ইসলামে সৌন্দর্যতত্ত্বের নীতিমালা

মুসলিম শিল্পের একত্ব ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীগণঃ

ইসলামী শিল্পকলার একত্ব সম্পর্কে বিতর্ক অর্থহীন। যদিও, ইতিহাসবিদেরা কাল ও স্থানের পার্থক্যের কারণে বিপুল সংখ্যক বিচিত্র মোটিফ, উপাদান ও স্টাইলের কথা বলেছেন, তারপরও তারা এর উদ্দেশ্য ও রূপের একতার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। কর্ডোভা থেকে মিন্দানাও পর্যন্ত দেশগুলো ইসলামে দীক্ষিত হবার পর এর শিল্পকলায় একই রকম গঠনগত বৈশিষ্ট্য ও বিকাশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে দেখা যায় স্টাইলাইজেশনের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং একটি ডিজাইনকে বিভিন্ন দিকে সীমাহীন ভাবে বিস্তৃতির শৈলীকে গ্রহণ করা হয়েছে। ইসলামী শিল্পকলায় কোরআন, হাদীস এবং আরবী ও ইরানী কবিতার আবেগ দীপ্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেগুলোকে আরবী ক্যলিওগ্রাফি আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। একই ভাবে সকল যুগের সকল মুসলমানেরা কোরান তেলাওয়াত ও আজানের ধ্বনির প্রতি গভীর আবেগে সাড়া দিয়েছে, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর অর্থ তারা খুব সামান্যই বুঝত বা একেবারেই বুঝত না । এসব ক্ষেত্রে বোঝার বিষয়টি কার্যকরী না থাকলেও উপলব্ধির ব্যাপারটি পুরোপুরি কার্যকর থাকত এবং এর মাধ্যমে তারা কোরান ও আজানের ধ্বনির শৈল্পিক মূল্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো। আসলে তাদের এই শৈল্পিক বোধ, যারা কোরআনকে তাত্ত্বিক বা অর্থগতভাবে বুঝত তাদের মতই শক্তিশালী ছিল, কারণ শৈল্পিকবোধের ক্ষেত্রে উপলব্ধি ও ইন্টুইশনের ভূমিকাই প্রধান। এভাবে দেখা যায় ইসলামের নান্দনিকবোধ এতটাই শক্তিশালী এবং এর অন্তর্গত ঐক্য এতটাই স্বতস্ফূর্ত যে ভৌগলিকভাবে পৃথক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটা সত্ত্বেও এর মধ্যকার একতা এবং সংহতি কিছূমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি। এখানে ইসলামিক স্থাপত্যগুলো সুপরিচিত অ্যারাবেসক এবং আরবী ক্যালিওগ্রাফি দ্বারা অলংকরণের মাধ্যমে। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন জাতি, বর্ণ, ভাষা ও জীবন পদ্ধতির মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম যে সাহিত্যিক ও শৈল্পিক মূল্যবোধ দান করেছে তার মধ্যে সাজুয্য লক্ষ্য করা যায়।

পাশ্চাত্যের পন্ডিতদের মধ্যে ইসলামী শিল্পকলা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা এবং পক্ষপাতদুষ্টতা রয়েছে। তাদের ধারণা, শিল্পকলায় কোন অবদান রাখতে “ইসলাম” মুসলিম জাতির জন্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলাম শিল্পকলাকে সীমিত করেছে, শৈল্পিক প্রবণতাগুলো নষ্ট করেছে। ইসলামের এক মাত্র শিল্পকলার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আরবী ক্যালিওগ্রাফী। পাশ্চাত্যের এক পন্ডিত হার্জফিল্ড একে “অন্ধ গোঁড়ামী” বলে মন্তব্য করেছেন। পাশ্চাত্যের দাবী, মুসলমানদের মধ্যে যারা সত্যিকার শিল্পকর্ম তৈরী করেছে, তারা ইসলামকে অনুসরণ করে নয় বরং ইসলামকে ডিঙ্গিয়ে ও এর সীমালংঘন করেই তা করেছে। যেমন মুসলিম অভিজাত শাসকরা তাদের মহল বা পাঠাগার মানুষ ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি দিয়ে অলংকৃত করেছে। অথচ পাশ্চাত্যের পন্ডিতরা এটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে ইসলামকে ডিঙ্গিয়ে যে শিল্পকর্ম তৈরী হয়েছে তা মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের মধ্যে অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্থান দখল করে আছে মাত্র ।

পাশ্চাত্যের শিল্পীরা আরও সমালোচনা করে বলেন যে, মুসলিমরা সকল শিল্পকর্মের সম্মূখভাগ নক্সা দিয়ে আচ্ছাদিত করেছে। এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা বলেনঃ “মুসলিম শিল্পীরা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃতি শূন্যতা বরদাশত করতে পারে না। এজন্যে তারা নক্সা দিয়ে সকল স্থানের শূন্যতা পূরণ করতে চেয়েছে।”

দূর্ভাগ্যের বিষয় হল যে, পাশ্চাত্য তাদের নীতি ও মানদন্ডর আলোকে ইসলামী শিল্পকলাকে বিচার করতে চেয়েছে। মুসলিম সংস্কৃতির প্রকাশক ইসলামী শিল্পকলার তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা বিভ্রান্তিকর ও হাস্যকর। তারা সকলেই অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছেন, ইসলামী শিল্পকলায় প্রতিকৃতি এবং ন্যাচারালিজম একেবারেই অনুপস্থিত। তারা এখানে এমন কিছু পাননি যার সাথে তারা পাশ্চাত্যের শিল্পকে সম্পৃক্ত বা তুলনা করতে পারেন । ফলে তারা ইসলামী শিল্পকে ব্যাখ্যা করতে যেয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন।

এবার আমরা গ্রীক শিল্পের সাথে নিকট প্রাচ্যের শিল্পের তুলনা করবো। গ্রীক শিল্পের মূল কথা হচ্ছে প্রকৃতিবাদ বা ন্যাচারালিজম। তাদের থিওরী মতে, পাথর কেটে মানষের প্রতিকৃতি (portrait) নির্মাণ হচ্ছে সর্বোচ্চ শিল্প। তারা মনে করে প্রকৃতির মধ্যে মানুষই সবচেয়ে ঐশ্বর্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে জটিল অস্তিত্ব। মানব সত্ত্বার গভীরতা এবং অন্তর্নিহিত বৈচিত্র হচ্ছে শিল্পীর অনুসন্ধান, আবিষ্কার ও প্রকাশের জন্য একটি অন্তহীন খনি। মানুষ হচ্ছে সবকিছু বিচার ও পরিমাপের মানদন্ড। খোদ ঐশী সত্ত্বাকে ধারণা করা হয়েছে মানুষের প্রতিমূর্তিতে। তাদের ধর্ম হচ্ছে মানবতাবাদ ঐশী সত্ত্বার উপাসনা হচ্ছে মানব প্রকৃতির অন্তহীন গভীরতা ও বৈচিত্রের অসন্ধান। গ্রীক বা হেলেনিক সংস্কৃতির এই সার নির্যাসের প্রতিফলন ঘটেছে হেলেনিক শিল্পে।

অন্য দিকে নিকট প্রাচ্যে ঠিক এর বিপরীত অবস্থা দেখা যায়। তারা মনে করে মানুষ একটি সৃষ্টি মাত্র। স্রষ্টার ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট। মানুষ কোন কিছুর চরম লক্ষ নয় সে কোন কিছুর মানদন্ড নয়। মানদন্ড একমাত্র স্রষ্টাই স্থাপন করেন। তার দেয়া নিয়মই হচ্ছে মানুষের জন্যে আইন। এখানে কোন প্রমিথিউস নেই। সব সৃষ্টিই দাস মাত্র। স্রষ্টার আদেশ পালন করলে করুণা লাভ করবে ,পালন না করলে করুণা বঞ্চিত হবে, আদেশ লংঘন করলে ধ্বংস হবে। স্রষ্টার ইচ্ছাকে কিভাবে পূর্ণ করা যায় এই হবে মানুষের সার্বক্ষণিক চিন্তা। তার লক্ষ্য হচ্ছে স্রষ্টামুখী হওয়া। এটাই তার জীবনের তাৎপর্য এবং এভাবেই সে একটি মহাজাগতিক মর্যাদা অর্জন করে। আবশ্যম্ভাবীভাবে নিকট প্রাচ্যের সমস্ত শিল্পকলাই হচ্ছে নিকট প্রাচ্যের এই সমস্ত বিশ্বাসের প্রতিফলন। অন্যদিকে গ্রীকরা মনে করে, প্রকৃতি সর্বোপরি মানব প্রকৃতি তথা মানুষ হচ্ছে স্রষ্টার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। আর তাই প্রমিথিউস কোন গল্প কাহিনী নয়, বরং সে হচ্ছে প্রভুত্ব অর্জনের জন্য স্রষ্টার সাথে মানুষের সংগ্রামের কাব্যিক উপাখ্যান। তাই প্রথমত, গ্রীক ও মিশর স্রষ্টা ও প্রকৃতির মধ্যে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল তা মোকাবেলা করা এবং মানুষের চেতনা থেকে তা সরিয়ে ফেলা দরকার। দ্বিতীয়ত, সমগ্র চেতনা স্রষ্টার দিকে নিমগ্ন রাখা যিনি সকল কিছুর উৎস এবং প্রভু। আর এজন্যই আলেক্সান্ডারের অনেক আগে নিকটপ্রাচ্যের শিল্প, গ্রীক প্রকৃতিবাদ তথা ন্যাচারালিজম থেকে মুক্তির জন্য করে স্টাইলাইজেশন উদ্ভাবন করে।

২. নন্দন তত্বের অতীন্দ্রিয়তাঃ

তৌহিদ দ্বারা বুঝায় যে স্রষ্টা সৃষ্টি থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। যা সৃষ্ট তা কোন ভাবেই অতীন্দ্রীয় নয়, আল্লাহই একমাত্র অতীন্দ্রীয় সত্ত্বা। তৌহিদ আমাদের জানায় যে স্রষ্টার মত আর কিছুই নেই, তাই সৃষ্টি দ্বারা স্রষ্টাকে উপস্থাপন করা যায় না কোন ভাবেই।

কিন্তু গ্রীকরা ইশ্বর বা গডকে মানব প্রকৃতির মাধ্যমে উপস্থাপন করে। গ্রীকরা একে বলত apotheosis অথাৎ ঐশী সত্তার মধ্যে মানবিকতার প্রতিস্থাপন (transfiguration of a human into divinity)। পরবর্তীতে রোমানরা তাদের বিভিন্ন রাজা বাদশাদের প্রতিকৃতি গড়ে। কিন্তু এটা করতে যেয়ে ও তারা রাজা বাদশাদের দেবত্ব দান করে অর্থাৎ দেবতার পদমর্যাদায় আসীন করে। একইভাবে গ্রীস ভাষ্কর্য শিল্পের পাশাপাশি নাট্যশিল্পেরও বিকাশ ঘটে দেবতাদের পারস্পারিক দ্বন্দের বিষয়টি তুলে ধরার জন্য। ওরিয়েন্টালিস্ট ফনগ্র“নেবাম ইসলামী শিল্প সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ইসলামে কোন প্রতিকৃতিধর্মী চিত্র, ভাষ্কর্য ও নাটক নেই। কারণ ইসলামে এমন কোন দেবতা নেই যে মানুষের রূপ ধরে অথবা এমন কোন দেব-দেবী নাই যারা পরষ্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত অথবা মন্দের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত।” তিনি কথাটি বলেছেন নিন্দা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রকৃপক্ষে এটাই ইসলামের বৈশিষ্ট ও মহত্ত্ব যে ইসলাম পৌত্তলিকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

তাওহীদ শৈল্পিক সৃজনশীলতা বিরোধী নয়, সৌন্দর্য উপভোগের ও বিরোধী নয়। বরং তাওহীদ সৌন্দর্যকে পবিত্র গণ্য করে, এর পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎকর্ষ সাধন করে। তৌহিদ শুধু আল্লাহতে, তার ওহীতে বা ওহীর শব্দে পরম সৌন্দর্য দেখতে পায়। ইসলাম এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুন শিল্প তৈরী করতে চায়। মুসলিম শিল্পীর সূচনাবিন্দু “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই” এই বাক্য। এর আলোকে তারা মনে করে, প্রকৃতির কোন কিছুই আল্লাহর প্রতীক হতে পারে না বা আল্লাহকে ব্যক্ত করতে পারেনা। তাই তারা স্টাইলাইজেশনের মাধ্যমে প্রকৃতির সবকিছু উপস্থাপন করলেন। স্টাইলাইজেশনের মাধ্যমে তারা সবকিছুর প্রকৃতিকতা বা ন্যাচারালনেস প্রত্যাখ্যান করলেন।

এভাবে মুসলিমরা অলংকরণ শিল্পকে ‘অ্যারাবেসক’-এর রূপ দান করেন। এরাবেস্ক হচ্ছে এমন একটা non-developmental নক্সা যা বিভিন্নদিকে অন্তহীনভাবে বিস্তৃত হতে পারে। কাপড়, ধাতু, ফুলদানী, দেয়াল, ছাদ, থাম, জানালা বা বইয়ের পাতা – যে কোন কিছুর উপর এই নক্সা অলংকৃত হয়ে শিল্পীর ইচ্ছেমত নানা দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই আলোচনা থেকে বুঝা যায় কেন মুসলিমদের অধিকাংশ শিল্পই বিমূর্ত। এমনকি, যেখানে তারা গাছ, প্রাণী এবং মানুষের প্রতিকৃতি ব্যবহার করেছেন, তারা এমনভাবে তা স্টাইলাইজ করেছেন যাতে তার প্রকৃতিকতা বা ন্যাচারালনেস বিনষ্ট হয়। একইকারণে মুসলিমরা এমনভাবে আরবী স্ক্রিপ্টের বিকাশ ঘটিয়েছেন যাতে একে একটি অন্তহীন ‘অ্যরাবেসক’-এ পরিণত করা যায়। ক্যালিওগ্রাফিতে একজন ক্যালিওগ্রাফার সম্পূর্ণ তার ইচ্ছা ও রূচিমত যে কোন দিকে যে কোন আরবী বর্ণকে বিস্তৃত করতে পারেন। একইভাবে এবিষয়টি মুসলিম স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যার কাছে দালান হচ্ছে পরিকল্পনার দিক থেকে একটি অ্যারাবেসক শিল্পকলা। ভৌগলিক ও জাতিগত ভাবে মুসলিম শিল্পীরা যতই পৃথক হোক না কেন তাদের মধ্যে সাধারণ বিভাজক (common denominator) হচ্ছে আত্-তাওহীদ।

ক. ইসলামে নান্দনিকতার নতুন দিগন্তঃ

স্টাইলাইজেশন যা কিনা নিকট প্রাচ্যে অনুশীলিত হত, তা আলেকজকন্ডার ও তার উত্তরসূরীদের চাপিয়ে দেওয়া হেলেনিক ন্যাচারালিজমের মোকাবেলরায় এক নতুনতর পূর্ণতার মাত্রায় উন্নীত হয়। বর্তমান খৃষ্টান ছদ্ধাবরণে হেলেনিজমের মোকাবেলায় ইসলামের নন্দনতাত্ত্বিক শক্তি ঠিক ততটাই প্রবল যতটা প্রবল এর ধর্মতাত্ত্বিক শক্তি। ইসলাম যেভাবে যীশু খৃষ্টের ঐশ্বরিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে ঠিক সেভাকেই প্রকৃতির নন্দনতাত্ত্বিক প্রকাশে ন্যাচারালিজমকে প্রত্যাখান করে এবং স্টাইলাইজেশনকে উৎসাহিত করে।

অনেক ক্ষেত্রে এমন হতে পারে যে ডিন্যাচারালাইজড (Denaturalized) বস্তু আরো প্রকটভাবে ন্যাচারালিজমকে উৎসাহিত করতে পারে, ঠিক যেমন অনেকসময় অসুস্থার মাধ্যমে সুস্থতার প্রকাশ ঘটানো হয় এবং মৃত্যুর মাধ্যমে জীবনের প্রতিফলন ঘটানো হয় ।

কিন্তু এটা ইসলামী উদ্দেশ্যের বিপরীত। তাই মুসলিম আটিষ্টরা এ সমস্যার সমাধান করেন রিপিটেশান বা পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে। স্টাইলাইজড গাছ বা ফুলের অনির্দিষ্ট পূনরাবৃত্তি ঘটানো হয় । প্রকৃতি বহিভুত কোন বিষয় একইভাবে বারবার প্রকাশ করলে তা অপ্রকৃতিত্বকেই (non-nature) প্রকাশ করে।

১. আরব মনন ইসলামের ঐতিহাসিক ভিত্তিঃ

আরব মননই ইসলামের ভিত্তিমূল। ইসলামের পূর্বে আরবী ভাষা ও লেখন শিল্পের অর্জন ছিল সত্যিই এক আলৌকিক ব্যাপার, যেন অহীর জন্যে তা প্রস্তুত এবং অহী বহনের ক্ষমতাসম্পন্ন ।

আরব মননের প্রথম হাতিয়ার হচ্ছে আরবী ভাষা। আরবী শব্দ প্রাথমিকভাবে তিনটি ব্যঞ্জন ধাতুমূল নিয়ে গঠিত, যার প্রত্যেকটিরই তিনশরও বেশী ধাতুরূপ সম্ভব। আবার ধাতুমূল অসংখ্য, বলা যায় অনন্ত। কারণ যেকোন তিনটি ব্যঞ্জনের সমন্বয়ের প্রতি নতুন অর্থ আরোপ করা যেতে পারে। তাই ওয়েবষ্টার বা অক্সফোর্ডের মত আরবী ভাষার একটি অভিধান, যাতে সকল শব্দ সংকলিত এবং তালিকাবদ্ধ হবে তা একেবারেই অসম্ভব। কারণ আবহমানকাল থেকে পরিচিত সকল শব্দমূলের ধাতুরূপ করা হয়নি। ধাতুমূলের তালিকা কখনো বন্ধ হয়নি।

আরবী ভাষার গঠনমূলক প্রকৃতি তার কবিতাকেও গঠন করে। আরবী কবিতা স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ এবং স্বাধীন শ্লোক নিয়ে গঠিত। কবিতা শুরু থেকে সমাপ্তর দিক পাঠ করা হোক বা সমাপ্তি থেকে শুরুর দিকে, বরাবরই একই রকম মাধুর্য বজায় রাখে। পুনরাবৃত্তিতে আমরা আনন্দিত হই। কোন আরবী কবিতাই সম্পূর্ণ বা বন্দী নয়। অর্থাৎ আরবী কবিতাকে উভয় দিকে টেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব, শুরুতে এবং অন্তে। কবিতার রচয়িতা তো বটেই, যে কোন মানুষই এটা করতে পারে সৌন্দর্যকে বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন না করে। তাই আরব জগতে এটা কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় যে, কোন কবি তার মহৎ শ্রোতাদের উপস্থিতিতে সেই শ্রোতার মৌখিক সাহায্য লাভ করেন।

২. ইসলামের প্রথম শিল্প কোরআনঃ

যদি কোন কিছু শিল্প হয়ে থাকে তবে কোরআনই হচ্ছে সেই শিল্প। মুসলিম মন কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকলে তা হচেছ এই কোরনআন। আর এই প্রভাব নান্দনিকতার দিক থেকেই গভীর। এমন কোন মুসলমান নেই কোরআনের সূর মূর্ছনা যার মর্মমূলে নাড়া দেয়নি। কুরআন এ দিকটাকেই “ই‘জাজ” বলে, মানে হচ্ছে ‘অবাক করে দেওয়ার (power to incapacitate)। কুরআন নিজেই সর্বোচ্চ সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী আরবদের আহবান করছে কোরআনের মত কিছু সৃষ্টি করতে (২:২৩)। কুরআনই আবার তাদের ব্যার্থতার জন্যে তিরস্কার করছে (১০:৩৮, ১১:১৩, ১৭:৮৮) । কোরআনকে বলা হল যাদুর কিতাব (২১:৫৩, ২৫:৪), কেবলমাত্র শ্র্রোতাদের চেতনার উপর এর ক্রিয়ার কারণে। কুরআনের আয়াতগুলো কবিতার জ্ঞাত প্যাটার্নের সাথে খাপ খায়না। প্রত্যেকটি পূর্ববতী বা পরবর্তী আয়াতের সাথে ছন্দে মিলে যায়। এর আবৃতি পাঠক ও শ্রোতার মনে প্রবল গতি সঞ্চার করে, এবং শ্রোতা পরবর্তী আয়াতটি আশা করতে থাকে ।

মুসলিম আরবরা কি পরবর্তী শতকে কোন শিল্প নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল? তারা কি বিজিত জাতি গুলোর শিলল্পকলায় কোন অবদান রেখেছিল? ইসলামী শিল্প বিষয়ক পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদদের প্রত্যেকেই অজ্ঞতা বা পূর্বানুমান বশতঃ এর উত্তরে বলেছেন, ‘না’। তারা অন্তহীনভাবে বার বার একথাই বলে, “মুসলিম শিল্পকলা তার আরব অতীত থেকে বলতে গেলে কিছুই অর্জন করেনি।” অথচ প্রকৃত সত্য এ অভিযোগের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা গোটা ইসলামী শিল্পকলাই অর্জিত আরব অতীত থেকে। একটি শিল্প প্রকৃত শিল্প হয়ে উঠে তার স্টাইল উপাদান ও প্রকাশ ভঙ্গির উপর ভিত্তি করে, যা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভৌগলিক বা সামাজিক আবহ থেকে অর্জিত। সকল ইসলামিক শিল্প সাযুজ্যপূর্ণ এবং কাঠামোগত ভাবে এক , কারণ এর ভিত্তি হচ্ছে ইসলামের মাধ্যমে পাওয়া আরব মনন ও ঐতিহ্য। আরব মনন ও ঐতিহ্যের রীতিপ্রণালীগুলো দ্বারাই সকল মুসলমানের শিল্পসৃষ্টি নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।

খ. দৃশ্যমান শিল্পে নান্দনিকতার প্রকাশঃ

পাশ্চাত্যের দৃশ্যমান শিল্প পুরোপুরি মানব প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু মুসলমানরা মানব প্রকৃতি নয় বরং স্রষ্টার গুণাবলীর ব্যাপারে আগ্রহী । মানব প্রকৃতির নূতন নূতন দিককে প্রকাশ করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। এজন্য এ শিল্প নন্দনতাত্ত্বিকভাবে প্রতিকৃতির আলোচনা করেনি। মানব প্রকৃতির বৈচিত্রপূর্ণ রূপগুলো তারা চিত্রিত করেননি। স্রষ্টাই হচ্ছে তার প্রথম প্রেম এবং শেষ আবিষ্টতার বিষয়। তাই মুসলমানরা তাঁর উপস্থিতি নির্দেশ করে এমন সব অবলম্বন ও উদ্দীপক দিয়ে নিজেদের পরিবেষ্টিত করেন।

স্টাইলাইজেশনের মাধ্যমে যেহেতু প্রকৃতিত্ব থেকে মুক্তকরণ বা ডিন্যাচারালাইজেশন করা যায় সেহেতু মুসলিমরা একে গ্রহণ করেন এবং একে উৎকর্ষতার দিকে নিয়ে যান।

১. স্টাইলাইজেশনের অর্থ হচ্ছে ভেরিয়েশন এবং ক্রমবিকাশের (development) অনুপস্থিতি। উদ্ভিদ জগতে কান্ড থেকে শুরু করে শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু স্টাইলাইজেশনে তারা কান্ড ও শাখা-প্রশাখা সব কিছূর ঘনত্ব, টেক্সচার এবং আকৃতি পুরো চিত্রকর্মে একই রকম রাখলেন । অথাৎ কোন ভেরিয়েশন নেই।

২. ভেরিয়শেনের অভাবে চিত্র কর্মে কোন ক্রমবিকাশও ঘটল না। একটা চিত্রকর্মে সব পাতা এবং ফুল একই রকম থাকল।

৩. ন্যাচারিলিজমকে পুরোপুরি এড়ানোর জন্য যে কৌশলটি সংযোজন করা হল তা হচ্ছে “ডিজাইনের পূনরাবৃত্তি (Repetition)”। বৃন্ত, ফুল, এবং পাতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে সেগুলোকে অন্তহীনভাবে পরপর সাজানো হল যা প্রকৃতিতে অসম্ভব। এভাবে প্রকৃতিকে চেতনা থেকে বাদ দেওয়া হল।

৪.এরপরও দর্শকদের চেতনায় প্রকৃতি যাতে কোনভাবেই স্থান না পায় সে জন্যে তারা “জিওমিট্রাইজেশন” করলেন। তারা সরল, বক্র, ভগ্ন, বৃত্তাকার বিভিন্ন ধরণের রেখা এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতি ব্যবহার করলেন ।

৫. সর্বশেষ তারা পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে প্রতিসাম্য বা মিল (Symmetry) বজায় রাখলেন যাতে তা একই দূরত্ব বজায় রেখে সকল দিকে অগ্রসর হয়। এভাবে ডিজাইন অনন্ত দৃষ্টিক্ষেত্র জুড়ে বিস্তার লাভ করল। শিল্পী তার খেয়াল মত যাকে বইয়ের পাতা, দেওয়াল,প্যানেল, বা ক্যানভাসে স্থান করে দিতে পারেন। এমনকি যেখানে মানুষ ও প্রাণীর আকৃতি ব্যবহৃত হয়েছে , যেমন কিছু পার্সিয়ান মিনিয়েচার গুলোতে, সেখানেও তাকে স্টাইলাইজেশনের মাধ্যমে প্রকৃতিত্ব থেকে মুক্ত (Denaturalize) করা হয়েছে । সেখানে প্রানী বা মানুষের চেহারায় বা দেহে কোন স্বাতন্ত্র, বৈশিষ্ট বা ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়নি। এজন্যে পার্সিয়ান মিনিয়েচার গুলোতে মানবাকৃতিগুলোর একটি থেকে অন্যটির পার্থক্য করা যায় না। আরবী কবিতার মতই মিনিয়েচর গুলো বিভিন্ন অংশ দ্বারা গঠিত, যা পরষ্পর বিচ্ছিন্ন এবং প্রত্যেকটি অংশই একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র হিসেবে বিরাজমান।

৬. ইসলামী শিল্পের প্রতিটি চিত্রকর্ম এবং অলংকরণে একটি গতি রয়েছে। এই গতি স্বতস্ফুর্তভাবে ধাবমান, নক্সার একটি ইউনিট থেকে অপর একটি ইউনিটে , একটি নক্সা থেকে অপর একিিট নক্সায়, একটি দৃষ্টি ক্ষেত্র থেকে অপর একটি দৃষ্টিক্ষেত্রে, যেমনটি আমরা দেখতে পাই বড় বড় প্রাসাদের বিশাল তোরণে, সম্মুখভাগে বা প্রাচীরগুলোতে। কিন্তু কোন ইসলামী শিল্পে কর্ম নেই যেখানে এই গতি চুড়ান্ত। এই গতি চলমান, যা দর্শকদের দৃষ্টিকে সদা চলমান রাখে। এবং তার কল্পনা ও মননে সৃষ্টি করে গতিশীলতা ।

আরাবেসক কি ?

অ্যারাবেসক অন্য যে কোন শৈল্পিক গঠন থেকে আলাদা। এটা মুসলিম দেশগুলোতে সর্বব্যাপী পরিচিত। অ্যারাবেসক নামটা যর্থার্থ হয়েছে কারণ নান্দনিক দিক থেকে এটি ততটাই আরব যতটা আরব আরবী কবিতা বা আরবী কোরআন। এর উপস্থিতি যে কোন পরিবেশকে ইসলামী আবহ দান করে। এটাই বিশাল ভৌগলিক সীমার মধ্যে বিস্তৃত বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে শৈল্পিক সাজুয্য দান করেছে। মূলত অ্যারাবেসক পাশাপাশি সজ্জিত অনেক গুলো ইউনিট বা ফিগারের সমন্বয়ে গঠিত। দর্শকের দৃষ্টি এক ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটের দিকে অগ্রসর হয় যতক্ষণ না তার দৃষ্টি চিত্রকর্মটির বহির্কাঠামোর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে গিয়ে পৌছে। ফিগার বা ইউনিট গুলো পরিপূণর্ এবং স্বাধীন । তারা পরস্পর যুক্ত থাকায় ফিগারের আউটলাইন বা নক্সা অনুসরন করে দর্শকদের দৃষ্টি বাধ্য হয় পরবর্তী ফিগারটির নক্সা অনুসন্ধানে । এতেই সৃষ্টি হয় ছন্দ। এই ছন্দের গতি মন্থর হয় যদি ইউনিট বা ফিগারগুলি দূরে দূরে থাকে । কাছাকাছি থাকলে গতি হয় বেশী। আবার দৃষ্টি যদি বৃত্তাকৃতি বা ভগ্ন রেখায় বাধাগ্রস্থ হয় তবে অ্যারাবেসক আরো গতিশীলতা প্রাপ্ত হয়, অ্যারাবেসকের গতিশীলতা যত বাড়ে দর্শকের মন তত সহজে এমন কল্পনা তৈরী করতে পারে যা শিল্পকর্মের বাহ্য কাঠামোর উর্ধে চলে যেতে পারে ।

অ্যারাবেকস দু ধরনের হতে পারে: floral এবং geometric (জ্যামিতিক)। অ্যারাবেসকে যদি ‘আত-তাওরীক’ বা বৃন্ত-পাতা-ফুল ব্যবহার করে তাহলে তা floral । আর যদি জ্যামিতিক আকৃতি ব্যবহার করে তবে তা geometric (জ্যামিতিক)। জ্যামিতিক অ্যারাবেকস আবার দুধরনের হতে পারেঃ খাত (রৈখিক) এবং রামি(বংকিম)। ‘খাত’-এ সরল বা ভগ্ন রেখা এবং ‘রামি’তে বহুকেন্দ্রিক বক্ররেখা ব্যবহৃত হয়। অ্যারাবেসক দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক উভয়ই হতে পারে। ত্রিমাত্রিক অ্যারাবেসকের উদাহরণ হচ্ছে মাগরিব ও আন্দালুসিয়ার স্থাপত্য, কর্ডোভার মসজিদ, গ্রানাডার আল হামরা প্রাসাদ ইত্যাদি। আলহামরা প্রাসাদের গম্বুজ যে আর্কগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তাতে এমন গতিশীলতা রয়েছে যা ছন্দবদ্ধভাবে দর্শককে আকৃষ্ট করে।

গ. আরবী ক্যালিওগ্রাফিঃ অতিন্দ্রীয় চেতনার সর্বোচ্চ শিল্পঃ

সর্বক্ষেত্রে স্রষ্টার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মুসলিমরা এতটাই উদগ্রীব ছিল যার ফলে তাদের মাধ্যমে এমন একটি প্যাটার্নের জম্ম নেয় যা গোটা মানবজাতির কাছে একেবারই অজ্ঞাত ছিল।

ইসলাম পূর্ব যুগে বিশ্ববাসী শব্দের নান্দনিকতার সাথে পরিছিত ছিল গদ্য সাহিত্য ও কবিতার মাধ্যমে। এসব ক্ষেত্রে আরব, মেসোপটেমিয়ান, হিব্রূ, গ্রীক ও রোমানদের অবদান খাটো করার উপায় নাই। কিন্তু আরবী সহ তাদের কারো ক্ষেত্রেই শব্দের প্রতীকের সাথে কোন নান্দননিকতার ধারণা সংযুক্ত ছিলনা। সমগ্র বিশ্বব্যাপী লেখনী ছিল স্থুল এবং নান্দনিকভাবে আকর্ষণহীন ব্যাপার। এমনকি এখনও লেখার ব্যাপারটি প্রায় তেমনই রয়ে গেছে । ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবী স্ক্রিপ্টও ছিল নান্দনিক গুরুত্ব বর্জিত। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পরই মুসলমানরা একটি নতুন দিগন্ত উম্মোচন করে।

নিকট প্রাচ্যের লোকেরা ক্যালিওগ্রাফি নামে প্রায় কিছুই জানত না। রোমানরা কিছুটা ক্যালিওগ্রাফিক যোগ্যতা অর্জন করলেও তা নান্দনিকতার মানোত্তীর্ণ ছিল না। আয়ারল্যান্ডের সেলটিক সন্ন্যাসিদের অবস্থাও সেরকমই ছিল। তাদের ক্যালিওগ্রাফিক মানও রোমানদের অতিক্রম করতে পারেনি। তারা অক্ষরগুলো কিছুটা গোলাকৃতি করে অলংকরণের মাধ্যমে সামান্য সৌন্দর্য বর্ধনেরে চেষ্টা করেছে মাত্র । অথচ পর্যায়ক্রমে মাত্র দুই জেনারেশনের মধ্যে মুসলিম শিল্পীরা আরবী শব্দকে একটি দৃশ্যমান শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করল। শাব্দিক ও যৌক্তিক তাৎপর্যের বাহিরে তারা শব্দগুলোকে নান্দনিক তাৎপর্য দান করলেন। অন্যান্য শিল্পের মত এটাও ইসলামি চেতনা ধারনের উদ্দেশ্যই সাধন করল।

১. পূর্বে আরবীর নাবাতিয়ান ও সিরিয়াক স্ক্রিপ্টে অক্ষরগুলো ল্যাটিন স্ক্রিপ্টের মত পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিল। আরব শিল্পিরা তাদের সংযুক্ত করল যাতে অক্ষরের উপর চোখ বুলানো বাদ দিয়ে এক দৃষ্টিতে একটি গোটা শব্দের এবং পর্য়য়িক্রমে গোটা লাইনটির ইন্দ্রিয়জ উপলব্ধি সম্ভব হয় ।

২. আরব শিল্পীরা আরবী বর্ণমালাকে স্থিতিস্থাপক বা প্লাসটিসাইজ (অর্থাৎ পরিবর্তনশীল, যা ভাংগাচুরা করা যায় এমন) করলেন। ফলে অক্ষর গুলোকে এখন যেদিকে খুশী সেদিকে ইচ্ছেমত টানা বা দীর্ঘায়িত করা, সংকুচিত করা, ঝুকিয়ে দেওয়া, প্রসারিত করা, সোজা করা, বাঁকানো, ভাগ করা, মোটা করা, চিকন করা , আংশিক বা পূর্ণভাবে বর্র্ধিত করা সম্ভব হল। ফলে অক্ষরগুলো পরিণত হল অনুগত শিল্প উপাদানে, যারা ক্যালিওগ্রাফারের ইচ্ছামত যে কোন নান্দনিক আইডিয়া বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত।

৩. তারা আরাবেসকের floration এবং geometrization প্রক্রিয়া ক্যালিওগ্রাফীতে নিয়ে আসলেন। উদ্দেশ্য ছিল, শুধু লেখনির অলংকরণ বৃদ্ধিই নয় বরং লেখনীকে পুরো একটা অ্যরাবেসকে পরিণত করা।

ইসলাম বিশ্বাস করে আল্লাহর বাণী হচ্ছে তার সবচেয়ে নিকটতম বিশুদ্ধতম ইচ্ছার প্রকাশ। আর তাই এই বাণীর লেখনী হচ্ছে নান্দনিকতার চরম ও পরম স্তর। এজন্যে এ শিল্প দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। প্রস্তরে, কাঠে, কাগজে, চর্ম কিংবা বস্ত্রে, গৃহে, দোকানে, মসজিদে অথবা প্রত্যেকটি প্রাচীর বা ছাদে আরবী লিখন হয়ে উঠল ইসলামের সাধারন শিল্প। রাজা বাদশা এবং প্রাকৃতজন প্রত্যেকেই তাদের সমগ্র জীবনের জন্য একটি পরম আশা পোষণ করতেনঃ একখন্ড সমগ্র কোরআন কপি করা এবং তা সমাপনের পর পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া।

শেষে বলা যায়, গ্রীক ও রেনেসাঁর শিল্পকর্ম মানুষের মূল্য বৃদ্ধি করেছে এবং তাকে এমন উৎকর্ষে পৌছে দিয়েছে যে সে এমনকি স্রষ্টার চেতনার সাথে সংযুক্ত হতে পারে। এভাবে সে মানুষকে মানবিক উৎকর্ষ ও আতœপোলব্ধির স্তরে উন্নীত করেছে। ইসলামী শিল্পকলাও একই ভাবে মানবিক উৎকর্ষতা ও আত্মপোলব্ধি অর্জনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু তা করেছে স্রষ্টার উপস্থিতিকে সামনে রেখে। ফলে ইসলামী শিল্পকলার আদর্শবাদ নিজেকে শৃংখলার অধীনে স্থাপন করেছে। এটা কি একধরণের সীমাবদ্ধতা নয়? অবশ্যই। তবে এ সীমাবদ্ধতা ইন্দ্রিয়াতীত মূল্যমান অর্থাৎ স্রষ্টা দ্বারা আরোপিত। ইসলামী শিল্পের শেষ্ঠত্ব হচ্ছে খোদ ইসলামের মহত্ব অনুসন্ধান এবং সর্বদা পরম এবং অতীন্দ্রীয় (transcendent) সত্ত্বা অর্থাৎ স্রষ্টা থেকে পার্থক্যের দূরত্ব বজায় রাখা।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *