আরাকানে ব্যস্ত ভারত-চীন, বাংলাদেশ শুধু দর্শক

প্রায় হঠাৎ করেই যেন ভারতের বিদেশনীতির মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে আসিয়ান অঞ্চল। ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা একের পর আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় যাচ্ছেন এবং নানান উপায়ে ভারতের উপস্থিতি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা চলছে। আর প্রতিটি সফর শেষেই ভারতীয় প্রচারমাধ্যমে পূর্বাঞ্চলীয় মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার বাড়তি তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কারণ, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির শুরুর বিন্দু মিয়ানমার। আর মায়ানমার-ভারত সম্পর্কের শুরুর বিন্দু হয়ে উঠেছে এখন কালাদান বহুমুখী প্রকল্প। এই প্রকল্প কীভাবে মায়ানমার-ভারত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চলেছে এবং বাংলাদেশের জন্য তার প্রতিক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে ঢাকার সামান্যই মনোযোগ আছে বলে মনে হয়।

মিয়ানমার ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিবেশী হলেও দেশটিতে দিল্লির বাণিজ্যিক অভিলাষের বিকাশ চীনের তুলনায় সামান্যই। উভয় দেশের ব্যবসায় এখনো মাত্র দুই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা চীনের তুলনায় বহু গুণ কম। উভয় দেশের প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকলেও সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম অতি নগণ্য। এমন পরিস্থিতিতে কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে দিল্লি মায়ানমারের ওপর বড় এক বাজি ধরেছে বলা যায়।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রপথে ভারতের পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলের সঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতা বন্দরের সঙ্গে প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার দূরের আরাকানের আকিয়াব হয়ে মিজোরাম-নাগাল্যান্ড অঞ্চলের যোগাযোগ গড়ে তোলা। এটা একই সঙ্গে ট্রানজিট ও ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প হবে। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের আরাকান ও চিন রাজ্য জুড়ে সমুদ্রপথ, নদীপথ এবং সড়কপথ মিলে একটা করিডর তৈরি হবে। উল্লেখ্য, সড়কপথে কলকাতার সঙ্গে আরকানের দূরত্ব ২ হাজার ৬৪২ কিলোমিটার। আর কালাদান প্রকল্পের মধ্য দিয়ে সেটা হবে ৫৪০ কিলোমিটারের নৌ-দূরত্ব মাত্র।

এই প্রকল্পের পাঁচটি দিক রয়েছে। প্রথমেই আকিয়াবে নির্মাণ করা হয় বড় কার্গো আসার উপযোগী একটি বন্দর, যা এখন ‘সিতউই বন্দর’ নামে পরিচিত। ভারতের এসার কোম্পানি এই নির্মাণের ঠিকাদার। দ্বিতীয় পর্যায়ে সিতউই থেকে মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পালিতওয়া পর্যন্ত ১৬০ কিলোমিটারজুড়ে কালাদান নদী ড্রেজিং করা হয়। তৃতীয় পর্যায়ে পালিতওয়া থেকে ভারতের মিজোরাম পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের মহাসড়ক নির্মাণ করা হয় এবং চতুর্থ পর্যায়ে মিজোরামের ভেতরে তৈরি হয় প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের মহাসড়ক। এটা যাচ্ছে লমাসু (মিজোরামের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম) থেকে মিজোরামের লাই জেলার লংটালাই পর্যন্ত। এই সড়ক ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়েতে (৫৪) কালাদান প্রকল্পকে যুক্ত করবে। সেটা যুক্ত হবে লংটালাই থেকে আসামের ডাবাকা পর্যন্ত অপর এক মহাসড়কে। এই পুরো প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডর ও আসাম দিয়ে ঘুরে আসার ব্যয়ভার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবে। কিন্তু এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু এটুকুই নয়।

উল্লেখ্য, উপরিউক্ত চার অংশ নিয়ে সমগ্র কালাদান প্রকল্পটি ভারতের দায়িত্বেই সম্পন্ন হয়েছে, কেবল তৃতীয় অংশে মিয়ানমারের অংশীদারত্ব ছিল। ২০০৮ থেকে এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে তা চালুর কথা থাকলেও কেবল এই বছর শিগগির তা উদ্বোধন হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘ প্রায় এক দশকে কালাদান প্রকল্পটি চালু করতে না পারা ভারতের জন্য বিরাট এক হতাশার বিষয়। এই প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ার মূল কারণ অবশ্যই মিয়ানমারে চীনের প্রভাব। প্রকল্পের তৃতীয় অংশটিতেই ভারতের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটছে বেশি। তবে বিলম্বের আরেকটি ক্ষুদ্র কারণ ছিল প্রকল্প নিয়ে কালাদান নদীর দুই পাড়ের মানুষের আপত্তি। এই নদীর অববাহিকায় যে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বাস। এই নৌ ও স্থল করিডর তাদের জীবন-জীবিকাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে শুরু থেকেই তারা প্রতিবাদী। এমনকি বিশাল এই প্রকল্প শুরুর আগে তার কোনো পরিবেশগত প্রতিক্রিয়াও যাচাই করে দেখা হয়নি। নির্মাণকাজ শুরুর দীর্ঘ সময় পরও প্রকল্প সম্পর্কে জরুরি অনেক তথ্যই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। পরবর্তীকালে ‘কালাদান আন্দোলন’কারীদের চাপেই কেবল এই প্রকল্পের বিস্তারিত প্রচারমাধ্যমে আসতে থাকে।

এদিকে পুরো প্রকল্প চালু হতে বিলম্ব হলেও সিতউই বন্দর এলাকা এবং বিশেষভাবে কালাদান নদীতে ভারতকে নিয়মিতভাবে ড্রেজিং চালু রাখতে হচ্ছে, যা এই প্রকল্পকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তুলেছে। তবে শিগগির প্রকল্পটি চালু করতে ভারত এখন মরিয়া। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট এ ক্ষেত্রে ভারতের জন্য বাড়তি সুযোগ এনে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিঃসঙ্গ মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত কার্যত কালাদান প্রকল্পে মিয়ানমারের উৎসাহ আরো বাড়িয়ে তুলেছে মাত্র।

তবে ভারতের মিয়ানমারকেন্দ্রিক উচ্চাশা কেবল কালাদান করিডরের মধ্যে আটকে নেই। আকিয়াবের পন্নাগুনে তারা এক হাজার একরজুড়ে একটা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও করতে যাচ্ছে। বলা বাহুল্য এটা পার্শ্ববর্তী কাইয়াকপুতে চীনের বিশেষ ইকোনমিক জোনকে চ্যালেঞ্জ করেই করা হচ্ছে। উপরন্তু, ভারতের স্বপ্ন রয়েছে কালাদান প্রকল্প সফলভাবে চালু হয়ে গেলে তারা সিতউই থেকে আইজল ও শিলিগুড়ি পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন বসাতে পারবে।

এ ছাড়া ভারত মণিপুর থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত একটি ত্রিদেশীয় সড়ক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছে। এটাও আকিয়াবের ওপর দিয়েই যাবে। মোদি এ বছরের শুরুতে আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশের নেতৃবৃন্দের কাছে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ত্রিদেশীয় সড়কের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে বোঝাতে চেয়েছেন, এটাই হবে ভারতে আসিয়ান দেশগুলোর বাজার সম্প্রসারণের মূল করিডর। এই পথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৬৯টি সেতুও বানাতে চায় ভারত। বিরাট এই প্রকল্পের যাত্রা নির্ভরশীল কালাদান প্রকল্পের সফল আরম্ভের ওপর। এবং এও বলা বাহুল্য, চীনের বেল্ট এন্ড রোডের মোকাবিলা হিসেবেই মণিপুর-মান্দালয়-আকিয়াব-ব্যাংকক হাইওয়ে নিয়ে অগ্রসর হতে যায় দিল্লি।

এদিকে ভারত যখন আরাকানে কালাদান প্রকল্প উদ্বোধন করতে হিমশিম খাচ্ছে তখন চীন একই এলাকায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল এক তেল পাইপলাইন তুমুল বেগে শেষ করে ফেলেছে। এই পাইপলাইন কার্যত তাদের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের অংশ। ৭৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন বসেছে আরাকানের কাইয়াকপু বন্দর থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়ে আসা অপরিশোধিত জ্বালানি কাইয়াকপু বন্দরে এনে তা মিয়ানমারের ভূমির ওপর দিয়ে তার মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবহারকারী চীন। কিন্তু এত দিন জ্বালানি তেলের অনেকখানিই তাকে দক্ষিণ চীন সাগর দিয়ে আনতে হতো। কিন্তু সে অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার শিকার হওয়ায় আরাকানের কাইয়াকপু বন্দর হয়ে উঠছে বিকল্প পথ। আর এই নতুন পাইপলাইন তাকে জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বাড়তি খরচ থেকেও রেহাই দিয়েছে। বর্তমানে চীন আকিয়াব পথে বছরে ২২ মিলিয়ন টন জ্বালানি নিচ্ছে। যদিও এটা তার মোট জ্বালানি চাহিদার ৬ শতাংশ মাত্র, কিন্তু ইউনান অঞ্চলের জন্য এটা বিরাট এক সমাধান।

এই তেল পাইপলাইন ২০১৫ সালে চালু হওয়া আরাকান থেকে চীন পর্যন্ত ৭৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস পাইপলাইনের অতিরিক্ত। এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কাইয়াকপু বন্দরের পশ্চিমের শিউউ গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে যে গ্যাস চীনে যাচ্ছে, সেটা একদা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পাইপলাইনে করে ভারতের দিকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। ২০০৫ সালে চীন ছোঁ মেরে এই গ্যাস তার জিম্মায় নিতে সক্ষম হয়। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৩০ বছর ধরে আরাকান উপকূলের ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন গ্যাস যাচ্ছে চীনে।

রাখাইনের কিয়াউকফুতে চীনের তৈরি তেলের ট্যাংকার ভেড়ার জেটি। ছবি: রয়টার্স

রাখাইনের কিয়াউকফুতে চীনের তৈরি তেলের ট্যাংকার ভেড়ার জেটি। ছবি: রয়টার্সবিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের উপরিউক্ত দুটি তেল ও গ্যাস পাইপলাইন যে আরাকানে চীনের জন্য আপসহীন এক ভূরাজনৈতিক স্বার্থ তৈরি করেছে, বাংলাদেশ হয়তো সেটা খেয়ালই করেনি। কালাদান প্রকল্পের মতোই চীনের দুটি পাইপলাইন প্রকল্পও প্রায় ৮-১০ বছর আগে শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশ কেন এত দিন এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ তাৎপর্য বুঝতে পারেনি, তা বোধগম্য নয়।

আকিয়াবজুড়ে ভারত ও চীনের দুটি বন্দর, ভারতের কালাদান প্রকল্প এবং চীনের দুটি পাইপলাইন প্রকল্পের পাশাপাশি ভারতের ত্রিদেশীয় মহাসড়ক নির্মাণের মরিয়া চেষ্টা স্বভাবত মিয়ানমার উপভোগ করছে। কারণ, এমন প্রতিটি প্রকল্প থেকে দেশটির শাসকেরা একদিকে যেমন প্রচুর রাজস্ব পাচ্ছে, অন্যদিকে তাদের দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে। আরাকান মিয়ানমারের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা রাজ্য হওয়ার পরও বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষত চীন ও ভারতের জন্য আরাকান তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের মতোই গুরুত্ববহ। বাংলাদেশ গত ১০ বছর আরকানজুড়ে বিকাশমান উপরিউক্ত বাস্তবতা যে বুঝতে কেবল ব্যর্থই হয়েছে তা-ই নয়, কালাদান প্রকল্প চালু হওয়া মাত্র ভারতের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও যে অনেক কমে যাবে, সেটাও উপলব্ধি করতেও ব্যর্থ হয়েছে। যেটা বিশেষভাবে দেখা যায়, ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট আলোচনার অগোছালোপনা ও অস্পষ্টতা দেখে। কালাদান প্রকল্প চালু হলে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশে ওপর আর বেশি নির্ভরশীল থাকবে না। ত্রিপুরা ও মেঘালয় ব্যতীত উত্তর-পূর্ব অন্য রাজগুলোতে ভারত কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে সহজে বাণিজ্যসহ তার সব ধরনের তৎপরতা চালাতে পারবে কম সময়ে এবং কম ব্যয়ে। উপরন্তু, ওই সব রাজ্যে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যসুবিধা ছিল, কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে তারও অবসান ঘটবে বলে অনুমান করা যায়। কলকাতা ও সিতউই বন্দরের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যই আইজল, কোহিমা ও গুয়াহাটিতে পৌঁছাবে ঢাকার পণ্যের আগে আগে।

আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *