অবাক করা দেশ জাপান

জাপান (জাপানি: 日本 নিপ্পন বা নিহন; পুরো নাম 日本国 এই শব্দ সম্পর্কে নিপ্পন-কোকু বা নিহন-কোকু, “জাপান রাষ্ট্র”) হল পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। এই দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জাপান সাগর, পূর্ব চীন সাগর, চীন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়ার পূর্ব দিকে উত্তরে ওখোৎস্ক সাগর থেকে দক্ষিণ পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান পর্যন্ত প্রসারিত। যে কাঞ্জি অনুসারে জাপানের নামটি এসেছে, সেটির অর্থ “সূর্য উৎস”। জাপানকে প্রায়শই “উদীয়মান সূর্যের দেশ” বলে অভিহিত করা হয়।

জাপান- প্রশান্ত মহাসাগরের একদম পূর্ব কোণে ৬৮০০ টি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি দেশ; কিন্তু এই দেশটি নিয়ে পৃথিবীজুড়ে মানুষের বিস্ময়ের সীমা নেই।। জাপানের বৃহত্তম চারটি দ্বীপ হল হোনশু, হোক্কাইদো, ক্যুশু ও শিকোকু। এই চারটি দ্বীপ জাপানের মোট ভূখণ্ডের ৯৭% এলাকা নিয়ে গঠিত। জাপানের জনসংখ্যা ১২৬ মিলিয়ন। জনসংখ্যার হিসেবে এটি বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। জাপানের রাজধানী টোকিও শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৯.১ মিলিয়ন। এই শহরটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার ২য় বৃহত্তম মূল শহর। টোকিও ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাজ্য নিয়ে গঠিত বৃহত্তর টোকিও অঞ্চলের জনসংখ্যা ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম মহানগরীয় অর্থনীতি।

পুরাতাত্ত্বিক গবেষণার ফলে জানা গিয়েছে যে উচ্চ প্যালিওলিথিক যুগেও জাপানে জনবসতির অস্তিত্ব ছিল। জাপানের প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীতে রচিত চীনা ইতিহাস গ্রন্থগুলিতে। জাপানের ইতিহাসে অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাব দেখা যায়। এই দেশের ইতিহাসে প্রথমে চীনা সাম্রাজ্যের প্রভাব পড়েছিল। তারপর একটি বিচ্ছিন্নতার যুগ কাটিয়ে এই দেশের ইতিহাসে পড়ে পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব। ১২শ শতাব্দী থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত শোগুন নামের সামরিক সামন্ত-শাসকরা সম্রাট উপাধিতে জাপান শাসন করেছিলেন। ১৭শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জাপান এক দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর্যায়ে প্রবেশ করে। ১৮৫৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পাশ্চাত্যের সামনে জাপানকে খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিলে সেই বিচ্ছিন্নতার যুগের অবসান ঘটে। প্রায় দুই দশক আভ্যন্তরিণ বিবাদ ও বিদ্রোহ চলার পর ১৮৬৮ সালে মেইজি সম্রাট রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হন এবং জাপান সাম্রাজ্য ঘোষিত হয়। এই সাম্রাজ্যে সম্রাট জাতির দিব্য প্রতীকের সম্মান পান। ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে এবং ২০শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জাপান প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধ, রুশ-জাপান যুদ্ধ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে। এই ক্রমবর্ধমান সামরিক যুগে জাপান নিজ সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃত করে। ১৯৩৭ সালের দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ ১৯৪১ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বর্ধিত অংশে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। ১৯৪৭ সালে সংশোধিত সংবিধান গ্রহণের পর জাপান একটি এককেন্দ্রিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। এই ব্যবস্থায় সম্রাটের পাশাপাশি কোক্কাই নামে একটি নির্বাচিত আইনসভাও গঠিত হয়।

জাপান জাতিসংঘ, জি-৭, জি৮ ও জি২০ গোষ্ঠীগুলির সদস্য। এই রাষ্ট্রটি একটি মহাশক্তিধর রাষ্ট্র।নামমাত্র মোট আভ্যন্তরিণ উৎপাদন অনুযায়ী জাপান বিশ্বের ৩য়-বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার সাম্য অনুযায়ী ৪র্থ-বৃহত্তম অর্থনীতি। এছাড়া জাপান বিশ্বের ৫ম-বৃহত্তম রফতানিকারক এবং ৫ম বৃহত্তম আমদানিকারক রাষ্ট্র। সরকারিভাবে জাপান যুদ্ধ ঘোষনার অধিকার বর্জন করলেও এই দেশটি একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী রেখেছে। এদেশের সামরিক বাজেট বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম সামরিক বাজেট।অবশ্য জাপানের সামরিক বাহিনীর কাজ হল আত্মরক্ষা ও শান্তিরক্ষা। জাপান একটি উন্নত দেশ। এখানে জীবনযাত্রার মান ও মানব উন্নয়ন সূচক উচ্চ। সারা বিশ্বের মধ্যে এই দেশে গড় আয়ু সর্বাধিক এবং শিশু মৃত্যুর হার তৃতীয় সর্বনিম্ন। দেশীয় তরবার সূচকে জাপানের স্থান প্রথম। বিশ্বশান্তি সূচকে এই রাষ্ট্রের স্থান সর্বোচ্চ।

প্রযুক্তির মুন্সিয়ানায় গোটা বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছে জাপানিরা, কিন্তু তাদের সাফল্যের দৌড় কেবল কাঠখোট্টা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, শিল্প সাহিত্যে চিত্রকলা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ঈর্ষণীয় বিচরণ। জাপানের চলচ্চিত্র অস্কার পেয়েছে, কুস্তির জগতে যুক্তরাষ্ট্রের পর তাদের দেশেই সবচেয়ে বেশি প্রসার, আবার পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের তালিকায়ও মাফিয়ার পরই জাপানের দুর্ধর্ষ ইয়াকুজার অবস্থান! সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের এমনই কিছু বিচিত্র মজার তথ্য নিয়ে আজকের এই আয়োজন।

জাপানে আবর্জনা ক্লিনারদের হেলথ ইঞ্জিনিয়ার বলে, তারা ৫০০০-৮০০০ ডলার মাসিক বেতন পায়।

জাপানে শিশুদের স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি আদব-কায়দা শেখানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়ে থাকে। গুরুজনদের সম্মান করা, মানুষের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেওয়া, সবাই মিলে কাজ করা ইত্যাদি শিক্ষা একদম ছেলেবেলায় জাপানিদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়। স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক নিজেরাই মিলেমিশে একসাথে ক্লাসরুম, ক্যাফেটেরিয়া ইত্যাদি পরিষ্কার করেন, কোন কাজকেই ছোট করে না দেখার অভ্যাস এখান থেকেই গড়ে ওঠে জাপানী শিশুদের। জাপানের স্কুল স্টুডেন্টরা প্রতিদিন তাদের টিচারদের সাথে ১৫ মিনিট তাদের স্কুল পরিষ্কার করে। যা তাদের একটি পরিচ্ছন্ন জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। জাপানে স্বাক্ষরতার হার শতকরা ১০০ ভাগ। তাদের পত্রিকায় আমাদের দেশের মত সংবাদ দূর্ঘটনা, রাজনীতি, সিনেমার সংবাদ ইত্যাদি ছাপানো হয় না। সেখানে শুধু প্রয়োজনীয় ও আধুনিক জগৎ সম্পর্কে সংবাদ ছাপা হয়।

বিশ্বজুড়ে অসম্ভব করিৎকর্মা পরিশ্রমী একটি জাতি হিসেবে জাপানিদের দারুণ সুনাম রয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরের পরও তারা ঘরে বসে থাকতে পছন্দ করে না। ঘরের কাজে, বাচ্চাদের যত্নআত্তিতে, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় কেটে যায় তাদের। পরিশ্রমের সুফলটাও প্রত্যক্ষ। জাপানের মানুষের চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে কম, শরীর শক্তপোক্ত থাকে বহুবছর পর্যন্ত। সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মানুষের তালিকায় জাপানের অবস্থান তৃতীয়। গড়ে প্রায় ৮৩ বছর বাঁচে জাপানিরা, পুরো জীবনটাই কাটে কাজের প্রতি বিপুল উদ্দীপনায়, পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে।

জাপানের রাস্তায় কোন ডাস্টবিন থাকে না! এমনকি দেশটির কোথাও অন্যান্য দেশের মত বর্জ্যের ভাঁগাড় পর্যন্ত নেই, কারণ জাপানিরা সবরকম বর্জ্য রিসাইকেল করে ফেলে! যেগুলো রিসাইকেল করা সম্ভব না সেগুলো খুব সুশৃংখল একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়। ধূমপায়ীরা ব্যাগে করে ছাইদানি নিয়ে ঘুরেন, জাপানের রাস্তায় যে সিগারেটের ছাই পর্যন্ত ফেলা নিষিদ্ধ!

Japan

শৈশবে নৈতিক শিক্ষাদানের অভ্যাসটির দারুণ সুফল পেয়েছে জাপান। বড় হয়ে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে জাপানি তরুণরা, মানবিক মূল্যবোধ তাদের অসাধারণ, শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ, তাই অপরাধের প্রসারও অসম্ভব কম। জাপানের রাজধানী টোকিও পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ একটি শহর, ছয় বছরের একটি শিশুও এই শহরে কোন রকম বিপদ আপদের আশঙ্কা ছাড়াই ইচ্ছামতো সারা শহর ঘুরে বেড়াতে পারে নিরাপদে!

জাপানের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই এবং প্রতি বছর শত শত ভূমিকম্প হয় তবু তারা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।

হিরোশিমায় বোম মারার মাত্র ১০ বছরে হিরোশিমা তার আগের জায়গায় ফিরে আসে।

জাপানে রেস্টুরেন্ট ও ট্রেনে মোবাইল ফোন ইউজ করা নিষেধ।

জাপানে শিক্ষাজীবনের প্রথম ৬ বছর শেখানো হয় নৈতিকতা ও কিভাবে মানুষের সাথে চলতে হবে।

বিশ্বের একটি ধনী দেশ হয়ে ও তাদের কোন কাজের মানুষ রাখেনা। সকল কাজের দায়িত্ব মা, বাবাকে করতে হয়।

জাপানে শিক্ষাজীবনের প্রথম ৩ বছর কোন পরীক্ষা হয়না। কারন তারা মনে করে লেখাপড়া চরিত্র গঠনের জন্য, পরীক্ষা নেয়ার জন্য না।

জাপানিজরা খাবার অপচয় করে না, রেস্টুরেন্টে গেলে দেখবেন। মানুষ যার যতটুকু দরকার এর বেশি নেয়না।

জাপানের ট্রেন দেরি করে আসার গড় সময় বছরে ৭ সেকেন্ড! তারা প্রতিটা সেকেন্ডের হিসেব করে চলে।

জাপানে স্টুডেন্টদের খাওয়ার জন্য আধ ঘন্টা বিরতি দেয়া হয় সঠিক হজমের জন্য। কারণ তারা স্টুডেন্টদের জাতির ভবিষ্যত মনে করে।

দীর্ঘজীবী মানুষের তালিকায় জাপানের অবস্থান তৃতীয়। গড়ে প্রায় ৮৩ বছর বাঁচে জাপানিরা।

অনেক সময় সমস্যা মোকাবিলায় বা দুশ্চিন্তায় আরামের জন্য একক বিছানায় থাকার প্রবণতা চলে আসে। জাপান এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় ক্যাপসুল হোটেল তৈরি করে থাকে, যেখানে শুধু একটি বিছানার সমপরিমাণ স্থান রয়েছে। তবে এই ঘরে ওয়াইফাই সুবিধা রয়েছে। এই ক্যাপসুল হোটেল শুধু ছেলেদের জন্য তৈরি করা হয়।

জাপান অনেক উন্নত দেশ। হয়তো ভাবতে পারেন তাদের জমি অনেক উর্বর। যেখানে প্রচুর ফসল ফলে। কিন্তু তা নয়। জাপানে শতকরা ৭০ ভাগ ভূমি হচ্ছে পাহাড়ি। এ ছাড়াও দেশটিতে ২০০-এর মতো আগ্নেয়গিরি রয়েছে!

জাপানে মোট প্রকাশিত বইয়ের ২০% হচ্ছে কমিকস বই।

সন্তান দত্তক বা পালক সন্তান গ্রহণতো পুরো বিশ্বেই রয়েছে। জাপানে মোট দত্তক গ্রহণের শতকরা ৯৮ ভাগের বয়স ২০-৩০ বছর! অর্থাৎ তারা বয়স্কদের দত্তক গ্রহণ করে! ব্যবসায়িক পরিবার কিন্তু ছেলে নেই, তখন তারা দত্তক নেয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে, যদি নিজের ছেলে বাবা-মা রাখতে অক্ষম হয় তবে অন্য একজনের ছেলে নিয়ে আসে।

জাপানে শ্রম আইন বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক ভাল। এজন্য কোন কোম্পানি চাইলেই তার কর্মী বিদায় করতে পারে না। এজন্য মোটা অঙ্কের টাকা গুণতে হবে! তাই বলে কোম্পানির মালিক পক্ষরাও কিন্তু বোকা নন। তারা যে কর্মীকে ছাঁটাই করতে চান তাকে বিরক্তিকর কাজ দিয়ে থাকেন। হতে পারে সারাদিন টিভি পর্দার সামনে বসিয়ে রাখা। এসবের জন্য আবার আলাদা শাস্তি কক্ষ রয়েছে।

আমাদের দেশে সাধারণত দাঁত সঠিক ও সুন্দর গঠনের হতে হয়। কিন্তু জাপানে গত কয়েক বছর আগে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা তাদের দাঁতের গঠন সৌন্দর্য না বাড়িয়ে ত্রুটিপূর্ণ আকার দিয়ে সৌন্দর্য আরো কমিয়ে ফেলত!

জাপানে প্রতি ২ লক্ষ জনে একজন খুন হয়।

জাপানিদের আত্মসম্মানবোধ টনটনে! সম্মানের খাতিরে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার ভুরিভুরি নজির রয়েছে দেশটিতে। জাপানের বেশ কয়জন প্রধানমন্ত্রী অল্প কয়টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, কথা দিয়ে সে কথা রক্ষার ব্যাপারে তারা এতটাই কঠোর। টাইটানিক জাহাজডুবি থেকে যে কয়জন জাপানি বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিলেন, দেশে ফিরে তাদের প্রবল জনরোষের সম্মুখীন হতে হয়। “সহযাত্রীদের বাঁচাতে যদি নাই পারলে, তবে তাদের সাথেই প্রাণ কেন দিলে না!” এই ছিলো জনতার আক্ষেপ!

নির্ধারিত সময়ের পরও কাজ করার জন্য “ওভারটাইম” নামে একটি শব্দ প্রচলিত দুনিয়াজুড়ে, শুধুমাত্র জাপানে এই শব্দটির কোন অর্থ নেই। জাপানিরা স্বভাবগতভাবেই অফিসের সময় শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে কাজ নিয়ে। ঊর্ধতন কর্মকর্তার আগে অফিস ত্যাগ করার কথা কল্পনাতেও ভাবতে পারে না তারা, যত জরুরী তাড়াই থাকুক না কেন ঘরে ফেরার। কাজের প্রতি ভালবাসা তাদের মজ্জাগত, ছোটবেলাতেই এই বিষয়টি তাদের খুব ভালভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাপানের মানুষ তাই গড়ে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘন্টা অতিরিক্ত কাজ করে অফিসে এবং এই অতিরিক্ত খাটুনির ব্যাপারটি নিয়ে তাদের কোন বিরক্তি বা আক্ষেপ নেই, খুব সাধারণভাবেই তারা বিষয়টি মেনে নেয়।

“ওভারটাইম” শব্দটি না থাকলেও জাপানি ভাষায় এরচেয়ে অনেক গুরুতর একটি শব্দ আছে- “কারোশী” যার অর্থ “অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যু!’’ ব্যাপারটি শুনতে আজব মনে হলেও জাপানের প্রেক্ষাপটে এটি খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। সেখানে প্রতিবছর গড়ে ১০,০০০ মানুষ মারা যায় শুধুমাত্র অতিরিক্ত কাজের চাপে, ডায়াগনোসিসে তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়- “কারোশী”!

এটি ঠেকাতে অবশ্য জাপানিদের অভিনব একটি পন্থা রয়েছে। পৃথিবীর আর যে কোন দেশে অফিসে ঘুমালে মানুষ বসের ঝাড়ি খায়, এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে, কিন্তু একমাত্র জাপানে এই ব্যাপারটিকে উৎসাহিত করা হয়! কেননা সেখানে কাজ ফাঁকি দিয়ে ঘুমাবে এমন মানুষ বলতে গেলে নেই, বরং স্বেচ্ছায় ভয়াবহ খাটুনি করতে গিয়ে মারা পড়ার ঝুঁকি ঢের বেশি, তাই কাজের ফাঁকে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটি বলতে গেলে অলিখিত একটি প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে সে দেশে!

আমাদের দেশে হঠাৎ একটি ভূমিকম্প হলে সবাই হতচকিত হয়ে পড়ি, মানুষ প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটে ঘর থেকে নেমে আসে রাস্তায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে জাপানে এই বিষয়টি নিয়ে মানুষের তেমন কোন ভ্রুক্ষেপ নেই! মানুষ অফিসে কাজ করছে, ছাত্ররা পরীক্ষা দিচ্ছে, রেঁস্তোরায় রান্নাবান্না হচ্ছে, এর মাঝেই ভূমিকম্প হচ্ছে- মানুষজন নির্বিকার। কারণটা হচ্ছে- জাপানে প্রতিবছর প্রায় ১৫,০০০ ভূমিকম্প হয়! ব্যাপারটি নিত্যদিনের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটি তাদের জন্য এখন গা সওয়া একটি ব্যাপার! তাদের বাড়িঘরগুলোও সেভাবেই ভূমিকম্প প্রতিরোধের উপযোগী করে তৈরী, তাই এত বিপুল পরিমাণ ভূমিকম্পেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় তুলনামূলক অনেক কম।

জাপানে সামাজিক বন্ধনগুলো খুব দৃঢ়। বিভিন্ন সমস্যায় সবাই মিলে একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমাধানে। জাপানের প্রতিটি মোবাইল ফোনে একটি ইমার্জেন্সি এলার্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করা থাকে। যে কোন দুর্যোগ বিপর্যয়ে এই এলার্মগুলো বেজে ওঠে সবার মোবাইলে (সাউন্ড অফ করা থাকলেও!) এবং মুহূর্তের মাঝে চলে যায় মেসেজ- এই দুর্যোগ মোকাবিলায় কি কি পদক্ষেপ নিতে হবে তাদের সেটি জানিয়ে। একবার একটি মজার ঘটনা ঘটেছে। সুনামি আর ভূমিকম্পের আঘাতে বিপর্যস্ত পুরো জাপান, আক্রান্ত জনপদের কাছে খাদ্য, চিকিৎসা, সেবা ইত্যাদি পৌঁছে দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, এমন সময় জনগণের সেবায় মাঠে নেমে এলো কুখ্যাত জাপানি মাফিয়া গোষ্ঠী- ইয়াকুজা! তাদের সংঘবদ্ধতা এবং পেশাদারিতা পুলিশের চেয়ে ঢের বেশি, দেখা গেল দুর্গম সব লোকালয়ে সরকারি সাহায্য পৌঁছানোর অনেক আগেই পৌঁছে গেছে তাদের ত্রাণ! এভাবেই দুর্যোগ আর বিপর্যয়ে গোটা জাতি যখন দুরবস্থায় পড়ে, ভাল খারাপের সীমানাটা তখন মুছে যায়, মুখ্য হয়ে উঠে একমাত্র পরিচয়- “আমরা সবাই জাপানি, আমার জাপানি ভাইয়ের জন্য আমি সবার আগে প্রাণ দেবো।” তাই তো যুগে যুগে পারমাণবিক বোমার আঘাত সহ নানা ভয়াবহ আক্রমণের ধাক্কা সইয়েও আজ জ্ঞানে-কল্যাণে-প্রযুক্তিতে সাফল্যের শীর্ষে ছোট্ট এই দেশটি, পৃথিবীবাসীর কাছে ভালবাসা এবং শ্রদ্ধামিশৃত বিস্ময়ের একটি নাম- জাপান!

 

 

 

 

Sharing is caring!

(Visited 1 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *