ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গতিধারাঃ রাসূল (সাঃ) ও বর্তমান

ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলন ভিন্ন কোন বিষয় নয়। একটি অপরটির সাথে একেবারেই সম্পর্কযুক্ত। সাহিত্য-সংস্কৃতি একটি জাতির স্বরূপ অন্বেষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সকল যুগের সকল সেরা সাহিত্যিকদের শিরোমনি হযরত মুহাম্মদ (সা:)। যিনি এমন একটি সমাজে আগমন করেছিলেন, যা ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতির শীর্ষে অবস্থানকারী একটি সমাজ। আজকের অপসংস্কৃতির সয়লাবের মুখে ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতির অবস্থান শক্তিশালী মজবুত করণে রাসূল (সা:) এর রেখে যাওয়া বিশাল হাদীস শাস্ত্র থেকে সাহিত্যের রূপ রস এবং উপাদানের ক্ষেত্রে কার্যকরী ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

ইসলামী সাহিত্য :
ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রাসূল (সা:) এর সময় এবং বর্তমান অবস্থান আলোকপাতের পূর্বে এর সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনা প্রয়োজন।
১. ইসলামী সাহিত্য তাকেই বলা হবে, যার মধ্যে জীবনের এমন সব নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে যেগুলোকে ইসলাম মানবতার জন্য কল্যাণপ্রদ গণ্য করেছে যার মধ্যে এমন সব মতবাদের বিরোধিতা করা হবে যেগুলোকে ইসলাম মানবতার জন্য ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছে।
২. ইসলামী সাহিত্যের পথিকৃৎ মিসরের নবীজ কিলানী ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘মাদখাল ইলাল আদব আল-ইসলামী’ বইতে লিখেছেন; ইসলামী সাহিত্য হচ্ছে- মোমিনের অন্তর থেকে উৎসারিত প্রভাবশালী সুন্দরশিল্পীর বর্ণনাভঙ্গি যাতে জীবন ও জগত এবং মানুষ সম্পর্কে একজন মুসলমানের ঈমান আকীদায় প্রতিবিম্ব ঘটবে। যা হবে বিনোদন ও কল্যাণমুখী এবং আবেগ ও কল্পনা সঞ্চারকারী। আর যা কোন ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা গ্রহণের দাবি রাখে।
৩. লক্ষ্মৌভিত্তিক বিশ্ব ইসলামী সাহিত্যলীগ ইসলামী সাহিত্যের নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছে; ইসলামী চিন্তা-চেতনার পরিধির ভেতর জীবন, জগত ও মানুষ সম্পর্কে শিল্পীর বর্ণনাকে ইসলামী সাহিত্য বলা হয়।

ইসলামী সংস্কৃতি :
ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য হল মানবতার কল্যাণ। তাই ইসলাম হলো মানবতার ধর্ম। ইসলামই একমাত্র জীবন বিধান যেখানে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ সকল দিকের সুষ্ঠু সমাধান।
১. ইসলাম যেহেতু মানুষের সামষ্টিক জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করে তাই মানবজীবনের চিন্তার বিশ্বাস, প্রত্যয়, আবেগ, অনুভূতি, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, সামাজিকতা, আচরণ ও ক্রিয়াকান্ডের পূর্ণাঙ্গ পরিমার্জন, পরিশোধন ও অনুশীলনের নামই ইসলামী সংস্কৃতি।
২. মিশরের প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক হাসান আইয়ুব তাঁর রচিত ‘আল আকায়েদ আল ইসলামী’ গ্রন্থে ইসলামী সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রদান করে বলেছেন- ইসলামী সংস্কৃতি বলতে কুরআন সুন্নাহভিত্তিক মানুষেরই সামষ্টিক জীবনের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, অনুরাগ, মূল্যবোধ ক্রিয়াকান্ড সৌজন্যমূলক আচরণ; পরিমার্জিত ও পরিশোধিত সৎকর্মশীলতা, উন্নত নৈতিকতা তথা জীবনের সকল কর্মকান্ডকে বুঝায়, মানুষের পরিপূর্ণ জীবন ধারাই ইসলামী সংস্কৃতির আওতাধীন।
৩. মাওলানা মওদূদী (র:) রচিত ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা বইতে তিনি বলেছেন : ‘‘ইসলামী সংস্কৃতি লক্ষ্য হলো, মানুষকে সাফল্যের চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যে প্রস্তুত করা। … এ সংস্কৃতি একটি ব্যাপক জীবন ব্যবস্থা, যা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব চরিত্র, আচার ব্যবহার, পারিবারিক ও সামাজিক কাজকর্ম, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর উপরই পরিব্যাপ্ত।
ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতির উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য :
পৃথিবীর সব জিনিসের মত সংস্কৃতিরও একটা উদ্দেশ্য লক্ষ্য রয়েছে। লক্ষ্যহীন সংস্কৃতি আদপেই সংস্কৃতি নামের যোগ্য নয়; তা নিতান্ত তামাসা মাত্র তা ছেলে খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ- একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মানবতার কল্যাণ সাধনই এর উদ্দেশ্য। তাই অন্যান্য সকল ক্রিয়াকর্মের মতো ইসলামে সাহিত্য-সংস্কৃতির উদ্দেশ্য ও মানবতার কল্যাণ সাধন। মানুষকে তার ইহ ও পারলৌকিক সুখ শান্তি কল্যাণের পথে উদ্বুদ্ধ করাই ইসলামী সাহিত্যের মূল লক্ষ্য।

সংক্ষেপে কয়েকটি ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হল :
১. আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস ও এক আল্লাহমুখীতা।
২. আল্লাহ প্রেম, আল্লাহভীতি, আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের প্রেরণা।
৩. আখিরাত ও পরকালে চিন্তা।
৪. নৈতিক মূল্যবোধ।
৫. চিন্তা, চরিত্র ও কর্মের পবিত্রতা।
৭. অনাবিলতা, পরিচ্ছন্নতাবোধ ও পংকিলতা থেকে মুক্তি।
৮. সৌন্দর্যবোধ।
৯. দায়িত্বানুভূতি ও কর্তব্যবোধ।
১০. উদারতা ও মনের বিশালতা।
১১. আত্মসম্মানবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ।
১২. বিশজননীতা ও সার্বজনীনতা।
১৩. আদর্শবোধ ; রিসালাতের অনুবর্তন।
১৪. মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান।
১৫. ভারসাম্যতা, সুষমতা ও সামঞ্চস্য।
উপরে বর্ণিত আলোচনায় ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতির মৌলিক সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যর ভিত্তিমূল গড়ে ওঠেছে। এ পর্যায়ে আমরা তৎকালীন আরব সমাজে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়ে ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রাসূল (সা:) এর অবদান :
এ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে ইসলাম আবির্ভাবের সময়কালে আরবদের সাংস্কৃতিক অবস্থান তুলে ধরা প্রয়োজন। আমরা জানি, ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরব সমাজের অধিকাংশ মানুষ ছিল গন্ডমূর্খ অশিক্ষিত এবং বর্বর। সুতরাং তৎকালীন আরবী সাহিত্য ছিল লোকজ সাহিত্য। আর সেই লোকজ সাহিত্যকথা এতই উন্নত ছিল যে, আরবী কাসীদাগুলো হোমারের ‘ইলিয়ড’ সফোক্লিসের’ ওডেসীকে হার মানায়। ওকায মেলায় এই কাসীদার যুদ্ধ বা কবিতার লড়াই এতই উন্নতমানের ছিল তা ভাবতেই অবাক লাগে। কবিতার সাহিত্যমান, বাগ্মী-গুণ, স্মৃতিশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব কবিকে সমাজে উচ্চ মর্যাদা পেতে সাহায্য করতো। কাব্যের বিষয়বস্তু ছিল প্রেমলীলা, মদ খাওয়া অথবা জুয়া খেলার মত। গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়ার মত। ইমরাউল কায়েসের মত কবিদের কবিতার বিষয়বস্তু ছিল- নারী ও ঘোড়া। কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানের রণগীতি, প্রেমগীতি, রঙ্গব্যঙ্গ কবিতা বহু কুখ্যাত ও বিখ্যাত কবিগণ যশ কামাত যা তৎকালীন সকল কাব্যকলাকে ছেড়ে গিয়েছিল। যদিও তা বল্গাহীন জৈবাণুভূতির যৌনরসে উৎসারিত আদিম ও পাশবিক উচ্ছাসের সৃষ্টি করেছিল।

আরব সমাজের সাহিত্য সাংস্কৃতিক বল্গাহীন অবস্থার উত্তরণে এবং মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগের অন্যতম একমাত্র প্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) তাঁর আদর্শই একমাত্র উত্তম আদর্শ। যার মূল ভিত্তি হল মহাগ্রন্থ আল কুরআন। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মত সাহিত্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তিনি যে আদর্শে উদ্ভাসিত হয়েছেন, আমাদের জন্য সেটিই আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য। রাসূল (সা:) কবি ছিলেন না, কিন্তু কবিতার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অসাধারণ। নবী করীম (সা:) এর একটি অমীয় বাণী ইসলামী সংস্কৃতির রূপরেখা নির্ণয়ে পথিকৃৎ বলে মনে করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন- প্রতিটি শিশু প্রকৃতিজাত সন্তান, জনক জননী তাদের কাউকে ইয়াহুদী বানায়, কাউকে খৃষ্টান বানায় আবার কাউকে অগ্নি উপাসক ।
তিনি আরও বলেছেন- ‘ইসলাম প্রকতির ধর্ম (বুখারী)। যে সংস্কৃতি প্রকৃতিগত। একটি শিশু জন্মগতভাবেই সে সংস্কৃতি উত্তরাধিকার লাভ করে। পিতা মাতার বিশ্বাসের কারণে তার প্রকৃতিগত উত্তরাধিকার হয় বিবর্তিত। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে জ্ঞানেরও উন্মেষ হতে থাকে। বিশ্বাস তার ধ্যান ধারণা ও মন সম্পর্কে করে প্রভাবিত। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বাসী মানুষের জীবন তৌহিদভিত্তিক। ‘আল্লাহু আকবার’ তৌহিদের বিশ্বাসের প্রতিফলন সদা প্রতিভাত। তৌহিদী ভিতে রচিত সংস্কৃতি স্বভাতই বস্তুভিত্তিক সংস্কৃতি হতে আলাদা।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টা আমাদের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সেটা হলো- ‘‘হযরত ইউসুফ (আ:) ও জুলায়খার ঘটনা। যেমন- জুলায়খা ছিল বস্তুবাদী সংস্কৃতিবান আর হযরত ইউসুফ (আ:) ছিলেন তৌহিদবাদী সংস্কৃতিবান। তাই নিছক জৈব জিজ্ঞাসার জবাব ছিল জুলায়খার কাম্য। যা সে লোক ভয়ে, প্রকাশ্যে চরিতার্থ করতে পারেনি। নিভৃতে, গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে চেয়েছিল তার অভিলাষ পূরণ করতে। হযরত ইউসুফ (আ:) তৌহিদে বিশ্বাসের কারণে নিভৃত প্রকেষ্ঠেও দেখতে পেয়েছিল ঐ বাধা, যা জুলায়খা দেখেছিল লোকালয়ে।’ কিসের ভিত্তিতে ইসলামী সংস্কৃতি মানদন্ড স্থাপিত হতে পারে তা উক্ত উদাহরণে স্পষ্ট বুঝা যায়।

পবিত্র আল কুরআনেও কবিতা বা সাহিত্য শিল্পকলার অসাধারণ সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- ‘‘এবং বিভ্রান্ত তাঁরা, যারা কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখনা তাঁরা (কবিরা) উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে ফেরে? এবং যা করে না তা বলে। কিন্তু তারা ব্যতিত যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে এবং বারবার স্মরণ করে আল্লাহকে এবং অত্যাচরিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। (সূরা শুয়ারা, আয়াত-২২৪-২২৭)

উপরের চারটি আয়াতের প্রথম তিনটি আয়াতে তৎকালীন (আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ) আরবী কবিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। যারা অসত্য, অশ্লীল, বিভ্রান্তিকর, অমানবিক মুশরিকী চিন্তা চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের কবিতা অশ্লীলতা ও বিভ্রান্তিতে ভরা। মানবিক মহত্তম কোন প্রবণতা এতে নেই। সুতরাং এরা যেমন নিজেরা বিভ্রান্ত তেমনি তাঁদের যারা অনুসরণ করে তারও বিভ্রান্ত। শেষোক্ত আয়াতে সত্য সুন্দর কল্যাণের প্রতিক কবিদের প্রসঙ্গে তাদের চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
এ চারটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য হল :
১. তাঁরা ঈমানদার
২. তারা সৎকর্মমীল
৩. তারা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী অর্থাৎ তাদের চিন্তা চেতনা, কর্ম ও আচরণে তারা আল্লাহর বিধানের অনূবর্তী।
৪. সব রকম জুলুম নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা, অবিচার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা উচ্চকণ্ঠ।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রদর্শিত এই নীতিমালা অনুযায়ী মহানবী (সা:) কবিতা রচনায় যথোপযুক্ত উৎসাহ প্রদান করতেন। কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন এবং মাঝে মাঝে স্বয়ং কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং অন্যদের আবৃত্তি গভীর আগ্রহের সাথে শ্রবণ করতেন। বিভিন্ন কবি ও কবিতা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য অত্যন্ত প্রাজ্ঞচিত এবং এর মাধ্যমে কবিতা বা সাহিত্য সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সুষ্ট হয়ে ওঠেছে। এ থেকে বুঝা যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর সময় থেকেই ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলেন। কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রায় এ অঙ্গনের ভূমিকা অনস্বিকার্য। ইসলামী সাহিত্যিক সম্পর্কে তাঁর নিম্নোক্ত মন্তব্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। যা সেই- সময়কার সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে গতিশীল করতে সাহায্য করেছিল।
তিনি বলেন :
‘‘মুমিন ব্যক্তি তার তরবারী দিয়ে এবং তার মুখের ভাষা দিয়ে জিহাদ করে। যাঁর হাতে আমার প্রাণ সে মহান সত্তার কসম, তোমরা যে কাব্যাস্ত্র দিয়ে ওদের আঘাত হানছো তা তীরের আঘাতের মতই প্রচন্ড।’’ (মিশকাত শরীফ)
উল্লেখ্য যে-রাসূল (সা:) এর সাহাবাত্রয় হাসসান বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা এবং কা’ব বিন মালিকের উদ্দেশে তাঁদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেছিলেন।

মুসলিম শরীফের একটি হাদীস ‘‘যে ব্যক্তি কাফিরদের বিরুদ্ধে ভাষার মাধ্যমে জিহাদ করলো সেই তো মু’মিন।’’
এ সকল হাদীসসমূহে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) সত্যপন্থী বিশ্বাসী কবিদেরকে মুজাহিদরূপে এবং তাদের কবিতা ও মুখনি:সৃত কাব্যভাষাকেও জিহাদের সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যে, সেকালে কবিরা প্রধানত: মুখে মুখেই কবিতা রচনা করতেন এবং আবৃত্তির মাধ্যমেই শ্রোতাদের মুখের জবানের কথা উল্লেখিত হয়েছে।

আরবের বিভিন্ন গোত্রের নামকরা কবিগণ রাসূল (সা:) এর দরবারে এসেছেন কবিতা ও বাগ্মিতার লড়াই করার জন্য। সেকালে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধরনের লড়াইয়ের খুব বেশি প্রচলন ছিল। আর এটা ছিল মর্যাদার লড়াই। এ লড়াইয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, বংশীয় গৌরবগাথা, বীরত্ব ও শৌর্যবীর্য কৃতিত্বের কবিত্বময় বর্ণনা থাকতো।

আরবের বিভিন্ন গোত্রের নামকরা কবিরা এসেছেন রাসূলের (সা:) এর দরবারে কবিতা ও বাগ্মীতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য। মহানবী (সা:) তাদের সামনে তার কবি যোদ্ধাদের এগিয়ে দিয়েছেন। আরবের খ্যাতনামা যেসব কবি মহানবীর কবি যোদ্ধাদের সাথে কবিতা ও বাকযুদ্ধে ধরাশায়ী হয়েছেন তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে পরবর্তীকালে ইসলামের কলম সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। যেমন কা’ব বিন যহায়র, কবি কুররা বিন হাবীবা (রা:) প্রমুখ ছিলেন এমনি ধরনের কবি। ইসলামের কবি সৈনিকদের কাছে কবিতা ছিল জিহাদের হাতিয়ার। জিহাদ হলো বাতিলের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক সংগ্রাম। যার যে ধরনের শক্তি রয়েছে সে সেই ধরনের শক্তি প্রয়োগ করেই বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাবে। লেখনী শক্তি যার থাকবে সে লেখনী শক্তি প্রয়োগ করে এ যুদ্ধে তার কলমকে শাণিত করবে। শুধু বিপক্ষীয়দের লেখনী প্রতিবাদ করেই নয়, ইতিবাচকভাবে ইসলামের মহিমান্বিত আদর্শের সফল উপস্থাপনায় ইসলামী মনীষিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন দ্বীন প্রচার ও জিহাদের অংশগ্রহণেরই সমতুল্য।

রাসূল (সা:) এর হাদীস এক্ষেত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন- তোমরা কাফির মুশরিকদের নিন্দা চর্চার জবাবে কাব্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। তীরের ফলার চেয়ে তা আরও বেশি আহত করবে তাদের। ইবনে রাওয়াহাকে পাঠানো হল। রাসূল (সা:) সম্পূর্ণ মুগ্ধ হতে পারলেন না। কা’ব ইবনে মালিকও এলেন। অবশেষে যখন হাসসান এলেন, তখন রাসূল (সা:) বললেন, সব শেষে ওকে পাঠালে তোমরা? ওতো লেজের আঘাতে সংহারকারী তেজোময় সিংহশাবক। একথা শুনে জিভ নাড়াতে লাগলেন হাসসান বললেন, যিনি আপনাকে সত্য বাণীসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ। এ জিভ দিয়ে ওদের চামড়া ছুলে ফেলার মত গাত্রদাহ সৃষ্টি করেই ছাড়বো। (আশুন আল বারী, ৪/২২)

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা (রা:) বলেন, রাসূল (সা:) বিশিষ্ট কবি হাসসান বিন সাবিতের (রা:) জন্য মসজিদে নববীতে একটি মিম্বর স্থাপন করেন। এ মিম্বরে দাঁড়িয়ে কবি হাসসান রাসূলুল্লাহ (সা:) এর শানে প্রশংসা ও গৌরবগাথাপূর্ণ কবিতা আবৃত্তি করতেন অথবা [কখনো কাফিরদের বিদ্রুপাত্মক কবিতার মুকাবিলায়) জাওয়াবী কবিতা আবৃত্তি করতেন।
রাসূল (সা:) তখন বলতেন, আল্লাহ তায়ালা রুহুল কুদ্দুস জিব্রাইল(আ:) দ্বারা কবি হাসসানকে সাহায্য করছেন যতক্ষণ হাসসান রাসূলুল্লাহর (সা:) এর শানে কবিতা আবৃত্তি করছেন। (বুখারী)

একবার মহানবী (সা:) দীর্ঘ সফরে বের হয়েছেন। মরুভূমির রাস্তায় সাধারণত: রাত্রিতেই চলতে হয়। একে রাত্রি, উপরন্তু পথচলার ক্লান্তি মোচনের জন্য মহানবী (সা:) কবি হাসসানকে ডেকে বললেন, আমাদের কিছু হাদু (উটের গতি সঞ্চারক এক ধরনের ছন্দময় গীতি) শুনাওতো। কবি শুরু করলেন, মহানবীও গভীর মনোযোগ সহকারে তা শুনছেন। গানের তালে তালে উটের চলার গতি ও ক্ষিপ্রতম হয়ে ওঠছে। উটের হাওদা পেছন দিকে ঢলে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মহানবী (সা:) গান থামাতে বললেন, তারপর বললেন, কবিতাকে এজন্য বলা হয় বিদ্যুতের চেয়েও দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং সব আঘাত শেলের আঘাতের চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক।
ইস্পাহানী : আল আগানী ৪/১৪৩]
নবী করীম (সা:) মহিলা কবিদেরকেও কবিতা রচনায় বিশেষ উৎসাহ প্রদান করতেন। প্রখ্যাত মহিলা কবি খানসা (রা:) এর কবিতা তিনি খুব পছন্দ করতেন। মাঝে মধ্যে যখনই তিনি তার কবিতা শুনতে চাইতেন, হাত ইশারা দিয়ে বলতেন, খুনাশ মুনাও তো? [থাযানাহ আল আদাব ১/৪৩৪]

কবিতা সাহিত্য সাংস্কৃতিক শিল্পকলা সম্পর্কিত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর হাদীসসমূহে একদিকে যেমন মহানবীর (সা:) এর হাদীসসমূহে একদিকে যেমন মহানবীর (সা:) এর কাব্যানুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তেমনি তৎকালীন সময় ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ অঙ্গনের অবস্থান ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কত দৃঢ় ছিল তারও সুষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মহানবী (সা:) কবিদের বিশেষ মর্যাদা ও এনাম পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাদের কাব্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতেন। এরূপ দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। নিম্নে দুটো উদাহরণ পেশ করা হলো:
কবি হাসসান বিন সাবিতকে মহানবী (সা:) ‘‘শায়িরুর রসূল’’ অর্থাৎ রাসূলের কবি খেতাবে ভূষিত করে তাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেন। তার জন্য মসজিদে নববীতে একটি উঁচু মিম্বর তৈরী করে তাকে বিরল মর্যাদা দান করেন। তিনি সেই মিম্বরে বসে রাসূলের শানে কবিতা আবৃত্তি করতেন। মিসরের শাসনকর্তা মুকুকিকস অন্যান্য উপঢৌকনাদির সাথে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া দুই সুন্দরী মেয়েকে রসূলের (সা:) এর খেদমতে পেশ করলে তার একজনকে (মারিয়া কিবতিয়াকে) নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অন্যজনকে (শিরিন) তিনি কবি হাসসানের স্ত্রী হিসেবে পেশ করেন।
কবি কুবরা বিন হাবীরা ইসলাম গ্রহণ করলে মহানবী (সা:) তাকে দুটো চাদর দেন। উপরন্তু তাকে স্বীয় ঘোড়ার পিঠে আরোহন করান এবং তাকে নিজ সম্প্রদায়ের নেতা মনোনীত করেন।

রাসূল (সা:) এভাবে কবি সাহিত্যিকদের মর্যাদা প্রদান করে তাদের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করে তোলেন। তিনি ছিলেন কবিতার একান্ত সমঝদার ও নিখুত সমালোচক। অতি অল্প কথায় তিনি এ সম্পর্কে অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ সঠিক মন্তব্য করতেন। তার সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি ও রীতিনীতি সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি আদর্শ মাপকাঠি।
শিল্প সাহিত্য-সংস্কৃতি একটি সমাজের দর্পণ ও ব্যারোমিটার। সমাজকে সঠিক পথ নির্দেশনা দানের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্প সাহিত্যের আবেদন হলো মানুষের মন বা অনুভূতির নিকট। মন বা অনুভূতি মানুষকে যে পথে তাড়িত করে সেটাই হয় নির্দিষ্ট মানব সমাজের লক্ষ্য বা আদর্শ। সেজন্য এসব যারা চর্চা করেন, তাদের সৃষ্টি কর্মে উৎসাহ প্রদান যেমন প্রয়োজন, তাঁদেরকে যথোপযুক্ত পথ নির্দেশনা প্রদান আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মহানবী (সা:) একাধারে তাদেরকে উৎসাহ প্রদান ও যথোপযুক্ত পথ নির্দেশনা প্রদানের ফলে সেই সময়কাল ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি এক নতুন যুগের সূচনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন :
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এবং অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে আবদ্দ আজ গোটা বিশ্ব। সেক্ষেত্রে ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চার আন্দোলন যদিও আশার আলো, কিন্তু এই ক্ষেত্রকে ছাপিয়েযেতে ইসলামী সাহিত্য, ইসলামী সংস্কৃতির আন্দোলনকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
এজন্য বর্তমান সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অবস্থান তুলে ধরা প্রয়োজন :
বিশ্ব মানচিত্রের দিকে চোখ বুলালে সংস্কৃতির দুটো বড় ধারা চোখে পড়বে। একটি পশ্চিমের অপরটি প্রাচ্যের । পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রধানত: তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষতার আড়ালে ধর্মহীনতার প্রতিভূ। ধর্ম সেখানে উপেক্ষিত। যেখানে প্রধান ধর্মসমূহ বিগত কয়েকশতাব্দীতে এত বেশী বিচ্যুতি, কুসংস্কার, বিকৃতি ও অবহেলার শিকার হয়েছে যে, সেখানে থেকে ধর্মের আসল রূপ বের করে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গীর্জা, সিনাগগের গন্ডির বাইরে ধর্মের কোন প্রাত্যহিক প্রায়োগিকতা নেই, যা আছে তা ব্যক্তি বিশেষে সীমাবদ্ধ। ইদানিং ধর্মের এক ধরনের প্রথাসর্বস্ব চর্চা পশ্চিমের কোথাও আছে বটে, তবে তা জীবনাচারে কোন প্রভাব রাখে না। জীবনের মহত্তম উদ্দেশ্য ও বৃহত্তম ক্ষেত্র নিয়ে ভাবার তাকিদ এসব ধর্মে পশ্চিমের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে রাখতে পারেনি। ফলে এক কথায় বলা যায়- পশ্চিমের প্রধান ধর্ম হলো- ধর্মহীনতা, আর এটাই সেই সংস্কৃতির মূল সুর বা প্রধান বক্তব্য।
সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম হলো মিডিয়া। কিন্তু আমরা দেখছি, বিশ্বের তাবৎ মিডিয়াগুলো প্রধানত ইহুদীদের দখলে। প্রিণ্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বড় বড় ধনকুবের মিডিয়া টাইফুনরা যে কোন কারণেই ইহুদিদের সাথে যুক্ত হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ (ব্যাংক, বীমা) তাও ইহুদিদের দখলে। এরাই বর্তমান সময়ে প্রায় সকল বুদ্ধিভিত্তিক ও অগ্রগামী বিষয়সমূহের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর ইহুদি ও ভারতীয় উভয় মিডিয়ার প্রধান বিষয় তৌহিদী বিশ্বাস থেকে মানুষকে সরিয়ে নেয়া। নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত অশ্লীলতার বহি:প্রকাশ এখানে সাধারণ বিষয় । মুসলিমদের অর্জন খাটো করে দেখানো, কোন মুসলিম ত্রুটি করলে সেটিকে বিশ্বময় প্রচার করে ইসলামের ব্যর্থতা প্রমাণের চেষ্টা করা। এক্ষেত্রে তারা বৃহৎ শক্তিগুলোর সকল প্রকার আনুকূল্য পেয়ে থাকে। যার প্রভাব আমরা প্রতিক্ষণেই পেয়ে যাচ্ছি।

এমনকি আমাদের দেশ বাংলাদেশেও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। আমাদের ঈমান- আকীদা ও বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। দৃষ্টি ভঙ্গি, ধ্যান ধারণায় বস্তুবাদী চিন্তাধারা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইসলাম এদেশে আসার পূর্বে বাংলাদেশের সংস্কৃতি কখনো ছিল হিন্দু ধর্মের প্রভাব, কখনো বৌদ্ধধর্ম প্রভাবিত আবার কখনো হিন্দু বৌদ্ধ প্রভাবিত সংকর সংস্কৃতি। বিভিন্ন সময়ে বহিরাগত আরও যেসব সভ্যতা বা মতবাদের আবির্ভাব হয়েছে। তারও কিছু প্রভাব এ সংকর সংস্কৃতির মধ্যে সকলের অজান্তে স্থান লাভ করেছে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা:) এর সময় থেকেই ইসলামের সাথে পরিচয় ঘটে বাংলাদেশের জনগণের। আরব বণিক ও ধর্মপ্রচারক, পীর আউলিয়া দরবেশের দ্বারাই ধীরে ধীরে বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার শুরু হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামী সংস্কৃতি পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। কারণ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ইসলাম সমাজের সর্বস্তরে কায়েম হয়েছিল, ফলে ইসলামী সংস্কৃতির একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্টরূপ সেখানে ফুটে ওঠেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইসলাম কায়েম না হলে জীবনের সর্বস্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সংস্কৃতির পরিচয় লাভ করাও অযৌক্তিক।

বর্তমান বিশ্বের ক্ষুদ্র এই অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে যে বিষয়টা প্রতিভাত হয়ে ওঠেছে, সেটা হলো ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বাতিল শক্তির প্রাধান্য, আর বাতিল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে অপসংস্কৃতি বিকাশের মাধ্যমে। তাই অপসংস্কৃতির পরিচয় এবং ফলাফল কি হতে পারে সংক্ষেপে এবার জেনে নেয়া যাক।

অপসংস্কৃতি হলো- যা একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বভাবের বিপরীত এবং কল্যাণকে বিধ্বস্ত করে তাই অপসংস্কৃতি। এটি হলো সাংস্কৃতিক ভাইরাস এবং একটি মারণাস্ত্র যা একটি জাতির জাতীয় চেতনাকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারে। সেই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের দেশীয় এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী দারুণভাবে সচেষ্ট। তারা কথায় কথায়, আলাপ আলোচনায়, রেডিও টেলিভিশন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, টকশো বা পেপার মিডিয়ায় অপসংস্কৃতির রাহুগ্রাসের কথা বলেন। কিন্তু তারাই আবার এটাকে লালন করছেন যথেষ্ট সুচারু কর্মকান্ডের মাধ্যমে যা আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি।

অপসংস্কৃতির কালো থাবায় গোটা পৃথিবীই আজ জর্জরিত। সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের পথ প্রায় রুদ্ধ। সাহিত্যের সুস্থ অঙ্গন ক্লাসিক, রোমান্টিক জড়বাদী সাহিত্য দ্বারা বিপথগামী হচ্ছে। বিজাতীয় সংস্কৃতির মাঝে নিজস্ব সংস্কৃতি মিশ্রণ করে আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে। আমাদের স্বীকয়তা বোধটুকু কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে ;
সে সম্পর্কে আমাদের কোন ভাবনাই নেই। যেসব মাধ্যমে এই সাংস্কৃতিক অঙ্গন কুলষিত হয় এবং অপসংস্কৃতির দ্বারা উন্মুক্ত হয়। তাহলো :
১. আদর্শহীন শিক্ষা ব্যবস্থা
২. নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত অশ্লীল বই পুস্তক ও পত্রপত্রিকা
৩. টেলিভিশনের নগ্ন অপসংস্কৃতির প্রচার
৪. বিদেশী ইসলাম বিদ্বেষী ও বস্তুবাদী দর্শনের বাহক বই পুস্তক ও পত্রপত্রিকার অবাধ আমদানি।
৫. আদর্শবোধ বিবর্জিত সিনেমা, নাটক, গান, যাত্রা, ইত্যাদি।
৬. সহশিক্ষা।
৭. সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা এবং ব্যক্তি ও জাতিপূজা।
৮. রাজনৈতিক অনাচার।
১০. এনজিওদের অপৎপরতা ইত্যাদি।

ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতির উজ্জল সম্ভাবনা:
আজকের পৃথিবীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ধর্মহীন নৈতিকতাবিবর্জিত অপসংস্কৃতির ঘোড়ায় যে সাওয়ার হয়েছে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তবে আঁধারের এই তীব্রতায় আশার ক্ষীণ আলো ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাও জোরদার হচ্ছে। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
১. ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা জোরদার হয়েছে।
২. যুব সমাজের মাঝে ইসলামী জীবনবোধ ও চেতনার উন্মেষ ঘটেছে।
৩. ইসলামী বই পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা রচনা এবং প্রকাশনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪. শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে ইসলামী ভাবধারায় সংগঠন সংস্থা গড়ে ওঠছে; ওডিও, ভিডিও তৈরি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৫. আদর্শভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে।
৬. ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
৭. ইসলামিক টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চ্যানেলগুলোতে ইসলামী অনুষ্ঠানমালা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৮. মসজিদ মাদরাসা সংখ্যা বৃদ্ধি পচ্ছে।
৯. নারী সমাজের মাঝে হিজাব চেতনার প্রসার ঘটেছে।
এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবিলায় আমাদের স্বকীয় সংস্কৃতির পতাকাবাহিরা বিভিন্নক্ষত্রে এগিয়ে আসছে। মানুষ ইসলামী আদর্শবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। ইসলামী চেতনা ও জীবনবোধ তীব্র হচ্ছে।

ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার উপায়:
অপসংস্কৃতির বিষবা আচ্ছাদিত একটি জাতির সঠিকধারায় এগিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। এক্ষেত্রে নিম্নে পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে।
১. ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আরও জোরদার করা। সুস্থ-সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধি করে প্রকৃত আদর্শের ভিতকে মজবুত করা।
২. ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। যুবকদের চরিত্রকে পুতঃপবিত্র ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইসলামী শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
৩. ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রগড়ার আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
৪. ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে আরো ব্যাপকভাবে শিল্প ও সাহিত্য সংস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. ইসলামী জীবন দর্শনকে প্রতিফলিত করে ব্যাপক বই পুস্তক রচনা, প্রকাশনা ও বাজারজাত করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. ইসলামী চেতনাধারী পত্র-পত্রিকার প্রকাশনা বৃদ্ধি করতে হবে।
৭. ইসলামী আদর্শে প্রতিফলিত সি.ডি, ভিসিডি ব্যাপকহারে ছড়িয়ে দিতে হবে।
৮. রেডিও এবং টেলিভিশনে ইসলামী সংস্কৃতির বাহক প্যাকেজ প্রোগ্রাম করতে হবে।
৯. নতুন স্যাটেলাইট ও মিডিয়া সৃষ্টি করা। সংস্কৃতির বিশ্বায়নে মিডিয়ার বিকল্প মিডিয়া। মিডিয়ার অপপ্রচারে গোটা মুসলিম বিশ্ব তথ্য সন্ত্রাসে আক্রান্ত। ইসলাম, মুসলিম মানে জঙ্গি, মৌলবাদ, উগ্রপন্থী আখ্যা দেয়া মিডিয়ারই কারসাজি। সুতরাং বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজস্ব ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া গড়ে তোলা ছাড়া উপায় নেই। এক্ষেত্রে বিত্তবান মুসলিমদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
১০. ইসলামী শক্তির ঐক্য প্রতিষ্ঠা। সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তা থেকে বাঁচতে হলে একক বা একদলীয় চেষ্টায় কাজ হবে না। রাজনৈতিক মত ও পথের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামের ব্যাপারে ইসলামী দলগুলোর মিল রয়েছে এবং এই ঐক্যকে আরও মজবুত করতে হবে।

এছাড়া আরও যে কাজগুলো করা দরকার, সেগুলো নেতিবাচক এবং কঠিন। যেমন:
১. অশ্লীলতা প্রসার রোধ করা। সিনেমা, নাটক বিজ্ঞাপন, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদির সকল সেক্টরের অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ সকল ক্ষেত্রে তীব্র জনমত গড়ে তুলতে হবে এর প্রতিরোধকল্পে।
২. আদর্শবর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্মহীন রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
৩. ইসলামবিরোধী মিশনারী তৎপরতা, এনজিওদের অপকর্মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া।
৪. মদ- সুদ, জুয়া, জুলুম-নির্যাতনের তথা সকল অন্যায়ের প্রতিরোধ এগিয়ে আসতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিনের। তবে আজকের দিনের ষড়যন্ত্রকারীরা এ ব্যাপারে খুব সিদ্ধহস্ত। সরাসরি আঘাত না করে এর শক্ত ভিত উপড়ানো যাবে না ভেবে বুদ্ধিমত্তার সাথে দরদী বন্ধুর বেশে সুদৃঢ়প্রসারী ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে আমাদের সামনে। সুতরাং আমাদের অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে এদের। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে হবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে। অপসংস্কৃতি নয়, আমাদের মৌলিকত্বের দিকে ফিরে যেতে হবে। বিশ্বের মানুষ যখন ধ্বংস ও প্রলয়ের প্রহর শুনছে, সভ্যতা যখন হিংসা ও জিঘাংসায় কবলিত, শান্তি যখন স্বার্থ দ্বনেদ্ব তিরোহিত; তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই সোনালী যুগ আবার বয়ে নিয়ে আসতে পারে রহমতের ফল্গুধারা এই ধরণীতে। তাঁর সময়ের আদর্শে উজ্জীবিত তৎকালীন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে গতি সঞ্চারিত হয়েছিল, সেই আদর্শের বাস্তব রূপায়নে বর্তমান সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনও হতে পারে অপসংস্কৃতির শৃংখলমুক্ত উত্তম মডেল।

————————————————————————-
তথ্যসূত্রঃ
১. শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি, আব্দুস শহীদ নাসিম। পৃষ্ঠা ১৭-২২, ৫৯-৬১
২. শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম। পৃষ্ঠা ২৪০-২৪১
৩. মাসিক সংস্কার, অক্টোবর ২০০৯, পৃষ্ঠা-২৩
৪. মাসিক আল বাছায়ের, আগস্ট ২০০৯, পৃষ্ঠা-২৪

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *