‘ইসলাম গ্রহণের পর মনে হচ্ছিল যেন পুনরায় জন্মগ্রহণ করছি’

রিয়াদ: মার্কিন ধনকুবের মার্ক শাফার পেশায় একজন আইনজীবী। ২০০৯ সালের ১৭ অক্টোবর তারিখে তিনি সৌদি আরবে ইসলাম গ্রহণ করেন। মার্ক সেই সময় ছুটি উপভোগ করতে সৌদি আরবে ছিলেন। ১০ দিনের সফরে তিনি রিয়াদ, আভা ও জেদ্দার মতো বিখ্যাত শহরগুলো ভ্রমন করেন।

মার্ক লস এঞ্জেলেসের সিভিল আইনের একজন বিশেষজ্ঞ। তার পরিচালিত শেষ বড় মামলাটি ছিল বিখ্যাত আমেরিকান পপ গায়ক মাইকেল জ্যাকসনের ঘটনা। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরেই জ্যাকসন মারা যান।

সৌদি আরবে ১০ দিনের জন্য মার্কের পর্যটন গাইডের দায়িত্ব পালনকারী ধায়ি বেন নাসির বলেন, ‘সৌদি আরবের প্রথমবারের মতো পা রাখার পর থেকেই মার্ক ইসলাম ও প্রার্থনা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। সৌদি আরব আসার পর মার্ক দুই দিন রিয়াদে ছিলেন। রিয়াদে অবস্থানকালে মার্ক ইসলাম সম্পর্কে খুবই আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নাজরানের দিকে অগ্রসর হওয়ার পর আমরা আবাহ ও আল-উলাতে গিয়েছিলাম। সেখানে ইসলামের প্রতি তার আকর্ষণ আরো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে সেই সময় যখন আমরা মরুভূমির মধ্যে প্রবেশ করেছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘আল-উলাতে আমাদের গ্রুপে থাকা তিনজন সৌদি যুবককে দেখে মার্ক খুবই বিস্মিত হয়ে যান। বিস্তৃত মরুভূমির উন্মুক্ত স্থানে তাদের প্রার্থনা; সত্যিই একটি খুব চমত্কার দৃশ্য ছিল।’

বেন নাসির আরো বলেন, ‘আল-উলাতে দুই দিন থাকার পরে আমরা আল-জুফে যাই। আমরা আল জুফে এসে পৌঁছামাত্রই মার্ক জিজ্ঞেস করলেন, তিনি ইসলাম সম্পর্কিত কিছু বই পেতে পারেন কিনা। তারপর আমি তার জন্য ইসলামের কিছু বই সংগ্রহ করি। মার্ক সব বই পড়েন। পরের দিন সকালে তিনি আমার কাছে কিভাবে প্রার্থনা করতে হয় তা শিখতে চাইলেন। আমি তাকে কিভাবে নামাজ ও ওজু করতে হয় তা শেখাই। তারপর তিনি আমার সঙ্গে যোগ দিলেন এবং আমার পাশে বসে প্রার্থনায় অংশ নেন।।’

তিনি বলেন, ‘নামাজ শেষে মার্ক আমাকে বলেন, এর মাধ্যমে তিনি তার আত্মায় শান্তি অনুভূত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে, আমরা জেদ্দার উদ্দেশ্যে আল-উলা ত্যাগ করেছিলাম। ইসলাম সম্পর্কিত ওই বইগুলি পড়ার সময় তাকে খুবই সিরিয়াস মনে হয়েছিল। পরের দিন শুক্রবার সকালে, আমরা জেদ্দায় পুরাতন শহর পরিদর্শন করলাম। শুক্রবারের জুমার নামাজের কিছু আগে, আমরা হোটেলে ফিরে গিয়েছিলাম এবং শুক্রবারের নামাজের জন্য তার কাছ থেকে বিদায় চাইলাম। তখন মার্ক বললেন, শুক্রবারের প্রার্থনা করার জন্য আমি আপনাদের সঙ্গী হতে চাই। আমি তার ইচ্ছাকে স্বাগত জানাই।’

বেন নাসির বলেন, ‘আমরা তারপর একটি মসজিদ গিয়েছিলাম যা আমাদের হোটেল থেকে খুব দূরে ছিল না। মসজিদটিতে প্রচুর সংখ্যক মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। যাইহোক, সেখানে পৌঁছাতে আমাদের কিছুটা দেরি হওয়ায় আরো অনেকের মতো আমিও মসজিদের বাইরে নামাজে অংশ নেই। আমি দেখতে পাই মার্ক উপস্থিত লোকদের পর্যবেক্ষণ করছেন, বিশেষ করে শুক্রবারের নামাজ শেষ হওয়ার পর, যখন সবাই হাত মেলাচ্ছিল এবং হাসি মুখে একে অপরকে আলিঙ্গন করছিলেন, তা মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। এটি মার্ককে খুবই প্রভাবিত করেছিল।’

‘আমরা যখন হোটেলে ফিরে যাই, মার্ক হঠাৎ আমাকে বলেন যে তিনি একজন মুসলিম হতে চান। তাই আমি তাকে বললাম, ‘এজন্য প্রথমে আপনাকে গোছল করে নিতে হবে’। আমি মার্ককে কালেমা বলার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলাম এবং তারপর তিনি দুই রাকাত নামায পড়েন। পরবর্তীতে, মার্ক মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ পরিদর্শন এবং সেখানে নামাজ আদায় করার ইচ্ছ প্রকাশ করেন।’

‘তার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য এবং ইসলামে ধর্মান্তরের আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের জন্য আমরা জেদ্দায় দা’ওয়া সেন্টার গিয়েছিলাম, যাতে তাকে মক্কা শহরে এবং গ্র্যান্ড মসজিদ প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। মার্ককে ইসলামে ধর্মান্তরের একটি অস্থায়ী সার্টিফিকেট দেওয়া হয় এবং এটি নিয়ে তিনি পবিত্র মক্কা শহর পরিদর্শন করেন।’

ইসলামে ধর্মান্তরের পর মার্ক ‘আল রিয়াদ’ পত্রিকায় নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি আমার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছি না। শুধু এতটুকু বলছি, মনে হচ্ছিল যেন আমি পুনরায় জন্মগ্রহণ করছি এবং আমার জীবন মাত্রই শুরু হয়েছে। আমি খুবই আনন্দিত। আমি যে আনন্দের অনুভূতি অনুভব করছি তা এক কথায় প্রকাশ করা যাবে না, বিশেষ করে যখন আমি গ্র্যান্ড মসজিদ এবং মহান ক্বাবা পরিদর্শন করি।’

ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তার পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে মার্ক জানান, তিনি ইসলাম সম্পর্কে আরো শিখতে চান এবং হজ্ব পালন করতে সৌদি আরব ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

কোন বিষয়টি তাকে ইসলামে ধর্মান্তরের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল, সে সম্পর্কে মার্ক ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘আমি আগেই ইসলাম সম্পর্কে কিছু ধারণা পেয়েছি, কিন্তু এটি ছিল খুবই সীমিত। যখন আমি সৌদি আরবে আসি এবং ব্যক্তিগতভাবে সেখানে মুসলমানদের পর্যবেক্ষণ করেছি এবং দেখেছি কিভাবে তারা প্রার্থনা করেছে। এসব কিছু আমাকে ইসলাম সম্পর্কে আরো জানতে আগ্রহী করে। যখন আমি ইসলাম সম্পর্কে সত্যিকার তথ্য পড়ি, তখন আমি নিশ্চিত হই যে ইসলাম হচ্ছে সত্যের ধর্ম।’

রবিবার সকালে (১৮ অক্টোবর, ২০০৯) মার্ক আমেরিকার উদ্দেশ্য জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। জেদ্দা ছেড়ে যাওয়ার আগে ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করার সময়, মার্ক তার ধর্ম হিসাবে ইসলাম লিখেছিলেন।

ডিসকভরিং ইসলাম অবলম্বনে

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *