ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতায় যেদিন ঝরে গিয়েছিল শতাধিক প্রাণ

১৯৭৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে লিবিয়ান আরব এয়ারলাইন্সের কায়রোগামী একটি যাত্রীবাহী বোয়িং ৭২৭ বিমান ভুল করে ঢুকে পড়ে ইসরায়েলের আকাশসীমায়। প্লেনটির ফরাসী পাইলট তখনও জানতেন না, তার এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে ঝরে পড়বে ১০৮টি তাজা প্রাণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে শুরু হবে নতুন সংকট, যার ফলশ্রুতিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার উপক্রমণ হবে লিবিয়া, মিসর এবং ইসরায়েলের।

লিবিয়ান আরব এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১৪ (এলএন ১১৪) ছিল লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলী থেকে বন্দর নগরী বেনগাজী হয়ে মিসরের রাজধানী কায়রোগামী একটি নিয়মিত ফ্লাইট। ১৯৭৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বেলা ১০টা ৩০ মিনিটে ফ্লাইটটির বোয়িং ৭২৭-২০০ বিমানটি ত্রিপলী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। প্লেনটিতে মোট যাত্রী ছিল ১১৩ জন, যাদের অধিকাংশই লিবিয়ান, মিসরীয় ও অন্যান্য আরব দেশের নাগরিক, দুজন জার্মান এবং একজন আমেরিকান।

লিবিয়ান বোয়িং ৭২৭ বিমানটি, যেটি বিধ্বস্ত হয়েছিল

লিবিয়ান বোয়িং ৭২৭ বিমানটি, যেটি বিধ্বস্ত হয়েছিল

প্লেনের ক্রু ছিল মোট ৯ জন, যাদের মধ্যে পাঁচজনই ছিল ফরাসী নাগরিক। ক্রুদের সম্পূর্ণ দলটিই ছিল এয়ার ফ্রান্সের অধীনস্থ একটি দল। লিবিয়ান আরব এয়ারলাইন্সের সাথে এয়ার ফ্রান্সের সম্পাদিত একটি চুক্তির অধীনে তারা এই ফ্লাইটটি পরিচালনা করত। প্লেনের পাইলটও ছিলেন একজন ফরাসী নাগরিক, জ্যাক বার্জ। তার সহকারী ছিলেন আরেকজন ফরাসী ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন লিবিয়ান কো-পাইলট। ৪২ বছর বয়সী জ্যাক বার্জ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ এক পাইলট, যার কয়েক হাজার ঘন্টা আকাশে ওড়ার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু সেদিন তার কোনো অভিজ্ঞতাই শেষপর্যন্ত কাজে আসেনি।

ত্রিপলী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করার পর লিবিয়ার বন্দরনগরী বেনগাজীতে স্বল্প যাত্রাবিরতি শেষে স্থানীয় সময় ১২টা ৪০ মিনিটে বেনগাজী থেকে প্লেনটি পুনরায় যাত্রা শুরু করে কায়রোর উদ্দেশ্যে। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী লিবিয়া এবং মিসরের আবহাওয়া সাধারণত সারা বছরই অত্যন্ত পরিষ্কার থাকে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেদিন ছিল ভিন্ন একটি দিন। যাত্রা শুরুর পরপরই শুরু হয় প্রচন্ড মরুঝড়। আর এই ঝড়ো বাতাসের ঝাপটায় এবং পথ নির্দেশক চিহ্নগুলো খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ায় সবার অলক্ষ্যে যাত্রাপথ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে প্লেনটি।

ফ্লাইট ১১৪ এর স্বাভাবিক যাত্রাপথ অনুযায়ী লিবিয়া থেকে সমুদ্র উপকূল ধরে প্রথমে সোজা পূর্বদিকে গিয়ে মিসরের সিদি বাররানীতে পৌঁছার পর দিক পরিবর্তন করে কায়রোর মূল ভূখন্ডের দিকে প্রবেশ করার কথা। দৃষ্টি পরিষ্কার না থাকায় পাইলট দিক নির্ণায়ক যন্ত্রের সাহায্য নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেদিন তাদের যন্ত্রপাতিতেও ত্রুটি দেখা দেয়, যদিও প্রথমে তারা সেটি বুঝতে পারেননি। ফলে পাইলট যখন কায়রো কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করে জানান যে, তিনি দিক পরিবর্তন করে কায়রোর উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন, বাস্তবে ততক্ষণে কম্পাসের ভুল দিকনির্দেশনায় বাতাসের প্রভাবে প্লেনটি তার নির্ধারিত স্থান থেকে এগিয়ে চলে গিয়েছিল আরো ১২০ কিলোমিটার সামনে। দিক পরিবর্তন করার পর কায়রোর আকাশে প্রবেশ করার পরিবর্তে সুয়েজ খাল পাড়ি দিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন ইসরায়েলি আকাশ সীমায়।

ইসরায়েলি এফ-৪ ফ্যান্টম মডেলের একটি যুদ্ধ বিমান

ইসরায়েলি এফ-৪ ফ্যান্টম মডেলের একটি যুদ্ধ বিমান

মূল মিসরীয় ভূখন্ডের পাশে সুয়েজ খালের পরেই যে বিশাল সিনাই উপদ্বীপ, সেটি আসলে মিসরেরই অংশ। কিন্তু ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েল তা দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘদিন দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব চললেও আনোয়ার সাদাত ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭০ সালে কৌশলগত কারণে ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছিলেন। অবৈধভাবে দখলকৃত হলেও তাই সে সময় সিনাইয়ের উপর ইসরায়েলের অধিকার একরকম প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গিয়েছিল, এবং ইসরায়েল সিনাইয়ের আকাশে নো-ফ্লাই-জোন ঘোষণা করে রেখেছিল।

যদিও ১৯৭৩ সালে মিসরের সাথে ইসরায়েলের তেমন কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না, কিন্তু ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের পাল্টা প্রতিরোধ এবং প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা সে সময় বেশ সক্রিয় ছিল। এই ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগেই, ১৯৭২ সালের ৮ মে, ফিলিস্তিনের ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর বেলজিয়াম এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী প্লেন ছিনতাই করে ইসরায়েলের লড এয়ারপোর্টে অবতরণ করিয়েছিল।

এর তিন সপ্তাহ পরে, ৩০ মে, ফিলিস্তিনের পিএলএফপির সহায়তায় জাপানের রেড আর্মি কর্তৃক একই এয়ারপোর্টে গুলি এবং হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করার ঘটনায় ২৫ জন যাত্রী নিহত হয়েছিল, যাদের একজন ছিল ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট এফ্রাইম কাটজিরের ভাই। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে, জার্মানীর মিউনিখ অলিম্পিকে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের গেরিলারা ১১জন ইসরায়েলি খেলোয়াড়কে জিম্মি এবং পরে হত্যা করেছিল। এসব কারণে ইসরায়েল তাদের সীমান্তে যেকোনো ধরনের প্লেনের প্রবেশের ব্যাপারেই অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করত।

যেভাবে ইসরায়েলি যুদ্ধ বিমান দুই দিক থেকে লিবিয়ান প্লেনিকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল

যেভাবে ইসরায়েলি যুদ্ধ বিমান দুই দিক থেকে লিবিয়ান প্লেনিকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল

ঘটনার দিন দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ২০,০০০ ফুট উচ্চতা দিয়ে সুয়েজ খালের উপর দিয়ে ইসরায়েলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা লিবিয়ান প্লেনটি ইসরায়েলের রাডারে ধরা পড়ে। যদিও তখনও পর্যন্ত প্লেনটি মিসরের আকাশ সীমায় ছিল, কিন্তু ইসরায়েল সাথে সাথেই চূড়ান্ত সতর্কমূলক অবস্থানে চলে যায়। দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে ইসরায়েলি আকাশ সীমায় প্রবেশ করা মাত্রই ইসরায়েল দুইটি এফ-৪ ফ্যান্টম যুদ্ধবিমান পাঠায় প্লেনটিকে নামিয়ে ইসরায়েলের বির গিফগাফা (রেফিদিম) সামরিক বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে আসার জন্য।

যুদ্ধবিমান দুটি লিবিয়ান প্লেনটির কাছাকাছি পৌঁছে হাতের ইশারায় তাদেরকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দেয়। লিবিয়ান প্লেনটি প্রথমে কিছুদূর পর্যন্ত তাদেরকে অনুসরণ করলেও ইসরায়েলের রেফিদিম বিমান ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছামাত্রই এটি দিক পরিবর্তন করে পশ্চিম দিকে মিসরের উদ্দেশ্যে ফিরে যেতে শুরু করে। যদিও এ পর্যায়ে যাত্রীবাহী প্লেনটি ইসরায়েলের প্রতি কোনো হুমকি ছিল না, এটি ইসরায়েল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসরায়েলি ফ্যান্টম বিমান দুটি লিবিয়ান প্লেনটিকে লক্ষ্য করে গোলা নিক্ষেপ করে, যা প্লেনটির ডানায় এবং এর জ্বালানীর ট্যাংকে আঘাত করে।

প্লেনটি কিছুদূর যাওয়ার পরে মরুভূমির বালির উপরেই জরুরী অবতরণের চেষ্টা করে। কিন্তু সফলভাবে অবতরণে ব্যর্থ হয়ে এটি সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয় এবং বিস্ফোরিত হয়ে এতে আগুন ধরে যায়। এর ১১৩ যাত্রীর মধ্যে ১০৮ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়, বাকিরা গুরুতর আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সাবেক এক লিবিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। জীবিতদের মধ্যে মাত্র একজন ছিল ফরাসী ক্রুদের একজন, আর বাকিরা সাধারণ যাত্রী। প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়েছিল ইসমাইলিয়া নামক এলাকায়, মিসর সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে।

মানচিত্রে সিনাই উপদ্বীপ, বির গিফগাফা এয়ারফিল্ড এবং ইসমাইলিয়ার অবস্থান

মানচিত্রে সিনাই উপদ্বীপ, বির গিফগাফা এয়ারফিল্ড এবং ইসমাইলিয়ার অবস্থান

প্লেনটি ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেন বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে মাত্র চার মিনিটের মাথায়ই শতাধিক যাত্রী সহ প্লেনটিকে ভূপাতিত করা হয়েছিল, তা নিয়ে সে সময় বেশ সমালোচনা হয়। ইসরায়েল দাবি করে, তাদের আকাশ সীমা ভঙ্গ করায় এবং তাদের নির্দেশ না মেনে ভিন্ন পথ ধরে চলার চেষ্টা করায় তারা মনে করেছিল, প্লেনটি ইসরায়েলের কোনো স্থানে আত্মঘাতী হামলা করতে পারে। সেজন্যই তারা প্লেনটিকে ধ্বংস করতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, তারা বারবার সিগন্যাল দেওয়া এবং রেডিওর মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছিল যে, প্লেনটি ছিল একটি হামলাকারী প্লেন অথবা অন্ততপক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে নিয়োজিত প্লেন।

কিন্তু বিধ্বস্ত হওয়ার তিন দিন পরে, ২৪শে ফেব্রুয়ারি যখন প্লেনটির ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা হয়, তখন ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর দাবির অসাড়তা প্রমাণিত হয়। ব্ল্যাকবক্সের কথপোকথন থেকে দেখা যায়, ইসরায়েলিরা প্লেনটির সাথে কোনো ধরনের রেডিও যোগাযোগ করেনি, এমনকি কোনো ইশারা-ইঙ্গিতও দেয়নি, অথবা ইশারা দিলেও প্লেনের ক্রুরা সেটা বোঝেনি। ব্ল্যাকবক্স থেকে এবং জীবিত উদ্ধার পাওয়া একজন ফরাসী ক্রুর জবানবন্দী থেকে জানা যায়, তাদের কোনো ধারণাই ছিল না যে তারা ইসরায়েলি আকাশ সীমায় প্রবেশ করেছিল।

ফরাসী ক্রুর বর্ণনানুযায়ী, মিসরের কায়রোতে সে সময় দুটি এয়ারপোর্ট ছিল। একটি হচ্ছে কায়রোর পশ্চিমে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, এবং অন্যটি কায়োরোর পূর্বে অবস্থিত সামরিক বিমানবন্দর। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দুটি যখন তাদের কাছাকাছি এসেছিল, তখন তারা ভেবেছিলেন সেগুলো মিসরীয় বিমান বাহিনী থেকে এসেছে তাদেরকে পথ দেখিয়ে পশ্চিম কায়রোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।

ধ্বংস হওয়া বিমানটি পাহারা দিচ্ছে এক ইসরায়েলি সেনা

ধ্বংস হওয়া বিমানটি পাহারা দিচ্ছে এক ইসরায়েলি সেনা

যখন যুদ্ধ বিমান দুটি তাদেরকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দেয়, তখন তারা নিজেদের মধ্যে মিসরীয়দের উদ্ধত আচরণ নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তারপরেও ফাইটার দুটির পেছনে পেছনে গিয়েছিলেন। রেফিদিম এয়ারপোর্টের কাছাকাছি যাওয়ার পরে তারা ভেবেছিলেন সেটি পূর্ব কায়রোর সামরিক বিমান বন্দর। ততক্ষণে রেডিওতে কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করলে তাদেরকে সেখানেই ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে তারা প্লেনের দিক ঘুরিয়ে পশ্চিম দিকে রওয়ানা করেন।

ফেরার সময় যখন তাদেরকে উদ্দেশ্যে গোলা নিক্ষেপ করা হয়, কেবলমাত্র তখনই তারা বুঝতে পারেন যে, এটি ইসরায়েলের আকাশ এবং ফাইটারগুলো ইসরায়েলি ফাইটার। কিন্তু ততক্ষণে তাদের আর কিছু করার ছিল না। এছাড়া তারা যখন বুঝতে পেরেছিলেন ওটা ইসরায়েলের আকাশসীমা, তখন লিবিয়া এবং ইসরায়েলের মধ্যকার তিক্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা বিবেচনা করেও তারা ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর অধীনে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না।

ফরাসী ক্রুর মতে এবং ব্ল্যাক বক্সের কথপোকথন থেকেও বোঝা যায়, পুরো ব্যাপারটি আরো বেশি জটিল হয়ে উঠেছিল ভাষাগত সমস্যার কারণে। পাইলট এবং অন্যান্য ক্রুরা ফ্রান্সের নাগরিক হওয়ায় তারা নিজেদের মধ্যে ফরাসী ভাষায় কথা বলছিলেন। কিন্তু প্লেনের কো-পাইলট লিবিয়ান হওয়ায় তার পক্ষে তাদের কথা বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে এরকম সময়ে তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সবার মধ্যে যেরকম বোঝাপড়া এবং সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে সমান ধারণা থাকার দরকার ছিল, তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

ইসরায়েল কর্তৃক লিবিয়ান আরব এয়ারলাইন্সের বিমান ধ্বংস করার এই ঘটনাটি নানা কারণে অত্যন্ত তাৎপর্য ছিল। এটি ছিল যুদ্ধাবস্থা ছাড়াই কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরায়েলের গত ৭০ বছরের ইতিহাসে একাধিক যুদ্ধ হলেও এখন পর্যন্ত এটিই একমাত্র ঘটনা, যেখানে ইসরায়েল প্রকাশ্যে কোনো যাত্রীবাহিনী বিমান ভূপাতিত করেছে।

ইসরায়েল প্রথমে নিজেদের দায় অস্বীকার করতে চাইলেও ব্ল্যাকবক্সের কথোপকথন এবং বোয়িং কর্তৃপক্ষের ঘটনার আনুষ্ঠানিক বিবরণ প্রকাশিত হওয়ার পর তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। যদিও তারা শেষপর্যন্ত তাদের দোষ স্বীকার করেনি, কিন্তু তারা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়। নিহতদের আত্মীয় স্বজনদেরকে তারা ৩০,০০০ মার্কিন ডলার করে এবং আহতদেরকে ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ মার্কিন ডলার করে ক্ষতিপূরণ দেয় তারা। জাতিসংঘ সে সময় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ (ICAO) এ ঘটনায় ইসরায়েলকে দায়ী করেছিল এবং নিন্দা প্রস্তাব পাশ করেছিল।

এ ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। মাত্র কয়েক বছর আগেই ক্ষমতায় আসা তরুণ লিবীয় নেতা মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফী তার দেশের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার ঘটনাকে সহজভাবে নিতে পারেননি। তিনি ইসরায়েলের উপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তার সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক গুপ্তচরের তৎপরতায়, যে গুপ্তচর ছিল আবার ঐ পরিকল্পনার প্রধান অংশীদার মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের বিশ্বস্ত কর্মচারী। শ্বাসরুদ্ধকর সেই অপারেশনের কাহিনী আসছে আগামী পর্বে।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *