আদম সেতুর অজানা ইতিহাস

শিরোনাম দেখে হয়ত ভাবছেন, এ সেতুর ‘অজানা’ ইতিহাস কেন বলা হচ্ছে? কারণটা হলো, অনেকেই এটাকে আদম সেতু বলে জানে, এটা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদর মানুষের কাছে রাম সেতু নামে পরিচিত।  অথচ এটা যে অনেক আগে থেকে আদম সেতু নামে খ্যাত সেটা তাদের অজানা। এই জানা-অজানার ঘোরপ্যাঁচে এই সেতুর ইতিহাসটাই জানা হয় না। তাছাড়া ‘রাম’ আর ‘আদম’ নাম থাকায় ধর্মীয় পরিচয়ও এখানে চলে আসে, আর সেই সাথে ধর্মীয় অনুভূতি। কিন্তু ইতিহাস কী বলে? ভারত থেকে শ্রীলংকা সংযোগকারী রহস্যময় এ প্রাচীন সেতুর কথাই আজ বলা হবে।

Adams Bridge

উপর থেকে তোলা সেই সেতুর ছবি

ভারতের তামিলনাড়ুর দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে রামনাথপুরাম জেলার একটি দ্বীপ পাম্বান (Pamban)। এটি রামেশ্বরম দ্বীপ নামেও পরিচিত। এখান থেকে শ্রীলংকার উত্তর-পশ্চিমের মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত অগভীর চুনাপাথরের একটি সেতু চলে গিয়েছে সমুদ্রের বুকে। ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এটি একসময় ভারত আর শ্রীলংকাকে যোগ করে রেখে ছিল স্থলপথে। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৩০ মাইল বা ৪৮ কিলোমিটার। সবচেয়ে অগভীর জায়গাতে চুনাপাথরের গভীরতা আসলে ১ মিটারের বেশি না। তবে অন্য জায়গায় ৩০ ফুট পর্যন্তও দেখা যায়। এর ফলে সেখানে সেচ কাজ করা যায় না।

এখন এই সেতু দিয়ে চলাচল করা না গেলেও, পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত একদম পায়ে হেঁটে যাবার অবস্থাই ছিল, মানুষ যেতে পারত। মন্দিরের নথি অনুযায়ী, ১৪৮০ সালে এক ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল, যার ফলে এই সেতু ভেঙে যায়। বিভিন্ন ঝড়ের ফলেও তলিয়ে যাচ্ছিল সেতুটি।

সেতুটি যেহেতু আদম সেতু বা রাম সেতু উভয় নামেই পরিচিত, এ থেকেই বোঝা যায় দু’ধর্মের সাথেই এর সম্পর্ক আছে কোনোভাবে। আদম সেতু নামটি কীভাবে এলো? Adam’s Peak নামের একটি পর্বত রয়েছে মধ্য শ্রীলংকায়, যার উচ্চতা ৭,৩৫৯ ফুট। সেখানে রয়েছে ‘শ্রীপদ’ নামের এক পবিত্র পায়ের ছাপ, চূড়ার ঠিক কাছে। সেই ছাপের দৈর্ঘ্য ১.৮ মিটার (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি)।

adams peak

অ্যাডামস পিক

যদিও কোনো প্রমাণিত হাদিস বা কুরআনের আয়াতে এর উল্লেখ নেই, তবুও কথিত আছে, দীর্ঘদেহী হযরত আদম (আ) যখন দুনিয়াতে আসেন, তখন তিনি শ্রীলংকায় পতিত হন। তিনি অনুতপ্ত হয়ে এই পর্বতচূড়ায় টানা এক হাজার বছর প্রার্থনা করেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে। সেই পায়ের ছাপই এটি। এছাড়া এরকমও বর্ণিত আছে, তিনি পতিত হবার সময় যে প্রচণ্ড বল নিয়ে ভূমিতে প্রথম পায়ে আঘাত করেন, সেটির কারণেই এই পায়ের ছাপ সৃষ্টি হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, তিনি এই চূড়া থেকে নেমে স্থলপথে এ সেতু অতিক্রম করে চলে যান ভারতে এবং একসময় আরাফাতের ময়দানে পৌঁছান, যেখানে জেদ্দায় পতিত বিবি হাওয়ার সাথে পুনর্মিলিত হন তিনি। অন্য একটি মতবাদ অনুযায়ী, তিনি ভারত থেকে এই সেতু পেরিয়ে এই পর্বতের চূড়ায় অনুতাপ করতে গিয়েছিলেন। তবে এ কাহিনীগুলোর প্রামাণ্য কোনো রেফারেন্সের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে কোনো কাহিনীতে এটার উল্লেখ নেই এই সেতুটি সেখানে আগে থেকেই কীভাবে ছিল, বা কীভাবে বানানো হয়েছিল। এই সরু রাস্তাটি কি আগে থেকেই সেখানে ছিল, যা আদম (আ) সমুদ্র পার হবার জন্য ব্যবহার করেন? তবে এ কাহিনী থেকে এ সেতুর নাম হয়ে যায় আদম সেতু।

ভারতের পরলোকগত মনীষী হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ লিখিত একটি তাথ্যিক পুস্তিকা অবলম্বণ করে বলা যায় যে, পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ) স্বর্গ হতে নেমে সর্বপ্রথম পদার্পণ করেছিলেন ভূমন্ডলের ভারত ভূমিতেই । জায়গাটা ছিল সিংহল, যেটা তখন ভারতেরই অর্ন্তভূক্ত ছিল ।হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জামাতা ও চতুর্থ খলীফা হযরত আলীর সময় ভারতের সঙ্গে আরবের কোন যোগাযোগ হয়নি । অথচ এমন কথা তিনি বলে গেছেন যাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না । যার মর্মানুবাদ হচ্ছে এই ‘ ভারতভূমি – যেখানে হযরত আদম (আঃ) স্বর্গ হতে নেমে এসেছিলেন এবং মক্বার ভূমিযা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) দ্বারা সম্মন্ধযুক্ত এই দুই স্হান উত্তম ভূ-খন্ড ।’এতএব, এই মুসলমানদের ভারতপ্রেম যে এক পবিত্র ধর্মীয় কারণ তা বোঝায় ।ভারতের অযোধ্যায় এক বিরাট মন্দিরের পাশে সুদীর্ঘ এক কবর রয়েছে যেটা সম্মন্ধে যুগ যুগ ধরে জনশ্রূতি – ঐ সামাধি হযরত শীষ (আঃ) , যিনি আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর পুত্র ।হযরত আলী (রাঃ) কে সিরিয়ার একজন মনীষী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভূ-মন্ডলে গুরুত্বব্যন্জক দেশ কোনটি ? উত্তরে তিনি বলেন- সেই দেশ , যাকে সরণদ্বীপ বলা হয় । যেখানে আদম (আঃ) স্বর্গ হতে নেমে এসেছিলেন গবেষক ডাঃ মুহাম্মদ আলী তার লেখায় উল্লেখ করেছেন -‘বিশ্বনবী (সাঃ) নিজেও ভারতকে ভালোবাসতেন । তিনি একবার বলেছিলেন, ভারত হতে আমার প্রতি স্নিগ্ধশীতল হাওয়ার হিল্লো ভেসে আসে । সুগন্ধময় স্বর্গ হতে হযরত আদম (আঃ) যখন ভারতে আসলেন তখন স্বগীয় সুগন্ধে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমোদিত ছিল । তাই লেখকের ধারণা ভারতের সুগন্ধদ্রব্য তুলনামূলক হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত । যেমন,ভারতের মৃগনাভি, কর্পূর, চন্দন, কাঠ, জাফরান, কেওড়া এবং তীব্র গন্ধের পুস্প প্রাচুর্য ও মাধুর্য অস্বীকার করা যায় না ।আদম যখন স্বর্গোদ্যান থেকে পৃথিবীতে আসেন তখন স্বর্গ হতে এক খন্ড পাথর সঙ্গে এনেছিলেন যেটার নাম, হজরে আসওয়াদ । বর্তমানে পাথরটা মক্বার কাবা ঘরে বহিঃপ্রাচীরের এক কোণে লাগাণো আছে । সেই পবিত্র পাথর পৃথিবীর প্রথম যেখানে স্পর্শিত হয়েছিল সেটাও ছিল ভারতবর্ষ ।বিশ্বনবী (সাঃ) এর র সঙ্গী হযরত আবু হোরায়রা হতে বর্ণিত আছে, হযরত আদম (আঃ) কে পৃথিবীতে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে হযরত জীব্রাঈল (আঃ) কে পাঠানো হয়েছিল । তিনি পৃথিবীতে শুভাগমন করে বর্তমানের আজান ধ্বানির মতো শব্দ করেন । তাতে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কথাও ধ্বণিত হয়েছিল । তখন আদম (আঃ) জিব্রাঈল কে প্রশ্ন করেছিলেন ‘মুহাম্মদ’ ব্যাক্তিটি কে ? উত্তরে জিব্রাঈল (আঃ) বলেছিলেন , ‘ইনি আপনার সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ নবী ‘ । [দ্রঃ তিবরাণী গ্রন্হ ]

মুসলিম এবং খ্রীষ্টানদের বিশ্বাস হল- হযরত আদম (আঃ) কে যখন আল্লাহ  বেহেশ্ত থেকে নামিয়ে দিলেন তখন তিনি শ্রীলংকায় এসে পড়েন এবং মা হাওয়া পড়েন মধ্যপ্রাচ্যে । শ্রীলংকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দূরুত্ব কয়েকশ হাজার বর্গ কিঃমিঃ । মহান স্রষ্ট্রার কাছে অনুতাপের পর তারা মিলিত হন মধ্যপ্রাচ্যে ।তখন তিনি প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ এক পায়ে হাজার বৎসর দাড়িয়ে থাকেন এবং কান্না-কাটি করতে থাকেন । তার ফলস্বরূপ এখানে তার পবিত্র পায়ের পদচিহ্ন এর দাগ পড়ে যায় । যেমন এরকম আরেকটি জায়গায় পায়ের দাগ আছে আরেক নবীর সেটা হল – মাকামে ইব্রাহীম এ যা মক্কায় কাবা শরীফের নিকট অবস্হিত -,হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কাবাশরীফ নির্মাণের সময় এই পাথরের উপর দাড়িয়ে কাবা ঘর নির্মাণ করার সময় উনার পায়ের দাগ পড়েছিল , যা এখনও রয়ে গেছে- হাজীরাযেখানে নামাজ পড়ে থাকেন ।

বোদ্ধ ধর্মমতে , খ্রষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে এইপদচিহ্ন আবিস্কিৃত হয় । আবিস্কিৃত হওয়ার পরে পদচিহ্নির চর্তুদিকে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে ।যুগ যুগ ধরে শত শত পর্যটক ভ্রমণ করেছেন এই চূড়াটি ।বিশ্বেরযেসব নামকরা পর্যটক এই চূড়াটি ভ্রমণ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইবনে বতুতা ও মার্কো পোলো । বোদ্ধ ধর্মের অনুসারীরাই এই চূড়ায় বেশী যাতায়াতকরে । তবে চূড়াটিতে যাওয়া এত সহজ ব্যাপার নয় । প্রথমে নৈাকা বা জলযান, তারপর পায়ে হেটে উচু পাহাড়ে ওঠা এবং সেখান থেকে অনেক কষ্টের মাধ্যমে চূড়ায় উঠতে হয় ।ব্রিটিশ ব্যক্তিত্ব রবার্ট পারসিভাল যিনি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে কলম্বোর সেনাদুর্গে কাজ করেছিলেন, তিনি শ্রী-পদের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন আদমের চূড়ার পর্বতে উঠার যে লোহার সিড়ি প্রেথিত বা দেখা যায় তা বহু পূর্বে থেকে আছে , কিন্তু কে বা কারা তাসেখানে স্হাপন করেছে তা জানা যায়নি । যে বিশ্বাস এবং কুসংস্কার স্হানীয়দের মধ্যে রয়েছে তাও খুব জটিল বা দুর্বোধ্য । যাই হোক, সকল সাক্ষ্য প্রমাণ এটাই নির্দেশ করে যে এই চূড়া বিখ্যাত বা লাইম লাইটে ছিলো এই দ্বীপের ইতিহাস লেখার অনেক অনেক আগে থেকেই

বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ইবনে বতুতা যিনি চর্তুদশ শতাব্দীতে প্রায় সমগ্র দুনিয়া ভ্রমণ করেছিলেন, তার সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা দেয়া হল লাখ বছর ধরে চলে আসা যে রহস্য আজো মানুষ জানতে পারেনি তা হলো চূড়ার যে স্হানে আদম (আঃ) এর পায়ের চিহ্ন সেই স্হানে জানুয়ারী থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সূর্যের আলো আর মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি পড়ে না । এমন আরো অনেক রহস্য আছে এ চূড়াটিকে কেন্দ্র করে । অতি চমৎকার এ চূড়াটি বছরের পর বছর অবিকল রয়ে গেছে । এর সৈান্দর্য এতটুকু হ্রাস পায়নি । এ কারণে এ চূড়াটি মানুষের কাছে পবিত্র বলে পরিচিত ।অ্যাডাম’স ব্রিজ বা আদমের সেতুঃ শ্রীলংকা থেকে ভারত পর্যন্ত সাগরের তলদেশ দিয়ে একটি সংযোগ সেতুরূপী ভূমি বিদ্যমান, যা আদমের সেতু নামে পরিচিত। ধারণাকরা হয় এই সেতু দিয়েই আদম (আঃ) দ্বীপ থেকে মূল ভূ-খন্ডে যাতায়াত করতেন ।বলা হয়ে থাকে শ্রীলংকায় মানববসতির যে প্রাচীন ইতিহাস যা ১,৭৫০,০০০ বছর পুরানো , ঠিক অনুরূপভাবে এই সেতুটিও সেইরকম পুরানো ।এই সময়কালটা হয়তো পুরোপুরি সঠিক নয় । হযরতআদম আঃ পরবর্তী মানুষগণ অনেক দিন বেচে থাকতেন । কুরআনে হযরত নূহ (আঃ) এর কথা বলা আছে যিনি ৯৫০ বৎসর বেচে ছিলেন । তিনি হযরত আদম (আঃ) এর অনেক পরের নবী ছিলেন । সুতরাং হযরত আদম আঃ ও যে হাজার বছরের উপরে বেচেছিলেন তা ধারণা
করা যায় ।হযরত আদম (আঃ) সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) বলেছেন,“আল্লাহ আদমকে প্রচুর চুল দিয়ে একজন লম্বা মানুষ হিসেবে তৈরী করেছিলেন (বুখারী-৩৩২৬, মুসলিম-২৮৪১)

Adam-s-Peak-Sri-pada

অ্যাডামস পিক

তবে Adam’s Peak এর সেই পায়ের ছাপ হযরত আদম (আ) এর বলে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিশ্বাস থাকলেও, তামিল হিন্দুগণ একে শিবের পায়ের ছাপ বলে মনে করেন। আবার বৌদ্ধগণ মনে করেন, এ পায়ের ছাপটি গৌতম বুদ্ধের বাম পায়ের, যখন তিনি শ্রীলংকা এসেছিলেন সেই সময়ের।

adams-leg-peak

সেই পায়ের ছাপ

সনাতন ধর্মের ক্ষেত্রে

এবার আসা যাক সনাতন ধর্মের ক্ষেত্রে। প্রাচীন সংস্কৃত মহাকাব্য বাল্মীকি রচিত রামায়ণে এ সেতুর উল্লেখ পাওয়া যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, এর নাম হলো রাম সেতু। রামায়ণ অনুযায়ী, রামের স্ত্রী সীতাকে লংকার রাজা রাক্ষস রাবণ অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং রাম তাঁকে উদ্ধার করতে এ সেতু বানাবার নির্দেশ দেন। বানর সেনাদের সহায়তায় রামের নামখচিত পাথরগুলো সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয় এবং সেগুলো ভেসে ওঠে। একে নল সেতুও বলা হয়, কারণ নল নামের একজনের কাছ থেকেই এ সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সহায়তা নেন রাম। বলা হয়, মাত্র ৫ দিনে এ সেতুটি নির্মিত হয় লংকা যাবার জন্য। রামায়ণের ২-২২-৭৬ শ্লোকে একে সেতুবন্ধনম ডাকা হয়েছে।

এবার আসা যাক ইতিহাসবিদ, মানচিত্রবিদ বা পরিব্রাজকদের লেখায়। Thanjavur Saraswathi Mahal Library-তে একজন ডাচ মানচিত্র নির্মাতার মানচিত্র পাওয়া যায়, যেখানে তিনি ১৭৪৭ সালে একে Ramancoil নামে অভিহিত করেছেন। শব্দটি তামিল Raman Kovil থেকে এসেছে, যার মানে রামমন্দির। একই গ্রন্থাগারে পাওয়া যায় J. Rennel নামের একজনের মুঘল আমলের করা মানচিত্র। ১৭৮৮ সালের সে মানচিত্রে এ এলাকাকে তিনি ‘রামমন্দির এলাকা’ নামে চিহ্নিত করেছেন। শোয়ার্টজবার্গের ঐতিহাসিক অ্যাটলাসে এবং পরিব্রাজক মার্কো পোলোর ভ্রমণ লেখনিতে এ জায়গাকে সেতুবন্ধ রামেশ্বরম ডাকা হয়েছে। তবে মার্কো পোলো একে আদম সেতুও ডেকেছেন।

stalite image of adams bridge

স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যাচ্ছে সেতু

পশ্চিমা বিশ্ব প্রথম এ সেতুর কথা জানতে পারে ইবনে খোরদাদবেহের লেখা Book of Roads and Kingdoms বই থেকে। বইটি আনুমানিক ৮৫০ সালের দিকে বের হয়। সেই নবম শতকে এ সেতুর নাম তিনি সেতবান্ধাই (‘সমুদ্রের সেতু’) নামে লিপিবদ্ধ করেছেন। পরবর্তীতে আলবিরুনিও এ সেতুর কথা বর্ণনা করেন। একজন ব্রিটিশ মানচিত্রবিদের ১৮০৪ সালের মানচিত্রে আমরা এ সেতুর নাম দেখতে পাই ‘আদম সেতু’।

adams bridge

স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যাচ্ছে সেতু ও মেঘ

এ সেতুর উৎপত্তি আজও বিতর্কিত। ভূতাত্ত্বিকেরাও এ ব্যাপারে একমত নন। কারো মতে, ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুকে চর জেগে এই সেতু তৈরি হয়েছে। আবার কারো মতে, শ্রীলংকা যখন ভারতের স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে চলে যাচ্ছিল, তখনই এ সেতুর জন্ম হয়। যে চারকোনা পাথরগুলো দেখা যায়, সেগুলো সময়ের সাথে সাথে তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে, এরকম মতও কেউ কেউ দিয়েছেন।

সরাসরি সেতু পরীক্ষা না করে স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিং ডেটা ব্যবহার করে Indian Space Research Organisation (ISRO) এর Marine and Water Resources Group of the Space Application Centre (SAC) এ উপসংহারে আসে যে, সেতুটি ১০৩টি অংশ বা ‘প্যাচ রিফে’ বিভক্ত।Geological Survey of India (GSI) প্রজেক্ট রামেশ্বরম নামে একটি গবেষণা চালায় যার উপসংহার ছিল যে, রামেশ্বরম দ্বীপ গঠিত হতে শুরু করে ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে। কিন্তু কার্বন ডেটিং অনুযায়ী, রামেশ্বরম ও তালাইমান্নারের মাঝের অংশটা সমুদ্র থেকে উঠতে শুরু করে ৭,০০০ থেকে ১৮,০০০ বছর আগের কোনো এক সময়।

যদি এই সেতু এলাকা না থাকত তবে এর মাঝ দিয়ে শর্টকাট দিয়ে জাহাজ পেরিয়ে যেতে পারত, কিন্তু এখন বেশ ঘুরে যেতে হয়, যেমনটা নিচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে।

adams peak

এজন্য ভারত সরকার Sethusamudram Shipping Canal Project নামের একটি মাল্টিমিলিয়ন ডলার প্রজেক্ট হাতে নেয় ২০০৫ সালে, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি শিপ চ্যানেল তৈরি করা, কিন্তু সেটি করতে হলে আদম সেতু বা রাম সেতুর বেশ বড় অংশ ক্ষতি করতে হবে। তখন বিজেপিসহ ভারতের নানা রাজনৈতিক ও হিন্দু সংগঠন ধর্মীয় কারণে এর বিরোধিতা করে। তখন Archaeological Survey of India ও ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টকে ২০০৭ সালের এফিডেভিট দিয়ে জানায় যে, রাম কর্তৃক সেতু নির্মাণের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ২০০৮ সালের কোর্ট কেসে সরকার পক্ষের একজন দাবি করেন, রাম নাকি এ সেতু ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তবে এ দাবিটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরে মাদ্রাজ হাই কোর্ট রায় দেয় যে, রাম সেতু প্রাকৃতিক নয়, বরং নির্মিত। ২০০৭ সালে ভারতের ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং এজেন্সির একটি প্রকাশনাতে বলা হয়, সেতুটি মনুষ্যনির্মিত হতে পারে। তবে Archaeological Survey of India থেকে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডিস্কভারি কমিউনিকেশন্স এর সায়েন্স চ্যানেলের What on Earth নামের একটি প্রোগ্রামের একটি পর্বে (‘Ancient Land Bridge‘) রাম সেতুর উৎপত্তি উন্মোচন করা হবে বলে একটি প্রোমো দেখানো হয়। সেখানে দেখা যায়, নাসার স্যাটেলাইট ইমেজ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের গবেষণা অনুযায়ী, রাম বা আদম সেতুর বালি ৪,০০০ বছর পুরনো হলেও উপরের পাথর ৭,০০০ বছরের পুরনো। ভিডিওতে প্রত্নতত্ত্ববিদ চেলসি রোজ, ভূতত্ত্ববিদ ড. অ্যালান লেস্টারের বক্তব্য দেখানো হয়েছে। তাদের মতে, সেতুটি ৫,০০০ বছর আগে নির্মিত। পুরো গবেষণাটি জানা যাবে পর্বটি প্রচারিত হলে।

নাসার স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যাচ্ছে উপরে ভারত, নিচে শ্রীলংকা আর মাঝে সংযোগকারী সেতুটি

তবে শত শত বছর ধরে এ সেতুটি রহস্যে আবৃত ছিল এবং এখনো আছে, সে যে নামেই হোক না কেন। পাঁচশ কি ছয়শ বছর আগে এ সেতুর প্রাণবন্ত রূপ দেখতে কেমন ছিল সেটা জানবার কোনো উপায় আমাদের আর নেই।

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *