আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড যেভাবে অকার্যকর রাষ্ট্র হলো

ব্রিটেন ও ইতালির দখল থেকে সোমালিয়া স্বাধীন হয় ১৯৬০ সালে। তার পর থেকে প্রায় এক দশক কাল দেশটি গণতন্ত্র উপভোগ করে। এ সময় দেশটির শান্তি ও সমৃদ্ধি তাকে এনে দেয় ‘আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড’ পরিচিতি। সোমালিয়ার প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আদম আবদুল্লাহ ওসমান। তিনি ব্রিটেন ও ইতালি-শাসিত অঞ্চলগুলোকে পুনরেকত্রিত করে ‘আধুনিক সোমালিয়া’ প্রতিষ্ঠা এবং সাত বছরব্যাপী দেশ শাসন করেন। তারপর অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে তার স্থলাভিষিক্ত হন আবদিহ রশিদ আলী শারমারকে। ষাটের দশকে এই ‘আধুনিক সোমালিয়া’র কাহিনী ছিল স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের।

দেশটির দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট আলী শারমারকে-কে ১৯৬৯ সালে তারই দেহরক্ষীদের একজন হত্যা করে। গণতান্ত্রিক দেশের নিয়ম অনুযায়ী সোমালিয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মুখতার মোহামেদ হুসেইন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। ছয় দিনের মাথায় জেনারেল সিয়াদ বারের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক সামরিক অভ্যুত্থান। অবসান ঘটে সোমালিয়ার গণতান্ত্রিক যুগের।

সোমালিয়ার সামরিক স্বৈরাচারী শাসন চলে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এই অপশাসনের প্রতিক্রিয়ায় দেশটিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় দেশটির সমাজ। লাখ লাখ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নেয় উদ্বাস্তুশিবির অথবা প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে। অনেকে শরণার্থী হয়ে চলে যায় আরো দূরে আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডায়।

এর মধ্যেই চলে সামরিক জান্তা জেনারেল সিয়াদ বারের শাসন। দীর্ঘ ২২ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে সক্ষম হন তিনি। এই দীর্ঘ শাসনে অসংখ্য অপকর্মের মাঝেও কিছু বিষয় রয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো। যেমন, এ সময় কার্যকর আধুনিক সোমালিয়া প্রতিষ্ঠা হয়, সোমালিয়ার সেনাবাহিনী হয় আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাক্ষরতার হার অনেক বেড়ে যায়। রহস্যজনকভাবে জেনারেল সিয়াদ বারে তৎকালীন দুই পরস্পরবিরোধী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনও পেতে থাকেন।

পাশাপাশি ক্ষমতার মদে উন্মত্ত জেনারেল এ সময় পার্লামেন্ট বাতিল, সংবিধান স্থগিত, সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, রাজনীতিকদের ব্যাপক হারে গ্রেফতার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করেন। সোমালিয়ার পতন এখান থেকেই শুরু। সব কিছুতেই একটা বিশৃঙ্খলা। আর যেখানেই একটু বিশৃঙ্খলা, সেখানেই সামরিক সরকার আরো কঠোর, আরো স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।

এভাবেও চলছিল। আঘাতটা আসে ১৯৭৭ সালে। এক দিকে আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিধর সেনাবাহিনীর অধিকারী হওয়া; অন্য দিকে উভয় পরাশক্তির সমর্থন দুয়ে মিলে জেনারেল সিয়াদ বারেকে পুরোপুরিই উন্মত্ত করে তোলে। তিনি হঠাৎ ইথিওপিয়া আক্রমণ করে বসেন। তার দাবি, ইথিওপিয়ার ওগাদেন অঞ্চলটি সোমালিয়ার। কারণ ওখানে সোমালি জাতিগোষ্ঠীর মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

জেনারেল বারের এই হঠকারী পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশ্বজনমত চলে যায় ইথিওপিয়ার পক্ষে। এমনকি যে সোভিয়েত ইউনিয়ন চোখ বন্ধ করে সিয়াদ বারেকে সমর্থন দিত, তারাও সোমালিয়াকে ত্যাগ করে ইথিওপিয়ার পক্ষ নেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে লেজ গুটিয়ে ঘরে ফেরে সোমালি সেনাবাহিনী।

এ দিকে দেশে ধীরে ধীরে বারে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ১৯৮৮ সালের মে মাসে এসে সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় সাবেক ব্রিটিশ সোমালিয়ায়। উত্তরের উপজাতিরা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ দিকে ১০ বছর আগের সোমালি কামড়ের ক্ষত তখনো শুকায়নি প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার মন থেকে। তারা এবার উত্তরের বিদ্রোহীদের মদদ দিতে থাকে। অন্য দিকে সোমালি সরকারও বসে থাকে না। তারা পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিদ্রোহীদের ওপর। হাজার হাজার মানুষের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে বিদ্রোহী দমিত হয়।

তিন বছর পর ১৯৯১ সালে আবার দেখা দেয় বিদ্রোহ। এবার উত্তরের সাথে যোগ দেয় দক্ষিণও। আর যথারীতি ইথিওপিয়া তো পেছনে আছেই। তত দিনে জেনারেল বারের বজ্রমুষ্ঠি শিথিল হয়ে এসেছে, তার সাবেক মিত্ররা তাকে ছেড়ে গেছে। অতএব যা ঘটার তা-ই ঘটল। পতন হলো জেনারেল সিয়াদ বারের।

কিন্তু এই বিদ্রোহের ফলও ভালো হলো না সোমালিয়ার জন্য। উত্তরাঞ্চল স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসল এবং নাম নিলো ‘সোমালিল্যান্ড’। তারা এখনো সেভাবেই আছে, যদিও তথাকথিত সোমালিল্যান্ডের কপালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জোটেনি। এর মধ্যে দেশটিতে দাঁড়িয়ে গেল সংখ্যাহীন পরস্পরবিরোধী গ্রুপ। তারা একে অপরের সাথে প্রতিনিয়ত হানাহানিতে লিপ্ত থাকল আর তাদের মদদ দিতে থাকল বিভিন্ন বিদেশী শক্তি এবং প্রতিবেশী দেশগুলো। ২০০৬ সালে ইসলামিক কোর্টস ইউনিয়ন কয়েক টুকরো হয়ে গেল। এর একটি হচ্ছে আল শাবাব। চরমপন্থী এই গোষ্ঠীটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিরাট অংশ এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে।

গণতন্ত্র হত্যা ও অপশাসনের কুফল এভাবেই ভোগ করতে হচ্ছে একসময়ের ‘আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড’কে। গৃহযুদ্ধে, অনাহারে, মৃত্যুতে জর্জরিত এখন সোমালিয়া নামের দেশটি। অনেকেই মনে করেন, এ অবস্থা এড়ানো অসম্ভব ছিল না। আবদি সামাতার তাদেরই একজন। এই সোমালি মানুষটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির ভূগোলবিদ্যার প্রফেসর। তিনি বলেন, ‘মাত্র দু’টি বছর আগে যদি সিয়াদ বারে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিতেন এবং বলতেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, এবার তোমরা একটা নির্বাচন করো। আমি আর থাকতে চাই না।’, তাহলে এসব কিছুই হতো না। কিন্তু তিনি যখন দেশের বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ওপর নিপীড়ন চালালেন, তখন মানুষ আর কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু তার হাত থেকেই মুক্তি চাইল।’

দুঃশাসনের কবল থেকে জনতার মুক্তি মিলল বটে কিন্তু তার পরিবর্তে নেমে এলো দুর্দিন। গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকল দেশটি। নেমে এলো অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সেও আরেক বিচিত্র কাহিনী। বিদেশী সাহায্য কিভাবে একটি দেশকে শেষ করে দিতে পারে, তারই জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ এটি। ১৯৯০ সালে ২০০০ সাল পর্যন্ত সোমালিয়ায় জাতিসঙ্ঘের ত্রাণসহায়তার বন্যা চলে। কোনো কাজ না করে খেতে পাওয়ায় হাজার হাজার কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে উদ্বাস্তুশিবিরে এসে আশ্রয় নেয়। এতে দেশটির কৃষিতে বিপর্যয় নেমে আসে। একই সময়ে সোমালিয়ার নৌসীমায় মাছ শিকাররত বিদেশী নৌযানগুলো জলদস্যুতার শিকার হতে থাকে। এই জলদস্যুতা এখন এতই ব্যাপক হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী জলদস্যুতার অপর নামই যেন হয়ে গেছে সোমালিয়া।

চলমান গৃহযুদ্ধ সোমালিয়ার অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে, এক কথায় বলতে গেলে, ধসিয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার সোমালি হয় অর্থনৈতিক অভিবাসী হয়ে দেশ ছেড়েছে, নতুবা শরণার্থী হয়ে পালিয়ে গেছে। অনেকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর উদ্বাস্তুশিবিরে কাটিয়ে দিচ্ছে। প্রায় দুই লাখ সোমালি শরণার্থী পালিয়ে গেছে ইয়েমেনে, কমবেশি ৫০ হাজারের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এ ছাড়া দেড় লাখের মতো সোমালি কানাডায়, এক লাখ যুক্তরাজ্যে এবং ৮৫ হাজার যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে। আর সোমালিয়ার ভেতরে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে গেছে।

সোমালিয়াকে ত্রাণ দেয় জাতিসঙ্ঘ ও আরব লীগ। কিন্তু সেগুলো কিভাবে বিলিবণ্টন হয়, মাঝে মাঝেই তার কোনো হিসাব পাওয়া যায় না।
দেশের ভেতরে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক সোমালি আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। যেমন, ইথিওপিয়া আশ্রয় দিয়েছে ৪৬ লাখ এবং কেনিয়া ২০ লাখ সোমালিকে। এরা স্বপ্ন দেখে, একদিন গৃহযুদ্ধ শেষ হবে, তারা আবার ফিরে যেতে পারবে স্বদেশে।

কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নপূরণেও বাধা হয় জঙ্গিবাদীদের হামলা। ২০১১ সালে আল শাবাব জঙ্গিরা কেনিয়ায় সিরিজ হামলা চালালে কেনিয়া সরকার সব সোমালিকে শরণার্থীশিবিরে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেয়। কাউকে কাউকে ওই দেশ থেকে বেরও করে দেয়া হয়।
অনেক সোমালি আবার পালিয়ে চলে গেছে লিবিয়া। ওই দেশেও চলছে যুদ্ধ, কাজেই সেখানে থাকার চিন্তাও করে না ওইসব সোমালি। তবে দেশটি এখন মানবপাচারের স্বর্গরাজ্য। সেখান থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার আশায় ওরা ওই দেশে যায়। এই সমুদ্রযাত্রায় পদে পদে বিপদ, মৃত্যুভয়। এসব কিছুকে জয় করে ইউরোপের মাটিতে পা রাখতে পারে যারা, তাদেরও বহু সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। তবে অনেকে সেখানে প্রতিষ্ঠিত সোমালিদের সাহায্যও পায়।

দেশের ভেতরে সরকারহীনতার শূন্যস্থান পূরণ করতে সোমালিরা শরণ নেয় বিভিন্ন উপজাতি, গোত্র ও উপগোত্রের। আর এই গোত্রপ্রীতি সোমালিয়া, ইথিওপিয়া ও কেনিয়া ছাড়িয়ে আরো বহু দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি যেন এক আশ্চর্যজনক নিরাপত্তা বীমা। যেমন, ধরা যাক কোনো সোমালি গোত্রের কেউ লন্ডন চলে গেল। সেখানে সে তার গোত্রের ভাই-বোনদের খুঁজে বের করতে পারলে তারাই তার দেখাশোনা করবে। হাতে টাকা নেই? দেবে। ব্যবসা করতে চাইলে নিজেদের টাকা দিয়ে ব্যবসা ধরিয়ে দেবে। সেই টাকা পরে ফেরত দিলেও চলবে। গোত্রের কারো কোথাও থাকার জায়গা নেই? তারাই ছোটাছুটি করে তাকে থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেবে। এভাবেই গোত্রের লোকেরা একে অন্যকে সাহায্য করে থাকে।

আবদিরাজাক বিহির কথাই ধরা যাক। ১৯৯৬ সালে তিনি ওয়াশিংটন ডিসি থেকে মিনিয়াপোলিশ চলে যান। সেখানে সোমালি শরণার্থীদের হয়ে কি না করেন তিনি কখনো ওদের দোভাষী, কখনো পরামর্শক, কখনো বা আমেরিকান রীতিনীতির প্রশিক্ষক। মোটের ওপর সোমালি শরণার্থীরা যাতে আমেরিকাবাসের উপযুক্ত হয়ে ওঠে, তার জন্য সব কিছুই করে চলেছেন তিনি। কাজটি খুবই কঠিনÑ জানেন তিনি এবং বলেনও সে কথা, ‘কালো, মুসলিম ও অভিবাসী হয়ে থাকা মোটেই সহজ নয়।’

তবুও থাকে তারা। থাকতে হয়। কারণ, গৃহযুদ্ধে তাদের দেশটি ‘অকার্যকর রাষ্ট্র’ হয়ে গেছে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে পরবাসী সোমালিদের স্বপ্ন এতটুকু ফিকে হয়নি। সে কথাই শোনা যায় আবদি ওয়ারসামের কণ্ঠে। মিনিয়াপোলিশ সিটি কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য হয়েও তার মন ও চোখ থেকে মুছে যায়নি স্বদেশভূমি সোমালিয়ায় ফেরার স্বপ্নটি। গভীর আবেগভরা গলায় স্বপ্নালু উচ্চারণ করেন তিনি : ‘হয়তো ১০ বছর লাগবে, হয়তো বা ২০। কিন্তু হবে ইনশাআল্লাহ। সোমালিয়ায় শান্তি আসবে, আসবেই ইনশাআল্লাহ।’

আলজাজিরা অনলাইন অবলম্বনে

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *