়াসী হবে না আর। আল্লাহ পাক স্বয়ং তাতে হস্তক্ষেপ করবেন। মুসলমানদের পরিণাম যখন অতি সংকটজনক হবে, আবির্ভাব হবে ইমাম মাহদী (আঃ) এবং তারপর হজরত ঈসা (আঃ) যিনি অকাতরে শেষনবী (সাঃ) উম্মত হবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। হজরত ঈসা (আঃ) এর আগমন ও তাঁর পরবর্তী ঘটনার ফলাফল হবে যে পৃথিবীতে ইসলাম ব্যতীত আর কোন মতবাদ থাকবে না। আল্লাহ পাকের প্রতিশ্রুতি পরিপূর্ণ হবে।

হজরত ঈসা (আঃ) পর শত বছর কিংবা আরো অনেক বছর পার হয়ে যাবে – ততদিনে মানুষ আবার পূর্ণ গোমরাহীতে ফিরে যাবে। সে সময়টি দ্রুত ধাবিত হবে মহাঘটনার দিকে – কিয়ামত বা কারিয়া। ধ্বংস হয়ে যাবে এই সুন্দর পৃথিবী। ইতিহাস শেষ হবে এখানেই।

নভেম্বর ১৯৪৭ সনের পর হতে (Balfour Declaration)  পৃথিবীতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও এখনো চলমান সংঘর্ষ হচ্ছে ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের আন্তর্জাতিক প্রভাব এতটাই প্রবল যে, একে কেন্দ্র করে তিনটি মেরুতে মানবসমাজ বিভক্ত। এক দল ইসরাইলের পক্ষে, আরেক দল ফিলিস্তিনের, তৃতীয় দলটি হলো অগ্রগামী। এরা উভয় জাতির সহাবস্থানে বিশ্বাসী। এই প্রবন্ধে মূলত এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ, ফিলিস্তিন-ইসরাইল ভূখন্ডের প্রকৃত দাবিদার কারা, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমেই এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটের দিকে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যাক। একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, ইহুদিরা একটি নৃতাত্ত্বিক জাতি। ইহুদিদের আদি নিবাস বর্তমানের সিরিয়া-জর্দান-লেবানন-ইসরাইল-ফিলিস্তিন অঞ্চল। কিন্তু ইতিহাসের নানা সময় নিপীড়নের শিকার হয়ে ইহুদিরা তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয় এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীতে অধিকাংশ ইহুদি বসবাস করত ইউরোপজুড়ে। বিশেষত জার্মান ও রুশ অঞ্চলে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে খ্রিস্টধর্মানুসারীদের সঙ্গে ইহুদিদের ওপর নতুন নিপীড়ক হিসেবে অবতীর্ণ হয় জাতীয়তাবাদীরা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইহুদি নেতারা তাদের আদি ভূখন্ডে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এর মূল লক্ষ ছিল ইহুদিরা তাদের আদি ভূখন্ডে ফিরে যাবে। ১৮৯৭ সালে ইহুদিদের আদি নিবাসে ফিরে যাওয়া ও তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির বিষয়টি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন অঞ্চল অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের পর বর্তমান ইসরাইল, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্দান, লেবানন অঞ্চলগুলো ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের ম্যান্ডেটের অধীন চলে যায়। এই সময় ইউরোপে ইহুদিদের আদিভূমি ফিলিস্তিন অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন তীব্রতর হয়। এর প্রেক্ষিতে ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বালফোর ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। বেলফোর ঘোষণার আগে ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ইহুদির সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। বেলফোর ঘোষণার পর ইহুদিরা দলে দলে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। ফলে ফিলিস্তিন অঞ্চলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের সংখ্যা লাখের ঘরে পৌঁছায়। ফিলিস্তিন অঞ্চলে তখন চূড়ান্ত অশান্ত, আরব-ইহুদি দ্বন্দ্ব তখন তুঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনী ব্যাপক ও বীভৎসভাবে ইহুদি নিধনের (হলোকাস্ট) ফলে ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি দৃঢ়তর হয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখ-কে দ্বিখন্ডকরা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত ও পাস হয়। ফলে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং এর সঙ্গে শুরু হয় ফিলিস্তিন-ইসরাইল জাতিগত ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ।

ইসরাইল-ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সাধারণত দুটো প্রশ্ন করা হয় : ১. ফিলিস্তিনিরা কি ইসরাইলিদের আদিনিবাস বের করে দিয়েছে? ২. কারা ইসরাইল-ফিলিস্তিনের আদিবাসী ইসরাইলিরা নাকি ফিলিস্তিনিরা? বিভিন্ন বই-পুস্তক থেকে আমি এই দুটো প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করার চেষ্টা করছি। আমার অনুসন্ধান থেকে পাওয়া ফলাফল নিয়েই মূলত এই লেখা। লিভান্ত অঞ্চল সম্পর্কে আশা করি সবার ধারণা আছে। লিভান্ত অঞ্চল বলতে পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে বুঝায়, অর্থাৎ বর্তমান ইজিপ্ট রাষ্ট্রের উত্তরাংশ থেকে বর্তমান তুরস্ক রাষ্ট্রের দক্ষিণাংশের মাঝে বিস্তৃত অঞ্চল; আরো ভেঙে বললে বর্তমান ফিলিস্তিন, ইসরাইল, সিরিয়া, জর্দান, লেবানন, সাইপ্রাস, মিশরের উত্তরাংশ (সিনাই উপত্যকা), দক্ষিণ তুরস্ক (তুরস্কের আলেপ্পো প্রদেশ), ইরাকের দক্ষিণাংশ।

লিভান্ত অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার অব্দের আগে (প্রস্তর যুগ) আহমারিয়ান, অ্যানতেলিয়ান, ক্যাবারান, ন্যাটুফিয়ান, হারিফিয়ান, গাসসুলিয়ান কালচারের বিকাশ ঘটেছিল। এই সময় মানুষ শিকার ও সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত এবং ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ হচ্ছিল। এই মানুষ আফ্রিকা থেকে আগমনকারীদের বংশধর। পরবর্তীকালে লিভান্ত অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার থেকে ১ হাজার খ্রিস্টাব্দে (ব্রোঞ্জ যুগ) একাধিক গোত্রভিত্তিক নগরের উত্থান হওয়া শুরু করে। এই নগরগুলোর উত্থান হওয়ার সময় গোত্রপতি, কিনশিপ, ধর্ম, বিনিময় প্রথা, কৃষিকাজ, ঘরবাড়ি নির্মাণ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, লেখার পদ্ধতি, যানবাহন ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রচলন শুরু হয়। এই সময় বিভিন্ন সভ্যতা, যেমন পার্শ্ববর্তী মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়, অ্যাসিরিয়ান, আক্কাডিয়ান, আমোরাইটস ও ইজিপ্টে ইজিপ্টিয়ান সভ্যতা, তুরস্কের আনাতোলিয়ায় হিত্তিতে সভ্যতা বিকশিত হয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, ধর্ম ও যুদ্ধ বিষয়টি এই অঞ্চলে খুব স্পর্শকাতর ছিল। এই অঞ্চলের মানুষ ধর্মকে অত্যধিক প্রাধান্য দেওয়া শুরু করে এবং বিভিন্ন গোত্রের মাঝে যুদ্ধ নিত্যকার বিষয় ছিল।

লিভান্তের দক্ষিণ অংশকে বলা হতো ক্যানান। দক্ষিণ লিভান্ত বলতে বর্তমান ইসরাইল, ফিলিস্তিন, জর্দান, লেবাননের উপকূলীয় অঞ্চল ও সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত অংশকে বুঝায়। ক্যানানে বসবাস করা নগরভিত্তিক গোত্র ছিল; যারা মোয়াব, জেশুর, ফিলিস্তিয়া, অ্যাম্মোন, ত্যাজেকার, উপকূলীয় এবং জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি। এরাই ইসরাইলটদের পূর্বপুরুষ। এদের সমষ্টিকে বলা হতো ক্যানানাইটস। এদের মধ্যে জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি এই অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের দিকে প্রাধান্য বিস্তার করা শুরু করে। স্বাভাবিক কারণে এই প্রাধান্য বিস্তার ও প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি ছিল এই অঞ্চলের অন্য অধিবাসীদের সঙ্গে বিশেষত ফিলিস্তিয়াদের সংঘাতপূর্ণ। ধীরে ধীরে পুরো দক্ষিণ লিভান্তে জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি তাদের প্রাধান্য বিস্তার করে। বিজেতার ও এগিয়ে যাওয়া গোত্রের ধর্ম, ভাষা, আচার সে আমলে প্রভাব বিস্তার করত। তাই, জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি ধর্ম-ভাষা-আচার দক্ষিণ লিভান্ত অঞ্চলের অন্য আদিবাসীদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং ক্যানানে বসবাস করা গোত্রগুলোর ধর্ম-ভাষা ও আচার পরস্পরের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করে।

এখানে কয়েকটি কথা বলে রাখা ভালো, ইহুদিদের পূর্ব-পুরুষ হলো এই জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টি ও অন্যান্য ক্যানানাইটস গোত্র এবং ক্যানানাইটসদের ধর্মই হলো ইহুদি ধর্মের পূর্বরূপ। আরো সোজা করে বললে, ক্যানানাইটসদের ধর্মের বিবর্তিত রূপ হলো বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন সেমেটিক (আব্রাহামিক) ধর্ম। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে লিভান্ত অঞ্চলটি পার্শ্ববর্তী ইজিপ্টিয়ান সভ্যতা ও বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক হিত্তিতে সভ্যতার সংঘর্ষভূমিতে পরিণত হয় এবং এই অঞ্চল ইজিপ্টিয়ানদের অধিকারে ছিল। এই সময়টিতে ইজিপ্টিয়ানরা ক্যানানাইটসদের দাস হিসেবে ব্যবহার করত। মোজেসের কাহিনির উৎপত্তিও এই সময়টিতে এবং ইহুদি ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও এই সময়টিতে রচিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির উত্তর-পুরুষদের ‘ইসরালাইট’ বলে সম্বোধন করা শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে ক্যানান অঞ্চলের উপকূলীয় অংশে (বিশেষত বর্তমান লেবানন, ইসরাইল-ফিলিস্তিনের উপকূল) ফোনিশিয়ানরা প্রাধান্য বিস্তার করে। ফোনিশিয়ানরা হলো, ক্যানানাইটস (বিশেষত ফিলিস্তিয়া গোত্র) ও অন্যান্য সেমিটিক গোত্র (বিশেষত বর্তমান দক্ষিণ আরব ও আরব-উপকূলের গোত্রগুলো) এবং আশপাশের বিভিন্ন গোত্র ও সভ্যতার মানুষের মিশ্রণ। এরা দক্ষ নাবিক ছিল, এদের নিজেদের বর্ণমালা ছিল এবং সভ্যতার নানা দিকে এরা অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিল।

ইজিপ্টিয়ান সভ্যতা ও বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়াকেন্দ্রিক হিত্তিতে সভ্যতা মূলত এই অঞ্চলে তাদের প্রাচুর্য ও গুরুত্ব ফোনিশিয়ানদের কাছে হারায় এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফোনিশিয়ানরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দের কাছাকাছি পারশিয়ান ও গ্রিকদের কাছে ফোনিশিয়ানদের চূড়ান্ত পতন হয়। ১১৭৫ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে ইজিপ্টিয়ান শাসক তৃতীয় রামেসিসকে পরাজিত করে ফোনিশিয়ানরা তাদের পূর্বপুরুষ ফিলিস্তিয়াদের নামে একটি নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ফিলিস্তিয়া। এখানে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিই, ফিলিস্তিয়া গোত্রের সঙ্গে ইসরালাইটদের পূর্বপুরুষ জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির দ্বন্দ্ব ছিল, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময়টিতে (খ্রিস্টপূর্র্ব ১২০০ থেকে ৭৪০ অব্দ) পুরো ক্যানান অঞ্চলটি প্রশাসনিকভাবে ফোনিশিয়ানদের রাজ্যভুক্ত ছিল এবং ক্যানানাইটস গোত্রগুলো বস্তুত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ছিল স্বাধীন। ঐতিহাসিকভাবে ক্যানানাইটস গোত্রগুলোর ধর্মের উপাদানভিত্তিক প্রচুর মিল থাকলেও পরবর্তীকালে ইসরালাইটদের ধর্ম ভিন্নরূপ লাভ করতে শুরু করে এবং ক্রমেই ইসরালাইটদের ধর্ম ‘ঈশ্বর ও রীতির’ ক্ষেত্রে অন্য ক্যানানাইটসদের ধর্মের চেয়ে আলাদা হতে থাকে। প্যাগান ফিলিস্তিয়া ও অন্যান্য ক্যানানাইটস গোত্রের সঙ্গে একেশ্বরবাদী ইজরালাইটদের ধর্মীয় বিরোধ সুস্পষ্ট হতে থাকে।

পরবর্তীকালে সভ্যতা চর্চার দৌড়ে ইসরালাইটরা এগিয়ে যায় এবং এই অঞ্চলে তাদের ভাষা-ধর্ম-আচারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই সঙ্গে প্যাগান ক্যানানাইটস ভাষা-ধর্ম-আচারও প্রচলিত ছিল। ততদিনে ইহুদি ধর্মের ভিত্তি রচিত হয়ে গেছে এবং এই অঞ্চলে দুটো ইসরালাইট রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় খ্রিস্টপূর্র্ব ৯০০ অব্দে ইসরাইল-রাজ্য ও ৮০০ অব্দে জুদেয়া-রাজ্য। খ্রিস্টপূর্র্ব ৭৪০ অব্দে অ্যাসিরীয়রা ইসরাইল রাজ্য দখল করে। এই সময় প্রথম ইহুদিদের উচ্ছেদ করা হয়। অ্যাসিরীয়রা ৭৩২ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইহুদিদের তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদ করে এবং ইসরাইল রাজ্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি, অ্যাসিরীয়রা ইসরাইল-রাজ্যের শাসক ও তার গোত্র তথা ইহুদিদের শুধুমাত্র উচ্ছেদ করে, অন্য ক্যানানাইটস গোত্রগুলো এই উচ্ছেদের আওতামুক্ত ছিল। খ্রিস্টপূর্র্ব ৬২৭ সালে ব্যাবিলোনিয়ানরা অ্যাসিরীয়দের পরাজিত করে নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ব্যাবিলোনিয়ানদের সঙ্গে ইজিপ্টিয়ানদের রাজ্যবিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিল। খ্রিস্টপূর্র্ব ৬০৯ থেকে ৬০৫ অব্দ পর্যন্ত ইজিপ্টিয়ানরা ব্যাবিলোনিয়ানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইহুদি রাজ্যগুলো অধিকার করে রাখে। ৬০৫ অব্দে ব্যাবিলোনিয়ানরা এই অঞ্চল পুনর্দখল করে।

পরবর্তীকালে ইজিপ্টিয়ান ও ব্যাবিলোনিয়ানদের মাঝে ব্যাপক যুদ্ধ হয় এবং এই যুদ্ধে ইসরালাইটদের (ইহুদিদের) বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাবিলোনিয়ানরা। ফলে ৫৮৬ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে ব্যাবিলোনিয়ানরা জেরুজালেম ও সলোমনের মন্দির ধ্বংস করে দেয় ও পৃথিবীর ইতিহাসে ‘দ্বিতীয়বার’ ইহুদিরা উচ্ছেদের সন্মুখীন হয়। এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি, ব্যাবিলোনীয়রা এবার শুধু ইসরালাইটদের (ইহুদিদের) নয়, পুরো দক্ষিণ লিভান্ত অঞ্চলের সব গোত্রকে হত্যা ও উচ্ছেদ করে। খ্রিস্টপূর্র্ব ৫৪০ অব্দে পারশিয়ানরা ব্যাবিলোনিয়ানদের পরাজিত করে দক্ষিণ-লিভান্ত অঞ্চলকে (ক্যানান) নিজেদের দখলভুক্ত করে। এরা এই অঞ্চলকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে : ১. ফোনেশিয়া, যা বর্তমান লেবানন ও ইসরাইলের দক্ষিণ অংশ। ফোনিশিয়ানরা অধিকাংশ ছিল সেমিটিক প্যাগান। ২. জুদেয়া ও সামারিয়া, জুদেয়া ও সামারিয়ার মানুষরা ছিল ইসরালাইট ইহুদি ও ফিলিস্তিয়া সেমিটিক প্যাগান। ৩. আরব ও সেমেটিক বিভিন্ন গোত্রের জন্য একটি অঞ্চল (বর্তমান গাজা, নেগেভ মরুভূমিসহ বর্তমান ইসরাইলের উত্তরাংশ, পশ্চিমতীর থেকে শুরু করে জর্দান, সিরিয়া) আরব ও সেমেটিক বিভিন্ন গোত্র ছিল সেমিটিক প্যাগান। এই সময় ইসরালাইটরা (ইহুদি) মন্দির পুনর্নির্মাণ করে এবং ইহুদি ধর্ম ও ইসরাইলাইটাদের রিভাইব হয়। হিব্রু ভাষা ও ইসরালাইটদের ধর্ম (বর্তমান ইহুদি ধর্মের পূর্বরূপ) পারশিয়ানদের শাসনামলে বিকশিত হয়।

৩৩০ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে দক্ষিণ লিভান্ত (ক্যানান) গ্রিকদের হস্তগত হয় এবং ১৪০ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দ পর্যন্ত গ্রিকরা প্রকারান্তরে এই অঞ্চল নিজেদের অধিকারে রাখে। এই সময় এ অঞ্চলটি গ্রিকদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও অভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন ছিল। এই সময় ১৬৭ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে গ্রিকরা ইসরালাইটদের ধর্মপালনে বাধা দেওয়া শুরু করে। গ্রিকরা এই অঞ্চলকে ফিলিস্তিন বলে সম্বোধন করত। এর কারণ, ফোনিশিয়ানদের পূর্বপুরুষ ছিল প্যালেস্তিনা; তাদের সঙ্গে গ্রিকদের অসংখ্য যুদ্ধ হয়েছিল, তাদের পতনের মূলে গ্রিকরা অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল।

১৪০ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে জুদেয়ায় ইসরালাইটদের স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়। এই রাজ্য শাসন করত হ্যাসমোনিয়ান ডাইনেস্টি। এই রাজ্য ৬৩ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। এই সময়টিতেই ইসরালাইটরা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি অগ্রসর হয়। দক্ষিণ লিভান্তের (ক্যানান) অধিকাংশ অংশ ইসরালাইটদের রাজ্যভুক্ত হয়। এই সময় ইসরাইলাইটরা তাদের উন্নতি ও বিকাশের সর্বোচ্চ সময়ে আরোহণ করে। রোমানরা ৬৩ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে জুদেয়া রাজ্য দখল করে।

রোমানরা তাদের শাসন এই অঞ্চলে পাকাপোক্ত করার জন্য স্থানীয় ইসরালাইটদের থেকে একজন রাজা নিয়োগ করেছিল, যার নাম হেরোদ। এই সময়ে ইসরালাইটদের মধ্যে অনেকে তাদের ধর্মে বর্ণিত মেসাইয়া (প্রেরিত পুরুষ) বলে দাবি করে। ইসরালাইটদের একটি ধর্মীয় উপগোত্র হিসেবে খ্রিস্টান ধর্মের আবির্ভাব হয়। কিন্তু ইসরালাইটদের এই সুদিন খুব বেশি সময় টিকে ছিল না। ইসরালাইটদের সঙ্গে রোমানদের যুদ্ধ বেধে যায়। টাইটাস ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম ধ্বংস করে এবং প্রায় এক মিলিয়ন ইসরালাইটকে হত্যা করা হয় ও তাদের উচ্ছেদ এবং এটিই ইসরালাইটদের সর্ববৃহৎ উচ্ছেদ; ইসরালাইটরা এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৩২ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা সম্রাট হাদ্রিয়ানের সময় থেকে জুদেয়া অঞ্চলকে অফিসিয়ালি প্যালেস্টিনা বলে সম্বোধন করা শুরু করে। কেন রোমানরা এই অঞ্চলকে প্যালেস্টিনা বলে সম্বোধন করা শুরু করে? তার কারণটাও খুব ইন্টারেস্টিং। সে সময় জুদেয়া অঞ্চলে বসবাস করত দুটো ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায় : ১. ইহুদি ধর্মাবলম্বী ইজরালাইট, এরা ছিল শাসক ও এলিট শ্রেণি। ২. সেমিটিক প্যাগান ধর্মাবলম্বী অন্যান্য ক্যানানাইটস ও সেমিটিকরা। এরা ছিল প্রজা শ্রেণি।

এখানে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের অন্য গোত্রগুলোর, বিশেষত ফিলিস্তিয়াদের সঙ্গে ইসরালাইটদের পূর্বপুরুষ জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা এবং আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দিই, এরা সবাই কিন্তু এই অঞ্চলেরই আদিবাসী। রোমানরা জুদেয়াতে বসবাসকারী সেমিটিক প্যাগান ধর্মাবলম্বী অন্যান্য ক্যানানাইটস ও সেমিটিক গোত্রগুলোকে ইসরালাইটদের বিপক্ষে একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। ঠিক যেন ডিভাইড অ্যান্ড রুল তত্ত্ব আর এই লক্ষ্যে রোমানরা জুদেয়া অঞ্চলকে প্যালেস্টিনা বলে সম্বোধন শুরু করে এবং ইসরালাইট বাদে অন্যান্য প্যাগান ধর্মাবলম্বী ক্যানানাইটস ও সেমিটিক গোত্রকে প্যালেস্টিনিয়ান বলে সম্বোধন করা শুরু করে। এখানে রোমান হঠকারিতাটি হলো, যে ফিলিস্তিয়া গোত্রের সঙ্গে ইসরালাইটদের পূর্বপুরুষ জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির দ্বন্দ্ব ছিল, সে ফিলিস্তিয়া গোত্র এবং জুদেয়া ও সামারিয়ার পর্বতভূমিতে বসবাসকারী গোত্র-সমষ্টির কেউই তখন আর বিদ্যমান ছিল না। যারা ছিল, তারা ওদের বংশধর এবং তাদের গোত্রের নাম-ধর্ম-আচার-ভাষা হাজার বছরের ব্যবধানে বিবর্তিত হয়ে গেছে। রোমানরা তাদের এই হঠকারিতা এই অঞ্চলে তাদের শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। কিন্তু তারপরও এই অঞ্চলে শান্তি আসে না। ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইসরালাইটরা রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ান ১৩৬ খ্রিস্টপূর্র্বাব্দে ইসরালাইটদের প্রকাশ্যে ধর্মপালন নিষিদ্ধ করেন, তাদের ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয়, পবিত্র মন্দির ধ্বংস করা হয়, জেরুজালেম ধ্বংস করে দেন, জেরুজালেমে ইসরাইলাইটদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, জেরুজালেমের নাম পরিবর্তন করে করা হয় এইলিয়া, ছয় লক্ষাধিক ইসরালাইটকে হত্যা করা হয় এবং অধিকাংশ ইসরালাইট প্রাণ বাঁচাতে এই অঞ্চল ত্যাগ করে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার আগে ইসরালাইটরা (ইহুদি) যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার কারণ হলো রোমানদের হাতে ৭০ ও ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ইসরালাইটদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ। একটি কথা বলা দরকার, রোমানরা এবং তাদের পূর্বতন বিভিন্ন শক্তি অ্যাসিরীয় ও ব্যাবিলোনিয়ানরা যে শুধু ইসরালাইটদের হত্যা ও বিতাড়ন করেছে তা কিন্তু নয়; এই অঞ্চলে হাজার বছর ধরে প্রভাব বিস্তার করা শাসক-শ্রেণি ইসরালাইটদের স্থানীয় অন্য গোত্রগুলোর যারাই সমর্থন দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তাদেরও হত্যা ও বিতাড়ন করা হয়েছিল। তবে এখানে এটাও বলা জরুরি যে, এই অঞ্চলের প্রজা শ্রেণি সেমিটিক গোত্রগুলো স্বাভাবিক কারণেই অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলোনিয়ান ও রোমানদের করা এসব অত্যাচারের সম্মুখীন খুব বেশি হয়নি। কারণ এই অঞ্চলের শাসক শ্রেণি ইসরালাইটদের সঙ্গে অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলোনিয়ান ও রোমানদের দ্বন্দ্বগুলো তাদের কাছে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে’ জাতীয় ছিল; এসব যুদ্ধে প্রজা শ্রেণির তেমন আগ্রহ ছিল না।

তবে এই অঞ্চলের সব গোত্রই কোনো না কোনো সময় বিজেতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। ফিনিশিয়ান, সামারাটিয়ান, বেদুইন-গাসসানিদসহ বিভিন্ন আরব গোত্র ও অন্যান্য সেমিটিক গোত্র নানা সময় বিজেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং অধিকাংশ সময়ই বিজেতারা এদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ করেছে। ইসরালাইটদের ইহুদি ধর্ম ও প্যাগান সেমিটিকদের ধর্ম নিয়ে একটি কথা বলে রাখা উচিত হবে যে, এই দুটো ধর্মের অনেক উপাদানের মিল ছিল, এমনও দেখা গেছে একই ব্যক্তি উভয় ধর্মে সম্মানিত, একই আচার উভয় ধর্ম পালন করছে; এর কারণ, উভয় ধর্ম একই উৎস থেকে এসেছে। পরবর্তীকালে ইসরালাইটদের ঈশ্বর-ধারণা একেশ্বরবাদিতায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং অন্য সেমিটিক গোত্রগুলোর ঈশ্বর-ধারণা আগের মতো বহু-ঈশ্বরে রয়ে গেছে। রোমানদের ইসরালাইট তথা ইহুদি নিধন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বস্তুত ইহুদি ধর্মের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যায়। রোমানদের নিপীড়ন শুরু করার আগে ইহুদি ধর্ম ও পরের ইহুদি ধর্মের ব্যাপক পার্থক্য আছে। এর কারণ রোমানরা যেভাবে পেরেছে সেভাবে ইসরালাইটদের নিধন, প্রায় সব ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে হত্যা, উপাসনালয়, ধর্মগ্রন্থ ধ্বংস করেছে।

বর্তমানে ইসরালাইট তথা ইহুদিদের যে ধর্ম আমরা দেখি তার চর্চা মূলত ৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিক থেকে শুরু হয়। ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে রোমান সম্রাট কন্সটানটাইন এবং ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ধর্মকে রোমানরা ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়; কন্সটানটাইনের সময় খ্রিস্টান শহর হিসেবে জেরুজালেমের নাম পূর্ণ প্রচলন করে। এসময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ইসরালাইটদের নতুন শত্রু সৃষ্টি হয় আর তারা হলো খ্রিস্টানরা। খ্রিস্টানরা যিশুর মৃত্যুর জন্য ইসরালাইটদের দায়ী করে। শুরু হয় সংঘাতের নতুন অধ্যায়, খ্রিস্টান-ইহুদি দ্বন্দ্ব। ৩৫১-৩৫২ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের বিরুদ্ধে ইসরালাইটরা বিদ্রোহ করলে কঠোর হস্তে তা দমন করা হয় এবং আগের মতো ইসরালাইটদের হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়। ৩৬১ সালে রোমানরা ইসরালাইটদের জেরুজালেমে প্রবেশাধিকার দেয়, তাদের মন্দির তৈরির ও প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া হয়। রোমান সম্রাট থিওডোসিয়াস খ্রিস্টান ধর্মকে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এসময় যিশুর অঞ্চল হিসেবে জেরুজালেম ও তৎসংলগ্ন এলাকা খ্রিস্টানদের কাছে গুরুত্ব পেতে থাকে।

এর মধ্যে ৩৯৫ সালে চূড়ান্তভাবে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে; পূর্বতন অংশকে বলা হতো বিজান্টিয়াম সাম্রাজ্য। বিজান্টিয়ামদের সময় জেরুজালেম খ্রিস্টান ধর্ম চর্চার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ৬১৪ সালে পারশিয়ান-বিজান্টিয়াম যুদ্ধে ইসরালাইটরা পারশিয়ানদের পক্ষ নেয়। পারশিয়ান-ইসরালাইটদের যৌথবাহিনী জেরুজালেম জয় করে খ্রিস্টানদের চার্চগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়, খ্রিস্টানদের ওপর চালানো হয় গণহত্যা। ইসরালাইটরা পারশিয়ানদের অধীন প্যালেস্টিনা ও জেরুজালেম শাসন করতে থাকে। ৬১৭ সালে পারশিয়ান-ইসরালাইটদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পারশিয়ানরা ইসরালাইটদের হাত থেকে প্যালেস্টিনার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, ইসরালাইট সৈন্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সপরিবারে হত্যা করা হয়। জেরুজালেম থেকে তাদের বের করে দেয়, এর তিন মাইলের মধ্যে কোনো ইসরালাইটের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে দেয়। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে বিজান্টিয়াম সম্র্র্র্র্রাট হেরাক্লিয়াস জেরুজালেম পুনরায় জয় এবং পারশিয়ানদের বিতাড়িত করেন। এসময় অধিকাংশ ইসরালাইট বিজান্টিয়ামদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তারা ইসরালাইটদের হত্যা ও উচ্ছেদ করা থেকে বিরত থাকে কিন্তু ইসরালাইটরা জেরুজালেমে বসবাস করতে পারত না। মূলত ইসরালাইটদের অধিকাংশই ১৩৫ খ্রিস্টাব্দের পর জেরুজালেম ও দক্ষিণ লিভান্ত ছেড়ে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের নানা প্রান্তে চলে যায়।

৬৪১ খ্রিস্টাব্দে আরব মুসলমানরা হেজাজ অঞ্চল (বর্তমান সৌদি আরব) থেকে খ্রিস্টান ও ইসরালাইটদের বসতি অন্যত্র সরিয়ে নেয়। ৬৩৪-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান আরবরা জেরুজালেম ও লিভান্ত জয় করে। তখন জেরুজালেম খ্রিস্টানদের একটি পবিত্র শহর হিসেবে গণ্য হতো। আরবরা লিভান্ত জয়ের সময় খ্রিস্টান ও ইসরালাইটদের উচ্ছেদের বিষয়ে কৌশলগত কারণে সংযত ছিল,লিভান্ত জয়ের সময় আরব মুসলমানরা লিভান্তের খ্রিস্টান ও ইসরালাইটদের  উচ্ছেদ না করে জিজিয়া কর চালু করে। এদিকে ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের দ্বারা উচ্ছেদের পর ইসরালাইটদের অধিকাংশই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অধিকাংশ ইসরালাইট ইউরোপে আশ্রয় নেয়। ইউরোপিয়ানরা ৩৮০ খ্রিস্টাব্দের পর শাসকের ধর্ম হিসেবে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করা শুরু করে। খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারে, ইসরালাইটরা যিশুকে ত্রুশবিদ্ধ করেছে। ফলে খ্রিস্টানরা ইসরালাইটদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত। এর প্রভাব আমরা দেখতে পাই, ইউরোপে ইউরোপিয়ান খ্রিস্টানদের দ্বারা ইসরালাইটদের হত্যা ও উচ্ছেদের অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে।

স্প্যানিশ-পর্তুগিজ ও ক্যাথলিক ইনকুইজিশানের সময় ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা নানা সময় ইউরোপে অবস্থানরত অসংখ্য ইসরালাইটকে হত্যা ও উচ্ছেদ করেছে, ক্রুসেডের সময় এবং পরবর্তীকালে মধ্য ও আধুনিক যুগে খ্রিস্টানরা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরালাইটদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ করেছিল। স্পেন থেকে মধ্যযুগে ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা ইসরালাইটদের উচ্ছেদ করলে অটোম্যানরা সে সময় ইসরালাইটদের আশ্রয় দিয়েছিল। ইউরোপের মুরিশ স্পেনে বেশ কয়েকবার মুসলমান ও খ্রিস্টানরা মিলে ইসরালাইটদের গণহত্যা ও উচ্ছেদ করেছে, মুসলমানদের সূচনালগ্ন হতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে যে সব ইসরালাইট বসবাস করত, তারা বহুবার মুসলমানদের হাতে গণহত্যা ও উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। সত্যি বলতে কি, প্রাচীন আমল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর অর্ধাংশ পর্যন্ত ইজিপ্টিয়ান, অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলোনিয়া, গ্রিক, রোমান, খ্রিস্টান, মুসলমান, আরব, অটোম্যান, পারশিয়ান, ইউরোপিয়ান, নাজি, ফ্যাসিস্ট, রুশ, সোভিয়েত সবাই নানা সময়ে ইসরালাইটদের পার্সিকিউট করেছে। পরিশেষে, এত বড় একটি লেখা লিখতে হয়েছে শুধুমাত্র দুটো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য।

প্রশ্ন ১ : ফিলিস্তিনিরা কি ইসরাইলিদের আদিনিবাস থেকে বের করে দিয়েছে?

উত্তর : না, ফিলিস্তিনিরা ইসরালাইটদের তাদের আদিনিবাস দক্ষিণ লিভান্ত থেকে বিতাড়িত করেনি। ইসরালাইটদের তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছে মূলত রোমানরা। ফিলিস্তিনিরা বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন ভূখ-ের আদিবাসীদের বংশধর এবং ইসরালাইটরাও এই ভূখর আদিবাসীদের বংশধর। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ফিলিস্তিনিরা কারা, ওরা কীভাবে মুসলমান হলো ও তাদের ভাষা আরবি কেন? ফিলিস্তিনিরা ঐতিহাসিক দক্ষিণ লিভান্ত অঞ্চলে নানা সময়ে বসবাসকারী বিভিন্ন গোত্রের বংশধর। ফিলিস্তিনিরা মূলত ক্যানানাইটসদের বংশধর। ফিলিস্তিনিদের বর্তমানে ক্যানানাইট না ডেকে ফিলিস্তিনি ডাকা হয়, কারণ ১৩২ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলের শাসক রোমানরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই অঞ্চলকে প্যালেস্টিনা এবং ইসরালাইট বাদে এর অন্য অধিবাসীদের প্যালেস্টাইন বলে সম্বোধন করত। এর কারণ উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। আগেই বলেছি, শাসকের ভাষা ও ধর্ম প্রজাদেরও ভাষা ও ধর্মে রূপান্তরিত হয়। কারণ এতে শাসক শ্রেণির অংশ হওয়া যায়, নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাও উপভোগ করা যায়। আরব-মুসলমানরা লিভান্ত জয় করার পর, লিভান্তের প্যাগানরা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলের প্যাগানদের মতো ধর্মান্তরিত হয় এবং দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরবির প্রচলন থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য জায়গার মতো লিভান্তের মানুষও আরবিকে মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে।

প্রশ্ন ২ : কারা ইসরাইল-ফিলিস্তিনের আদিবাসী। ইসরাইলিরা নাকি ফিলিস্তিনিরা?

উত্তর : বস্তুত উভয়ের মাতৃভূমি ইজরাইল-ফিলিস্তিন। কারণ উভয়েই ক্যানানাইটসদের বংশধর। ক্যানানাইটস গোত্রগুলোর মাঝে ইসরালাইটদের এই অঞ্চল রোমানরা উচ্ছেদ করেছিল বলে ওরা নানা জায়গায় মাইগ্রেট করে কিন্তু বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন ভূখ- এদের পূর্বপুরুষের মাতৃভূমি। বর্তমানে ফিলিস্তিনি যাদের বলা হয়, এরাও ক্যানানাইটস গোত্রসমূহ, আরবসহ অন্যান্য সেমিটিক গোত্র ও এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারীদের বংশধর। এরা প্রাচীনকাল থেকে হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় এই অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন ভূখ-টি ফিলিস্তিনিদের হাজার হাজার বছরের বসতভূমি ও মাতৃভূমি। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। আর এর মাধ্যমে ইসরালাইটদের বড় অংশ তাদের পূর্বপুরুষের মাতৃভূমিতে আসতে শুরু করে এবং এ নিয়ে ইজরালাইটসহ এই অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের বর্তমান বংশধরদের তথা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরালাইটদের সংঘাত শুরু হয় যা ক্রমেই বড় হয়েছে এবং বর্তমানে এর কোনো সমাধান আমরা পাইনি।

আজ ইহুদিরা তাদের নাশকতামূলক কর্মকা- ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার দ্বিতীয় পর্যায়ে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যের তুঙ্গে অবস্থান করছে। আমরা বর্তমানে আমাদের ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের সূচানলগ্নে প্রবেশ করেছি এবং আমরা তাদের কুৎসিত চেহারা উন্মোচন করার পর্যায়ে রয়েছি ওই সময় যখন মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করবেন। যেমনভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রথমবার মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করে পৃথিবীতে তাদের গর্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন ঠিক তেমনি আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের আগে অথবা তাঁর সাথে মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করব এবং তাদের আধিপত্য, গর্ব ও শ্রেষ্ঠত্বকামিতার ধ্বংস সাধন করব ইনশাআল্লাহ ।ভবিষ্যতের অনাগত সব সঙ্কট মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা মহান আল্লাহ্‌ তা’আলা তার রাসুলের (সঃ) মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবী (স) তার সমগ্র জীবনে কতটা দক্ষতার সাথে ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলা করেছেন এবং ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন তা মুসলমানদের জন্য সবসময়ই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *