ইতিহাসে জেরুজালেম, জেরুজালেমের ইতিহাস

চাঁদের মতো এক ফালি ভূখণ্ড। সেখান থেকেই উঠে এসেছে ইহুদি , ক্রিস্টান ও ইসলাম। তিনটি ধর্ম বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গিয়েছে ইতিহাস এবং অবশ্যই রাজনীতি।ধর্ম আর রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ ঘটনা প্রবাহ। যে প্রবাহ অনেক রক্ত ঝরিয়েছে। অনেক আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ দেখেছে। এই পুরো প্রবাহের পথে কোনও একটি শহর যদি কেন্দ্রে থাকে, তা হলে তা জেরুসালেম।মুসলিমদের কাছে আল-কুদস, খ্রিস্টানদের কাছে জেরুজালেম, ইহুদিদের ভাষায় ‘ইরুশালাইম’। যে নামেই ডাকা হোক- হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র নগরীর মর্যাদা জেরুজালেমের।

ছোট্ট একটি শহরকে ঘিরে, তিন ধর্মের মানুষের এমন আবেগ, স্মৃতি বা ঐতিহ্য নেই পৃথিবীর আর কোথাও।ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এ শহর । তাই নগরীর পবিত্রতা নিয়ে মতভেদ না থাকলেও নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে আছে নানা বিতর্ক; আছে দফায় দফায় দখল, পুনর্দখল, ধ্বংস আর পুনর্নির্মাণের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। সবচেয়ে বেশি টানাপড়েন, পবিত্র ভূমি ‘হারাম আল শরিফ’-কে ঘিরে। রোমান সাম্রাজ্য, ক্রুসেড— কত ঝড়ই না বয়ে গিয়েছে এ শহরের ওপর।

তিনটি ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শহর। তিনটি ধর্মের পবিত্র স্থান রয়েছে এ শহরে। রয়েছে এই শহর নিয়ে তাদের দাবিও। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা, ‘ওল্ড সিটি’খ্যাত শহরটি বিভক্ত মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও আর্মেনীয় বসতিতে; যেখানে আছে বিভিন্ন ধর্মের অনেক পবিত্র স্থাপনা। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের কেন্দ্র এই এলাকায় অবস্থিত ইসলামের তৃতীয় পবিত্র মসজিদ আল-আকসা, বা বায়তুল মুকাদ্দাস-সহ মুসলিমদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বলা হয়, মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা; বিশ্বাস, শবে মেরাজের রাতে এখান থেকেই আসমানে যাত্রা করেছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। একই জায়গায় অবস্থিত, ইহুদিদের পবিত্র ভূমি খ্যাত ‘টেম্পল মাউন্ট’ বা ‘ঈশ্বরের ঘর’;   যা মুসলিমদের কাছে পবিত্র ‘কুব্বাত আস-সাখরা’। টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে থাকা ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ ইহুদিদের কাছে ‘পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর’ হিসেবে স্বীকৃত। এখানে নিয়মিত প্রার্থনায় অংশ নেন লাখো ইহুদি।যিশু খ্রিস্টের স্মৃতিবিজড়িত গির্জার কারণে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পবিত্রতার দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, এখানেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল যিশুকে।

১২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শহর; তার সাথে কতো ইতিহাস, কতো স্মৃতি জড়িত-তার ইয়ত্তা নেই। মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি-তিন ধর্মের মানুষের কাছেই হাজার বছর ধরে সমান গুরুত্ব জেরুজালেমের। ইতিহাসসমৃদ্ধ জেরুজালেম স্বাভাবিকভাবেই আজও সমান আলোড়ন তোলে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের হৃদয়ে। পৃথিবীর অন্যতম পুরনো শহরকে নিয়ে টানাপোড়েনও হাজার বছরের। ধর্মীয় যুদ্ধে বার বার যার হাতবদল হয়েছে; কিন্তু নিজেদের অধিকার ছাড়েনি কোনো পক্ষই। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দুটি দেশই জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে। ফলে এই দুটি দেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে এই শহর এবং সেখানে থাকা কিছু বিশেষ ছোট ছোট স্থানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রাচীন কাল থেকেই ভয়াবহ সংঘর্ষ চলে আসছে।

ইতিহাসে জেরুজালেম:

গবেষকদের দাবি প্রাচীন ব্রোঞ্চ যুগ থেকেই এখানে মানুষের বসবাস। ধারণা করা হয়, সেটা হতে পারে ৩৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ থেকেই।
১০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে কিং ডেভিড (দাউদ আঃ) প্রথম জেরুজালেম জয় করেন এবং রাজধানী ঘোষণা করেন। তারপর তার ছেলে সুলাইমান আঃ অন্তত ৪০ বছর পরে এখানে প্রথম পবিত্র মসজিদ তৈরি করেন।

পরবর্তীকালে ৫৮৬ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ব্যবিলনীয়রা জেরুজালেম অধিকৃত করে। তারা সেই সব ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করে এবং ইহুদীদের নির্বাসনে পাঠায়। এরও ৫০ বছর পরে পার্শিয়ান রাজা সাইরাস আবার ইহুদীদের জেরুজালেমে ফেরত আসতে দেন এবং আবার ধর্মীয় স্থাপনা স্থাপন করেন।

৩৩২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এসে আলেক্সা্ন্ডার দ্য গ্রেট জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তীতে কয়েক শত বছর ধরে নানান দল এই শহরটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মধ্যে রোমান, পার্শিয়ান, আরবস, ফাটিমিড, সেলজুক, তুর্কি, ক্রুশাডার, ইজিপশিয়ান, মামেলুকিস ও মুসলিমরা ছিলো।

জেরুজালেম শহরটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য। কেননা এখানেই শিশু হিসেবে এসেছিলেন যিশু খ্রিস্ট ( ইসা আঃ)। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এখানেই ধর্ম প্রচার করেছেন তিনি এবং জীবনের শেষে এখানেই ক্রুশে বিদ্ধ হয়েছেন ও ঈশ্বরের দ্বারা পুনরত্থিত হয়েছেন।(মহান  আল্লাহ তাআলা ইসা আঃ কে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছে) আবার ইহুদীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাদের ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মোজেসেরও (মুসা আঃ) পূণ্যভূমি এই জেরুজালেম। ইহুদীদের প্রথম মন্দির এই শহরে অবস্থিত ছিলো।এই লম্বা সময়ে জেরুজালেমের ইতিহাসে বেশ কিছু বড় বড় ধর্মীয় ঘটনাও ঘটেছে।যেমন ৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা হেরড সেখানে দ্বিতীয় মন্দির তৈরি করেন এবং সেটার চারপাশে দেয়াল তুলে দেন। রোমানরা সেটিও নষ্ট করে দেয় ৭০ খ্রিস্টাব্দে।

ইতিহাস অনুযায়ী হযরত মুহাম্মদের (সা:) নবুওয়াত প্রকাশের একাদশ বৎসরের (৬২০ খ্রিষ্টাব্দ) রজব মাসের ২৬ তারিখের দিবাগত রাত্রে প্রথমে কাবা শরিফ থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় গমন করেন এবং সেখানে তিনি নবীদের জামায়াতে ইমামতি করেন। অতঃপর তিনি বোরাক বিশেষ বাহনে আসীন হয়ে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। ঊর্ধ্বাকাশে সিদরাতুল মুনতাহায় তিনি আল্লাহ’র সাক্ষাৎ লাভ করেন। এই সফরে ফেরেশতা জিবরাইল তার সফরসঙ্গী ছিলেন।

কুরআন শরিফের সুরা বনি ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে :

“ سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنْ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّه هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি আস্রা বিআবদিহি লাইলাম মিনাল মাসিজদিল হারামী ইলাল মাসিজদিল আকসা

বঙ্গার্থ : “পবিত্র সেই মহান সত্তা, যিনি তাহার এক বান্দা (মুহাম্মদ)-কে মসজিদে হারাম (কাবাঘর) হইতে মসজিদে আকসা (বাইতুল মোকাদ্দাস) পর্যন্ত পরিভ্রমণ করাইয়াছেন। ইহার মধ্যে তাহাকে অসংখ্য নিদর্শনাবলী দেখান হইয়াছে।

জেরুজালেম এবং উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ)

ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইহুদিধর্ম – তিনটি সর্ববৃহৎ একেশ্বরবাদী ধর্মের (যে ধর্মের মানুষ একটামাত্র ঈশ্বরের পূজা করে) পবিত্র এক শহর জেরুজালেম। হাজার বছরের ঐতিহাসিক কাল-পরিক্রমায় শহরটি কখনো জেরুজালেম, কখনো আল-কুদ্‌স, কখনো ইয়েরুশালায়িম, কখনো অ্যায়েলিয়া প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল যা এর বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে। এটি এমন এক শহর যাকে হযরত সুলাইমান (আঃ) এবং হযরত দাউদ (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম নবী-রাসূল তাদের ভূমি বলে সম্বোধন করেছেন।

একবার মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর জীবদ্দশায় একরাতের মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং এরপর জেরুজালেম থেকে আসমান পর্যন্ত এক অলৌকিক ভ্রমণ করেছিলেন যা ইসরা’ এবং মি’রাজ নামে পরিচিত। যদিও তাঁর জীবদ্দশায় জেরুজালেম কখনো মুসলিমদের অধীনে আসেনি। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) এর সময়।

মুহাম্মদ ﷺ এর প্রচারিত বাণী দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, দলে দলে মানুষ গ্রহণ করতে থাকে এই বাণী। তখনকার পরাশক্তি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এর দক্ষিণ সীমান্তের দিকে ছড়িয়ে পড়া এই নতুন ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছিল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তাবুক অভিযানে মহানবী ﷺ এর নেতৃত্বে প্রায় ৩০,০০০ সৈন্য বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমানা অভিমুখে যাত্রা করে। যদিও কোনো বাইজেন্টাইন সৈন্য যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের মুখোমুখি হয়নি, কিন্তু এই অভিযানটি মুসলিম-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সূচনা হিসেবে পরিচিতি পায় যা পরে কয়েক দশক ধরে অব্যাহত ছিল।

৬৩২ থেকে ৬৩৪ সাল পর্যন্ত খলিফা আবু বকর (রাঃ) এর সময় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোন বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়নি। হযরত উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) এর সময় মুসলিমরা উত্তরদিকে বাইজেন্টাইন অঞ্চলে খিলাফত সম্প্রসারণ শুরু করে। তিনি খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ (রাঃ) এবং আম্‌র ইবন আল-আস্ (রাঃ) সহ বেশ কয়েকজন বিচক্ষণ মুসলিম সেনাপতিকে বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইয়ারমূক এ সংঘটিত চূড়ান্ত-নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধে দামেস্কসহ সিরিয়া অঞ্চলের অনেক নগরীর পতন হয়। এটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য বড় একটি আঘাত ছিল।

অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীকে স্থানীয় জনগণ – ইহুদি এবং খ্রিস্টান উভয়ই স্বাগত জানায়। ঐ অঞ্চলের বেশীরভাগ খ্রিস্টানই ছিল একেশ্বরবাদী, যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস মুসলমানদের প্রচার করা ধর্মের অনুরূপ ছিল। বাইজেন্টাইনদের সাথে ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকায় তারা বাইজেন্টাইনদের পরিবর্তে মুসলিম শাসনকে স্বাগত জানায়।

জেরুজালেম বিজয়

৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুসলিম সৈন্যরা জেরুজালেমের কাছাকাছি চলে আসে। তখন জেরুজালেমের দায়িত্বে ছিলেন বাইজেন্টাইন সরকারের প্রতিনিধি ও স্থানীয় খ্রিস্টান গীর্জার প্রধানঃ যাজক সোফ্রোনিয়াস। খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ (রাঃ) এবং আম্‌র ইবন আল-আস্ (রাঃ) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শহর পরিবেষ্টন করা শুরু করলেও উমর (রাঃ) নিজে এসে আত্মসমর্পণ গ্রহণ না করলে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান যাজক সোফ্রোনিয়াস।

এমন পরিস্থিতির খবর পেয়ে উমর ইবন আল-খাত্তাব (রাঃ) একাই একটি গাধা এবং এক চাকরকে নিয়ে মদীনা ছেড়ে জেরুজালেমের উদ্দেশে যাত্রা করেন। জেরুজালেমে সোফ্রোনিয়াস তাঁকে স্বাগত জানান। মুসলিমদের খলিফা, তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি উমর (রাঃ) ছিলেন খুব সাধারণ বুননের পোষাকে। তাঁকে ও ভৃত্যের মধ্যে কে উমর তা আলাদা করা যাচ্ছিলনা। এ অবস্থা দেখে সোফ্রোনিয়াস খুবই বিস্মিত হন।

উমর (রাঃ) এর মসজিদটি আজও গীর্জা সংলগ্ন রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে

এরপর উমর (রাঃ) কে পবিত্র সমাধির গীর্জাসহ পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখানো হয়। নামাজের সময় হলে সোফ্রোনিয়াস তাঁকে গীর্জার ভেতর নামাজ আদায় করার আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু উমর (রাঃ) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যদি তিনি সেখানে নামাজ আদায় করেন তাহলে পরবর্তীতে মুসলিমরা এই অজুহাত দেখিয়ে গীর্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করবে – যা খ্রিস্টান সমাজকে তাদের একটি পবিত্র স্থান থেকে বঞ্চিত করবে। বরং উমর (রাঃ) গীর্জার বাইরে নামাজ আদায় করেন যেখানে পরবর্তীতে একটি মসজিদ নির্মিত হয় (যা “মসজিদে উমর” নামে পরিচিত)।

উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামা

ইতিপূর্বে জয় করা শহরগুলোর মতো জেরুজালেমেও মুসলিমদের একটি চুক্তিনামা লিখতে হয়। চুক্তিনামাটি ছিল জেরুজালেমের সাধারণ জনগণ এবং মুসলিমদের নাগরিক অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন উমর (রাঃ) ও যাজক সোফ্রোনিয়াস, এবং মুসলিম বাহিনীর কতিপয় সেনাপতি। চুক্তিনামায় লিখিত ছিলঃ

পরম দয়ালু এবং করুণাময় আল্লাহ’র নামে। এতদ্বারা ঘোষণা করা হচ্ছে যে, আল্লাহর বান্দা, ঈমানদারদের সেনাপতি উমর, জেরুজালেমের জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করছে। নিশ্চয়তা দিচ্ছে তাদের জান, মাল, গীর্জা, ‌ক্রুশ, শহরের সুস্থ-অসুস্থ এবং তাদের সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদির। মুসলিমরা তাদের গীর্জা দখল করবেনা এবং ধ্বংসও করবেনা। তাদের জীবন, কিংবা যে ভুমিতে তারা বসবাস করছে, কিংবা তাদের ক্রুশ, কিংবা তাদের সম্পদ – কোনোকিছুই ধ্বংস করা হবে না। তাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হবে না। কোন ইহুদি তাদের সাথে জেরুজালেমে বসবাস করবে না।

জেরুজালেমের অধিবাসীদের অন্যান্য শহরের মানুষের মতই কর (ট্যাক্স) প্রদান করতে হবে এবং অবশ্যই বাইজেন্টাইনদের ও লুটেরাদের বিতাড়িত করতে হবে। জেরুজালেমের যেসব অধিবাসী বাইজেন্টাইনদের সাথে চলে যেতে ইচ্ছুক, গীর্জা ও ক্রুশ ছেড়ে নিজেদের সম্পত্তি নিয়ে চলে যেতে ইচ্ছুক, তাদের আশ্রয়স্থলে পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নিরাপত্তা পাবে। গ্রামের অধিবাসীরা চাইলে শহরে থেকে যেতে পারে, কিন্তু তাদের অবশ্যই শহরের অন্যান্য নাগরিকদের মত কর প্রদান করতে হবে। যে যার ইচ্ছেমতো বাইজেন্টাইনদের সাথে যেতে পারে কিংবা নিজ নিজ পরিবার-পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারে। ফসল কাটার আগে তাদের থেকে কিছুই নেয়া হবেনা।

যদি তারা চুক্তি অনুযায়ী কর প্রদান করে, তাহলে এই চুক্তির অধীনস্ত শর্তসমূহ আল্লাহর নিকট অঙ্গীকারবদ্ধ, তাঁর নবীর উপর অর্পিত দায়িত্বের ন্যায় সকল খলিফা এবং ঈমানদারদের পবিত্র কর্তব্য।

তারিখ তাবারী এর The Great Arab Conquests থেকে উদ্ধৃত

সেই সময় পর্যন্ত এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রগতিশীল চুক্তিগুলোর একটি। তুলনা করলে দেখা যায়, এ ঘটনার মাত্র ২৩ বছর আগেই পারসিকরা (পারস্যের অধিবাসী) বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে জেরুজালেম জয় করার পর জেরুজালেমের মানুষদের উপর গণহত্যা চালায়। একইভাবে ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা মুসলিমদের থেকে জেরুজালেম দখল করার পর গণহত্যা চালায়।

কুরআনের নির্দেশনা এবং মুহাম্মদ ﷺ এর বাণী অনুযায়ী লেখা উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামা জেরুজালেমের খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা এনে দেয়। এ ছিল ইতিহাসে ধর্মীয় স্বাধীনতার সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক নজির।  জেরুজালেমে উমর (রাঃ) এর পথপ্রদর্শক ছিলেন কা’ব আল-আহবার নামক জনৈক এক ইহুদি। কিন্তু উমর (রাঃ) ইহুদিদেরকে টেম্পল মাউন্ট এবং ওয়েলিং ওয়াল (ইহুদিদের পবিত্রতম দু’টি স্থান) এ ধর্মচর্চার অনুমতি দেন যখন এর আগে বাইজেন্টাইনরা ইহুদিদের এসব কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।

সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা করে এমন একটি প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত চুক্তির তাৎপর্য ছিল অনেক। এই চুক্তিনামা সাবেক বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আমলে মুসলিম-খ্রিস্টান সম্পর্কের একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়েছিল যেখানে সকল পরিস্থিতিতে যুদ্ধের পর অধিকৃত মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখা হয় এবং বাধ্যতামুলক ধর্মান্তরীকরণকে কখনোই অনুমোদন দেয়নি।

শহরের পুনরুজ্জীবন লাভ

উমর (রাঃ) অবিলম্বে শহরটিকে মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনে পরিণত করায় মনোনিবেশ করেন। তিনি টেম্পল মাউন্ট এর এলাকাটি পরিষ্কার করেন যেখান থেকে মহানবী (সাঃ) আসমানে আরোহণ করেছিলেন। খ্রিস্টানরা ইহুদিদেরকে অসন্তুষ্ট করার জন্য এলাকাটিকে আবর্জনা ফেলার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করত। উমর (রাঃ) এবং মুসলিম বাহিনী (এবং সাথে থাকা কিছু ইহুদি) ব্যক্তিগত উদ্যোগে এলাকাটি পরিষ্কার করেন

উমর (রাঃ) এর খিলাফতের বাদবাকী সময়ে এবং এরপর উমাইয়াদের সময় জেরুজালেম ধর্মীয় তীর্থযাত্রা এবং বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠে। মসজিদ আল-আক্‌সাকে পরিপূর্ণ করে তুলতে ৬৯১ সনে যোগ করা হয় “ডোম অফ রক” (কুব্বাত আস সাখরা)। শীঘ্রই গোটা শহর জুড়ে আরো অনেক মসজিদ ও সরকারী কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে খলিফা উমার (রাঃ) অধীনে মুসলিমদের জেরুজালেম বিজয় স্পষ্টতই শহরটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে। পরবর্তী ৪৬২ বছর পর্যন্ত উমর (রাঃ) এর চুক্তিনামা অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে মুসলিমরা শহরটির শাসনকার্য পরিচালনা করে।

প্রথম ক্রুসেড

এগারো শতাব্দীতে ইউরোপিয়ান শাসকেরা ধর্মীয় এবং বাণিজ্যিক অভিপ্রায়ে জেরুজালেমকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিতে পরিকল্পনা শুরু করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করেন -তা ছোট বড় আকারে ১৩ শো শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে। তাদের যুদ্ধ ও দখলদারিতে প্রাণহাণী ঘটান, নানান রকমের অত্যাচার ও নির্যাতন করেন এবং সর্বোপরি যুদ্ধের অর্থ সংগ্রহ করতে এবং সৈন্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে যে চরম মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা করেন তার জের এখনও শেষ হয় নি। ইউরোপ ও মুসলমানদের মধ্যে হাজার বৎসরের টানাপোড়নের সম্পর্ক এই যুদ্ধংদেহী তৎপরতার সৃষ্টি।

১০৬০ এর দশকে সেলজুক (মুসলিম) তুর্কীদের হাতে জেরুজালেমের কর্তৃত্ব চলে গেলে পশ্চিমা দেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, কেননা যেকোনো পটপরিবর্তনে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের অবকাশ দেখা দেয়। কিন্তু এই পরিবর্তন সাধারণ ছিল না, এটা ইউরোপিয়ানদের সামনে যুদ্ধের একটি অজুহাত খাড়া করে দেয়। ১০৯৫ সালে বুউয়েঁর গডফ্রি (Godfrey of Bouillon, একজন ফরাসী) সসৈন্যে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। ১০৯৯ সালে মুসলমানদেরকে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম তাদের দখলে আনেন। এই যুদ্ধে গোটা ক্যাথোলিক চার্চ ও পোপ ২য় আর্বানের (১০৩৫-১০৯৯) সমর্থন ও আশীর্বাদ ছিল।

বিজয়ের পর ক্রুসেড যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খুর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।

বিজয় ধরে রাখা, পরবর্তী যুদ্ধাদি চালিয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে গডফ্রি জেরুজালেমের বাদশার পদে সমাসীন হন।

নাইট টেম্পলারদের আত্মপ্রকাশ

১১১৮ সালে (মতান্তরে ১১১৯ সালে) বাদশাহ ২য় বল্ডউইনের সময় সন্ন্যাসীদের মধ্য থেকে একদল স্থায়ী সেনাবাহিনী তৈরির প্রস্তাব আসে –যাদের কাজ হবে তীর্থযাত্রীদের প্রতিরক্ষা ও জেরুজালেম সংরক্ষণ। এই বাহিনী তৈরির মূলে ছিলেন হিউ ডি প্যান, ((একজন ফরাসী নৌবলম্যান (noble man,রাজকীয় প্রথায় একজন সম্মানিত, উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি))। এই বাহিনীর মাধ্যমে ইউরোপ থেকে ব্যবসায়/ধর্মীয় যাত্রার নিরাপত্তা বিধানের এক ধরনের ফ্রাঞ্চাইজ নেয়া হয়। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ এই উদ্দেশ্যদ্বয়ের উপর দ্বিমত করেন। তাদের ধারণা যে এই বাহিনী তৈরির ‘মতলব’ অন্যস্থানে ছিল। ঘটনা যাই হোক এর নাম দেয়া হয় The Order of the Poor Knights of the Temple of King Solomon সংক্ষেপে the Knight Templars। এক দিকে ওরা সন্ন্যাসী আর অপর দিকে নিবেদিত যোদ্ধা, খোদার যোদ্ধা। নামের তাৎপর্যের দিক দিয়ে ‘নাইট টেম্পলার’ হল ধর্ম যোদ্ধা, সন্ন্যাসী যোদ্ধা। এটা ভারতের শিবসেনার সমার্থক, এই যোদ্ধারা ও তাদের জীবন স্রেফ যুদ্ধ কেন্দ্রিক, সমর নিবেদিত। আবার যদিও নামের মধ্যে ‘দরিদ্র’ (poor) শব্দটি আছে কিন্তু শব্দে যা’ই থাকুক বাস্তবে এভাবে থাকবেনা।

সেদিন যে বাহিনীটি গড়া হয়েছিল তা অদূর ভবিষ্যতে এক বিরাট বাহিনী হয়ে গড়ে উঠবে। তারা আগামীতে ধনসম্পদের পাহাড় গড়বে, রাজকীয় প্রশাসনের মোকাবেলায় হুমকি হবে এবং অবশেষে তাদেরকে মেরে শিকড় নির্মূল করার চেষ্টা করা হবে। কিন্তু এই উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হবে না। মনে রাখতে হবে, এদের অস্তিত্ব ছিল চার্চের নামে, ধর্মের আওতায়, চার্চ ও রাজার যৌথ শাসনের অধীনস্থ হয়ে যা পরবর্তীতে ইউরোপের ধর্ম ও শাসন ব্যবস্থায় প্রবল ছাপ মারবে। শুধু যে তাই, তা নয়, পরবর্তীতে মানুষ ধর্ম, চার্চ, যুদ্ধ, নৃশংসতার ‘মিলনের সম্পর্কে’ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবে। তাছাড়া মধ্যযুগ, যুক্তির যুগ এবং এনলাইটনম্যান্টের যুগ পর্যন্ত ধর্ম ও শাসন ব্যবস্থায় ফাটল ধরাতে যেসব উপাদান কাজ করে থাকবে, এটাই হবে তাদের একটি।

বাদশাহ বল্ডউইন ক্রুসেড যোদ্ধাদেরকে জেরুজালেম মসজিদের কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। এক সময় তারা মসজিদের মাটির নিচে একটি বিরাট ধনভাণ্ডার লাভ করে। তারা নাকি ভিত্তিস্থ মাটি খুড়ে ark of covenant পায়। মতান্তরে সেটি ছিল হলী গ্রেইল (Holy Grail)। তবে এর উপর আরও মতামত আছে। যেমন ডেড সী ক্রোল (dead-sea scroll), কোনো মৌলিক অতি বিরল তত্ত্ব, যীশুর কোন শিষ্যের কর্তিত মস্তক অথবা ৭০ খৃষ্টাব্দে রোমানরা জেরুজালেম আক্রমণ করলে ইয়াহুদীগণ তাদের সোনা-রূপা স্থানে স্থানে গোপন করে যে ম্যাপ তৈরি করে রেখেছিল সেই ম্যাপ আবিষ্কার এবং সেই বিপুল সম্পদাদি উদ্ধার ইত্যাদি । তবে মূল বস্তুটি কী ছিল –তা নিশ্চিত করা না গেলেও জিনিসটি যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা তাদের এক ‘চূড়ান্ত-মুক্তি সনদ’ থেকে বুঝা যায়। টেম্পলারদের প্রধান ফ্রান্সে আসেন। চার্চ প্রধান, বাদশাহ ও অবশেষে পোপের সাথে দেখা করেন এবং তার কাছ থেকে একটি অনাক্রম্যতা (immunity) লাভ করেন এই অর্থে যে কোনো দেশের আইন তাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে না, তাদেরকে কোনো রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি মানতে হবেনা, খাজনা ইত্যাদি দিতে হবেনা , এটা কেন? তারা সেখানে কী মহামূল্যের বস্তু পেয়েছিল –এসব সব প্রশ্নের কোন সঠিক উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। তবে তখন থেকে তারা এক ওঢেল সম্পত্তির মালিক হয়, ইউরোপ জুড়ে তাদের ক্ষমতা বিস্তার হয়। তাদের হাতে একটি ব্যাংকিং সিস্টেমও গড়ে ওঠে। তীর্থযাত্রীরা নিরাপত্তার জন্য নিজেদের অর্থ (সোনা/রূপা) ওদের দফতরে জমা দিত এবং মোকাবেলায় সেই মূল্যের কাগজের রিসিট নিয়ে পাড়ি জমাত। নির্দিষ্ট শহরাদিতে রিসিট দেখিয়ে টাকা তুলতে পারত। এই সার্ভিসের জন্য ১০% চার্জ করা হত। তীর্থ ছাড়া সাধারণভাবে এই সিস্টেম ব্যবহৃত হয়।

দ্বিতীয় ক্রুসেড

ক্রুসেডের যুদ্ধ কয়েক দফা হয়েছিল। জেরুজালেম ক্রুসেডদের দখলে থাকা অবস্থায় তারা সেখান থেকে অপরাপর স্থান দখল করার জন্যও যুদ্ধ করে। তাছাড়া ইউরোপ থেকে এই উদ্দেশ্যে আরও যুদ্ধাদি নিয়ে যাওয়া হয়। এগুলোর সবই ক্রুসেডের যুদ্ধ, ধর্মের যুদ্ধ।

একজন ফরাসী এবোট বার্নার্ড অব ক্লেয়ারভক্স (Bernard of Clairvaux) এর আহবানে বাদশাহ ৭ম লুইস ও ৩য় কনরাডের অধীনের একটি ক্রুসেড ১১৪৭ থেকে ১১৪৯ পর্যন্ত চালানো হয়। কিন্তু তারা এই অভিযানে তেমন কোন ফায়দা হাসিল করতে পারেননি।

সালাউদ্দীন আইয়ূবীর জেরুজালেম উদ্ধার

১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। সালাহুদ্দিন আইউবি গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিসর আগমন করেন। ফাতেমি খিলাফতের কেন্দ্রীয় খলীফা তাকে এ পদে নিয়োগ দিয়ে বাগদাদ থেকে প্রেরণ করেন। তার (দ্বাদশ শতাব্দীর) আগে থেকেই ইউরোপ, ফ্রান্স ও জার্মানি ইসলামিক রাষ্ট্র ভাঙ্গার জন্য ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করে, ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু করে নানা চক্রান্ত। সেইসঙ্গে তারা চালায় সশস্র অভিযান। মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দখল করে রাখে ইসলামের মহান স্মৃতি চিহ্ন প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস।

সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ছোটবেলায় গভর্নর নিজামুল মূলক এর মাদরাসায় জাগতিক ও আদর্শিক পড়াশুনা ও যুদ্ধ বিদ্যায় জ্ঞান লাভ করেন। রাজনীতি, কূটনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, পড়াশুনা ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ কৌশলের উপর গভীর জ্ঞান ও আগ্রহের কারণে চাচা শেরেকাহ ও নুরুদ্দীন জঙ্গী তাকে স্পেশাল প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। প্রশিক্ষণটি মূলত তৈরি হয় এক যুদ্ধের ময়দানে , যেখানে সালাহুদ্দিন আইউবি দীর্ঘকাল আবরোধের মধ্যে যুদ্ধ করেও হতাশ না হয়ে সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধ করে ফিরে আসেন। এর পরই নুরুদ্দীন জঙ্গী তাকে মিশরের গভর্নরের পদের জন্য মনোনীত করেন।

সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীও চিন্তা চেতনায় ছিলেন সালাহুদ্দীন আইউবির মতই। সেসময় যেখানে ইসলামিক খিলাফতের সব আমির, গভর্নর, উজিররা খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দিয়ে তাদেরথেকে সুন্দরি মেয়ে ও প্রচুর ধনসম্পদ এবং মূলত ক্ষমতার লোভে ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখত, ঠিক তখনই সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ও নুরুদ্দীন জঙ্গী ইসলামিক খিলাফত রাষ্ট্রকে ইহুদী–খৃষ্টানদের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করে বাইতুল মুকাদ্দাস কে সেই ক্রুসেডারদের থেকে মুক্ত করার জন্য একের পর এক জিহাদ করে গেছেন।

সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মিশরের গভর্নর হওয়ার পরই সর্বপ্রথম সেখান থেকে খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দেয়া আমির উজিরদের সুকৌশলে সরকারী দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেন। এজন্য তাকে মারার জন্য ক্রুসেডারদের দালালরা অনেক ফন্দি আটার পরও তারা ব্যর্থ হয়। দালালরা অনেক সুন্দরী মেয়ে ব্যবহার করেও পাথরের মত সালাহুদ্দীনকে গলাতে পারেনি। যেখানে অন্যান্য আমিররা সানন্দেই তাদের গ্রহণ করত। দালালরা সালাহুদ্দীনকে গলাতে না পেরে তাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় বসার জন্য মিশরের সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকা সুদানি সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে এই বলে যে তোমরা সুদানি তারা মিশরি। সুদানের বর্ডার মিশরের কাছে থাকাতে বিদ্রোহের পর সেখান থেকে আক্রমণ করাও সহজ ছিল। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইয়ুবি তার চৌকস গোয়েন্দা প্রধান আলি বিন সুফিয়ান কে দিয়ে সব তথ্য আগেই পেয়ে যান । আর খুবই কৌশলে তাদের বিদ্রোহ দমন করেন। এদিকে সেনা বিদ্রোহ করিয়ে দালালরা সম্রাট ফ্রাঙ্ককে আক্রমণ করার আগমনও জানায়। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবি আগেই বিদ্রোহ দমন করেন, আর যখন পরে ফ্রাঙ্ক এর সেনাবাহিনী আসে তারা পুরোপুরিভাবে সালাহুদ্দীনের কাছে পরাজিত হয়। এই দিকে ফ্রাঙ্ক মিসরে আক্রমণ করলে সিরিয়া থেকে নুরুদ্দীন জঙ্গিও ফ্রাঙ্ক এর দেশে আক্রমণ করে বসেন। তাতে আক্রমনের খবর পেয়েই ফ্রাঙ্ক তার দেশে ফিরে যেয়ে দেখেন সেখানের চিত্রই বদলে গেছে। সব দিক দিয়েই ফ্রাঙ্কের শোচনীয় পরাজয় ঘটে।

বাগদাদের খলীফা খলীফা আজেদ ও যখন ক্রুসেডারদের চক্রান্তে পা দেন তখন সালাহুদ্দীন আইউবি তাকে সুকৌশলে খিলাফতের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বাগদাদকে সিরিয়ার খিলাফতের অধীনে নুরুদ্দীন জঙ্গীর কাছে দিয়ে দেন, এতে করে খিলাফত রাষ্ট্র আবারো একটি রাষ্ট্রে পরিনত হয়। মূলত ক্রুসেডাররা ফাতেমি খলীফাকে মদ আর নারীতে ব্যস্ত রেখে তাকে অধমে পরিণত করে, এমনকি সে সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে হত্যাও করার পরিকল্পনা করে। আর খলীফা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সালাহুদ্দিন আইউবির উপর কথা বলতে ভয় পেতেন। চরিত্রের অধপতনের কারণেই মূলত এমনটি অনুভব করতেন তিনি। তাই তাকে সরিয়ে খিলাফতের দায়িত্ব একজনকে দেয়া ও একমুখী করা সালাহুদ্দীন আইয়ুবির পক্ষে সহজ হয়।

সেকালে মাসজিদে জুময়ার খুৎবাতে আল্লাহর ও রাসুলের নামের পর খলীফার নাম উচ্চারন করতে হতো। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি জুময়ার খুৎবা থেকে খলীফার নাম উচ্চারন করা বাদ দিয়ে দেন।

সুলতান আইয়ুবি যেখানে ক্রুসেডারদের আক্রমণ করে তাদের ইসলামিক রাষ্ট্রের দখলকৃত অঞ্চল থেকে বিতারিত করবেন, সেখানের মুসলিমদের তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিবেন, সেখানে ক্রুসেডাররা সারাক্ষণই তাদের গয়েন্দাদের ব্যবহার করে মিশরে কোন না কোন সমস্যা তৈরি করে রাখত। যাতে করে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি নতুন করে তাদের আক্রমনের সময় না পান, তিনি যেন মিশর ঠিক করতেই তার সকল সময় পার করে দেন। তারা প্রায়ই চেষ্টা করত সুদানি বাহিনী দিয়ে সুদান থেকে মিশরে আক্রমণ করাতে, যাতে সালাহুদ্দীন শুধু তাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। তারা মিসরের বিভিন্ন মাসজিদে তাদের প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা ইমাম পাঠাত যারা সেখানে জিহাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে মানুষের ভিতর থেকে জিহাদের চেতনাকে ধ্বংস করতে চাইত। ক্রুসেডাররা মুসলিমদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করত মেয়েদের দিয়ে। তারা প্রায় সব আমিরদের কাছেই তাদের সুন্দরী মেয়েদের প্রেরণ করত, তাদের দিয়ে সেই আমিরদের চরিত্র ধ্বংস করার পায়তারা করত। তারা জানত মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তাদের ঈমানী শক্তি যেটা দিয়ে তারা ক্রুসেডারদের সাথে লড়ে। আর সে শক্তির কাছেই তারা বার বার হারে, আর সে শক্তির বলেই তাদের চেয়েও অনেক কম পরিমাণ সৈন্য দিয়ে মুসলিমরা বার বার জয় লাভ করে।

ক্রুসেডাররা তাদের নিজেদের মেয়েদেরকে মুসলিমদের চরিত্র হরণের প্রশিক্ষণ দিত। তারা এ কাজে সেসকল মেয়েদেরও ব্যবহার করত যাদেরকে তারা মুসলিমদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অপহরণ করে এনেছিল তাদের বাল্যকালে। তারা ক্রুশের স্বার্থে এরূপ করাকে পুণ্য মনে করত।

সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মিশরের স্থায়িত্ব আনার পরই আবার তার সেই বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার শপথ পুরন করার জন্য বের হয়ে যান। তিনি সর্ব প্রথম খৃষ্টানদের ফিলিস্তিনের শোবক দুর্গ অবরোধ করে সেটা জয় করে ফেলেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গীর সহায়তায় কার্ক দুর্গও জয় করেন। কার্ক দুর্গ অবরোধ করার সময় সুদানিরা আবারো মিশরে সমস্যা তৈরি করতে চায় ক্রুসেডারদের সাহায্যে। পরে সুলতান আইয়ুবি কার্কের অবরোধ নুরুদ্দীন জঙ্গীকে দিয়ে মিশরে চলে আসেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গী কার্ক দুর্গ সহ ফিলিস্তিনের আরও কিছু জায়গা দখল সম্পন্ন করেন।

ফিলিস্তিনের শোবক ও কার্ক দুর্গ পরাজয়ের প্রতিশোধ স্বরূপ ক্রুসেডাররা পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। স্পেনের পূর্ণ নৌ বহর এতে যুক্ত হয়। ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়ামও যুক্ত হয়। গ্রিস ও সিসিলির জঙ্গি কিশতিগুলও যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা ভাবতো তারা চাইলে একাই মুসলিমদের পরাজয় করতে পারে তাই তারা যুক্ত হতে চায় নি। কিন্তু তাদের পোপের অনুরধে তাদের কিছু যুদ্ধ জাহাজগুলও যুক্ত করে। …… এদিকে সুলতান আইয়ুবি গোয়েন্দা মারফত তাদের আগমনের খবর পেয়ে যান, তিনি এও জেনে যান যে তারা আগে এসে মিশরের উপকুলের আলেকজান্দ্রিয়া অঞ্চল দখল করবে। তাই সুলতান আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সকল জনগণকে সেখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যান এবং সেখানে ঘরগুলোতে মুসলিম সৈন্য দিয়ে ভরে রাখেন। ক্রুসেডাররা যখন উপকুলে এসে ভিড়ে তারা পরে আক্রমণের জন্য কোন সৈন্য না দেখে খুশি হয়, এবং পরে হেসে খেলে উপকূলের আলেকজান্দ্রিয়া দখল করতে যায়। রাতে যখন তারা নগরীতে প্রবেশ করে তখনই সৈন্যরা ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে নিষ্পেষিত করে দেয়। ওই দিকে তাদের জাহাজগুলোতে যেই সৈন্যদেরকে রেখে এসেছিল তাদের উপর হঠাৎ পেছন থেকে সুলতান আইয়ুবির যুদ্ধ জাহাজ আক্রমণ করা শুরু করে। তারা মিনজানিকের সাহায্যে বড় বড় আগুনের গোলা ও পাথর মারতে শুরু করে ক্রুসেডারদের জাহাজের উপর। ক্রুসেডাররা পালাতে থাকে জাহাজ নিয়ে এবং ধ্বংস হতে থাকে। ক্রুসেডারদের আরেকটা অংশ ফিলিস্তিন থেকে আক্রমনের জন্য আসলে সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের পরাজয় করে দেন। এই যুদ্ধ শেষে নুরুদ্দীন জঙ্গী সুলতান আইয়ুবিকে তার অধিকৃত অঞ্চল দিয়ে সিরিয়ায় নিজ এলাকায় চলে যান।

সালাহুদ্দীন আইয়ুবির যুদ্ধ কৌশলের সবচেয়ে ভয়ানক কৌশল ছিল তার গেরিলা হামলা। তার সৈন্যরা গেরিলা বাহিনী দিয়ে শত্রুদের সেনা বহরের পেছনের অংশে আঘাত হরে নিমিষেই হারিয়ে যেত। তার এই কৌশল আজো সামরিক বিশ্লেষকরা প্রশংসা করে।

১১৭৪ সালের মে মাসে নুরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যু বরন করেন। তার মৃত্যুতে নেমে এসে শোকের ছায়া। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি হারান তার প্রাণপ্রিয় চাচাকে যিনি বরাবরই তাকে সাহায্য দিয়ে আসতেন বিভিন্ন সময়ে। ক্রুসেডাররা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। কারণ তারা এখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবির সাথে আগের চেয়ে কম কষ্টে লড়তে পারবে। জঙ্গীর মৃত্যুর পর তার মাত্র ১১ বছরের নাবালেক ছেলেকে ক্রুসেডারদের গাদ্দাররা ক্ষমতার লোভে খিলাফতের মসনদে বসায়। যদিও মাত্র ১১ বছরের নাবালেগ ছেলেকে খলীফা হিসেবে মসনদে বসানো সকলের জন্য হারাম, তবুও তারা ক্ষমতার জন্য এটা করে। এতে নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী রোজি খাতুন অনেক বাধা দিলেও তারা তা অমান্য করে। রোজি খাতুনও ছিলেন মুলত তার স্বামীর মতোই একজন খাটি ঈমানদার। যিনি এই অন্যায় মেনে নিতে না পেরে সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে চিঠি লিখেন এই বলে যে, উনি যেন এসে সিরিয়া দখল করেন।

এদিকে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি আসবেন জেনে রোজি খাতুন সেখান কার জনগণকে বুঝাতে থাকেন যে একজন নাবালেগকে খলীফা হিসেবে মানা হারাম। আর এ কাজ গাদ্দাররা একারনে করেছে যাতে করে তারা তার নাবালক ছেলেকে দিয়ে ভুল বুদ্ধি দিয়ে সব করিয়ে নিতে পারে।

একদিন সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মাত্র ৭০০ সৈন্য নিয়েই সিরিয়ার মুল দুর্গ অবরোধ করেন। এতে সিরিয়ার জনগন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় এবং তারা সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে ভিতরে আসতে দেয়ার জন্য নগরীর মুল ফটক খুলে দিতে বলে। তারা বাধ্য হয়ে ফটক খুলে দিলে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ভিতরে প্রবেশ করে। সকলে তাকে স্বাগত জানায়।

এদিকে সুলতান আইয়ুবির আগমনের খবর পেয়ে সকল আমলা-উজিররা দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ছেলেও পালিয়ে যায়। সাথে করে তারা প্রচুর মূল্যবান সম্মত্তি ও প্রচুর দিরহাম নিয়ে যায় আর সাথে করে খৃষ্টানদের দেয়া মেয়েগুলোও নিয়ে যায়। তারা সিরিয়ার অদূরে হালব, হাররান ও মাশুল দুর্গে যেয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে খৃষ্টানদের প্রভাব থাকায় তারা নিরাপদেই থাকতে শুরু করে।

সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর যখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবি সিরিয়া মিশরকে এক করে দেন, তখন থেকেই তিনি মিসরের গভর্নর থেকে সেই সালতানাতে ইসলামিয়ার সুলতান হন। তখন থেকেই তাকে সুলতান উপাধিতে ডাকা হয়।

হালব ও মাসুলে আশ্রয় নেয়া আমিররা ক্রুসেডারদের সাথে আতাত করে সুলতান আইয়ুবিকে পরাজিত করে পুনরায় সিরিয়া দখল করের ফন্দি আটে। এতে ক্রুসেডাররাও তাদের সাহায্য করতে থাকে। সুলতান আইয়ুবি যেন নিজেদের মুসলিম ভাইদের সাথেই যুদ্ধ করতে করতে শেষ হয়ে যান সেই লক্ষ্যে ক্রুসেডাররা হালব, মাসুল ও আশপাশের আমিরদের সালাহুদ্দীন এর বিরুদ্ধে উদ্ধু‍‌দ্ধ করতে থাকে। তাদের সাহায্য করতে থাকে। তারা সেখানকার মুসলিম জনগণদের গোয়েন্দা মারফত বিভ্রান্ত করতে থাকে। তাদের বুঝাতে থাকে সুলতান সালাহুদ্দীন অত্যাচারী, নির্দয় শাসক।

পরে বহু দিন যাবত সুলতান আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাসের বাঁধা স্বরূপ সেই কথিত মুসলিম আমিরদের সাথেই যুদ্ধ করতে থাকেন। ক্রুসেডাররা সেই আমিরদের প্রচুর ধন-সম্পত্তি ও সুন্দরী মেয়ে দিয়ে রেখেছিল। আর ক্ষমতার নেশা সে সকল আমিরদের জেকে বসেছিল।

একদিন মরহুম সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর ছেলে প্রচুর মদ্য পানের ফলে ভুগে ভুগে মৃত্যুবরন করে। তাকে দেখার জন্য তার মা রোজি খাতুন আর কখনো যান নি।

অতঃপর অনেক দিন পর অনেক যুদ্ধ ও অনেক কষ্টের পর সুলতান আইয়ুবি হালব, মাসুল ওহাররান দখল করে নেন। তখন সেখানকার মুসলিমরাই তাদের আমিরদের বিরুদ্ধে সালাহুদ্দীন এর জন্য দরজা খুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বলে, পরে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এতে সুলতানের নিজেদের সাথে যুদ্ধ করেই প্রচুর মুসলিম সৈন্য শেষ হয়ে যায়। ক্রুসেডারদের গাদ্দার আমিরগুলোও তাদের সৈন্যদের এই বলে যুদ্ধে নিত যে, সালাহুদ্দীন ক্রুসেডারদের সাথে আতাত করেছে, আর আমরাই প্রকৃত ইসলামের পথে আছি।

হালব, হাররান আর মাসুল দুর্গ জয় করার পর সালাহুদ্দীন আইয়ুবির সামনে বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে আর কোন বাধা রইল না।

সুলতান আইয়ুবির এইবার বাইতুল মুকাদ্দাস এর দিকে আগমনের পালা। ক্রুসেডাররা এইবার আর মুসলিমদের থেকে সাহায্য পাবে না। কারণ সব আমিরই এখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবির আনুগত্য শিকার করেছে। সুলতান আইয়ুবি এইবার সর্ব প্রথম কার্ক আক্রমণ করেন। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি এর আগেও একবার কার্ক দখল করেন কিন্তু ১ মাস পর সেটা আবারো ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়। কার্কের শাসনভার ছিল অরনাত এর উপর। অরনাত একজন নাস্তিক ছিল যে রাসুল (সাঃ) কে নিয়ে বিদ্রুপ করত, তাই সুলতান তাকে ঘৃণা করতেন আর তাকে কাছে পেলেই হত্যা করবেন বলে শপথ নিয়েছিলেন। অরনাত মিশর আর সিরিয়ার হজ্ব কাফেলাগুলোর উপর হামলা করে তাদের সম্পত্তি ডাকাতি করত, আর মেয়েদের তুলে নিত।

সুলতান আইয়ুবি কার্ক আক্রমণ করলেন। কিন্তু তিনি সেটা অবরোধ না করে শত্রু যেন তার ইচ্ছা মত এলাকায় এসে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয় সেই পরিবেশ তৈরি করলেন। তিনি শত্রুর সকল রসদ বন্ধ করে তাদের পানির উৎস গুলো দখল করলেন আর তাদের পানির তৃষ্ণায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাগল করে ফেললেন। ক্রুসেডাররা বর্ম পরে যুদ্ধে আসতো আর তিনি যুদ্ধের সময় ঠিক করলেন জুন-জুলাই মাসে, এতে তারা বর্মের ভিতর উত্তাপে জ্বলে-পুড়ে মরতে লাগলো। তাদের পরাজয় হল। সুলতান কার্ক ও আশপাশের দুর্গ জয় করে নিলেন। সেই যুদ্ধে অরনাত সহ মোট ছয় জন সম্রাট ধরা পরে। সুলতান পরে তার শপথ মত অরনাতকে হত্যা করে বাকিদের ক্ষমা করে দেন।

এই যুদ্ধে ক্রুসেডাররা তাদের সবচেয়ে বড় ক্রুশটা (তারা ভাবে এইটাতেই ঈসা (আঃ) কে শূলে চড়ানো হয়েছিল) যুদ্ধের ময়দানে এনেছিল। তাদের সবচেয়ে বড় পাদ্রি (পোপ) এটা আনে। পরে পোপ মৃত্যু বরণ করে আর বড় ক্রুশটি মুসলিমদের হাতে চলে আসে। পরে সুলতান ক্রুসেডারদের তাদের ক্রুশটি দিয়ে দেন।

এরপর পালা আক্রার দুর্গের। ক্রুসেডাররা ভেবেছিল সুলতান আগে বায়তুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করবেন। তাই তারা বুঝে উঠার আগেই সুলতান আগে আক্রা আক্রমণ করলেন। ২-৩ দিন অবরোধের পর সেটা জয় করে ফেলেন।

তারপর সুলতান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ আসকালান অবরোধ করেন। প্রায় ৩৪ টি বছর পর এই অঞ্চলটি আবার স্বাধীন হল। ১১৫৩ সালের ১৯ এ সেপ্টেম্বর সম্রাট ফ্রাংক এটি দখল করে নেয়। আসকালান থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস অবস্থিত।

এইবার পালা বায়তুল মুকাদ্দাসের ……….
ক্রুসেডারদের দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের দখল হয় ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই মতাবেক ৪৯২ হিজরীর ২৩ শাবান । ক্রুসেডাররা বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে মুসলিম শাসকদের সহায়তায়। সেসময় মুসলিম শাসকরা নিজেদের রাজ্য চলে যাবে বিধায় সকলেই একে একে ক্রুসেডারদের পথ ছেড়ে দেয়, কেউই তাদের বাধা দেয় না। বরং অনেকেই তাদের সাহায্য করে, রসদ দেয়।

শুধু আরাকার আমির ছিলেন একজন ঈমানদার পুরুষ, যার সামরিক শক্তি খৃষ্টানদের তুলনায় কিছুই ছিল না। তবু তিনি খৃষ্টানদের দাবি পুরন করতে অস্বীকৃতি জানান। খৃষ্টান বাহিনী আরাকা ১০৯৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে। মুসলিমরা এমন প্রাণপন লড়াই করে যে বিপুল ক্ষতির পর ক্রুসেডাররা পথ পরিবর্তন করে চলে যায়।

মুসলিম আমিরগনই সে সময়য় ক্রুসেডারদের নিরাপদে বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে দিয়েছিল। পরে ১০৯৯ সালের ৭ জুন তারা বায়তুল মুকাদ্দাস আবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই বায়তুল মুকাদ্দদাসের ভিতরে প্রবেশ করে। সে সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের গভর্নর ছিলেন ইফতেখারুদ্দৌলাহ, তিনি প্রাণপন লড়াই করেছিলেন ক্রুসেডারদের সাথে। কিন্তু তাদের রসদ ও সৈন্য অগণিত হওয়ায় তিনি বার্থ হয়েছিলেন। পরে ক্রুসেডাররা নগরীতে ঢুকে সব মুসলিমদের হত্যা করে, তাদের নারীদের অত্যাচার করে, শিশুদের মাথা কেটে সেটা দিয়ে ফুটবল খেলে। মুসলিমরা আশ্রয়ের জন্য মাসজিদুল আকসা ও অন্যান্য মাসজিদে যায় তারা ভাবে মাসজিদুল আকসা উভয়ের নিকট সম্মানিত হওয়ায় তারা তাদের ছেড়ে দিবে। কিন্তু না ক্রুসেডাররা সেখানে ঢুকে মুসলিমদের হত্যা করে, তাদের রক্ত মাসজিদ গড়িয়ে গড়িয়ে বাইরে পরছিল, রক্তে খৃষ্টানদের ঘোড়ার পা ডুবে গিয়েছিল। খৃষ্টান ঐতিহাসিকদের মতে উদ্বাস্তু মুসলিমের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।

সুলতান আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাসের সেই অবমাননার কাহিনী তার পিতা নাজমুদ্দিন আইউব থেকে শুনতেন, নাজমুদ্দিন তার পিতার কাছ থেকে শুনতেন। পরে সুলতান এই কাহিনী তার নিজের ছেলেদের বলতেন।

১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার মতাবেক ৫৮৩ সনের ১৫ রজব সুলতান আইয়ুবি দ্রুত বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে যান, অবরোধ করেন বায়তুল মুকাদ্দাস। এদিকে খৃষ্টানরাও তাদের পবিত্র ভুমি ছাড়তে নারাজ। তারাও আমরণ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। সেখানকার প্রায় সব মুসলিমই বন্দি। তারা জেলের ভিতর থেকেই আজান আর তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছেন। অনুরূপ খৃষ্টানরাও গির্জায় গান গাইছে ও প্রার্থনা করছে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে আহত নিহত করে চলছে। শহিদদের সংখ্যা জেনে সুলতান অবাক হন। পরে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ৫৮৩ হিজরীর ২৭ রজব মোতাবেক ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ ২ অক্টোবর শুক্রবার সালাহুদ্দীন আইয়ুবি বিজয়ী বেশে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করেন। এটিই ছিল সেই রাত যেদিন আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মিরাজে গমন করেন। বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত হয়ার পর সেখানকার মুসলিমরা প্রায় ৯০ বছর পর ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেল।

ইংল্যান্ডের সম্রাট রিচার্ড যাকে ”ব্লাক প্রিন্স” বলা হত সে এর প্রতিশোধ নিতে ৫২০ যুদ্ধ জাহাজ ও অনেকগুলো মালবাহী বড় জাহাজ নিজে রোম সাগর আসে। তখনই ঝড়ের কবলে পরে প্রায় অনেক জাহাজ তলিয়ে যায়। যা বাকি থাকে তা দিয়েই সে বায়তুল মুকাদ্দাস আবার দখল করতে আসে। তখন তার সৈন্য ছিল ২ লাখ।

সুলতান চাচ্ছিলেন তারা যেন আগে উপকূলীয় অঞ্চল আক্রা অবরোধ করে, এতে করে তাদের সেখানেই ব্যস্ত রেখে শেষ করে দিতে পারলে বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষা করা যাবে।

রিচার্ড যখন আক্রা আগমন করে তারও আগেই তার জোটভুক্ত রাষ্ট্ররা আক্রা অবরোধ করে। রক্ত ক্ষয়ী ও দীর্ঘ যুদ্ধের পর সকলে মিলে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি সৈন্য নিয়ে আক্রা দখল করে নেয়। এতে তারা দখলের পর আক্রার প্রায় ৩ হাজার নিরস্ত্র মুসলিমের হাত পা বেধে পিচাশের মত ঝাপিয়ে পরে হত্যা করে।

রিচার্ড আক্রা দখলের পর উপকূলীয় বাকি অঞ্চল আসকালান ও হিফা দখল করতে যায়, যেন সেগুলোকে দখল করে ক্যাম্প বানিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করা সম্ভব হয়। কিন্ত তারা যেন সেটা করতে না পারে তার জন্য সুলতান আইয়ুবি আগেই সেখান থেকে জনগনকে সরিয়ে সেগুলোকে পুড়িয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। পরে ক্রুসেডাররা সেখানে যেয়ে আর কিছু পায় নি। শেষে একসময় রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে সে যুদ্ধ ত্যাগ করে নিজ দেশে চলে যায়, আর বলে যায় সে আবার আসবে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করতে। কিন্তু পরে আর কেউ পারেনি বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করতে।

কিন্তু না, ইসলামিক খিলাফতের শেষের দিকে যখন মুসলিম আমিররা ক্রুসেডারদের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলে মূলত তাদের দাসত্বকে গ্রহণ করল। তখনই ক্রুসেডাররা আবারো তুচ্ছ ও সংকীর্ণমনা জাতীয়তাবাদের নীতিতে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে দিল। আবারো ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিনে ইহুদীদের প্রবেশের মাধ্যমে মূলত নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করল। সেখানে মুসলিমদের হত্যা করল, তাদের নিজ ভুমি থেকে ছাড়া করল, গঠন করল সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র, আর সেটা কতিপয় নামধারি মুসলিম শাসকদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।

১১৯৩ সালের ৪ মার্চে অবশেষে ইসলামের মহান নেতা সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ইন্তিকাল করেন। সেদিন সমগ্র ফিলিস্তিনের নারী-পুরুষ তাদের ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে তাদের সুলতানের জন্য মাতম করছিল (যদিও মাতম করা ঠিক নয়)। নগরীর অলিতে-গলিতে কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছিল। আজও সেই কান্নার রোল শোনা যায় সেই ফিলিস্তিনের অলিতে গলিতে আজও তারা তাদের সেই সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকেই খুজছে ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে তাদের মুক্তির জন্য।

অবশেষে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ ক্রুসেডাররা ইসলামের সর্বশেষ খিলাফত থাকা অঞ্চল তুরস্ক থেকেও খিলাফতকে ধ্বংস করল। লর্ড কার্জন বলল, আমরা মুসলিমদের মেরুদণ্ড খিলাফতকে ধ্বংস করে দিয়েছি, তারা আর দাড়াতে পারবে না। তারা সেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবির কবরে লাথি মেরে বলল, উঠো সালাহুদ্দীন, তোমার বায়তুল মুকাদ্দাসকে রক্ষা কর। আর আমরা কি করলাম? পেরেছি কি সেই খিলাফতকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে? পেরেছি কি সেই বায়তুল মুকাদ্দাস কে রক্ষা করতে?

তৃতীয় ক্রুসেড

সালাউদ্দীনের বিজয় ইউরোপে তুমুল ক্ষোভ ও বিকম্পন সৃষ্টি করে। পোপ ৩য় আর্বান হার্ট এটাক করে মারা যান। স্মরণ রাখা দরকার যে ১০৯৯ সালে যখন জেরুজালেম ক্রুসেডরা দখল করে তখন পোপ ২য় আর্বানের মৃত্যু হয়। পোপ ৭ম গ্রিগোরি পালটা ক্রুসেড নিয়ে যাওয়ার জন্য আহবান করেন। জার্মানের ১ম ফ্রেড্রিক বারোসা, ফ্রান্সের ২য় ফিলিপস অগাস্টাস এক বিরাট বাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেন। পথে কোনো এক নদীতে ফ্রেড্রিক ডুবে মরেন। কুলক্ষণ ভেবে বা নিরাশ হয়ে তারা যাত্রা ভঙ্গ করেন।

১১৮৯ সালে ইংল্যান্ডের বাদশাহ তৃতীয় রিচার্ড সেকালের সবচেয়ে ভারী অস্ত্র ও কামান সহ ১৭,০০০ সৈন্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। গন্তব্যস্থলে পৌঁছিলে তার সাথে সিভিলিয়ান হয়ে থাকা ও পলাতক ক্রুসেডরা শরিক হন। তাছাড়া সেই অঞ্চলের খৃষ্টিয়ান সৈন্যরা যারা আগে বল্ডউন ও গীর অধীনে ছিল –তারাও সংঘবদ্ধ হন। অপরদিকে সালাউদ্দীনের সৈন্য সংখ্যা দিন দিন কমে আসছিল, কেননা তার লোকজন ছিল জেহাদ করতে আসা নানান অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ –যারা পরিবার পরিজন ও ক্ষেত-খামার রেখে বৎসরের পর বৎসর লেগে থাকার মত অবস্থানে ছিল না।

রিচার্ড বিপুল শক্তিতে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি একর, জাফা, কেসারিয়া এবং টায়ার –এই শহরগুলো মুসলমানদেরকে পরাজিত করে নিজ দখলে নেন। দু এক শহরে তুমুল যুদ্ধে কখন এই পক্ষ কখন সেই পক্ষ বিজয় লাভ করতে থাকে।

কিন্তু রিচার্ড প্রথমে একর দখল করেই সেখানে যুদ্ধাপরাধ করেন। তার হাতে ২,৭০০ মুসলিম সৈন্য ধরা পড়লে তিনি কয়েক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিয়ে মুক্তিপণে ফিরৎ দিতে রাজি হন। কিন্তু স্বর্ণ হস্তান্তর ও সৈন্য ফিরৎ পাওয়া প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে খানিক দেরি হলে তিনি সকল সৈন্যদেরে সারিবদ্ধ করে শিরচ্ছেন করেন।

অনেক তুমুল যুদ্ধের পর ১১৯২ সালে উল্লেখিত শহরগুলো তার কর্তৃত্বে রেখে এবং জেরুজালেম আক্রমণ না করেই রিচার্ড ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। রিচার্ড তখন আহত ছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি জেরুজালেম বিজয় করতে পারবেন বলে মনে করেননি অথবা বিজয় করলেও তা ধরে রাখতে পারবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন না। পরবর্তী বৎসর সালাদ্দিনের মৃত্যু হয়। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ক্রুসেডদের অনুশোচনা ছিল যে রিচার্ড যদি কোনো রকমে আরও একটি বৎসর থেকে যেতে পারতেন তবে সালাউদ্দীনের মৃত্যুতে তার উত্তরাধিকার নিয়ে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার সুযোগে জেরুজালেম আক্রমণ করা যেত এবং হয়ত বিজয় আসত। ইংল্যান্ড ফেরার কয়েক বৎসর পর অর্থাৎ ১১৯৯ সালে রিচার্ড মারা যান) ।

রোমান নিয়ন্ত্রন (৭০ – ৩২৪ খৃষ্টাব্দ)

৭০ খৃষ্টাব্দ- রোমানদের দ্বারা জেরুজালেম ধ্বংস।
১৩৫ খৃষ্টাব্দ- রোমান শহর হিসেবে জেরুজালেমের বিনির্মান।
বাইজান্টাইন নিয়ন্ত্রন (৩২৪ – ৬৩৮ খৃষ্টাব্দ)
৩৩৫ খৃষ্টাব্দ- চার্চ অব দ্য হলি সেপালচার নির্মান।
৬১৪ খৃষ্টাব্দ – পার্সিানদের জেরুজালেম দখল
৬২৯ খৃষ্টাব্দ – বাইজান্টাইন খৃষ্টানদের দ্বারা জেরুজালেম পূর্নদখল।
প্রথমবারের মতো মুসলিম নিয়ন্ত্রন (৬৩৮ – ১০৯৯ খৃষ্টাব্দ)
৬৩৮ – দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ) জেরুজালেমে প্রবেশ করেন।
৬৬১ – ৭৫০ খৃষ্টাব্দ- উমাইয়া খেলাফতের নিয়ন্ত্রন
৬৯১ খৃষ্টাব্দ- ডোম অব দ্য রক নির্মান।
৭৫০ – ৯৭৪ খৃষ্টাব্দ – আব্বাসীয়া খেলাফতের নিয়ন্ত্রন।
ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রন (১০৯৯ – ১১৮৭ খৃষ্টাব্দ)
১০৯৯ খৃষ্টাব্দ- প্রথম ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেম দখল করে।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী নিয়ন্ত্রন (১১৮৭ – ১২৫৯)
১১৮৭ খৃষ্টাব্দ- সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ক্রুসেডারতের থেকে জেরুজালেম দখল করেন।
১১২৯ – ১২৪৪ খৃষ্টাব্দ- ক্রুসেডাররা দুইবার স্বল্প সময়ের জন্যে জেরুজালেম দখল করে।
মামলুক নিয়ন্ত্রন (১২৫০ -১৫১৬)
১২৫০ খৃষ্টাব্দ- মুসলিম খলিফা জেরুজালেমের বহিঃদেয়াল ভেঙ্গে দেন।

 

অটোমান সাম্রাজ্য

১৫১৬ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের দ্বারা শাসিত হয় জেরুজালেম ও মধ্যপ্রাচ্য।
১৫১৭ খৃষ্টাব্দ- অটোম্যান সম্রাট জেরুজালেম দখল করেন।
১৫৩৮ – ১৫৪১ খৃষ্টাব্দ- অটোম্যান সম্রাট সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট জেরুজালেমের দেয়াল পূনঃনির্মান করেন।
১৯১৭ খৃষ্টাব্দ- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের পরে বৃটেন তুরষ্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে জেরুজালেম দখল করে নেয়।
বিভক্ত নিয়ন্ত্রন (১৯৪৮ – ১৯৬৭)
১৯৪৮ খৃষ্টাব্দ- ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হয় বৃটেন ও আমেরিকার সহায়তায়। এ বছর আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে জেরুজালেমের অর্ধেক সহ পুরনো জেরুজালেম জর্ডান কর্তৃক অধিকৃত হয়।
ইসরায়েলের দখল (১৯৬৭ – )
১৯৬৭ খৃষ্টাব্দ- আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল পুরানো জেরুজালেমের অর্ধেক সহ পুরো জেরুজালেম আবার দখল করে নেয়। এখনো সে দখলদারিত্ব বজায় আছে।

বৃটিশ শাসনামল

১৯১৭ সালে এমনই এক শীতার্ত ডিসেম্বরে ব্রিটিশ জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবি এসে পৌঁছালেন জেরুজালেমে। সদ্য অটোমান-তুর্কিদের হাত থেকে এ শহর জিতে নিয়েছে ব্রিটিশরা। তবে ঘোড়ায় চড়ে বিজয়ী বীরের মতো জয়োল্লাস করতে করতে নয়, ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে জাফা গেট দিয়ে শহরে ঢুকলেন তিনি। এত দিন জেরুজালেম একটি পবিত্র ধর্মস্থান হলেও তা রাজধানীর স্বীকৃতি পায়নি। ব্রিটিশরা সেই স্বীকৃতিই দিল। আর তারই সঙ্গে শুরু হয়ে গেল নতুন সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট। যে সংঘর্ষের এক দিকে রয়েছেন এই শহরের ভূমিপূত্র ফিলিস্তিনিরা। অন্য দিকে ইহুদিরা।
সারা ইউরোপ জুড়ে ইহুদি বিদ্বেষের তখন সবে সূচনা হয়েছে। ইউরোপের নানা জায়গায় নিজভূমে পরবাসী হতে থাকা এই ইহুদিদের কাছে, ব্রিটিশ শাসনে আসা ফিলিস্তিনের আকর্ষণ এড়ানো তাই ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠল। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের অধিকার তো আবার তাদের ধর্মমতে স্বীকৃত। ওখানেই ছিল তাদের দেশ। ফেরাউনদের হাতে বন্দি ইহুদিদের বাঁচিয়ে মুসা(আঃ) তো এই ভূমিতেই নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তাদের। অতএব দলে দলে ইহুদি শরণার্থী ভিড় জমালেন ফিলিস্তিনে, বিশেষ করে জেরুজালেম।শরণার্থীদের ভিড় অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় মানুষজনের কাছে কাম্য থাকে না। ফিলিস্তিনেও ছিল না। ১৫১৭ থেকে মুসলিম অটোমান শাসকদের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিদের কাছে অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হলো। ঠিক তার উল্টো প্রতিক্রিয়া ইহুদিদের মধ্যে। তাদের মধ্যে নিজেদের জন্য একটা দেশ তৈরির আকাঙ্খা তীব্র হতে থাকল। কিন্তু এই আকাঙ্খার পিছনে তখন ধর্মের থেকেও জাতীয়তা বোধ ছিল প্রবল। এর একটা কারণ, ইহুদিদের মধ্যে এই সময়ে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তাদের একটি বড় অংশ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন।
রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা এই ইহুদিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘাতের ক্ষেত্র ক্রমেই তৈরি হচ্ছিল। তৈরি হচ্ছিল ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদ। যার নেতৃত্বে ছিল নামকরা ফিলিস্তিনীয় পরিবারগুলি। এত দিন অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার সুবিধা যারা ভোগ করে এসেছেন। শুরু হয়ে গেল একের পর এক দাঙ্গা, রক্তপাত।পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ১৯৩৯ সালে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে আসার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করল ব্রিটিশ প্রশাসন। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অনেক ইহুদি আশ্রয়ের জন্য ফিলিস্তিনে আসতে পারেননি।

কলঙ্কিত বেলফোর ঘোষণাঃ

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর জারি করা বেলফোর ঘোষণাপত্রটি খুব বেশি বড় ছিল না। মাত্র ৬৭ শব্দেই শেষ করা হয় এটি। কিন্তু এর কারণে যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে, তা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবেই দেখা হয়। ওই ঘোষণার শতবর্ষ পূর্ণ হতে চললেও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত এখনো মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংকট।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ অ্যাভি শ্লায়ামের মতে, এই ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকারের গৌরবের কিছু নেই। বেলফোর ঘোষণা ছিল লজ্জাজনক এবং দুঃখজনক পদক্ষেপ। ব্রিটিশ সরকারের লজ্জায় মাথা নত করা উচিত।

বেলফোর ঘোষণা কী?

বেলফোর ঘোষণা ছিল ফিলিস্তিনে ‘ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠায় ১৯১৭ সালে যুক্তরাজ্যের করা একটি প্রতিশ্রুতি। তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এক চিঠিতে ব্রিটিশ ইহুদি নেতা লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে এই প্রতিশ্রুতি দেন। ফিলিস্তিন সে সময় অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ এবং সংখ্যালঘু ইহুদি জনগোষ্ঠীর আবাস। ওই এলাকার জনসংখ্যার দিক থেকে তারা ছিল মাত্র ৯ শতাংশ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) চলাকালীন ওই ঘোষণা আসে এবং অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে এতে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। তথাকথিত এই ম্যান্ডেট ব্যবস্থা মিত্রশক্তির দেশগুলো তৈরি করেছিল, যা ছিল আসলে ঔপনিবেশিকতা ও দখলদারিত্বের হালকা অবগুণ্ঠিত রূপ। বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়া পরাজিত হওয়ার পর এই ম্যান্ডেটের বলে বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মিত্রশক্তির করতলে আসে।

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের ওই এলাকায় গিয়ে বসবাসের সুযোগ করে দিতে থাকে। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সেখানে ইহুদি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। যদিও বেলফোর ঘোষণায় ‘ফিলিস্তিনের ইহুদি নয় এমন জনগোষ্ঠীর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘন করে এমন কিছু করা হবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি থাকলেও ব্রিটিশ সরকার সেখানকার ইহুদি জনগোষ্ঠীকে স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে থাকে।

কেন বিতর্কিত এই ঘোষণা

প্রয়াত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান শিক্ষাবিদ এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, ইউরোপের বাইরের একটি এলাকার বিষয়ে ইউরোপীয় একটি শক্তি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীর উপস্থিতি এবং ইচ্ছা বড় আকারে উপেক্ষিত হয়েছিল।

বেলফোর ঘোষণা বিতর্কিত হওয়ার এটাই সর্বপ্রথম কারণ। দ্বিতীয়ত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন বেলফোর ঘোষণার আগে ব্রিটিশরা ১৯১৫ সালে অটোমান সাম্রাজ্য থেকে আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বেলফোর ঘোষণার অর্থ ছিল, ফিলিস্তিন ব্রিটিশ দখলদারিত্বের অধীনে চলে আসবে এবং ফিলিস্তিনি আরবরা কখনোই স্বাধীনতা পাবে না।

ইসরাইল, শয়তানের অক্ষ রাষ্ট্রের উদ্ভবঃ

এরপরে ১৯৪৭-এ দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাধল। সমস্যা মেটাতে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল জাতিসংঘ। এক ভাগের অধিকার পাবে ইহুদিরা। অন্য ভাগে আরব ফিলিস্তিনীয়রা। আর জেরুসালেম! তার জন্য বিশেষ মর্যাদা। সে কোনও ভাগের অংশ হবে না। আন্তর্জাতিক একটি দল আলাদাভাবে এই শহরের দেখভালের দায়িত্বে থাকবে। পরিকল্পনা মেনে নিতে অস্বীকার করল আরবরা। নিজেদের অধিকারে থাকা অঞ্চলকে পরের দিন স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করল ইহুদিরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ইহুদি শরণার্থীদের আশ্রয় হয়ে উঠে জর্ডান সংলগ্ন অঞ্চল। ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করে দখল করতে শুরু করে আশপাশের এলাকা। ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেমও মুসলমানদের কাছ থেকে দখল করে নেয় ইসরায়েল। অস্ত্রের শক্তিতে জেরুজালেম দখলদারির এই বিরোধই ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। তারপর থেকে দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলে চলছে সহিংসতা। ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেখা হচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্তপাতের ইতিহাস । তৈরি হল ইসরায়েল। জেরুজালেমের পশ্চিম অংশের দখল থাকল তাদের হাতে। পূর্ব অংশ, যার মধ্যে শহরের পুরনো অংশ, ফিলিস্তিনিদের হয়ে দখলে রাখল জর্ডান। লাখ লাখ ফিলিস্তিনীয় ঘরছাড়া হলেন।

ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি নাকবা বা প্রস্থানের ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করা হয় বেলফোর ঘোষণাকে। যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ওই গোষ্ঠীগুলো সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম ২০ বছরের মধ্যেই জেরুজালেমকে ভাগ করে নেয়া হয়। সেখানে ইসরাইল পশ্চিম অংশ শাসন করতো আর জর্ডান নিয়ন্ত্রণ করতো জেরাজালেমের পূর্বাংশ। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর,  আরব ইসরাইল যুদ্ধে পুরো জেরুজালেম দখল করে নেয় ইজরাইল।

মজার কথা হলো, এরপরে বেশ কিছু দিন জেরুজালেমের অধিকারের জন্য দু’পক্ষ থেকেই তেমন দাবি ওঠেনি। জর্ডানের শাসক, রাজা প্রথম আবদুল্লা জেরুজালেম থেকে নিজেদের রাজধানী আমানকে ঢেলে সাজতে অনেক বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক চাপে ইসরায়েলের শাসকরাও সেভাবে জেরুজালেমকে নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। বরং তেল আবিব, হাইফা, আসকালোন-এর মতো শহরে উন্নয়নের জোয়ার আনতেই ব্যস্ত ছিল। ইসরায়েলের প্রথম দু’দশকের শাসকদের মধ্যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নেতাদের সংখ্যাও প্রভাব ছিল বেশি। এই নেতারা বুঝেছিলেন, জেরুজালেমের অধিকার পেলেও বা সেখানে রাজধানী বানালেও, কর্তৃত্ব বজায় রাখা বেশ শক্ত। আন্তর্জাতিক মহলও জেরুজালেম ভুলে, তেল আবিবে দূতাবাস খুলতে শুরু করে। তবে আরব-ইসরায়েল বিবাদ চলতেই থাকল।গোলমাল বড় আকার নিল ১৯৬৭ সালের জুনে। মিশরের তৎকালীন শাসক নাসের তাইরান প্রণালী দিয়ে ইসরায়েলের জাহাজ যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। মিশর-ইসরায়েল সীমান্তে সেনা সমাবেশ করলেন। নাসেরের উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখানোর। কিন্তু হঠাৎ পাল্টা বিমানহানা চালিয়ে সব ওলোট-পালোট করে দেয় ইসরায়েল। সে হানায় নাসেরের পুরো বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। পাশাপাশি গাজা ও সিনাই-এ স্থলযুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। এই অতর্কিত হানায় কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে মিশর।

নাসেরের চেষ্টায় সিরিয়া ও জর্ডানও যুদ্ধ নামে। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ছয় দিনের যুদ্ধের শেষে ইসরায়েল মিশরের কাছ থেকে গাজা ও সিনাই দখল করে নেয়। জর্ডান থেকে পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর আর সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়।
এই বিপুল জয় ইসরায়েলের মনস্তত্ত্ব পাল্টে দেয়। এখন আর কিছুই অসম্ভব নয়, এমন এক ধারণা তৈরি হয়। পাশাপাশি জেরুজালেম অধিকারে রাখা নিয়ে দাবি তীব্র হতে থাকে। এই জয়ের পরের পূর্ব জেরুজালেমে থাকা পবিত্র পশ্চিম দেয়ালে প্রার্থনা করার সুযোগও মেলে। এই সুযোগ হারাতে ইসরায়েল আর রাজি ছিল না। একই সঙ্গে ইসরায়েলের রাজনীতিতেও দক্ষিণপন্থী নেতাদের দাপট বাড়তে থাকে। যাদের রাজনীতির মূল ভিত্তিটাই এই অঞ্চলের ওপরে ধর্মীয় অধিকার স্থাপন করাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে শুরু করে। যা আরও ইন্ধন পায় ১৯৭৩ সালে।
সে বছরের অক্টোবরে ছয় দিনের যুদ্ধের শোধ তুলতে এক সঙ্গে আক্রমণ চালায় মিশর, সিরিয়া ও জর্ডান। হতচকিত হয়ে পড়ে ইসরায়েল। প্রথমে বেশ কিছু দখল করা এলাকার অধিকার হারাতে হয় তাদের। তার পর কিন্তু ইসরায়েল পাল্টা ঘুরে দাঁড়ায়। সাত দিন পরে দেখা যায়, দামেস্কের উপকণ্ঠে গোলাবর্ষণ করছে ইসরায়েলের গোলন্দাজ বাহিনী। আর সুয়েজ শহরে কোণঠাসা মিশরের সেনা।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শান্তি ফিরলেও আরব মনস্তত্ত্বে এই হারের গভীর প্রভাব পড়ে। ঠিক উল্টোটা হয় ইসরায়েলে। ১৯৭৭-এ ভোটে জিতে প্রথম ক্ষমতায় আসে দক্ষিণপন্থী লিকুদ পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হন মিনাহেম বিগিন। এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ত্বের সঙ্গে জেরুজালেমের অধিকার পাওয়া অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যায়।
সমাজতান্ত্রিক নেতাদের বদলে কড়া ও নরম দক্ষিণপন্থী নেতারাই ইসরায়েলের রাজনীতির ভিত্তি হয়ে ওঠেন। ১৯৮০-তে অখণ্ড জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইসরায়েল। যদিও পূর্ব জেরুজালেমকে পুরোপুরি করায়ত্ত করেনি তারা।
আহত ফিলিস্তিনীয় মনস্ত্বত্তের কাছেও জেরুজালেম ফিরে পাওয়া জয়ের সামিল। ১৯৯৩ সালে ওসলো শান্তি চুক্তিতে ফিলিস্তিনীয় প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পশ্চিম তীর ও গাজা শাসনের অধিকার পায় তারা। কিন্তু জেরুজালেম নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ, ১৯৯৩-এর মতো শান্ত পরিস্থিতিতেও এই আগুনে হাত ছোঁয়ানোর সাহস দেখায়নি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন। তারপর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে।
২০০০ সালে আল-আকসা মসজিদে বর্তমানে প্রয়াত নেতা অ্যারিয়েল শ্যারনের ঢোকা থেকে শুরু হয়ে ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াই, ইনতিফাদা। পাঁচ বছরে তিন হাজার ফিলিস্তিনীয় ও এক হাজার ইসরায়েলির প্রাণ গিয়েছে এই যুদ্ধে। এই সময়েই গাজায় নিজের অধিকার শক্ত করেছে হামাস। তাদের রকেট হামলার মোকাবিলায় বার বার টানা বিমানহানা চালিয়েছে ইসরায়েল। প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে সে শহর।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনীয় প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে গাজায় হামাসের নেতৃত্বের সম্পর্ক কখনই স্থিতিশীল হয়নি। ফলে ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রটিই গড়ে ওঠেনি।

 

ইসরায়েলি আগ্রাসনে ১০০ বছরের টানাপড়েন

১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর জেরুজালেম জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে আসে। এখানে বসবাস করা ইহুদি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের পর সব বদলে যায় এক নাটকীয় যুদ্ধে। সেই যুদ্ধের স্থায়ীত্বকাল ছিল মাত্র ৬ দিন। ১৯৬৭ সালের কথা। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে প্রতিবেশী আরব দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
৬ দিন স্থায়ী সেই যুদ্ধে নাটকীয়ভাবে ইসরায়েল শুধু আরব দেশগুলোকে পরাজিতই করেনি, তারা মিসরের কাছ থেকে গাজা তীর ও সিনাই উপত্যকা দখলে নিয়ে নেয়। এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে ওই অঞ্চলে। কারণ, একই সময় জর্ডানের কাছ থেকে ইসরায়েল দখল নেয় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম। অর্থাৎ এ সময় ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমের বাকি অংশসহ পুরনো শহর দখল করে নেয় এবং পশ্চিম অংশের সঙ্গে একীভূত করে পুরো এলাকাকে ইসরায়েলের অন্তর্গত করে ফেলে। বর্তমানে পুরো এলাকাটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। জেরুজালেমকে ইসরায়েল তাদের জাতীয় রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে। শরণার্থী হয়ে আসা ইহুদিদের যুদ্ধ, বিদ্রোহে মুসলমানদের হাত থেকে জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনের বড় অংশই আজ ইসরায়েল। সিরিয়ার কাছ থেকে নেয় গোলান উপত্যকা। যুদ্ধ আর থামেনি। দুই পক্ষের মিলিশিয়া বাহিনী দখল-বেদখলের এই লড়াইয়ে কেউ কখনোই পিছু হটেনি। হাজার হাজার যোদ্ধা, বিদ্রোহী প্রাণ দিয়েছেন। আরও সংঘবদ্ধ হয়েছে বিদ্রোহী দলগুলো। ফিলিস্তিনিরা বরাবরই দাবি করে আসছে তাদের স্বাধীন ভূমি। ইহুদি সেটেলাররা পূর্ব জেরুজালেম ধীরে ধীরে দখলে নিয়ে যাওয়ার এই ইতিহাস কারও অজানা নয়। বিভিন্ন যুদ্ধ-বিদ্রোহে ঘর হারানো ইহুদিরা ফিলিস্তিনের একাংশের দখল নিয়ে এই টানাপড়েনের শুরু হয়। মুসলমানরাও তাদের স্বাধীন ভূমির দাবিতে সোচ্চার। ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ আগ্রাসন ওই অঞ্চলে মুসলমানদের জীবন আরও জটিল ও সংকটময় করে তুলে। জেরুজালেমকে দখলে রাখতে মরিয়া ইসরায়েল। নানা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অস্ত্রের শক্তিতে ইসরায়েলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিনের শান্তি এখন স্বপ্ন।

জেরুজালেমের পুরনো শহরটি চারটি অসমান অংশে বিভক্ত। তবে বর্তমান অবস্থাটি ১৯ শতক থেকে চালু হয়েছে। বর্তমানে শহরটি মোটামুটিভাবে মুসলিম মহল্লা, খ্রিষ্টান মহল্লা, ইহুদি মহল্লা ও আর্মেনীয় মহল্লা নামক ভাগে বিভক্ত। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পুরনো শহরটি জর্ডান কর্তৃক অধিকৃত হয়। ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে টেম্পল মাউন্টের উপর দুপক্ষের মধ্যে মুখোমুখি লড়াই হয়। এসময় ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমের বাকি অংশসহ পুরনো শহর দখল করে নেয় এবং পশ্চিম অংশের সাথে একীভূত করে পুরো এলাকাকে ইসরায়েলের অধিগত করে নেয়। বর্তমানে পুরো এলাকাটি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে এবং তারা একে ইসরায়েলের জাতীয় রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে।
১৯৮০ সালের জেরুজালেম আইন নামক আইন যেটিতে পূর্ব জেরুজালেমকে কার্যকরভাবে ইসরায়েলের অংশ ঘোষণা করা হয় তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাব ৪৭৮ দ্বারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্ব জেরুজালেমকে অধীকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলের অংশ হিসেবে গণ্য করে।
জেরুজালেমের ইতিহাস প্রায় ছয় হাজার বছরের পুরানো। ধারনা করা হয় ৩৫০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে শহরটি প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়। এরপরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এটি শাসন করে। ৬১০ খৃষ্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর নবুয়ত লাভের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু হয়। এর পরবর্তী ১৪০৭ বছরের মধ্যে ১১২৭ বছরই মুসলমানরা জেরুজালেমে কর্তৃত্ব করে। বাকী ২৩০ বছর সময় পারসিয়ান, খৃষ্টান ও ইহুদীরা জেরুজালেমে কর্তৃত্ব করে। বর্তমানে এটি ইজরায়েলের ইহুদীদের দখলে রয়েছে। আমেরিকা-রাশিয়া সহ ইজরায়েলের কয়েকটি ঘনিষ্ট রাষ্ট্র ব্যতিত আর কেহ এটি সমর্থন করে না।
বাইবেল অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ১১শ শতকে রাজা দাউদ (সম্ভাব্য হযরত দাউদ আঃ) এর জেরুজালেম জয়ের পূর্বে শহরটি জেবুসিয়দের বাসস্থান ছিল। বাইবেলের বর্ণনা মতে এই শহর মজবুত নগরপ্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। রাজা দাউদ কর্তৃক শাসিত শহর যেটি দাউদের শহর বলে পরিচিত তা পুরনো শহরের দেয়ালের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। তার পুত্র রাজা সুলায়মানের (সম্ভাব্য হযরত সুলায়মান আঃ) শহরের দেয়াল সম্প্রসারিত করেন। এরপর ৪৪০ খ্রিষ্টপূর্বের দিকে পারস্য আমলে নেহেমিয়া ব্যবিলন থেকে ফিরে আসেন ও এর পুনর্নির্মাণ করেন। ৪১-৪৪ খ্রিষ্টাব্দে জুডিয়ার রাজা আগ্রিপ্পা “তৃতীয় দেয়াল” নামক নতুন নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেন।

ধর্মীয় গুরুত্ব :

তিনটি প্রধান ধর্মের (ইসলাম, খ্রিস্টান, ইহুদি) কাছেই জেরুজালেম অত্যন্ত পবিত্র জায়গা। ইসলাম ধর্মমতে, মুসলিমদের অন্যতম ধর্মীয় স্থান আল-আকসা; জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদ আল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মহানবী হযরত মুহম্মদ (স) মেরাজে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
ইহুদিরা মনে করে, এখানেই তাদের আদি নিবাস। ইহুদিদের পবিত্র ভূমিখ্যাত টেম্পল মাউন্ট বা ঈশ্বরের ঘর, যা মুসলিমদের কাছে পবিত্র কুব্বাত আস-সাখরা। টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে থাকা ওয়েস্টার্ন ওয়াল ইহুদিদের কাছে পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে স্বীকৃত। আবার যিশুখ্রিস্টের বহু স্মৃতিবিজড়িত গির্জার কারণে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পবিত্রতার দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, জেরুজালেমের বেথেলহামে যিশুর জন্ম আর এই শহরেই ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছিল যিশুকে।

 

১০০ বছর পরে সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরও ইন্ধন জোগালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আরও চওড়া হয়ে গেল বিরোধের খাদটি। আবার রাস্তায় নেমেছে ফিলিস্তিনীয়রা। আন্দোলন শুরু করেছে। দৃশ্যত খুশি ইসরায়েলও তা প্রতিরোধে নামবে। আর আন্তর্জাতিক মহল? জাতিসংঘের গর্ভগৃহে নতুন কোনও প্রস্তাব পাশ করে চেয়ে থাকবে।

ইহুদি রাজধানী হিসাবে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার আলোকে মুসলমানদের অবশ্যই ইতিহাসের যে প্রাথমিক রূপরেখাটি জানা উচিত:
১৮৯৭ : সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব জায়ানিস্ট কংগ্রেস।
– ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি বাড়ি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
– প্রায় ৫০ বছর যাবত বিশ্বের অধিকাংশ ইহুদী এই জায়ানবাদের (ইহুদিবাদের) বিরোধিতা করেছিল (হোলোকাস্ট পর্যন্ত)
– এ সময় ইহুদীরা ফিলিস্তিনে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সাথে শান্তিতে বসবাস করত এবং তারা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩% ।
১৯১৭ : বেলফোর ঘোষণা
– যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হন।
– প্রায় ১১% ভূমি এসময় ইহুদীরা দখল করে নিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইউরোপ থেকে আসা জায়ানবাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং তাদের আর্থিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল।
১৯২২ : লীগ অফ নেশনস যুক্তরাজ্যকে প্যালেস্টাইনের জন্য একটি ম্যান্ডেট প্রদান করে।
– কার্যতঃ ব্রিটেনকে সেখানে বসবাসকারীদের অনুমতি ছাড়াই জমিটির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।
– কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের এই আগমনকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করলে, জায়ানবাদীরা গোষ্ঠীর সন্ত্রাসীরা তাদের আক্রমণ করে (সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত কিং ডেভিড হোটেলের বোমাবর্ষণ, যাতে প্রায় একশ লোক মারা গিয়েছিল)। ফলে ব্রিটেন বুঝতে পেরেছিল যে তারা একটি গভীর গর্তে গিয়ে পড়েছে। প্রতিক্রিয়াতে,তারা কেবল এটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৯৪৮ পরবর্তী: ইসরায়েল জাতি রাষ্ট্র তৈরি করা হয়
– ঠিক সে সময়, প্রায় এক মিলিয়ন ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক ভূমি থেকে বের করে দিয়ে ইসরায়েল জমিগুলো দখল নিয়ে নেয়।
– দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েলে ইউরোপীয় ইহুদিদের ব্যাপক অভিবাসন ঘটতে থাকে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারনে ক্রুসেডের পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েল অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখন্ডে পরিণত হয়।
– জাতিসংঘ চুক্তির আওতায় জেরুজালেম জর্ডান (পূর্ব জেরুসালেম) এবং ইসরায়েল (পশ্চিম জেরুসালেম) উভয়ের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হত।
১৯৬৭ : ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম আক্রমণ করে তা দখল করে। আল আক্বসা কমপ্লেক্সটি বোমায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এখন জেরুজালেম ইসরায়েল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
১৯৬৭-ডিসেম্বর ২০১৭: ইতিহাসকে উপলব্ধি করে এবং জাতিসংঘ জেরুজালেমকে মুসলমান ও ইহুদীদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এই চিন্তা থেকে বিশ্বের কোন দেশ জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
– ইসরায়েলের বাইরে ট্রাম্প বিশ্বের প্রথম নেতা যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক রাজধানী বিবেচনা করে।
বর্তমান পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েলের প্রায় ৭৫% ইহুদি ঘরানার এবং ১৭% মুসলমান।

মার্কিন দূতাবাসকে তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করতে ১৯৯৫ সালেই একটি আইন প্রণয়ন করে মার্কিন কংগ্রেস। ট্রাম্পও দ্বিতীয়বারের মতো সেই সিদ্ধান্তটাই নিলেন। এই বিষয়টা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবার উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে চরমভাবে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আরব লীগ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ফিলিস্তিন ছাড়াও সৌদি আরব, আমিরাত, তুরস্ক, জর্ডান, ফ্রান্স, কাতার, মিসর, মরক্কো, কুয়েত, জার্মানি ও ইরাক সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছে। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে বলেন, ‘জেরুজালেমের ঐতিহাসিক ও বৈধ মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়াই উচিত।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এটা শুধু জর্ডান বা ফিলিস্তিনের নাগরিকদের নয়, পুরো আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিষয়।’
এদিকে জেরুজালেম নিয়ে সীমা লঙ্ঘন না করতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ইসরায়েলি রাজধানীর স্বীকৃতি দিলে তেল আবিবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের হুমকি দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহ, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ও সৌদি আরবের বাদশা সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। তারা সবাই ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা এমন সিদ্ধান্তে শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। উন্মাতাল হয়ে পড়তে পারে পুরো অঞ্চল। এদিকে ইসরাইলের একজন সিনিয়র মন্ত্রী ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বলেছেন, যেকোনো সহিংসতা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছেন তারা। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সারা বিশ্বের চোখ এখন ইজরাইলে। সামনের ইতিহাস কিভাবে লেখা হবে। বলা যায় না এখনো। আল জাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটর
ঠিক ১০০ বছর আগের কথা। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাস। অটোম্যান তুর্কিদের কাছ থেকে এই দিনেই বৃটিশ জেনারেল এডমান্ড অ্যালেনবি জেরুজালেমের দখল নিয়ে নেন। সেদিন জেনারেল অ্যালেনবি শহরের পবিত্রতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন খালি পায়ে। এরপর গত ১০০ বছর ধরে, জেরুজালেম নিয়ে নানা রকম লড়াই হয়েছে। শুধু ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমানই নয়, বহিঃশক্তিও এসেছে সমীকরণে। আধুনিক যুগে ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি লড়াই তার অন্যতম।

ইসরায়েলের অবস্থান :

১৮৪৮ সালে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই ইসরায়েল জেরুজালেমের পশ্চিমাংশে দেশের সংসদ ভবন স্থাপন করে। ১৯৬৭ সালে আরবদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমও দখল করে নেয় এবং পুরো জেরুজালেম শহরটিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৮০ সালে আইন জারি করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী দাবি করলেও ফিলিস্তিনিরা ও অন্য কোনো রাষ্ট্র এটির স্বীকৃতি দেয়নি। মুসলমান ও ফিলিস্তিনিদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাকর বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশে বিভিন্ন সময় নিয়ন্ত্রণ করে সহিংসতায় জড়ায় ইসরায়েল। সর্বশেষ এ বছরের জুলাইয়ে মাউন্ট টেম্পলে সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ বন্ধ রাখে। প্রবল প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক চাপে ১৭ দিন পর প্রবেশদ্বার খুলতে বাধ্য হয় ইসরায়েল। ট্রাম্প জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, জেরুজালেমের দীর্ঘদিনের ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে। এ ছাড়া তিনি ট্রাম্পকে অনুসরণ করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

ফিলিস্তিনিদের অবস্থান :

ফিলিস্তিনিরা কোনো দিনই জেরুজালেমের দখল মেনে নেয়নি। গত দশকগুলোয় পূর্ব জেরুজালেমের বহু জায়গায় ইহুদি বসতি বানিয়েছে, কিন্তু তার পরও এখানকার সিংহভাগ বাসিন্দা ফিলিস্তিনি, যারা বহু বছর ধরেই এই শহরে বসবাস করছে। তারা চায়, পূর্ব জেরুজালেম হবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী। ফিলিস্তিনি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দিয়ে দেওয়া। এ বছরও হামাস নেতারা জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে ফিলিস্তিনের সীমারেখা প্রস্তাব করেন, কিন্তু ইসরায়েল তা নাকচ করে দেয়। গত শুক্রবার রামাল্লা, বেথলেহেম, হেবরনসহ বিভিন্ন শহরে জুমার নামাজের পর ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে তারা। এ সময় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কয়েক জায়গায় সংঘর্ষ ও কয়েকজন হতাহত হয়েছে। আটক করা হয়েছে অনেককে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গতকাল মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও শহরে শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। আবার ট্রাম্পের ঘোষণার পরদিন বৃহস্পতিবার নতুন করে গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নানামুখী উদ্যোগ :

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্তটি বেশ পুরনো। ১৯৯৫ সালেই মার্কিন কংগ্রেস অনুমোদিত এক আইনে ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তার পরবর্তীরা ক্ষমতায় থাকাকালীন ওই প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৩ সালে হোয়াইট হাউসে বিল ক্লিনটনের মধ্যস্থতায় অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন। এর মাধ্যমে আইএলওকে স্বীকৃতি দেয় ইসরায়েল এবং পরে পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করে চুক্তিটি। সমস্যা নিরসন না হওয়ায় এরপর ১৯৯৫, ১৯৯৮, ২০০০ ও ২০০১ সালে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বিল ক্লিনটন। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিলিস্তিন সফরে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দুটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তিনি ফলপ্রসূ হতে পারেননি। জর্জ বুশ ক্ষমতায় এসে দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এবং ফিলিস্তিন, ইসরায়েল ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনায় বসেন। এ আলোচনা থেকে ইসরায়েল একটি রাষ্ট্রের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। কিন্তু শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত এগোয়নি। মার্কিনিদের ইরাক আক্রমণে ফিলিস্তিন নেতা ইয়াসির আরাফাতের অবস্থানকে তিনি সন্ত্রাসমূলক বলে আখ্যা দেন। ফলে ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে বুশের কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে, বিরোধ বাড়তে থাকে ইসরায়েল ও বুশের সম্পর্ক। এরপর ইয়াসির আরাফাতের রহস্যময় মৃত্যু, ফিলিস্তিনি গণঅভ্যুত্থানের ফলে দ্বিপক্ষীয় সহিংসতা আরও বাড়তে থাকে। ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকে কয়েকবার শান্তি ও সমঝোতার আশ্বাস দিলেও ইসরায়েলের ওপর প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল জর্জ বুশ সরকারের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে ওয়াশিংটনে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগ দেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ও জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহ। আলোচনা এগোলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই ওবামার উদ্যোগ থমকে যায়। শুরু হয় নতুন সংকট। ওবামা সরকারের কার্যক্রমও সমঝোতাবিহীন বৈঠক ও আশ্বাসেই সীমিত থাকে।
জেরুজালেম সমস্যা নিরসনে আশ্বাস ও ফিলিস্তিনিদের উন্নয়নে অনুদান দিলেও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবেই কাজ করেছে ওবামা সরকার। এরপর ক্ষমতায় আসা ডোনাল্ড ট্রা¤প শুরু থেকেই ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছিলেন। যদিও একবার ফিলিস্তিন সফরে তিনি সহিংসতা নিরসন ও শিগগিরই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দেন, কিন্তু গত ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন করে সহিংসতার পথ খুলে দিলেন।

বর্তমান সংকট

গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এর মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম, যারা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিল। তিন ধর্মের তীর্থস্থান হিসেবে স্বীকৃত জেরুজালেমকে শুধু ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণায় ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একে অগ্রহণযোগ্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘোষণার কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা হচ্ছে। গত শনিবার জাতিসংঘ ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেয়। মার্কিন মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব, পাকিস্তানও ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ট্রাম্পের এ ঘোষণার সমালোচনা করে।

চলমান ইসরাইলফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের কেন্দ্র এলাকায় অবস্থিত ইসলামের তৃতীয় পবিত্র মসজিদ আলআকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাসসহ মুসলিমদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বলা হয়, মুসলিমদের প্রথম কিবলা আলআকসা; বিশ্বাস, শবে মেরাজের রাতে এখান থেকেই আসমানে যাত্রা করেছিলেন মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামযুগে যুগে অসংখ্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সাক্ষী হওয়া পুরো নগরীকে নিজেদের রাজধানী দাবি করে ইসরাইল। কিন্তু পূর্ব জেরুজালেম নামে পরিচিত শহরের পূর্ব অংশে ইসরাইলিদের দখলদারিত্ব মানতে নারাজ শত শত বছর ধরে অঞ্চলটিতে বসবাসরত ফিলিস্তিনিরাকেবল মুসলিমরা নন, পুরো জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী করার বিরোধী খ্রিস্টানরাও

তিন ধর্মের কাছে পবিত্র বলেই আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়ায় জেরুজালেমের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সমঝোতা ছিল, ইসরাইলফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায় সবার শেষে নির্ধারিত হবে জেরুজালেমের মালিকানা।ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তাদের দাবিকৃত জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে কোনো রাষ্ট্রই স্বীকৃতি দেয়নি। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে কয়েকদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। বিশ্বের শীর্ষ নেতা ও রাষ্ট্রনায়করাও মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করছিল— এ ধরনের বিতর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে। এমনকি জাতিসংঘের শীর্ষ পর্যায় থেকেও ট্রাম্পকে বলা হয়েছিল, এ ধরনের মন্তব্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে সংকট আরও চরম রূপ নেবে। কিন্তু মিডিয়ার প্রবল সতর্ক বার্তা, সমালোচনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির কথা বলেন। ইসরায়েলের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ফিলিস্তিনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দিয়ে পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তুললেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের এই মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বিশ্ববাসী। ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে আরও দূরত্ব তৈরি হলো। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে তখন ট্রাম্পের এমন ঘোষণা স্পষ্টতই প্রমাণ করে, এই অঞ্চলের দীর্ঘ বিদ্রোহ, আন্দোলন ও রক্তপাতের ইতিহাস আরও দীর্ঘায়িত করারই প্রচেষ্টা। সবাইকে অগ্রাহ্য করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে। অনেক আগেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। তার বিতর্কিত এই মন্তব্যের পর তিনি তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের কাজ শুরু করতে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকৃতি দেওয়ার পর বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এমনকি ব্রিটেন, ফ্রান্স, সৌদি আরবের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোও এই স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ আর ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে বর্ণনা করেছে সৌদি আরব। ফ্রান্স, জার্মানি আর যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ওই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এটা খুবই গভীর উদ্বেগের সময়। কারণ দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ছাড়া এর আর কোনো বিকল্প নেই। তার ঘোষণায় ক্ষোভে ফুঁসছে ফিলিস্তিন। প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে হাজারো ফিলিস্তিনি। ট্রাম্পের এই খবরদারি মন্তব্যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। হোয়াইট হাউসের ডিপ্লোমেটিক রিসেপশন রুম থেকে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে। ট্রাম্পের বক্তব্য শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই তার ঘোষণার প্রশংসা করেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা বলছেন, একেবারেই ভিন্ন কথা। তাদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ সিদ্ধান্ত্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ফিলিস্তিনের বিদ্রোহী দল হামাস বলেছে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে নরকের দরজা খুলে দেবে। ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আগে থেকেই সতর্ক বার্তা দিয়েছিলেন অনেক বিশ্বনেতা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে ওই অঞ্চলের আরব নেতারা ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন ও তাকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তার এই পদক্ষেপে অঞ্চলটিতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের কারণ হলো তাদের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *